বাংলার বাইবেল: পর্ব ৫

Representative Image

ইস্ট ওয়েস্ট দ্বন্দ্ব

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ খোলা হবে। তাই সহ-অধ্যক্ষ অ্যাংলিকান পাদ্রী ক্লডিয়াস বুকানন সাহেব সমগ্র ভারত খুঁজে বিরল বই, পাণ্ডুলিপি ও প্রাচীণ নথি-নিদর্শন জোগাড় করতে বেরিয়ে পড়েছেন। ঘুরতে-ঘুরতে সাহেবের চোখ পড়ল ভারতের প্রাচীন সিরিও খ্রিস্টানদের কাছে সু-সংরক্ষিত একটি গ্রন্থের ওপরে। গ্রন্থটির লিপি প্রাচীন মাত্রা বিবর্জিত সিরিয়্যাক এস্ত্রাংগেলো। বুকানন সিরিয়্যাক না জানলেও, গ্রন্থটির মূল্য বুঝতে ভুল করেননি। তিনি দু’এক নজরেই বুঝে নেন এটি দুর্মূল্য। এ’টি আদতে হিব্রু বাইবেলের এক প্রাচীন সিরিয়্যাক অনুবাদ। ভাষায়, বাক্যে, গঠনে এর সঙ্গে পশ্চিমি বাইবেলের অমিল অনেক। কিন্তু সিরিওদের কাছে এই বাইবেল অমূল্য, প্রামাণ্য ও পবিত্র। এর নাম ‘পেশিট্টা’। বুকানন বলেন, সরকারের নব নির্মিত কলেজের জন্য, এই গ্রন্থটি প্রয়োজন। কিন্তু সাধুরা তাঁদের এই অমোঘ সম্পদ হাতছাড়া করতে অনুৎসাহী। তারপর যা হয়— সরকারি ক্ষমতার ভয়, উৎকোচের প্রলোভন, যেনতেন প্রকারেণ কার্যোদ্ধার ইত্যাদি প্রভৃতি। মোটকথা গ্রন্থটি অচিরেই বুকাননের হাতে আসে, ১৮০৮ সালে কেমব্রিজ পৌঁছয় এবং বর্তমানে কেম্ব্রিজের সংগ্রহশালায় মহাসমারোহে বিজ্ঞাপিত, এবং বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড় প্রবাদের চিরকালীন সত্যতার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে ‘বুকানন বাইবেল’ নামে সুপরিচিত। গ্রন্থটির রচনাকাল স্থির ভাবে নির্ধারিত করা না গেলেও, এ-কথা অনস্বীকার্য যে, ভারতে মাটিতে থাকা এটিই প্রথম অনুদিত বাইবেল।         

বাংলা বাইবেল অনুবাদে বাঙালির ভূমিকা নগণ্য কেন? পড়ুন: বাংলার বাইবেল পর্ব: ৪

তবে ভারতে প্রথম অনুদিত বাইবেল হলেও, এটি ভারতের মাটিতে পৌঁছনো প্রথম বাইবেল নয়। সেটি এসেছে তারও আগে। আর খ্রিস্টধর্ম এসেছে তারও আগে। যিশুর আত্মবলিদান ও পুনরুত্থানের পর পরই তাঁর প্রধান বারোজন শিষ্য নানাদিকে ছড়িয়ে পড়েন তাঁর বাণী-প্রচারে। এই শিষ্যদের মধ্যে পাশ্চাত্যে তাঁর বাণী নিয়ে যান প্রধানত পৌল বা সেন্ট পল, যিনি জীবদ্দশায় তাঁর বিরোধী ছিলেন ও পুনরুত্থানের পরে পরম ভক্ত হন। বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টের প্রথম চারটি গ্রন্থ, যেগুলিকে একসঙ্গে সুসমাচার বা মঙ্গল সমাচার (ইংরিজিতে গসপেল) বলা হয়, তার পরের বইটিই হল শিষ্যচরিত। সেখানে খ্রিস্টধর্মের এই গোড়ার দিকের আখ্যান বলা আছে।

