প্রতিবেশীর জানালা
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। কবি ও পরিচালক। কবি-পরিচয়ের সূত্রেই তাঁর সঙ্গে আলাপ সুবিমল বসাকের, ক্রমে বন্ধুত্ব। সুবিমল বসাকের থেকে বছর পাঁচেকের ছোট বুদ্ধদেব (জ. ১৯৪৫)। উভয়ের আলাপ সম্ভবত ছয়ের দশকের শেষদিকে। উভয়ের খালাসিটোলার স্মৃতি সম্পর্কে সুবিমল লিখছেন—
‘ফি-শনিবার বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত লেকচার শেষ করে খালাসিটোলায় আসত, সঙ্গে কবি সুব্রত চক্রবর্তী, দুজনেই অধ্যাপনা করে বর্দ্ধমানে। হাওড়া স্টেশনে নেমে সরাসরি কেটিতে। ‘কল্প-নির্জর’ ফিল্ম-পত্রিকায় বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের একটি লেখায় হাংরি জেনারেশনের ভাবনাচিন্তা, লেখালেখির উল্লেখ ছিল, আমাদের স্বপক্ষে। বুদ্ধদেব এবং সুব্রত দুজনেই তখন কবিতার ভাষা অন্বেষণে মগ্ন। ভেতরে কাউন্টারের পাশে দাঁড়িয়ে পান-রত কমলবাবুর বৃত্তে ঢুকে পড়ত তারা। নানাধরনের আলোচনা। বুদ্ধদেব তখন ফিল্ম নির্মাণের ব্যাপারে অত্যুৎসাহী। সঙ্গে থাকত প্রিতম মুখোপাধ্যায়, অরণি বসু, অলোকনাথ মুখোপাধ্যায়। প্রিতম, অরণি, অলোককে বড় একটা পান করতে দেখা যেত না, কেটিতে ওদের হাজিরীও ছিল কম। সেলিব্রেটি হবার পর বুদ্ধদেবের যাতায়াত স্তব্ধ হয়, অসুবিধে ছিল, সময়ের অভাব ছিল। অধ্যাপনার কাজে ইস্তফা দিয়ে পরিপূর্ণ ফিল্ম-সংক্রান্ত ব্যাপারে যুক্ত হয়ে পড়ে। বহুদিন পর, রাসবিহারী ফ্ল্যাটে আড্ডা মারার সময় খালাসিটোলার প্রসঙ্গ উঠতে বুদ্ধদেব জানতে চায়— তুমি এখনও যাও সুবিমল? স্বীকৃতি জানাতে ওর মুখে চকিত ছায়া— কতদিন যাওয়া হয়নি। মাঝে মাঝে ভয়ানক ইচ্ছে হয় সেখানে যেতে, পুরনো দিন খুঁজে পেতে।
: গেলেই হয়। চলো না, একদিন সকলে মিলে ঢুঁ মারি।
: তা আর সম্ভব নয়।
: কেন নয়? তুমি একটা টুপি পরে নেবে, চোখে কালো চশমা, আর একটা পুরুষ্টু গোঁফ। লাইনে মেক-আপ ম্যান আছেই। অসুবিধে হবে না।
আমরা একসঙ্গে শেষ হুল্লোড়বাজী করি সাতের দশকে গোড়ার দিকে। পঁচিশে বৈশাখে চিৎপুর থেকে সোজা খালাসিটোলায়। দল বেশ ভারি ছিল। বুদ্ধদেব, সুব্রত, ভাস্কর চক্রবর্তী, অলোকনাথ, ত্রিদিব মিত্র, প্রিতম ও অরণি।…’
আরও পড়ুন: ‘বাংলা ভাষার কেন্দ্রবিন্দু কোলকাতা’, কেন সুবিমল বসাককে চিঠিতে
এ-কথা লিখেছিলেন সুবিমল বসাক?
