‘কলেজ স্ট্রিট কা মসীহা’
বিগত বারো বছরে, সুবিমল বসাকের সঙ্গে বিভিন্ন আড্ডায়, দু’জন কবির প্রতি তাঁর প্রবল অ্যাডমিরেশন টের পেয়েছি। একজন উৎপলকুমার বসু, অন্যজন বিনয় মজুমদার। উৎপল ছিলেন বন্ধুস্থানীয়, আর বিনয় কয়েক বছরের বড়। সুবিমলের ডাইরিতে এই দু’জনের প্রসঙ্গ ফিরে-ফিরে এসেছে একাধিকবার, বেশির ভাগ উল্লেখই শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমের।
সুবিমলের সংগ্রহে বিনয়ের একটিমাত্র চিঠিই খুঁজে পেয়েছি। তবে তা দিয়ে বিনয়-সুবিমল সম্পর্ক বুঝতে চাওয়া অনুচিত। ১৯৬৩ সালে সুবিমল যখন হাংরি আন্দোলনে যোগ দেন, তার আগেই বিনয় জড়িয়ে পড়েছিলেন সেই আন্দোলনের সঙ্গে— প্রত্যক্ষভাবে কি না, তা অবশ্য বিচার্য। হাংরি জেনারেশনের একটি বুলেটিনে বিনয়ের কবিতা যেমন রয়েছে, তেমনই অপর একটি বুলেটিনে হাংরি-গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে বিনয়ের ‘ফিরে এসো চাকা’-রও। তবে যা-ই হোক, বিনয় ১৯৬৪-র জুনে যে-লিফলেট বিলি করেছিলেন কলেজ স্ট্রিটে, সেটিকে হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সংস্রব ছিন্ন করার ঘোষণাপত্র হিসেবে দেখা হয়। সেই লিফলেটে ছিল চার টুকরো আক্রমণাত্মক কবিতা। সুবিমলের সংগ্রহে সেই লিফলেটটিও দেখেছি এবং শিহরিত হয়েছি।
বিনয় মজুমদার সম্পর্কে সুবিমলের দৃষ্টিভঙ্গি হাংরি জেনারেশনের ঊর্ধ্বে। একজন কবি ও অগ্রজ হিসেবেই তাঁকে বরাবর দেখে এসেছেন সুবিমল। ডাইরির উল্লেখগুলিও ইঙ্গিত করে সেদিকেই। প্রসঙ্গত, ডাইরিতে অনেকবার বিনয়কে ‘পাগল’ বলে উল্লেখ করেছেন সুবিমল, কিন্তু সার্বিকভাবে পড়ে মনে হয়, সে-উল্লেখে ব্যঙ্গ বা বক্রোক্তি ছিল না। মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে তৎকালে ও পরবর্তীতে অনেকেই বিনয়কে তেমনই মনে করতেন, তাঁর কবিসত্তাকে এতটুকু ছোটো না করেই।
সুবিমলের ডাইরিতে, ২৪.১.৬৪ সালের নোটে পাচ্ছি— ‘বিনয় মজুমদারের সম্পর্কে প্রথম জেনেছিলাম সন্দীপনের চিঠিতে ‘मेरे और मेरे यार-दोस्तों ’, সেদিন (২২.১) দেখলাম পাগলাগারদ থেকে ফেরা— আপনমনে কথা বলে… হাসে… কে একজন বলল… অ্যালজেব্রা অঙ্ক কষে… পাগলা গারদে থাকে… দেখে তাই মনে হয়।’ তবে এ-দেখে সুবিমলের বিনয়-প্রীতি বিচার না করাই ভাল।