যেটা তেমন ভাবে বলা নেই, সেটা হল প্রাচ্যে তাঁর বাণী নিয়ে আসেন সন্ত থমাস। তিনি মালাবারে আসেন, তাঁর গুরুর কথা বলেন, প্রচুর শিষ্যকে আপন করেন, পথ দেখান এবং শেষে এক স্থানীয় রাজার ঈর্ষার কারণ হয়ে হত হন। তাঁর সমাধিক্ষেত্র ভারতে রয়েছে, এবং সেটি ভারতীয় খ্রিস্টানদের কাছে তীর্থক্ষেত্র। এখন কথা হল এই যে, থমাসের কাছে কোনও বাইবেল ছিল না। তিনি তাঁর গুরুর কাছে যেমন শুনেছেন, তেমন বলেছেন, আর সাধন যেমন শিখেছেন, তেমন শিখিয়েছেন। এই গোটা সময়টিতেও বাইবেলের কোনও উল্লেখ নেই। সুসমাচারেরও উল্লেখ নেই, যেটি নব সন্ধির প্রাচীনতম অংশ। রোমান ধর্মগোষ্ঠীর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইউসেবিয়াস তাঁর খ্রিস্টান ধর্মের প্রথম যুগের ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থে ভারতের পটভূমিকায় এর প্রথম উল্লেখ করেন। তিনি বলেন যে, আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ পেন্টাটিউস ১৯০ খ্রিস্টাব্দে ভারতে আসেন, এবং দেখে বিস্মিত হন যে, মালাবার উপকূলে বসবাসকারী ভারতীয়দের কাছে হিব্রু ভাষায় রচিত মথি লিখিত সুসমাচারের একটি পাণ্ডুলিপি আগে থেকেই রয়েছে। এটি এল কোথা থেকে? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি লোকমুখে যা শুনলেন, তা ব্যতীত প্রমাণ আমাদের কাছে নেই। তিনিও পাননি। প্রাচ্যের খ্রিস্টধর্ম ও তার বিকাশ পাশ্চাত্য খ্রিস্টধর্মের মতো অতটা ভালভাবে ডকুমেন্টেড নয়।             

ক্লডিয়াস বুকানন

তো পেন্টাটিউস যা শোনেন, সেটা এইরকম যে— সাধু থমাসের প্রয়াণের পরে যিশুর সাক্ষাৎ শিষ্য বার্থোলোমিউ এদেশে আসেন এবং মথি লিখিত সুসমাচারের ভিত্তিতে প্রচার-কাজ চালান। তিনিই হয়তো ফিরে যাওয়ার আগে তার একটি হাতে লেখা কপি ভক্তদের কাছে রেখে যান— যত না অবশ্যপাঠ্য হিসেবে, তাঁর চেয়ে বেশি রেলিক হিসেবে। আমার বিচার-বুদ্ধি যা বলে, তাতে এই তত্ত্ব যদি সত্যি হয়, তাহলে সেটি অন্যান্য সুসমাচারের মতো কোইনে গ্রিক ভাষায় লেখা হওয়ার কথা। হিব্রূ কেন? এর সঙ্গে পরবর্তী সিরিয়্যাক পেশিট্টার সম্পর্কই-বা কী? যা প্রারম্ভিক রূপে বহু শতাব্দী ধরে সিরিও সম্প্রদায়ের হাতে-হাতে সুরক্ষিত থাকে; শেষে এসে বুকাননের হাতে পৌঁছয়? কোনও স্পষ্ট উত্তর না থাকলেও, আর এর সঙ্গে আমাদের শুরুর জিজ্ঞাসার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক না থাকলেও, বাইবেলের যাত্রাপথের কিছু কন্টোউর আমাদের বুঝে না নিলেই নয়।          

তাঁর প্রথমটিই হল এই বাইবেল বিষয়টি কী? এ-কথা সর্বজনবিদিত যে, গ্রন্থটিকে আমরা এখন বাইবেল বলে মোটের ওপর চিনি সে’টি দু’মলাটে পাওয়া গেলেও, আসলে একটি একক বই নয়। এর বিভিন্ন অংশের রচনাকাল হাজার বারোশো বছর ধরে ছড়ানো। ভাষাও একাধিক। তাদের মধ্যে পুনরাবৃত্তি, পারস্পরিক উদ্ধৃতি, পুনর্কথন, অভ্যন্তরীণ অনুবাদের ছড়াছড়ি।  খ্রিস্টিয় বাইবেলের জটিল ইতিহাসে না ঢুকেও বলা যায় যে, অসংখ্য সুসমাচার, শিষ্যচরিত ও চিঠিপত্রের মধ্যে একটা সর্বজনগ্রাহ্য রূপ চতুর্থ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ফুটে উঠছিল। নিসিনার ধর্মসভার মাধ্যমে প্রথম তিন শতাব্দীতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা সহমতেও পৌঁছনো গিয়েছিল, কনস্ট্যান্টাইনের উদ্যোগে। আর আলেকজান্দ্রিয়ার মঠের মধ্যস্ততায়। বাকি সম্প্রদায় এই মতের সত্যতা স্বীকার করেন না। হয়তো বলে, হয়তো কৌশলে– বাকিটা উহ্য থাক।   