সুবিমলের সংগ্রহে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত-র তিনটি ছোটো চিঠি খুঁজে পেয়েছি, তিনটিই লেখালিখি-সংক্রান্ত। ‘আবহ’ পত্রিকার জন্য লেখা সংগ্রহ করতেন সুবিমল, সেই কবি-লেখকদের তালিকায় ছিলেন বুদ্ধদেবও।
৩১.৩.৭৫
ভাই,
সুবিমল—
তিনটি লেখা পাঠালাম। দেরী হলো বলে মাফ্ চাইছি। —পেয়েই চিঠি দেবেন, প্রাপ্তি স্বীকার না জানলে চিন্তা থাকলে, কপি নেই। আর দয়া করে প্রুফ্টা নিজে দেখে নেবেন।
একটা বিশেষ ব্যাপারে আপনাকে দরকার। হয়তো সাহায্য করা আপনার পক্ষে সম্ভব হবে। চিঠি দিয়ে জানাবেন। Duke হলে ভালো হয়। অশেষ ভালোবাসা,
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

তিনটি পাঠালেও, ‘আবহ’ পত্রিকার বৈশাখ ১৩৮২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় একটিই কবিতা— ‘তারপর’। অবশ্য এর আগেও ‘আবহ’-তে (বৈশাখ ১৩৭৯) বুদ্ধদেবের কবিতা ‘হাসপাতাল, হাসপাতাল’ প্রকাশিত হয়েছে। বুদ্ধদেব চিঠি লেখার পরদিনই, চাঁদনি চকের পানশালা ডিউক-এ সুবিমলের সঙ্গে দেখা তাঁর। সুবিমল ডাইরিতে লিখছেন (১.৪.৭৫)— ‘… সেখানে দেখা হয়ে গেল— বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে। ও জানালো, লেখা পাঠিয়ে দিয়েছে এবং আমার সঙ্গে নাকি জরুরী দরকার আছে— বোম্বের কমলেশ্বরের ব্যাপারে। পরে কথা হবে।’
চিঠি পাওয়ার পর, ৪ এপ্রিল আবার ডিউক-এ যান সুবিমল। ডাইরিতে সেদিনের এন্ট্রি— ‘Duke এ এসে শুনলুম, বুদ্ধদেব গত দু’দিন এসেছিল। আজ আমি অনেকক্ষণ রইলুম— কিন্তু, ওর পাত্তা নেই। জানিনা, কি ভেবে রেখেছে।’ পরের দিনও সুবিমল গিয়ে বুদ্ধদেবের দেখা পাননি। ডাইরির অনেকগুলো পাতা উল্টেও এরপর আর তাঁদের দেখা হওয়ার খবর পাওয়া গেল না। ফলে, বুদ্ধদেবের ‘বিশেষ ব্যাপারে দরকার’-এর বিষয়টি অনেকাংশেই অজানা থেকে গেল।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের পরের চিঠিটি ১৯৭৬ সালের মার্চ মাসের—
৫/৩/৭৬
প্রিয় সুবিমল,
ডাকবিভাগের দক্ষতায় তোমার চিঠি অনেক দেরীতে পেলাম।
গত সংখ্যার আগের সংখ্যায় তুমি যখন ‘আবহ’র জন্য কয়েকটি লেখা চেয়েছিলে, আমি তোমাকে দুটি লেখা পাঠাই, যার একটা প্রকাশিত হয়। অন্যটি কোথায়? তুমি কি জানো যে আমার কোন কপি থাকে না! লেখাটি হারালো।
যাই হোক, আবার লেখা পাঠালাম। নতুন লেখা। পাওয়ামাত্র প্রাপ্তিস্বীকার করে চিঠি দিও।
শ্রী রেণু’র অনুবাদের বইটি (তিসরী কসম) অসম্ভব, অসম্ভব ভালো হয়েছে। তুমি একটা দারুণ কাজ করেছো।
ভালোবাসা,
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

ডাইরিতে সুবিমল লিখছেন (৯.৩.৭৬)— ‘দুপুরে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কবিতা ও চিঠি পেলুম। আবহের জন্য। লিখেছে ‘তিসরী কসমের’ অনুবাদ অসম্ভব-অসম্ভব ভালো হয়েছে। ওকি পড়েছে? নাকি, দেশ থেকে রিভ্যু করতে নিয়েছে— কে জানে? তবে, অনুবাদ করে আমি satisfied— সেটা যথার্থ।’