১০ জুন পূর্বোক্ত লিফলেটের কবিতাগুলি বিনয় লেখেন ও তা বিলি করেন দু’একদিন পরে। ১৩.৬.৬৪-তে সুবিমল লিখছেন— ‘গতকাল বিনয় মজুমদার ছোট একটা leaflet বের করেছে— নিজেই। শক্তিকে গর্দ্দভ ও কুকুরের সঙ্গমজাত ফল, সন্দীপন দাসী অনুদাস ইত্যাদি বলেছে— এ নিয়েই কফিহাউসের আবহাওয়া গরম।’ ওই তারিখেই, খানিক এগিয়ে, ডাইরিতে লেখা— ‘…আমরা অনেকক্ষণ কফিহাউসে বসে রইলাম। বিনয় মজুমদার এসেছে— ঐ একটা লোক বটে। ও নীচে আসতেই আমরা পা জড়িয়ে ধরলাম— দুটো leaflet দিলেন এবং তাদের অনুবাদ করার স্বত্বও দিলেন। বললো— তোমরা আছো চালিয়ে যাও।’
ডাইরিতে এর পরের বিনয়-উল্লেখ ২০.৬.৬৪ তারিখের এবং তা দীর্ঘ। সুবিমল লিখছেন— ‘… আজ রাত্রে কফিহাউস গিয়েছিলাম। বিনয়ের একটা কবিতাবই বেরিয়েছে দেখলাম— ‘আমার ঈশ্বরীকে’। বিনয়ের যাবতীয় কবিতা— তাতে। উৎসর্গ করেছেন— আমার ঈশ্বরীকে। ‘ফিরে এসো চাকা’ বা ‘গায়ত্রীকে’ ইত্যাদি কবিতাগুলি ওতে স্থান পেয়েছে। প্রকাশ করেছে মীনাক্ষী দত্ত। জ্যোতির্ময় দত্তের স্ত্রী। Statesman-এ বিনয়ের সম্পর্কে জ্যোতির্ময় লিখেছে। বেলালের মুখে শুনেছি, যেদিন বেরিয়েছিল, বিনয় উৎপলের বাড়ীতে গিয়েছিল। হাতে কাগজ। বেলালকে বলল, আজ খবরের কাগজে আমার সম্বন্ধে বেরিয়েছে। তারপর হঠাৎ জানালার কাছে দাড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাড়িয়ে রইলেন, তারপর হঠাৎ ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললেন। এই হল বিনয় মজুমদার। বইয়ের মলাট কাপড়— প্রচ্ছদ ভাল। আজকাল নির্মল মৈত্রর কাছে থাকেন। শুনি, খরচ টরচ সেই দেয়। তার নামেও কবিতা লিখেছে।
শক্তির উপর প্রচুর রাগ। বলে, আমার কবিতা চুরি করে লিখছে— এখন আবার আমার অঙ্কের বই চুরি করবে, আইএসসি পাশ।’ বিনয় ইদানীং একটা অঙ্কের বই প্রকাশ করছে। আশ্চর্য্য লোকটা! দেখলে অবাক্ হয়! পুরোপুরি পাগল একটা। সবসময় আপনমনে বক্তে থাকে। অথচ কী সচেতন! আমার ঈশ্বরী’র ভূমিকাটা আকর্ষণীয়।’

ডাইরি থেকে এ-ও জানা যায় যে, সে-সময়ে একবার অর্থসংকটে পড়ে বিনয়ের কাছে চিঠি লিখে টাকা ধারও চেয়েছিলেন সুবিমল। কী জবাব এসেছিল, আদৌ এসেছিল কি না— তার অবশ্য উল্লেখ নেই কোনও। অন্যদিকে, সুবিমলের সংগ্রহ থেকে দুটি বই খুঁজে পেয়েছি, যেগুলি বিনয় উপহার দিয়েছিলেন তাঁকে। একটি, বিনয় মজুমদারের ‘ঈশ্বরীর কবিতাবলী’। ভিতরে বিনয় লিখে দিয়েছেন— ‘সুবিমল বসাককে/ বিনয় মজুমদার/ ১৭ই বৈশাখ, ১৩৭৩/ ১লা মে, ১৯৬৬’। অন্য বইটি বিনয়ের ‘অধিকন্তু’, ভেতরে লেখা— ‘সুবিমল বসাক/ বন্ধুবরেষু/ বিনয় মজুমদার/ ৩০.১০.১৯৬৭’। বিনয় ততদিনে ঠাকুরনগরের বাসিন্দা। তবে কি সুবিমলই গিয়েছিলেন বিনয়ের কাছে, না বিনয় এসেছিলেন কলকাতায়?
কালানুসারে, এরপরই উল্লেখ করা যেতে পারে চিঠিটির (পোস্টকার্ড) প্রসঙ্গ। সুবিমল বসাকের কাব্যগ্রন্থ ‘হাবিজাবি’ পড়ে বিনয়ের প্রতিক্রিয়া।
বিনয় মজুমদার
গ্রাম শিমূলপুর
ডাকঘর ঠাকুরনগর
জেলা ২৪ পরগনা
২৯.৪.৭১
সুবিমল বসাক
স্নেহাস্পদেষু
তোমার বই ‘হাবিজাবি’ আমি পেয়েছি। চিঠির জবাব দিতে খুবই দেরি হয়ে গেল। বইখানা আমি পড়েছি। কিন্তু ভাষা বুঝতে পারিনি। ফলে রসগ্রহণও ঠিকমতো করা যায় নি। ফলে বইখানি ভালো কি খারাপ বলার চেষ্টা করলাম না। ভবিষ্যতে তোমার সব বই কি এইরকম ভাষায় লিখবে নাকি? তাহলে পাঠকদের খুবই অসুবিধা হবে। তুমি কলকাতার চলতি ভাষায় লেখ। যাতে পাঠকসাধারণের পড়তে অসুবিধা না হয়।
আমার স্থায়ী ঠিকানা আমি এই চিঠিতে দিলাম। সুভাষ ও শৈলেশ্বরকে বলো চিঠি লিখতে। ইতি
বিনয়দা

উল্লিখিত সুভাষ ও শৈলেশ্বর যথাক্রমে সুভাষ ঘোষ ও শৈলেশ্বর ঘোষ। যাই হোক, সুবিমলের প্রথম উপন্যাস ‘ছাতামাথা’ (১৯৬৫) ও প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হাবিজাবি’ দুটিই ছিল পূর্ববঙ্গের— বিশেষত ঢাকার কথ্যভাষায় লেখা। হাংরি আন্দোলনের সদস্য সুবিমল সচেতনভাবেই ভাষার ভাঙচুর ঘটাতে চেয়ে এই ভাষাশৈলী নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু দুটি বইয়ের ক্ষেত্রেই, এই ভাষা-ব্যবধানই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বহু পাঠকের কাছে। ব্যতিক্রম নন বিনয়ও। তাঁর চিঠিতেও সেই ব্যবধানের প্রসঙ্গই উঠে এসেছে। তবে বিনয়ের একটি মন্তব্য— ‘তুমি কলকাতার চলতি ভাষায় লেখ’— প্রশ্ন জাগায়। চলতি ভাষায় লিখলে তা পাঠকের সঙ্গে সংযোগস্থাপনে সাহায্য করে, তা সন্দেহাতীত। কিন্তু বাংলাভাষার যে বিপুল বৈচিত্র্য, তাতে আঞ্চলিক ভাষাভঙ্গিগুলি নিয়ে সাহিত্যরচনার প্রয়াসকে কি বিনয় নিরুৎসাহিত করবেন শুধুমাত্র ‘পাঠকসাধারণের’ পড়তে অসুবিধা হবে বলে? এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা হতে পারে ভবিষ্যতে।
বিগত পর্বে ‘আবহ’ পত্রিকা ও তার সঙ্গে সুবিমল বসাকের সম্পৃক্তি আলোচিত হয়েছিল। সেই পত্রিকারও দুটি সংখ্যায় লিখেছেন বিনয় মজুমদার। ‘আবহ’ শারদ সংকলন ১৩৭৮-এ প্রকাশ পায় বিনয়ের তিনটি কবিতা— ‘ভাবনা সরবরাহ’, ‘বিচ্ছেদের কারণ’ ও ‘স্বপ্নের প্রকৃতি’। আর ‘আবহ’-র শারদ সংকলন ১৩৮৩ সংখ্যায় বেরিয়েছিল বিনয়ের বিখ্যাত কবিতা ‘রবীন্দ্রনাথ’, যেটি পরে স্থান পায় ‘বাল্মীকির কবিতা’ কাব্যগ্রন্থে। সুবিমলের সংগ্রহে খুঁজে পেয়েছি বিনয়ের স্বহস্তলিখিত সেই কবিতাটিও।