সন্ত থমাস বা থুমা, প্রাচ্যে খ্রিস্টের দূত

রোমান সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন তখন রাজ্য বাড়িয়েছেন অনেকখানি। বাইজেন্টিয়াম কন্সটান্টিনোপোল হয়ে গেছে। প্রাচ্যে বিস্তারের পথে অনেকটা এগিয়েছেন। পাশ্চাত্যের কাজ তাঁর পুর্বসূরিরা অনেকটাই সেরে রেখেছিল। এখন এই বিশাল সাম্রাজ্যকে এক করতে তাঁর দরকার ছিল একটি শান্তির ধর্ম। গ্রিক ধর্ম ও দর্শনের উর্বর স্রোতে তখন ভাঁটার টান। বলা হয় জাস্টিনিয়ান যখন গ্রিক অ্যাকাডেমিগুলিতে তালা লাগিয়ে দেন, তখন তালা লাগানোর মতো কিছু আর ছিল না। প্লটিনাসের নবপ্লেটোনিয় আধ্যাত্ম ছাড়া নতুন কিছু দেবার নেই। ওরাকেলগুলোর ওপরেও মানুষের বিশ্বাস এসেছে ক্রমে। রোমেও মিথ্রার কাল্ট অনেকটা কমজোরি।

এক্ষেত্রে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ ও প্রচার একটি উৎকৃষ্ট সম্ভাবনা হয়ে দেখা দেয়। তিনি সন্তপ্ত। নিজের জন্য, তাঁর জাতির হয়ে যারা এতদিন খ্রিস্টানদের ওপর অকথ্য অত্যাচার করেছে। আর খ্রিস্টিয় ধর্মতত্ত্বে সন্তাপের স্থান উচ্চে। এই অবস্থায় তিনি দু’টি দরকারি কাজ করেন। তিনি ইউসেবিয়াসকে বলেন খ্রিস্টধর্মের একটি ইতিহাস লিখতে, আর এথেনেসিয়সকে বাইবেলের একটি প্রামাণিক সংকলন প্রস্তুত করতে, যা একাধারে সন্তাপ ও অনুতাপকে পরম ধর্ম হিসেবে তুলে ধরবে, এবং কিছু নৈতিক শৃঙ্খলায় প্রজাদের বাঁধতেও সক্ষম হবে। যেখানে ‘সিজারের প্রাপ্য সিজার বুঝবে, পিতার প্রাপ্য পিতা’।’ দু’য়ের মধ্যে প্রভেদ থাকবে। অর্থাৎ এমন একটা মতাদর্শ, যেখানে ধর্ম ও রাষ্ট্রকে আলাদা করা সম্ভব হবে, যার রসদ রোমীয়ধর্মে সীমিত ছিল।         
কোন সুসমাচার থাকলো, এবং কোনগুলো বাদ গেল, এই নিয়ে নানান কন্সপিরেসি থিওরি আছে। কিন্তু সেগুলো আমাদের বিষয় নয়। তবে সংকলকরা মোটামুটি স্ববিরোধীতা এড়াতে চেয়েছিলেন। চতুর্থ শতাব্দীর শেষে এসে, মোটামুটি চারটে বাইবেল (সংকলন) প্রচলিত ছিল। তার মধ্যে প্রধান ছিল আলেকজান্দ্রিয় ও বাইজেন্টিয় বাইবেল দু’টি। এর মধ্যে প্রথমটি পরে সন্ত জেরোমের ল্যাটিন বাইবেল হয়, ও দ্বিতীয়টি সিরিয় পেশিট্টার রূপ নেয়। যে-দু’টি গোষ্ঠীর বৃহৎ ছাতার— বা ঘরানার নীচে অধিকাংশ গোষ্ঠী একত্রিত ছিল, তা হল পাশ্চাত্য রোমীয় খ্রিস্টধর্ম যার কেন্দ্র ছিল প্রথমে আলেকজান্দ্রিয়া ও পরে রোম, এবং প্রাচ্যের ঘরানা যার মূল কেন্দ্র ছিল সিরিয়ার অ্যান্টিয়োক।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ষিত সিরিয়্যাক ভাষায় লেখা পেশিট্টার একটি পৃষ্ঠা, যার দু’দিকে গ্রিক ও আর্মেনীয় ভাষায় শিরোনাম

