উল্টো দূরবিন : পর্ব ২

১২ নম্বর গ্যালিফ স্ট্রিট

গ্যালিফ স্ট্রিটটা খাল বরাবর। খালটা কাটা হয়েছিল নবাবি আমলে। বর্গী, মানে মারাঠাদের আক্রমণ থেকে শহর বাঁচানোর জন্য খোঁড়া হয়েছিল। টালা পুলের তলা থেকে গঙ্গা পর্যন্ত রাস্তাটা। পুরোটা হাঁটলে পাঁচ-সাত মিনিট। একটা ট্রামলাইন চলে গেছে গ্যালিফ স্ট্রিট ট্রামডিপো থেকে চিৎপুর ট্রাম ডিপো পর্যন্ত। এই ডিপোতে ট্রাম কম পড়লে ওই ডিপো থেকে আসে বা যায়। গ্যালিফ স্ট্রিট ডিপো থেকে ১২ নম্বর ট্রাম শিয়ালদা হয়ে ধর্মতলা যায়। পাঁচ নম্বর ট্রাম কলেজ স্ট্রিট হয়ে ধর্মতলা। ট্রামের সামনে লেখা থাকে এসপ্ল্যানেড। ছ’নম্বর ডালহৌসি। চিৎপুর থেকে সাত নম্বর ট্রাম কুমোরটুলি-জোড়াসাঁকো হয়ে ধর্মতলা, আট নম্বর ডালহৌসি। গ্যালিফ স্ট্রিটের দু-পাশে দুটো ট্রাম ডিপো। প্রায় মাঝামাঝি জায়গায় বারো নম্বর বাড়ি।

বাড়িটার ছবিটা দেখি। ধূসর রং। মানে বহুদিন রং করা হয়নি। দোতলা বাড়ি। ছাদ থেকে পাইপ নেমে এসেছে কয়েকটা। বৃষ্টির জল নেমে আসে। একটাও নীচ পর্যন্ত নামেনি। আগেই ভেঙে গেছে। পাইপের তলার দেওয়ালের রঙ কখনও নীল, কখনও লাল, কখনও সবুজ। কারণ ছাদ থেকে রঙিন জল নেমে আসে বৃষ্টি পড়লে। কালির বড়ি তৈরির মণ্ড। এই বাড়ির একতলায় কালির কারখানা। কালির বড়ি তৈরি হয়। ট্যাবলেট। ট্যাবলেটগুলির নাম রাজা, স্বস্তিকা, পেন, কিং এইসব। কালির বড়ি হলে গুলে দোয়াতে ঢালা হত, আর কাঠের হ্যান্ডেলে ধাতুর নিব বসিয়ে কালির দোয়াতে চুবিয়ে-চুবিয়ে লেখা হত।

স্মৃতিতে শব্দের সঙ্গে ভেসে আসে গন্ধও! স্বপ্নময় চক্রবর্তীর কলমে ‘উল্টো দূরবিন’-এর প্রথম পর্ব…

মেঘনাদবধ কাব্য-দুর্গেশনন্দিনী-গীতাঞ্জলী এরকম দোয়াতের কালিতে কলম ডুবিয়েই লেখা হয়েছিল। আমার দাদু কৃষ্ণকমল চক্রবর্তী এভাবেই লিখতেন। আমার বাবা দাদুকে ফাউনটেন পেন এনে দিয়েছিলেন, কিন্তু দাদু ফাউন্টেন পেন ব্যবহার করতেন না। সেই কালিতে লেখা হিসেবের খাতা আমার কাছে আছে। সবার সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছি একটা পাতা।

এখানে দেখুন খোকার জন্য রাবড়ি দু-আনা। দু-আনা মানে বারো পয়সা। খোকা মানে আমি। দাদুর প্রথম নাতি। এটা কত সাল বোঝা যাচ্ছে না। ২৯ ডিসেম্বর বোঝা যাচ্ছে। তিনু, মানে আমার কাকামণি তখনও বেঁছে নিশ্চয়ই, কাকামণির ১৯৫৭ সালে অকালমৃত্যু হয়। এই হিসেবের খাতাটি ১৯৫৬ সালের হতে পারে। তিনুর জন্য সন্দেশ দু-আনা। কাকামণি ইঞ্জিনিয়র ছিলেন। কোনও এক রবিবারের খরচ এটা। মাংস এসছিল। বাড়িতে লোক কম ছিল না। তিনপোয়া, মানে অন্তত ৭৫০ গ্রাম তো আনতেই হত। দাম এক টাকা ১২ আনা। মানে দু-টাকা চার আনার মতো সের। আরও একটা পৃষ্ঠা। সারাদিনের খরচা এক টাকা। এর মধ্যে ধোপাবাড়ির সাড়ে সাত আনাও রয়েছে।