১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ফণীশ্বরনাথ রেণু-র ছোটোগল্পের সংকলন ‘তিসরী কসম’ বেরোয়, সুবিমল বসাকের অনুবাদে। চিঠিতে সে-বইয়েরই উল্লেখ করেছেন বুদ্ধদেব। অন্যদিকে, বুদ্ধদেবের পাঠানো কবিতাগুলির একটি, ‘ঘামাচি-মানুষের গল্প’, প্রকাশ পায় ‘আবহ’ পত্রিকার শারদ সংকলন ১৩৮৩-তে।
পরের চিঠিটিও একই বছরের। সুবিমল আবার ‘আবহ’-র জন্য লেখা চেয়ে চিঠি দিয়েছিলেন, তারই উত্তর—
ভাই সুবিমল,
তোমার চিঠি পেয়ে খুব ভালো লাগলো।
কিছুদিন ধরেই আমার শরীর একেবারেই ভাল নেই। তাছাড়া এত বেশী কাজের চাপ পড়েছে যে সময় পাচ্ছি না। আমি কথা দিচ্ছি সামনের সংখ্যায় একটা ‘অসাধারণ গদ্য’ লিখবোই লিখবো তোমার জন্য। এ সংখ্যায় ভাই, কবিতা নাও। আর, একটু ভালো করে ছেপো।
তোমার একটি বই কিনেছি। নতুন যে বইটি বেরিয়েছে ‘প্রতিবেশীর জানালা’, পেতে চাই তোমার কাছ থেকে। আমি খুব আগ্রহী। ভালো কথা তুমি ‘Sunday’তে হিন্দি সাহিত্য বিষয়ে লিখতে পারো, ওরা চাইছে।
বুধবার ১৮/৮ ‘Roxy Miniature’এ আবার আমার ছবি হবে, ৫টায়। এসো অসিতবাবুকে নিয়ে। চিঠি দিও।
ভালোবাসায়,
বুদ্ধদেব
১৪.৮.৭৬
পুনশ্চ।। লেখা প্রাপ্তিস্বীকার করে এক লাইন অতি অবশ্যই জানাতে ভুলবে না। চিন্তায় থাকবো।

‘আবহ’ পত্রিকার শারদ সংকলন ১৩৮৩-তে প্রকাশ পায় বুদ্ধদেবের পাঠানো কবিতাটি, নাম— ‘ঘামাচি-মানুষের গল্প’। ডাইরি থেকে জানা যায়, ১৮ তারিখ বুদ্ধদেবের সিনেমাটি দেখতে গেছিলেন সুবিমল। কিন্তু কোন সিনেমা? তার উল্লেখ নেই। চিঠিতে উল্লিখিত ‘অসিতবাবু’ হলেন ‘আবহ’-র সম্পাদক অসিত গুপ্ত।
বেশ কয়েকমাস পেরিয়ে, ডাইরিতে আবার বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের উল্লেখ (২৫.১০.৭৬)— ‘বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে দেখা Coffee House। ও বললো, Feature Film করার ইচ্ছে। একটা Documentary-ও। আমাকে হিন্দী ডায়লাগের ব্যাপারে কিছু সহায়তার কথা বলেছে। বলেছি, করে দেবো।’
কয়েক বছর এগিয়ে যাওয়া যাক। ততদিনে ‘নিম অন্নপূর্ণা’ বেরিয়ে গেছে। ৪ এপ্রিল ১৯৮০, বুদ্ধদেবের বাড়িতে হাজির সুবিমল। ওই তারিখের ডাইরির এন্ট্রি—
‘… ভেতরের ঘরে, বুদ্ধদেব বসে লিখছিল— কে জানে চিত্রনাট্য কিনা। অনেক বই দেখলুম আলমারীতে। ‘গেরিলা-আক্রোশ’ ওকে দেয়া হয়নি, উপহার দিলুম। বুদ্ধদেব জানালো, গল্প পাচ্ছি না মোটেই। প্রেমচন্দের ‘পঞ্চ-পরমেশ্বর’ গল্পটির কথা বললুম। শুনে বললো— আমার subject নয়। অবশ্য ওর বিষয় নয়, এটা ঠিক।…
প্রথম দিকে একটু আড়ষ্ট ভাব ছিল; পরে বুদ্ধদেব সহজ-স্বাভাবিক হলো। গল্প হলো অনেকক্ষণ।…’
