পরিচয়ের ঊর্ধ্বে

২০১৮ সালের নভতেজ সিং জোহর ভার্সাস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া  মামলাতেই সুপ্রিম কোর্ট ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারার সেই অংশকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে, যা প্রাপ্তবয়স্কদের পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা সমকামী সম্পর্ককে অপরাধ বলে গণ্য করত। এই মামলায় যে আইনজীবী লড়ছিলেন, তিনি ও তাঁর সহকারী অন্যান্য আইনজীবীদের সঙ্গে আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তাঁদের যুক্তির কেন্দ্রে ছিল ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নম্বর (সমতার অধিকার), ১৯ নম্বর (স্বাধীনতার অধিকার) এবং ২১ নম্বর (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার) অনুচ্ছেদ। তাঁরা আদালতকে বোঝান যে, যৌন অভিমুখিতা কোনও অপরাধ নয়, বরং একজন মানুষের ব্যক্তিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ, এবং সংবিধান সেই সত্তাকেই সুরক্ষা দেয়। সুপ্রিম কোর্ট সেই যুক্তি মেনে নেয় এবং রায়ে স্পষ্টভাবে জানায়, সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার রক্ষাকবচ। এই রায়ের গুরুত্ব শুধু আইনি পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল ভারতের সামাজিক ইতিহাসেও এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। দীর্ঘদিন ধরে যে মানুষগুলো আইনের চোখে অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হয়েছিলেন, এই রায়ের মাধ্যমে তাঁরা প্রথমবার পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা লাভ করেন। এছাড়া T.S.R. Subramanian v. Union of India মামলায় এই আইনজীবীই প্রাক্তন ক্যাবিনেট সচিব টি.এস.আর. সুব্রহ্মণ্যম-সহ একাধিক অবসরপ্রাপ্ত শীর্ষ আমলার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। এছাড়া তিনি শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচার সংক্রান্ত বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রশ্নেও কাজ করেছেন। Right to Education Act কার্যকর হওয়ার পর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির অধিকার, সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেই সম্পর্কিত আইনি আলোচনাতেও তিনি যুক্ত ছিলেন। এই সমস্ত মামলায় তাঁর যুক্তির একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল, সংবিধানকে কেবল আইনের একটি কাঠামো হিসেবে নয়, বরং নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদার জীবন্ত দলিল হিসেবে ব্যাখ্যা করা। তাঁর আইনচর্চা তাই শুধুমাত্র আদালতে জয়লাভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বারবার এই প্রশ্ন তুলেছে যে, রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের ভিত্তি কতটা ন্যায়, কতটা স্বাধীনতা এবং কতটা মর্যাদার উপর দাঁড়িয়ে আছে। তিনি ন্যাশনাল ল স্কুল অফ ইন্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী। তিনি রোডস স্কলারও ছিলেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ভারত, পাকিস্তান এবং নেপালে সংবিধান। তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিআর অম্বেডকর রিসার্চ স্কলার এবং লেকচারারও ছিলেন। শিক্ষকতা করেছেন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়, টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে।

আচ্ছা, এই এরকম ঝলমলে একটা কেরিয়ার গ্রাফ দেখে নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে, আইনজীবীর নাম কী? স্বাভাবিক। আইনের ক্ষেত্রে তাঁর দাপিয়ে বেড়ানো মুন্সিয়ানা তো শ্রদ্ধা করার মতোই। তাঁর সাহস কুর্নিশ যোগ্য।

তাঁর নাম মেনকা গুরুস্বামী!

আরও পড়ুন: জম্মু-কাশ্মীরের রঞ্জি ট্রফি জয় বদলে দিল ক্রিকেটীয় ক্ষমতার বিন্যাস!
লিখছেন সোমক রায়চৌধুরী…

এবার নিশ্চয়ই শ্রদ্ধার পাল্লা হুউউস করে নেমে গিয়ে তীব্র অনীহা হচ্ছে এর সম্পর্কে? এঁর ঝলসানো ব্যক্তিত্ব ম্রিয়মান হয়ে তীব্র হয়ে উঠেছে তাঁর যৌন পরিচয়। হ্যাঁ, ইনিই সেই সমকামী আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী। যাঁকে কোর্ট চত্বরে আইনজীবী বা বিচারকের বিরুদ্ধে লড়ার চেয়েও নিয়ত অনেক বড় তীব্র লড়াই লড়তে হয় সমাজের বিরুদ্ধে, তার সমকামী পরিচয়ের জন্য সম্মান কেড়ে নিতে।