কথা হচ্ছিল কালি নিয়ে, না-না বাড়ি নিয়ে। আমার প্রথম বাসস্থান। ওই পরিস্কার এক তলায় কালির কারখানা। কারখানার মালিক আমার মেজপিসেমশাই জাহ্নবীজীবন চক্রবর্তী। ওঁর বাবা উদয়চন্দ্র চক্রবর্তী শুরু করেছিলেন লেখার কালি তৈরির প্রতিষ্ঠান। পিসেমশাই ওই প্রতিষ্ঠানকে বড় করেন। এই গোটা বাড়িটা ভাড়া নেন বটকৃষ্ণ পাল পরিবারের কাছ থেকে। দোতলা বাড়িটা পুরোটাই নিয়েছিলেন।

পিসেমশাইরা দুটো ঘর ব্যবহার করতেন, বাদবাকি প্রতিটি ঘর গল্পময়। আলাদা-আলাদা গল্প। একটা ঘরে তো সর্বদাই কোনও-না-কোনও আত্মীয় পরিজন থাকত। পূর্ব বাংলা বা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এসে আমার পিতামহ সপরিবারে আশ্রয় পেয়েছিলেন একটা ঘরে। ’৪৮ সালে আমার বাবার বিবাহের পর আমাদের পরিবারকে আরও একটা ঘর দেওয়া হয়। একটা ঘরে ভাড়াটিয়া থাকত, আর-একটা ঘরকে ঠাকুরঘর বলা হত। পিসেমশাইদের রাধাগোবিন্দ বিগ্রহকে ‘দেশের বাড়ি’ থেকে নিয়ে এসে ওই ঘরে স্থাপন করা হয়েছিল। পিসেমশাইয়ের একজন বড় ভাই ছিল, যিনি অকালে প্রয়াত হয়েছিলেন। তাঁর চার ছেলে। চার ছেলের একজন এই ঠাকুর ঘরেই থাকত। আমার পিসতুতো দাদা, যে পরে আমেরিকাতে বসবাস করতে লাগল। রাঙাদা, সে-ও ওই ঠাকুরঘরে থাকত। পিসেমশাইদের আলাদা একটা রান্নাঘর ছিল। আর একটা বারান্দাকে আমরা দু-ভাগ করে একটা অংশে আমরা রান্না করতাম, অন্য অংশে ভাড়াটেরা।

ওই যে কালিঝুলিমাখা বাড়িটা, দুটো দরজা। একটা দরজা দিয়ে কারখানায় ঢোকে, অন্য দরজা দিয়ে দোতলায়। সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই ডানদিকে কলঘর। ছোট। ফুটচারেক চওড়ায়, লম্বায় সাত/আট ফুট হবে হয়তো। একধারে একটা চৌবাচ্চা। কল থেকে একটা পাইপ লাগানো, ওটা থেকে চৌবাচ্চায় জল যায়। মোট ২৪ টা সিঁড়ি। দোতলায় উঠেই ডানদিকে দুটো পায়খানা। দরজা খোলাই, গোল মতো প্যান। একটা মগ। মগ মানে ডালডার কৌটো। অপরিস্কার। কখনও-বা প্যানের গায়ে হাগুর চিহ্ন রয়ে গেছে। কখনও-বা পা-দানির গায়েও। তখন তো খুব খারাপ লাগত না তেমন। যে যাবে, সে দু-মগ জল ঢেলে দিত।

ঝুলবারান্দার এধারে রেলিং-এ দাঁড়ালে, ‘গ্যালিফ স্ট্রিট’ দেখা যায়। খালটাও দেখা যায়। খালের পাড় নীচু হয়ে জলে মিশছে, পাড়ে কচুগাছ, আরও কীসব গাছ, খালের জলে কচুরিপানা ভেসে যাচ্ছে ভাঁটার সোময়ে। খালে নৌকো। নৌকো করে খড় আসে, মাটির হাঁড়ি আসে, আর আসে এঁটেল মাটি। আমার ঠাকুরমা-পিসিমারা বলাবলি করে— ঠিক আমাদের ফরিদপুরের মতো সেইরকম খাল সেইরকম নৌকো।