১১ জুলাই ১৯৮০-র ডাইরি। ‘রাত্রে রেডিয়ো সংবাদে জানা গেল, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘নিম অন্নপূর্ণা’ কারলো-ভি-ভ্যারিতে পুরস্কৃত হয়েছে। পুরস্কার পাবার মত বই, কিন্তু এখান থেকে না-পাঠালেই অসুবিধে হতো। এই পুরস্কারের সংবাদে আরও খুশী এই কারণে যে ঐ ছবিতে আমাদের প্রিতম ওরাও যুক্ত আছে।’ ‘নিম অন্নপূর্ণা’-র কাহিনিকার কমলকুমার মজুমদার হলেও, চলচ্চিত্রের কাহিনি-বিন্যাসে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে ছিলেন ‘উলুখড়’ পত্রিকার সম্পাদক, গল্পকার প্রিতম মুখোপাধ্যায়ও।
দুদিন পরে, বুদ্ধদেবকে একটি ছোট্ট চিঠি লেখেন সুবিমল। তার খসড়াটি পেয়েছি আমরা—

প্রিয় বুদ্ধদেব,
প্রথমে রেডিয়োয়, পরে, সংবাদপত্রে ‘নিম-অন্নপূর্ণা’র পুরস্কার প্রাপ্তির সংবাদ পড়লাম। এই সৃষ্টি, যেহেতু আমাদের প্রজন্মের একজনের— সহমর্মী হিসেবে স্বভাবতই সেই গৌরবের আমিও অংশীদার।
ভালোবাসা জেনো।
সুবিমল
কলকাতা-৫৬
১৩ই জুলাই ’৮০
এই চিঠির জবাব কি বুদ্ধদেব দিয়েছিলেন? আমরা জানি না। তবে এর পরেও একাধিকবার তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে সুবিমলের। ১৩ মার্চ ১৯৮১, বেলঘরিয়াতেই আবার হঠাৎ-দেখা। ‘… রেলওয়ে ক্রসিং-এর ধারে গাড়ীতে বুদ্ধদেব বসে। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। ঘুটুর কাছে যাচ্ছে। ওর ছবি ‘দূরত্ব’ রীলিজ করছে ২১ মে। কাল প্রেস কনফারেন্স আছে প্রেসক্লাবে। বার বার যেতে বললো। প্রায় তিনবছর হলো ছবিটা হয়ে পড়ে আছে। আমি অবশ্য ইতিপূর্বে দেখেছি। ওর প্রথম ছবিতে কিছু ভুল-ত্রুটি আছে— সময়, ক্যামেরা ইত্যাদির কাজে।’
বুদ্ধদেবের অনুরোধে, পরদিন (১৪ মার্চ) প্রেস ক্লাবে যান সুবিমল। ‘বিকেলে বুদ্ধদেবের প্রেস কনফারেন্স-এ হাজির হলুম। বুদ্ধদেব মোটামুটি ফিল্ম তৈরীর ব্যাপারে নতুন পরিচালকদের অসুবিধের কথা-সমস্যা বললো। ‘দূরত্বের’ নায়ক প্রদীপ গিয়েছিল। দূরত্ব প্রায় বছর তিনেক বাদে release করছে।’
এছাড়াও সুবিমলের ডাইরিতে, ১৯৮০-’৮১-’৮২-র পরিসরে, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত সম্পর্কে কিছু টুকরো মন্তব্য নজর টানে। ‘বন্ধুদের সে এখনও ভুলে যায়নি’ থেকে ‘আমাদের বন্ধু ছিল একসময়’ হয়ে দেখা হওয়ার পর কথা না-বলায় ‘আমার খুব খারাপ লাগলো’-পর্যন্ত সেই যাত্রা ধীরে-ধীরে বুদ্ধদেবের খ্যাতিবৃদ্ধি ও সুবিমলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ার দিকেই ইঙ্গিত করে। পরবর্তী ডাইরিগুলি ঘেঁটে দেখার ইচ্ছে জাগেনি আর।
এর পরের যে-ব্যক্তির চিঠি আলোচিত হবে, তিনি হাংরি আন্দোলনের প্রথমদিকের সদস্যদের মধ্যে অন্যতম এবং এখনও জীবিত। সুবো আচার্য। তাঁর একটিমাত্র চিঠিই খুঁজে পেয়েছি সুবিমলের সংগ্রহে।

প্রিয় সুবিমল,
দীর্ঘদিন আগে তোমার Book Post, চিঠি পেয়েছিলাম এবং কাল একটা কার্ড পেলাম। তোমার ‘ছাতামাথা’ পড়েছি, তোমার পক্ষে সম্ভব হলে ঐ ধরনের কিছু কার্ড এবং তোমার বইয়ের কিছু কপি পাঠাতে পারো, না, বিক্রীর জন্যে নয়, বরং Publicity-র জন্যে বলতে পারো।
