সংবাদ মূলত কাব‍্য: পর্ব ২৭

Representative Image

বনে-বন্দুকে

দিন কয়েক, তা তিন-চারদিন আমরা চম্বল বেহড়ের ভেতরেই ঘোরাঘু্রি করলাম। অপূর্ব সেই প্রকৃতির গোলকধাঁধায় যতই ভেতরে ঢুকলাম, ঢাকা পড়ে গেল রছেড়-সহ গ্রাম জনপদগুলি। চাচা মোহর সিং সঙ্গে না থাকলে, মাঝে-মাঝে এই পরিক্রমায় নির্দিষ্ট রছেড় গ্রামে ফেরা আমাদের পক্ষে দুষ্কর হত, তা বুঝেছিলাম। চাচা মোহর সিং আমাদের বলে দিয়েছিলেন, বেহড়ের একটি আপ্তকথা: যদি তুমি বেহড়ে পথ হারিয়ে ফেল, তাহলে যেখানে দেখবে বেহড়ে গরু ছাগল চড়ছে বা উট ঘুরছে, সূর্য ডোবার সময়ে ওরা যখন গ্রামে ফিরবে, ওদের পিছু-পিছু যে-কোনও গ্রামে ফিরে যাবে। তারপর, লোকজনের কাছে জেনে নিয়ে রছেড় গ্রামে ফিরে আসবে।

এরপর চাচা মোহর সিংয়ে সঙ্গে না এসে, আমরা দু’জন বেহড়ে নেমে দু’তিনবার পথ হারিয়ছি। বেহড়ের ভেতরে চিৎকার করেছি, ‘রছেড়বাসীও, কিধার তুম কিধার তুম…’ চম্বল বেহড় প্রতিধ্বনিময়।

বেহড়ের ভেতরে দেখেছি, দু’তিনটি দুর্গের ধ্বংসস্তূপ; বেহড়ের ভেতরে কোথাও-কোথাও দেখেছি রাজারাজড়ার ভাঙা মূর্তি ছড়ানো, যে-সব মূর্তি জাদুঘরে থাকতে পারত। এছাড়া গোয়েন্দা-নজরে দেখেছিলাম, বেহড়ের ভেতরে পথের ধারে দু’একটা জায়গায়, সিগারেটের টুকরো পড়ে, নিশ্চিতভাবে এই সিগারেট ফুকেছে বাগি দলগুলির কোনও সদস‍্য, মোহর সিং চাচাও এতে সহমত হলেন। চম্বলের গ্রামগুলির দোকানে তখন বিড়ি মিললেও, সিগারেট মিলত না। সিগারেট পাওয়া যেত গঞ্জ বা শহরে।

দ্রৌপদীর অভিশাপে চম্বল নদীর জল যারা পান করে, তারা প্রতিহিংসাপ্রবণ হয়ে যায়! পড়ুন: ‘সংবাদ মূলত কাব্য’: পর্ব ২৬

চম্বল উপত‍্যকার এসব অঞ্চল ছিল, গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া রাজত্বের অধীন। বেহড়ে যেসব ভাঙা মূর্তি দেখেছি, সেসব  সিন্ধিয়া রাজাদের, ইন্দিরা মন্ত্রিসভার প্রয়াত রেলমন্ত্রী  মাধবরাও সিন্ধিয়া ও তাঁর ছেলে এখনকার রাজনীতিক জ‍্যোতিরাদিত‍্যের পূর্বতনদের। ভাঙাচোরা যেসব দুর্গ দেখেছি, সেগুলি সম্ভবত সিন্ধিয়া রাজাদের শিকারকালের বিশ্রামাবাস। কানপুর দেহাতের বেহমাই গ্রামে ফুলনদেবী যখন গণধর্ষিতা, বিধ্বস্ত, এইরকমই একটি দু্র্গে তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন বাগিসর্দার বাবা মুস্তাকিন। পুলিশের এনকাউন্টারে বাবা মুস্তাকিন নিহত হওয়ার পর, তাঁর ভাঙা দলটি সংগঠিত করে ফুলন দেবী গড়ে তোলে তার বাগি দলটি। আমরা যখন চম্বল পৌঁছই, তখন ফুলন চম্বল বেহড়ের এ-প্রান্ত ও-প্রান্তে উত্তরপ্রদেশ ও মধ‍্যপ্রদেশ দুই রাজ‍্যেরই পুলিশকে দৌড় করাচ্ছে।

যত ঘুরেছি বেহড়, দেখেছি অজস্র ময়ূর। ময়ূরের কথা বলে নিই। হাওড়া থেকে ট্রেনে আসার সময়ে বিহার ছাড়তে না ছাড়তে সর্বত্র ময়ূর। উত্তরপ্রদেশে ঢুকতে আরও-আরও এই অপরূপ পেখমধারী বড়সড় পাখি। কেন ময়ূর ভারতের জাতীয় পাখি, তা তো তার নীল-বেগনি রূপের ছটাতেই। চম্বলে তো ময়ূরে ছয়লাপ। রেলস্টেশনের রেলিংয়ে ময়ূর। অট্টালিকার মাথায় ময়ূর, ঝূপড়ি ঘরের চালে ময়ূর। নীল-বেগনি ময়ূরের ইতিউতি সংখ‍্যায় অল্প গাঢ় খয়েরি, যেন হতশ্রী ময়ূরও দেখেছি। তবে ওই নীল বেগনির বর্ণময় ময়ূর, আহা কী সুন্দর! ‘ময়ূর, বুঝি-বা কোনও সূ্র্যাস্তে জন্মেছো।’