আলেকজান্দ্রিয়ার হাতে সংকলনের ভার দিয়ে কন্সট্যান্টাইন আগেই পাশ্চাত্য খ্রিস্ট-ধর্মমতকে খানিকটা এগিয়ে দিয়েছিলেন। এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, বাইবেল একবার নির্দিষ্ট হয়ে যাওয়ার পরেও এত পার্থক্য কেন? এর কারণ বাইবেল কেন্দ্রীয়ভাবে একরকম নির্দিষ্ট হলেও স্থানীয়ভাবে নানান প্রভাব এসে পড়ত। প্রেস তো ছিল না! আবার গোড়ার যুগেও অনেক স্থানীয় অনুবাদ হত। আর সেগুলোর চটজলদি ‘কপি’ও তৈরি হয়ে যেত খুব অল্প সময়ে। প্রথম থেকেই খ্রিস্টিয় সম্প্রদায় গ্রন্থের ওপর বিশ্বাসকে থিতু করতে চেয়েছিল। তেমন একটি হিব্রু অনুবাদ ভারতেও এসে পড়েছিল, হয়তো বার্থোলোমিউর হাত ধরে। অথবা হয়তো তার কোনও স্থানীয় কপি প্রস্তুত করা হয়েছিল। মোট কথা ভারতে বাইবেল অনুবাদ পাশ্চাত্য মিশনারিদের আগমনের আগেই হয়েছে।

ভারতের খ্রিস্টধর্ম পরে খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই প্রাচ্য সিরিও ঘরানার অংশী ছিল। তাঁদের বাইবেল এবং তাঁর ভাষ্যের, উপাসনার এবং যাপনের সঙ্গে তাঁর বহু শতাব্দীর যোগ ছিল। সেইভাবেই সিরিয়্যাক পেশিট্টোও তাঁদের হাতে এসে পড়ে। বুঝে নিতে হবে সিরিও খ্রিস্টান মানে কিন্তু একটি সম্প্রদায় নয়, বরং অনেকগুলি প্রাচ্য-খ্রিস্টিয় সম্প্রদায়ের একটি সামগ্রিক গোষ্ঠী। তাঁরা বাইবেল মানতেন পেশিট্টাকে এবং তাঁর ভাষ্য দিতেন নিজের ভাষায়। তারপর ক্যাথলিকরা এলেন ষোড়শ শতাব্দীতে। সঙ্গে আনলেন ভালগেট। আর হাত পড়ল এই ভাষ্যের অধিকারে।      

কিন্তু ক্যাথলিকরা কেন এলেন? কারণ মার্টিন লুথারের হাত ধরে ইউরোপে আছড়ে পড়েছে প্রোটেস্টান্টিসমের ঝড় এবং ক্যাথলিকরা তাঁদের নিজভূমে খানিক কোণঠাসা। বিশেষ করে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, জার্মানি, ইত্যাদি স্থান ক্রমেই পোপের হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। তাই ক্যাথলিকরা ডানা ছড়ালেন পশ্চিমে ল্যাটিনভূমে আর প্রাচ্যে ভারতে। ভারতে আসা মাত্র এখানকার নেস্টরিয়ান সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাঁদের গোলমাল বাধে। আপাতভাবে এই গোলমালের বিষয় কিছু শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার মতান্তর। কিন্তু আদতে এটি বাইবেলের প্রাচ্য-ভাষ্যের ওপর, সিরিও ভাষ্যের ওপর, পশ্চিমি ভাষ্যের আগ্রাসন। ততদিনে গোয়াতে পর্তুগিজরা তাঁদের ঘাঁটি বানিয়ে ফেলেছেন এবং বাকি মালাবার ও ভারতেও প্রভাব বিস্তারে উৎসুক।   

গোয়ার ক্যাথলিক বিশপ তেলাঙ্গা প্রদেশের উদয়মপুর শহরে (পর্তুগিজ লব্জে ডায়াম্পার) একটি যৌথ মহাসভার ডাক দেন। সময় ১৫৯৯। তার আগের বছরেই ইটালির ট্রেন্ট শহরে ক্যাথলিক প্রধানরা সভা করে তাঁদের মতকে সংঘবদ্ধ করা ও নতুনভাবে পৃথিবীর কাছে উপস্থাপিত করার লক্ষ্যে শপথ নিয়েছেন। পশ্চিমে হারানো জমির এক ইঞ্চিও তাঁরা পূর্বে ছাড়তে রাজি নন। ডায়াম্পারে সভা হয়েছিল, তবে খুব যাকে বলে ‘ফেয়ারলি’ হয়নি। বিশপ কোনও চান্স নেননি। আগে থেকেই বিরোধী পক্ষের কয়েকজনের সঙ্গে উভয়ের পক্ষে লাভজনক কিছু কথাবার্তা হয়েছিল বলে বলা হয়। যাইহোক, মোটের পরে ব্যাপারটা যা হয়, তা হল সিরিও-রা হেরে যান। তাঁদের প্রাচীন গ্রন্থ, ভাষ্য, আশ্রম ও মন্দির পরিচালনার গঠন সবই অপ্রামাণ্য বলে গণ্য হয়। হয়তো নষ্টও করা হয়। ভারতের খ্রিস্টধর্মের মূল ধার থেকে তাঁরা একটি প্রান্তিক গোষ্ঠী হয়ে দাঁড়ান। ক্যাথলিক ধর্মমত ও তাঁদের বাইবেলে, এবং তাঁর চেয়েও বেশি করে, বাইবেল ব্যাখ্যার উত্থান ঘটে।        

উদইয়মপেরুরের গির্জা

আর এখানেই বাইবেল অনুবাদ চর্চার মূল সমস্যা। বাইবেলের একটি মোটামুটি বাহ্যিক একটি আকার থাকলেও, এটি স্থিত একটি গ্রন্থ নয়। চিরকাল বিভিন্ন যুগ এই মুকুরে নিজের অবয়বকে চিহ্নিত করতে চেয়েছে, তাঁর ভাবাদর্শকে  মান্যতা দিতে চেয়েছে। এডুইন গেঞ্জলার মনে করেন– বাইবেলের ইতিহাস চুম্বকে পাশ্চাত্য সভ্যতার ইতিহাস। যেভাবে আদিকাল থেকে বাইবেল সারা পৃথিবীতে অনুবাদের মাধ্যমে ছড়িয়েছে, তাতে আমরা একটু এগিয়ে যদি বলি যে, বাইবেল অনুবাদের ইতিহাস চুম্বকে বিশ্বের ইতিহাস, হয়তো খুব ভুল হবে না। অনমনীয় ইহুদিধর্ম আর নিজের শ্রেষ্ঠ সময়কে পেছনে ফেলে আসা গ্রিক সভ্যতার প্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা গরিব প্রান্তিক মানুষের বুকে আশার আলো জ্বালানো এক মতবাদ, তাঁদের পরম গুরুর বাণী ক্রমে হয়ে উঠল সর্বহারার আশ্রয় থেকে রোমীয় সাম্রাজ্যের স্তম্ভ, মধ্যযুগে তাঁকে ঘিরে গড়ে উঠল দার্শনিক প্রতর্ক, আসলো লুথারের যুগ, রাজানুকুল্যে বাইবেল অনুবাদের হিড়িক উঠল নানান দেশে, ছাপাখানা এল, গুটেনবার্গ ছাপলেন, শেষে আঠারো শতকে তা হল প্রথমে র‍্যাশানালিটির হ্যান্ডবুক, ও সে-রাস্তায় ঔপনিবেশিক মতাদর্শের মহাগ্রন্থ। পরম শান্তির এই গ্রন্থ হল শাসন ও আগ্রাসনের কণ্ঠস্বর। আর এই বিভিন্ন কণ্ঠস্বরের মাধ্যম হল অনুবাদ। ক্ষমতাবানের বাইবেল ক্ষমতার সুরেই গাইল। 

কিন্তু শেষ কথা কে বলবে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে, সমস্ত উপনিবেশ ধীরে-ধীরে শেষ হয়ে গেলে, বাইবেল ভাষ্য ও অনুবাদের এক নতুন দিগন্ত খুলে গেল। কী সেই দিগন্ত? উৎস থেকে লক্ষ্যে ছুটল অনুবাদের অভিমুখ। কিন্তু বাংলা বাইবেলে তাঁর কোনও প্রভাব পড়ল কি? এর উত্তর আমরা খোঁজার চেষ্টা করব পরবর্তী ও অন্তিম পর্বে।