তোমার বই আমার খুব ভালো লেগেছে, অত্যন্ত দুঃসাহসিক প্রয়াস, বাংলাদেশে ঠিক এইভাবে লেখার কথা কেউ ভাবেনি, একআধ জায়গায় ভাষার ভুল চোখে পড়লো, একআধবার সুভাষকে মনে পড়ে কিন্তু সামগ্রিক মৌলিকতা অবশ্যই অভিনন্দনযোগ্য; এরকম নতুন লেখা আমাদের সময়ে খুব কম দেখা যাচ্ছে, তবে, তোমার নিজের কথা আরও অনেক লেখা উচিত ছিল, তাহলে সম্পূর্নতা আসতো।
কোলকাতায় ঠিক এইমুহূর্তে লেখালিখির খবর কি? কোনো Magazine পাইনা এখানে, মলয় একআধটা পাঠালে কিছুটা দেখতে পাই, কিন্তু দীর্ঘদিন এক অদ্ভুত, বিরামহীন শূন্যতা অনুভব করছি, মাথা খালি, খারাপ লাগা ছাড়া আর কোনো বোধ নেই, আরও কতোদিন বেঁচে থাকতে হবে কে জানে।
ভালবাসা জেনো,
সুবো আচার্য
৩০.১.৬৬

বালাজু, নেপাল, ১৯৬৭
১৯৬৫-র জুন মাসে প্রকাশ পায় সুবিমলের প্রথম গ্রন্থ ‘ছাতামাথা’। সেই বই-ই সুবোকে পাঠিয়েছিলেন সুবিমল। তাছাড়া, একটি বিজ্ঞাপনী কার্ডও ছাপা হয়েছিল— ছাতামাথার বিজ্ঞাপন হিসেবে। সেই কার্ডের কথাই উল্লেখ করেছেন সুবো। তাঁর এই চিঠি সম্পর্কে ডাইরিতে সুবিমলের বক্তব্য (১.২.৬৫)— ‘আজ আবার সুবো’র একটা চিঠি এলো— এই প্রথম। ছাতামাথার প্রশংসা করে লিখেছে। আমার মনে হয়, কার্ডটা কাজে দিচ্ছে।’ সুবো আচার্য সম্ভবত সেই সময়ে ত্রিপুরায়। সেখান থেকেই লেখা এ-চিঠি।

শেষ যে-ব্যক্তির চিঠি দিয়ে এ-পর্ব শেষ করব, তিনি কবি কাঞ্চন মুখোপাধ্যায় ওরফে কাঞ্চন কুমার। সুবিমলকে লেখা তাঁর অনেকগুলি চিঠির মধ্যে থেকে একটিই তুলে ধরা হল—
ডি৫৭/৯০ ডি নারায়ণ নগর
বারাণসী – ১
৪.১.৭০
প্রিয় সুবিমল,
তোমার চিঠি পেলাম। মলয়ের লেখার ‘কজ’ হয়তো শেষ হয়ে গেছে। যোনি-কেন্দ্রিক লেখার রোমান্টিসিজম যোনী পাওয়ার পরও বজায় সকলের নাও থাকতে পারে। এজন্যে দুঃখ করে লাভ আছে কি? ওর মনোটনাস প্রলাপ বন্ধ হওয়ায় আমাদের ভালই লাগছে। তারপর তুমি কবে লেখা বন্ধ করছ? তোমাদের হাংরি ফ্যাক্টরির লেখাগুলোর আর কি কোন রেলিভ্যন্স আছে। উঃ মালা, ওঃ বেলা, ওঃ শুভা তো অনেক হ’ল— ঐ শীৎকার ভাসিয়ে আর কতকাল চলবে?
‘প্রতিদ্বন্দী’তে যদি একই ধরণের ‘ট্র্যাশ’ ছাপো তাহলে আমায় পাঠিও না। ন্যাকামো আর ভাল লাগাছে না।
আশাকরি ভাল আছো।
প্রীতি ও শুভেচ্ছা নিও।
ইতি—
কাঞ্চন মুখোপাধ্যায়

হাংরিদের লেখালিখি সম্পর্কে এত তীব্র সমালোচনা আর-কোনও চিঠিতে চোখে পড়েনি। সে-কারণেই এটি উল্লেখযোগ্য। মলয় রায়চৌধুরী ১৯৬৮ সালে ঘোষিতভাবে লেখালিখি ছেড়ে দেন (আবার লেখায় ফেরেন ১৯৮৪-তে)। সেই সংক্রান্ত ‘কজ’-এর কথাই কাঞ্চনকে জানিয়েছিলেন সুবিমল। ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’— সুবিমল বসাক সম্পাদিত পত্রিকা।
বিগত ২৮ নভেম্বর ২০২৫, ৮৯ বছর বয়সে প্রয়াত হন কাঞ্চন কুমার।
(ডায়েরি ও চিঠির বানান অপরিবর্তিত)
ছবি সৌজন্যে: তন্ময় ভট্টাচার্য