মেনকা গুরুস্বামী হঠাৎ করেই একজন মানুষ থেকে একটি প্রতীকে পরিণত হলেন। তিনি আর শুধু একজন আইনজীবী নন, তিনি হয়ে উঠলেন একজন সমকামী আইনজীবী। যেন তাঁর বহু বছরের অধ্যবসায়, তাঁর সাংবিধানিক বোধ, তাঁর পেশাগত লড়াই এবং আদালতে দাঁড়িয়ে গড়ে তোলা বিশ্বাসযোগ্যতা, সবকিছু মিলিয়ে যে পরিচয় তৈরি হয়েছিল, তা একটি মাত্র শব্দের নিচে সংকুচিত হয়ে গেল।

তিনি যখন ঐতিহাসিক মামলাগুলো লড়ছিলেন, তখন অনেকে ইতিহাস রচনা হতে চলেছে, এমন মতও পোষণ করেছিলেন। অথচ একটা বড় অংশের কাছে তাঁর সমকামিতা হয়ে উঠল মুখ্য বিষয়, গৌণ হয়ে গেল, তাঁর কৃতিত্ব, তাঁর দক্ষতা, তাঁর কর্মজীবন। আমরা সবাই জানি যে কারও যৌন-অভিমুখ কখনও তাঁর একমাত্র পরিচয় হয়ে উঠতে পারে না। কর্মদক্ষতার ক্ষেত্রে তো নয়ই। কিন্তু এই বিষয়টা নিয়েই মাতোয়ারা হয়ে উঠবে সমাজ। কোনও সমকামীর বুদ্ধিবৃত্তি কিংবা কর্মক্ষমতা, এমনকী দৈহিক সুস্থতা বা ক্ষমতাও যে তাঁর যৌন-অভিমুখ নির্ধারণ করে না, তা-ও আমরা জেনে গিয়েছি। কিন্তু আমরা মন থেকে তা মেনে নিইনি। কারণ, ঐতিহ্য ও ধর্মের দোহাই দিয়ে আমরা নিজেদের অক্ষমতাকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করেছি প্রতিনিয়ত এবং করে চলেছি। সমাজ আমাদের যে ভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে, সেই ভাবেই আমরা চলেছি। এবং আমরা ভিন্নতাকে বুঝেও বুঝছি না। কারণ? কারণ একটাই, বাদ পড়ার ভয়। মেনকা গুরুস্বামী যেমন সমালোচনা ও ঘৃণার শিকার হচ্ছেন, তেমনই যদি সমকামীকে সমর্থন করার জন্য ‘মূল’ সমাজ আমাদের বাদ দিয়ে দেয়, তাহলে সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে রুলবুক না মেনে একলা হয়ে যাওয়ার ভয়।

আমরা ভাবছি না। সমাজ বলতে কেন কিছু প্রাচীন বলে দেওয়া নীতি মেনে আমরা চলব। আমরা ভাবছি না, কেন সমাজটা সবাইকে একটাই গন্ডির মধ্যে সবাইকে নিয়ে চলবে না। একজনের যৌন-অভিমুখ আমার চেয়ে আলাদা বলে, সে কেন মানুষ হিসেবে কমতি হবে? কারণ সাধারণ মানুষের যা যা বৈশিষ্ট্য, সে তো সবই তার মধ্যেও বিদ্যমান। এ কথা আমরা মানব না। আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রথার পক্ষে সওয়াল করে নিজের জায়গা আরও পাকা করার চেষ্টা করব। তাহলে ভয়টা কার বেশি হচ্ছে আসলে? সমকামী মানুষের না কি বিষমকামী সংখ্যাগরিষ্ঠের? একথা কখনও আমরা নিজেদের মন ও মননকে প্রশ্ন করব না। এখানেই সংখ্যাগরিষ্ঠের আসল হেরে যাওয়া। সে বিচার করার বোধ সমাজ তাকে তৈরি করতে দেয়নি।

মেনকা গুরুস্বামী

ফিরে আসি, মেনকা গুরুস্বামীর কথায়। তাঁকে নিয়ে এত আলোচনা করার একটা মূল বিষয় হল, পশ্চিমবঙ্গের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে তিনি এবছর রাজ্যসভার প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু মানুষ আলোচনা করছে তাঁর সমকাম বিষয়ে। কেউ তো একবারও বলছেন না যে মেনকার মতো একজন দক্ষ আইনজীবী সাংসদের উচ্চকক্ষে গেলে কতটা লাভ হবে। তাঁর যৌন-পরিচয়কে হাতিয়ার করে প্রচারে এলো। আমরা হয়তো একজন সমকামী সাংসদ পেয়ে ভবিষ্যতে খুশি হব। ফেসবুকে দীর্ঘ বক্তব্য রাখব। কিন্তু বাস্তবে দুটো ছেলে হাত ধরে হেঁটে গেলে বা চুমু খেলে তো নাক সিঁটকাবো। এটাই বাস্তব, এটাই আসল প্রতিচ্ছবি।