এরপর বাঁদিকে একটা চৌবাচ্চা, গঙ্গাজলের। গঙ্গাজল চলে আসত। পাম্প লাগত না। নীচের কলঘরে আসত টালার জল। ওপরে গঙ্গাজল। আর ছিল একটা টিউবওয়েল, নীচের কালির কারখানার প্রয়জনে যে জল লাগে, সেটা একটা ট্যাংকিতে জমা হয়। সেই ট্যাংকির সঙ্গে যুক্ত এই টিউবওয়েল। এই টিউবওয়েল পাম্প করে জল তুলতে হত রান্নার জন্য, বাসন ধোয়া ইত্যাদির জন্য। তারপর একটা অন্ধকার মতো ঘর, ওই ঘরকে কয়লার ঘর বলতাম। এখানে ভাগে-ভাগে কয়লা রাখা হত, আমাদের, পিসেমশায়দের ভাড়াটেদের। হয়তো গুল এবং ঘুঁটেও। এরপর একটা ঝুলবারান্দা। ঝুলবারান্দাটার মাঝ বরাবর বাঁশের চটার দেওয়াল ছিল। দেওয়ালের ওধারের কথায় পরে আসছি।

ঝুলবারান্দার এধারে রেলিং-এ দাঁড়ালে, ‘গ্যালিফ স্ট্রিট’ দেখা যায়। খালটাও দেখা যায়। খালের পাড় নীচু হয়ে জলে মিশছে, পাড়ে কচুগাছ, আরও কীসব গাছ, খালের জলে কচুরিপানা ভেসে যাচ্ছে ভাঁটার সোময়ে। খালে নৌকো। নৌকো করে খড় আসে, মাটির হাঁড়ি আসে, আর আসে এঁটেল মাটি। আমার ঠাকুরমা-পিসিমারা বলাবলি করে— ঠিক আমাদের ফরিদপুরের মতো সেইরকম খাল সেইরকম নৌকো। আমাদের দেশ নোয়াখালি জেলায় হলেও আমার পিতামহ ফরিদপুর শহরেই শিক্ষকতা করতেন। শুরু ট্রেনিং স্কুল। মানে, পাঠশালায় যেসব গুরুমশাইরা পড়াতেন, তাঁদের ট্রেনিং স্কুল। অনেকটা আজকের প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং স্কুলের মতো। সরকারি চাকরি। দাদু পেনশন পেতেন তেত্রিশ টাকা দশ আনা।

ওই বাড়িটার কথা। এবার কালো বারান্দা। বারান্দার একপাশে পরপর তিনটে ঘর। একটা ঘরে ভাড়াটে। কখনও বাবলুদা-দীপুদিরা, কখনও শিখারা, তারও আগে একজন রহস্যময় মাস্টারমশাই, যার পায়ে খুঁত ছিল, একটা ক্রাচও নিতেন, কিন্তু সাইকেল চালাতেন। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় সাইকেলটা ওঠাতেন কী করে জানি না। মাঝের ঘরে দাদু-ঠাকুরমা দুই কাকা, আত্মীয়স্বজন এলে ওই ঘরেই বসার ব্যবস্থা হত। ওই ঘরেই একটিমাত্র চৌকি ছিল। বাদবাকি সব মেঝেতে বিছানা পেতে। তারপর লাল সিমেন্ট। পিসেমশাইদের লাল সিমেন্টের ঘর। বড়-বড় চারটে জানলা। দক্ষিণ থেকে হু-হু হাওয়া। পিসেমশাইদের পুরনোদিনের পালঙ্ক। সিংহের পায়ের মতো পায়া। তলাটা যেন সিংহের থাবা।

একটা ড্রেসিং টেবিল সেই টেবিলে হিমানী-স্নো, হিমালয় বোফে ট্যালকম পাউডার, কান্তা সেন্ট, আর পিসেমশাই মাথায় দিতেন কোলগেটের হেয়ার ওয়েল। লাল রং। আর ছিল একটা কাঠের আলমারি। বিরাট আয়না। পিসেমশায়ের ঘরের আয়নতেই আমি নিজেকে পুরোটা দেখতে পেতাম। আমাদের ঘরের একটি দেওয়ালের আয়নার কথা মনে পড়ে। শুধু মুখটুকুই দেখা যেত। আমার মা ওতেই মাথা আঁচড়াতেন। একটা ব্যাপার আমার বড় রহস্যময় লাগে। ওই বাড়িতে পাঁচটা পরিবারের এতগুলো লোক কাচ্চা-বাচ্চা নিয়ে ১৫-১৬জন এর ওপর দু-একজন অতিথি সবসময়ে কীভাবে সিঁড়ির তলায় একটা ছোট কলঘরে ম্যানেজ হত? ওই ঘরে কাচাকুচিও তো হত। তবে? কলের পাশের সিঁড়িতে বসে থাকার কথা মনে পড়ে। কলে কেউ আছে, ওর হলে ঢুকব। মেয়েরা কল থেকে ভেজা কাপড়ে বেরত। গায়ে ভেজা গামছা জড়িয়ে। শীতকালেও। ওই ছোট কলঘরে কাপড় পাল্টানোর মতো জায়গা ছিল না।