সত্তরের দশকের পর থেকে উভয়ের যোগাযোগ কমে এলেও, একেবারে ছিন্ন হয়নি। সুবিমল ঠাকুরনগরে বিনয়ের বাড়িতেও গিয়েছেন একাধিকবার। বিনয়ের মৃত্যুর পর, ২০০৭-এ লেখা এক নিবন্ধে ষাটের দশকে বিনয়কে নিয়ে তাঁর টুকরো-টুকরো স্মৃতিচারণ চোখে পড়ে। সুবিমল লিখছেন—
‘ক্রিজহীন ফুলপ্যান্ট, গোঁজা শার্ট, বিনয় বেশ বাবু হয়ে বসেছেন, তাঁকে ঘিরে চারপাশে আমাদের বন্ধুবান্ধব। স্থান জেব্রাদপ্তর, সাবেক মুসলমান পাড়া লেন, শিয়ালদহ স্টেশনের অনতিদূরে, সে ঘরে আমার আশ্রয়, আদতে একটি দোকানঘর, বাইরের দিকে। বিনয় বেশ হেসেই শুরু করলেন— ‘সেই মুহূর্তে আমি টের পেলাম, আমার মাথার পোকা কিলবিল করছে, আমি কি আর সেখানে থাকি? সঙ্গে সঙ্গে টেবিলে রেজিগনেশন লেটার ফেলে সোজা দুর্গাপুর স্টেশনে—।’ সবে মাথার ব্যামো শুরু, প্রথম চাকরি, লোভনীয় পদ, ঈর্ষণীয় বেতন— সব ছেড়ে-ছুড়ে বিনয় কলকাতায়। মানসিক হাসপাতালে।
কথা অসমাপ্ত রেখে, আমাদের সবাইকে অবাক করে বিনয় উঠে দাঁড়ান, তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে যান। আমার আস্তানায় দিনের বেলায় জল বিয়োগের কোনও ব্যবস্থা ছিল না। বিনয় এক ছুটে ওপারে সুরেন্দ্রনাথ কলেজের পাশের গলিতে গিয়ে থামেন। ছোট নর্দমা।’ (অমলকুমার মণ্ডল সম্পাদিত ‘উদ্ভেদ’ পত্রিকা, বিনয় মজুমদার স্মরণ সংখ্যা, ২০০৭)
উল্লেখ্য, ষাটের দশকে হিন্দি সাহিত্যিক শরদ দেওড়া একটি উপন্যাস লেখেন— ‘কলেজ স্ট্রিট কা মসীহা’। তৎকালীন সময়ে কলকাতার সাহিত্যজগত নিয়ে লেখা সে-উপন্যাসের তিনটি পর্ব, প্রথমটি বিনয় মজুমদারকে নিয়ে, দ্বিতীয়টি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে ও তৃতীয়টি হাংরি জেনারেশন নিয়ে। প্রথম পর্ব অর্থাৎ বিনয়-কেন্দ্রিক অংশটি পরবর্তীতে অনুবাদ করেন সুবিমল বসাক।

শরদ দেওড়ার কথা যখন উঠলই, ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলা একটি অন্যায়ের সংশোধন করা যাক। হাংরিদের একটি বিখ্যাত গ্রুপফটো সর্বত্র দেখা যায়, যেখানে পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন শৈলেশ্বর ঘোষ, মলয় রায়চৌধুরী ও সুভাষ ঘোষ; সামনে বসে সুবিমল বসাক, ডেভিড গারসিয়া (আমেরিকান কবি) ও বাসুদেব দাশগুপ্ত। অথচ মূল ছবিটিতে বাসুদেবের পাশে ছিলেন শরদ দেওড়া-ও। ওঁকে কেন কেটে বাদ দেওয়া হয়, জানি না। এখানে মূল ছবিটি সংযুক্ত করা হল, ইতিহাসরক্ষার স্বার্থেই।
(ডাইরি ও চিঠিগুলির বানান অপরিবর্তিত)
ছবি সৌজন্যে: তন্ময় ভট্টাচার্য