মেনকা গুরুস্বামীর ক্ষেত্রে– একজন দক্ষ আইনজীবী, একজন সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ, একজন চিন্তাশীল নাগরিক, এই সমস্ত পরিচয়গুলো ধীরে ধীরে আড়ালে সরে গিয়ে সামনে চলে এসেছে শুধু তাঁর যৌন পরিচয়। আমরা হয়তো তাকে উদযাপন করি, তাকে নিয়ে গর্ব প্রকাশ করি, কিন্তু সেই উদযাপনের মধ্যেও তাকে একটি আলাদা খোপে বন্দি করে রাখি। ফলে ব্যক্তি হিসেবে তাঁর যে বহুমাত্রিকতা, তাঁর যে পরিশ্রম, তাঁর যে অর্জন সেগুলো আর কেন্দ্রস্থলে থাকে না। কেন্দ্রস্থলে চলে আসে তাঁর ভিন্নতা। অর্থাৎ, আমরা তাঁর সাফল্যকে নয়, তাঁর ব্যতিক্রমকে বেশি গুরুত্ব দিই।

তাঁকে নিয়ে এত আলোচনা করার একটা মূল বিষয় হল, পশ্চিমবঙ্গের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে তিনি এবছর রাজ্যসভার প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু মানুষ আলোচনা করছে তাঁর সমকাম বিষয়ে। কেউ তো একবারও বলছেন না যে মেনকার মতো একজন দক্ষ আইনজীবী সাংসদের উচ্চকক্ষে গেলে কতটা লাভ হবে। তাঁর যৌন-পরিচয়কে হাতিয়ার করে প্রচারে এলো। আমরা হয়তো একজন সমকামী সাংসদ পেয়ে ভবিষ্যতে খুশি হব। ফেসবুকে দীর্ঘ বক্তব্য রাখব। কিন্তু বাস্তবে দুটো ছেলে হাত ধরে হেঁটে গেলে বা চুমু খেলে তো নাক সিঁটকাবো। এটাই বাস্তব, এটাই আসল প্রতিচ্ছবি।

তবে এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে তৃণমূলের এহেন ‘মাস্টারস্ট্রোকে’ বিপাকে দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকরা। ভারতীয় রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সমকামের যে কোনও জায়গা নেই সেটা বেশ স্পষ্ট। অন্তত এই সময়ে সমাজের প্রান্তিক স্তরের জন্য লড়াই করা একজন আইনজীবী, যিনি নিজেকে সমকামী হিসেবে উল্লেখ করেন, তিনি সংসদে গেলে একটা ধারণা আরও স্পষ্ট হবে। ভারতীয় সংস্কৃতির পরিমণ্ডল আরও বড় হবে। আমাদের চেতনা কতটা বিকশিত হবে সেটা নিয়ে সন্দেহ থেকে যাবে তবে এই যে প্রথা ভাঙার খেলা, এই খেলা দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বেনজির দৃশ্য স্থাপন করবে।

এবার আমাদের মানসিকতার অন্ধকার দিকটা দেখুন। আমরা কিন্তু বলছি, ‘তৃণমূলের মাস্টারস্ট্রোক’, মানে এখানেও ঔদার্যের পরিচয় দিতে গিয়ে আমরা তাঁকেই ছোট করছি। কেন ভাবতে পারছি না যে তিনি একজন দক্ষ আইনজীবি হিসেবেই তাঁর যোগ্যতা অর্জন করেছেন। তবে, এটাও ঠিক, আমরা জানি না যে মেনকা গুরুস্বামীকে তৃণমূল সমকামী আইনজীবি না কি দক্ষ আইনজীবি, কোন তকমায় পাঠিয়েছে প্রার্থী হিসেবে। তবে অন্যরকম পদক্ষেপ হিসেবে সাধুবাদ প্রাপ্য।

মেনকা গুরুস্বামী সংসদে গেলে হয়তো ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হবে। কিন্তু তার থেকেও বড় প্রশ্ন, আমাদের মানসিকতার ইতিহাসে কোনও পরিবর্তন ঘটবে কি? আমরা কি তাঁকে একজন সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে মনে রাখব, না একজন সমকামী সাংসদ হিসেবে? উত্তরটা মেনকার কাছে নেই। উত্তরটা লুকিয়ে আছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই।