শ্মশানে দেখা হবে।’ এক প্রৌঢ়া বলছে এক প্রৌঢ়কে। স্বামী-স্ত্রী তারা। তাদের দুই ছেলেই লাশ হয়ে গেছে। একজনের শব মহাসমারোহে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দাহ করার জন্য। অন্যজনেরটা পড়ে আছে লাশকাটা ঘরে। ঠিক এমনভাবে, এই কথাতেই, শেষ হয় একটা গল্প। তার নাম ‘শোকমিছিল।’ লেখক দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। ’৭৩ সালে লেখা গল্প। সমকালীন প্রেক্ষাপটে। এমন হানাহানি তো সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের ঘরে ঘরেই। সে-সময়ের বাংলা গল্পেও তার ছাপ স্পষ্ট। তবু তাদের থেকে আলাদা ‘শোকমিছিল’। তার শেষ সংলাপের মতোই। ‘শ্মশানে দেখা হবে’— শোক আছে, কিন্তু তার অহৈতুকী নিঃসরণ নেই। চিৎকার নেই। এমনকী মীমাংসাও নেই। দ্বিধা-দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে নেহাতই একটা জরুরি কাজ সেরে ফেলা। এর মধ্যে আশ্চর্য এক দ্ব্যর্থতা আছে। অ্যাম্বিগুইটি আছে।
আরও পড়ুন: লোকগণনার নামে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ!
লিখছেন অনল পাল…
দ্ব্যর্থতা যখন দায়
এই দ্ব্যর্থতা কিন্তু সেই সময়ের বাস্তবকে অগ্রাহ্য করে নয়। রাজনীতি-বিমুখ হয়ে নয়। দায় এড়িয়ে গিয়ে নয়। বরং তা আসলে লেখকের সাদা-কালো মীমাংসায় না ঢোকার নৈতিক অবস্থান। ক্যাথারসিস ব্যবহার না করে পাঠককে ইচ্ছে করেই অস্বস্তিতে রাখার শৈল্পিক সিদ্ধান্ত।
’৭৩ সাল। ততদিনে ভাগ হয়ে গিয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি। দুই দল— সিপিআই এবং সিপিআইএম। এর মধ্যেই কমিউনিস্ট পার্টির সংখ্যালঘু একটা অংশ নকশালপন্থী হয়ে গিয়েছে। পুরনো বামদলগুলোর চোখে সেই অতিবামপন্থীরা আসলে দক্ষিণপন্থীদেরই মদতপুষ্ট। ক্ষতি করছে কমিউনিস্ট আন্দোলনের। এমনই প্রেক্ষাপটে লেখা ‘শোকমিছিল’।
এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিনয়ভূষণ। দলের নাম না করেও লেখক বুঝিয়ে দেন, বিনয়ভূষণের রাজনৈতিক অবস্থান। বিনয়ভূষণ সিপিআইএমের নিবেদিতপ্রাণ হোলটাইমার। তার স্ত্রী পারুলও। দু’জনেই জেল খেটেছে পার্টির জন্য। তাদেরই দুই ছেলে অজয় আর বিজয়। অজয় বাবা-মায়ের দলেরই সদস্য। কিন্তু তরুণ বিজয় নকশালপন্থী। পার্টির ভেতরে চলা সমস্যাগুলোও বোঝে বিনয়ও। কিন্তু তারপরেও নিবেদিতপ্রাণ পার্টিকর্মী হিসেবে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় বিজয়কে। এলাকা দখলের লড়াইতে বিনয়ভূষণের সামনেই খুন হয় বিজয়। খুন হয় অজয়ও। অজয়ের লাশ নিয়ে শুরু হয় শোকযাত্রা। যেখানে পার্টির অনুশাসন অনুযায়ী নকশালপন্থী বিজয়ের নাম মেনে নেওয়াও নিষিদ্ধ। সেই অনুশাসন মেনেও নেয় বিনয়ভূষণ। আর বিজয়ের লাশ বেওয়ারিশের মতো পড়ে থাকে লাশকাটা ঘরে। গল্পের শেষ হয় পারুল আর বিনয়ের কথোপকথনে। পারুল বলে, সে একাই যাবে বিজয়ের সৎকার করতে। তারপর শ্মশানে দেখা হবে দু’জনের।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি— সিপিআই-এর একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন দীপেন্দ্রনাথ। কেউ বলতেই পারে, দ্ব্যর্থতা কোথায়? বরং লেখক তো নিজেও এখানে পার্টিলাইন মেনে নিচ্ছেন। সব দোষ চাপিয়ে দিচ্ছেন তার দল ভাঙা সিপিএমের নেতৃত্বের দিকে।
দ্ব্যর্থতা আসলে ফুটে ওঠে বিনয়ভূষণের মনের গভীরে। মেনে নেওয়া আর না-নেওয়ার দ্বিধাদ্বন্দ্বে। বুঝতে পেরেও যে কিছুতেই ছাড়তে পারে না এতদিনের আঁকড়ে ধরা পার্টিকে। বিনয়ভূষণের এই অসহায়তা আসলে সেই সময়ের অসহায়তা। ঠিক আর ভুলের সাদা-কালো অঙ্কে যখন আর চারপাশকে, নিজের জীবনকেও মেলাতে পারছে না কেউ। যখন মানুষের সমস্যা তার সচেতনতার অভাব নয়, তার সচেতনতাই। সচেতন বলেই সে বুঝতে পারছে, মেনে নিতে হবে তাকে। আর সেই মেনে নেওয়ার মানে নিজের কাছে অসৎ হয়ে যাওয়া। রাজনৈতিক অনড়তা নয়। এই দ্বন্দ্ব আসলে ব্যক্তির সঙ্গে তার চারপাশের। দুনিয়ার সঙ্গে নিজেকে না মেলাতে পারার।
পরিসর যখন দ্ব্যর্থতা
‘অশ্বমেধের ঘোড়া’ গল্পের দুই কুশীলব রেখা আর কাঞ্চন। কাঞ্চন কলেজে পড়ায়। স্বাবলম্বী। তবু প্রেমিকা রেখাকে মেনে নেবে না জাতপাত-মেনে-চলা তার বাড়ির লোক। সেই বাড়ির লোকের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না সে। ভয়ে নয়, সংকোচে। লুকিয়ে রেখার সঙ্গে কোর্ট ম্যারেজ করে। সেই বিয়ের পরেই ডবলডেকার বাসে উঠে রেখার বাবাকেই দেখতে পায় ওরা। রেখাকে নীচে রেখে বাসের দোতলায় উঠে পড়ে সে। হাতে বিয়ের মালা। সেই মালা দেখেই কাঞ্চনকে বিদ্রুপ করে কন্ডাক্টর। ক্ষোভে, লজ্জায় বাস থেকে নেমে পড়ে রঞ্জন। হাত থেকে ছুড়ে ফেলে দেয় মেলা। দেখতে পায় একটা ‘স্থবির বলদ সেটা চিবুচ্ছে।’
কাঞ্চন কি ভিতু? না, সে ভীতু নয়। তাহলে সে লুকিয়ে বিয়ে করতে পারত না। সেই প্রতিবাদ করতে চায়। কিন্তু তার সংকোচ হয়। এই সংকোচ ভীরুতা নয়। এই সংকোচ আসলে ব্যক্তির নিজস্ব পরিসর খুঁজে নিতে চাওয়ায়। স্থবির বলদের মতো স্থবির বোকা সমাজ যে-পরিসর দিতে শেখেনি তখনও। পরিসর এই গল্পের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। প্রথম বিবাহবার্ষিকীর দিন দেখা করে দু’জনে। বিবাহিত তাঁরা। কিন্তু সে-পরিচয় দেওয়া যায় না সবার সামনে। আড়াল জোটেনি। তাই পুরোপুরি চেনাও হয়ে ওঠেনি পরস্পরকে। দরাদরি করে এক ঘোড়ার গাড়িতে উঠে পড়ে দু’জন। পর্দা-নামানো সেই ফিটন গাড়ির ভেতর নিভৃতে প্রথমবার রেখাকে ‘বউ’ বলে ডাকে কাঞ্চন। আর রেখা তাকে বলে ‘স্বামীন’।
দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প জীবনের সেই দ্বান্দ্বিকতার কথাই বলে। তাঁর চরিত্ররা হেরো নয়, নিষ্ক্রিয় নয়। তারা পরিস্থিতি বোঝে, সিদ্ধান্ত নেয়, অবস্থানও নেয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের অসম্পূর্ণতাও বোঝে। বোঝে জীবনের পরিত্রাণহীনতার কথা। তাঁর গল্প এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলা যায় না তাই। বরং তাঁর গল্প পড়তে গেলে, বার বার ভাবতে বাধ্য হতে হয়। বার বার যাচাই করে নিতে হয় অবস্থান।
সব সম্পর্কের একটা নাম থাকে। সেই নামই তাকে সর্বজনগ্রাহ্য করে। স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু এখানে সেই সম্পর্কের নামটাও লুকিয়ে থাকে পর্দার আড়ালে। দ্ব্যর্থতা ভাষা বনাম বাস্তবতার। তারপর যেন গোপন সেই সম্পর্ককেই বাস্তব করতে রেখার গলায় ফুলের মালার পরাতে যায় কাঞ্চন। আর ঠিক তখনই পর্দা সরে যায় ফিটন গাড়ির। ফুর্তি করছে বলে অপমান করে। মুহূর্তে নেমে আসে রেখা আর কাঞ্চন। অপমান এড়াতে এড়িয়ে যায় তড়িঘড়ি। কাঁদতেও পারেনি। কারণ, ‘একান্তে কাঁদার মতো কোনও আশ্রয় তাদের ছিল না।’ বিয়ের দিন কন্ডাকটরের কাছে অপমানিত হয়ে মালা ছুড়ে দেওয়ার পর, কাঞ্চনের মনে হয়েছিল— ‘রেজিস্টারের চেম্বারটা মনে পড়ল— ছোট, ঠাসা। রেস্তোরাঁর কেবিনটা মনে পড়ল— ছোট, ঠাসা। শোবার ঘরটা মনে পড়ল— ছোট, ঠাসা।’
পরিসর, ব্যক্তির পরিসর, চেপে ছোট করে দেয় সমাজ। দম বন্ধ করে দেয়। অথচ সে মুখ ফুটে সে-পরিসর চাইতেও পারে না। অ্যাম্বিগুইটি। আশ্চর্য দ্ব্যর্থতা— সমাজের চাপের মুখে ব্যক্তির নিজস্ব পরিসর খুঁজে পাওয়ার। ব্যক্তি এখানে জানে সে কী চায়। কী ঠিক। অথচ সমাজের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে গিয়ে নিজেকে ব্যক্ত করতে পারে না। এই গল্প কি রাজনৈতিক নয়? কিন্তু সেই রাজনীতি পার্টিলাইনের নয়। ‘উপযোগবাদ’-এর নয়। বরং সেই রাজনীতি ‘দেখা’-র, বড় নির্মোহ ভঙ্গিতে মানুষের দ্ব্যর্থতাকে দেখার।
ঘাম যখন দ্ব্যর্থতা
‘ঘাম’ গল্পের বিষ্টুচরণ থাকে বস্তিতে। কাজ করে পার্কস্ট্রিটের বাহারি রেস্তোরাঁয়। ওয়েটার হিসেবে। তার রেস্তোরাঁয় খেতে আসে ফিটফাট করে সাজা লোকেরা। ব্যান্ড বাজে। গান হয়। সেখানে কেউ ঘামে না। কিন্তু বিষ্টুচরণ ঘামে তার বস্তিতে ফিরে এসে। বস্তিতে থাকতে চায় না বিষ্টুচরণ। কিন্তু রোজগারের সামর্থ্য নেই ভাল জায়গায় চলে যাওয়ার। বিষ্টুচরণের রেস্তোরাঁয় যারা আসে, তাদের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারে না সে। ভয়ও পায় চাকরি হারাবার। আবার বস্তিতেও খুশি নয় সে। কারণ সেখানকার পরিবেশ পছন্দ হয় না তার। কিন্তু নামী রেস্তোরাঁর চাকরি তাকে সামান্য প্রতিপত্তি দিয়েছে ওই বস্তিতে। বিষ্টু থেকে সে হয়েছে বিষ্টুচরণ।
আসলে রেস্তোরাঁ এবং বস্তি— কোনও জায়গাতেই সম্পূর্ণ নয় বিষ্টুচরণ। আর এই অসম্পূর্ণতাই তার দ্ব্যর্থতা। ঘামের মতোই তার জীবনে সত্যি এলোকেশী। তার বিয়ে করা বউ নয়। সঙ্গিনী। ঠিকে ঝি-র কাজ করে। ক’দিন আগেও দেহপসারিনী ছিল। এখন বিষ্টুর ঔরসজাত সন্তান তার গর্ভে। এলোকেশীর সঙ্গে খিটখিটে আচরণ করে বিষ্টু। অকারণে ঝগড়া করে। আবার ভয়ও পায়। ঘুম ভাঙিয়ে হাওয়া করতে বলে। নিজের পৌরুষ জাহির করতে চায়। আসলে রেস্তোরাঁ এবং বস্তির মতো বিষ্টুচরণের জীবনে এলোকেশীর অবস্থানও অ্যাম্বিগুইটিতে ভরা। বিষ্টুচরণ তাকে মেনে নিতেও পারে না, আবার ছেড়ে যেতেও পারে না। গল্পের শেষে ‘নিজে ঘামতে ঘামতে এলোকেশীর গতরের ঘাম শুকতে শুকতে চোখ বন্ধ করল। তারপর বিষ্টুচরণ ঘুমোল।’
ঘুম নয়। যেন ক্লান্ত শরীরকে শেষ অবধি স্বস্তি দেওয়া। এলোকেশীর ঘামের গন্ধকে মেনে নেওয়াও তেমনই। যেন বিষ্টুচরণের নিজের জীবনকে মেনে নেওয়া। ঘামের মতোই যা নিজের ইচ্ছাধীন নয়। আবার যাকে না মেনেও উপায় নেই।
জীবনের দ্বান্দ্বিকতা
জীবন তো দ্ব্যর্থই। অ্যাম্বিগুইটিতে ভরা। যুক্তির আনুগত্য মেনে চলে না সে। চলে না বাঁধাধরা নিয়মেও। আর জীবনের সেই ঘাত-প্রতিঘাতে, নিয়ম মেলা না-মেলার সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে মানুষ। হারেও না। আবার জেতেও না। শেখে অস্বস্তিকে মেনে নিতে। মানিয়ে চলতে। কারণ পরিস্থিতি বদলানোর ক্ষমতা তার একার হাতে নেই। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প জীবনের সেই দ্বান্দ্বিকতার কথাই বলে। তাঁর চরিত্ররা হেরো নয়, নিষ্ক্রিয় নয়। তারা পরিস্থিতি বোঝে, সিদ্ধান্ত নেয়, অবস্থানও নেয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের অসম্পূর্ণতাও বোঝে। বোঝে জীবনের পরিত্রাণহীনতার কথা। তাঁর গল্প এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলা যায় না তাই। বরং তাঁর গল্প পড়তে গেলে, বার বার ভাবতে বাধ্য হতে হয়। বার বার যাচাই করে নিতে হয় অবস্থান।
আলাদা তাঁর গদ্যভাষাও। সুললিত যেমন, স্পন্দে ভরা যেমন, তেমনই পর পর বাক্যে শব্দকে পুনঃপ্রয়োগ না করার প্রচলিত গদ্যরীতিকে তিনি ভেঙে দিচ্ছেন ইচ্ছেমতো একই শব্দকে বার বার পর পর বাক্যে ব্যবহার করে। চরিত্রের মনস্ত্বত্বের নতুন উদঘাটন দেখাতে। ‘পরিচয়’ আর অবাণিজ্যিক পত্রিকা— এইখানেই লিখে গিয়েছেন দীপেন্দ্রনাথ। প্রয়াতও হয়েছেন অকালে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে পাকাপাকি ঠাঁই পেলেও তাই আম-পাঠকের কাছে তেমন পরিচিত নন তিনি।
সময় বদলেছে। অথচ চারদিকে তাকালেই দেখা যায়, কী অসম্ভব পরিত্রাণহীন সময়। অসহায় কোন দ্ব্যর্থতায় ঢেকে গেছে আমাদের বেঁচে থাকা। তাই আজও সমকালের কী অসম্ভব প্রতীক হয়ে ওঠে ওই কথাটা— ‘শ্মশানে দেখা হবে।’