সিন্ধিয়া রাজত্বের কথা বললাম। ওই সিন্ধিয়া রাজত্বেরই ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায়, ডোঙর ও বটরি নামে দুই দস‍্যুনেতার, থুড়ি বাগি সর্দারদের কথা। যুগ্মভাবে তাঁরা একটি বাগি দল চালাতেন মুরেনা-ভিন্দ অঞ্চলে। প্রায় দেড়শো বছর আগের আগের কথা। তখন প্রয়াত রেলমন্ত্রী মাধবরাও সিন্ধিয়ার ঠাকুরদা মাধো রাও সিন্ধিয়ার আমল। ডোঙর আর বটরি দুই বন্ধু তখন বেহড় তোলপার করছেন। লুটে নিচ্ছেন রাজার খাজনদারদের হাত থেকে খাজনার বস্তা, ঝুলি। তখনকার দিনে তাঁদের হাতে দুটো একটা গাদা বন্দুক, বাকি সব লাঠি-সড়কি। অতিষ্ট হয়ে সিন্ধিয়া রাজা পাঠিয়ে দিলেন সিপাই, অনেক সিপাই, সৈন‍্যও।

কোনও যুদ্ধ হল না। গাছতলায় বসে রোগা ডিগডিগে দুটো বুড়োটে লোক ভর দুক্কুরবেলা জোয়ারের রুটি চিবোচ্ছিল। তর্জনীতে চাটনি তুলে চাটছিল। সিপাই-সর্দারের কানে ফিসফিসিয়ে গুপ্তচর বলল, ওই ওই যে ডোঙর, বটরি। সিপাইরা ঘিরে দু’জনকে দড়িদড়ায় বাঁধতে যাবে, ডোঙর বলল, দাঁড়াও, আগে খেয়ে নিই। বটরিও তর্জনী চুষত-চুষতে বলল, আসবার আর টাইম পেলে না তোমরা!

ধরে-বেঁধে ডোঙর, বটরিকে এনে গোয়ালিয়র জেলে বন্দি করা হল। পরদিন রাজা মাধো রাও এলেন দু’জনকে দেখতে। রাজা দেখলেন, ভয়-উদ্বেগ কিচ্ছুটি নেই ওই ভয়ানক লোক দুটির। সেলাম ঠুকে হো-হো হাসছেন তাঁরা। রাজা বললেন, হাসছো কেন? ভয়ডর নেই। ডোঙর বললেন, জেলখানায় আমাদের বেঁধে রাখা যায় না। দুটো লম্বা বাঁশ আমাদের হাতে দাও না? এসে গেল দুটো লম্বা বাঁশ। ওই বাঁশ হাতে ছুটে বাঁশের মাথায় চড়ে গোয়ালিয়র জেলের পাঁচিল পার হয়ে গেলেন ডোঙর, বটরি দুই দোস্ত। যাকে বলা যায় পোলভল্ট। কী আশ্চর্য, ওই ভাবে জেলে ফিরে এলেন তাঁরা একেবারে রাজার সামনে। পালালেন না। দেখে তাজ্জব, মুগ্ধ সিন্ধিয়া রাজা মাধো রাও। তখনই সিপাহি ও সেনাবাহিনীতে ডোঙর, বটরির একজনকে সিপাহসালার, আরেকজনকে সেনাপতি নিয়োগ করলেন সিন্ধিয়ারাজা।

ইতিহাস অনুয়ায়ী ওই ডোঙর ও বটরি চম্বলের প্রথম দস‍্যু সর্দার জুটি, থুড়ি, বাগি দলের সর্দার জুটি। তবে তাঁদের আগে, আরও কেউ-কেউ অবশ‍্যই ছিলেন প্রতিহিংসার আগুনে দাউ-দাউ ক্রোধে সশস্ত্র দলবল গড়ে চম্বলের বেহড়ে নেমে তাণ্ডবসৃষ্টি করা বাগি। তবে তাঁদের কথা ইতিহাসে নেই। আরও কথা, হিন্দি ছায়াছবিতে দস‍্যুদল মানেই ঘোড়সওয়ার, যেমন ‘শোলে’ ছায়াছবিটিতে গব্বর সিং ও তার দলবলকে দেখানো হয়েছে, এযুগে তেমন কিন্তু নয়। ডোঙর বটরিদের হয়ত ঘোড়া ছিল, পরবর্তীকালে ছ’য়ের দশকে মাধো সিং, মোহর সিং, পান সিংরা, এবং পরবর্তীকালে মালখান সিং, ফুলন দেবীরা জিপ গাড়ি ব‍্যবহার করেছেন, মোটর সাইকেলও। অভিযানকালে সর্দার-সহ গোটা দলেরই ফৌজিসাজ, খাকি এবং জলপাই রঙের। হঠাৎ দেখলে পুলিশ বা সেনাবাহিনী মনে হবে। গভীর রাতে কখনও-কখনও ঘুম ভেঙে গেছে আমাদের বেহড় থেকে আসা জিপ ও মোটর সাইকেলের শব্দে।

সাম্প্রতিককালের চম্বলের সমাজে সবচেয়ে নামডাকওয়ালা বাগি সর্দার, মান সিং রাঠোর। সে-সময়ে চম্বলে মানসিং, পুতলি বাইয়ের দলবলের দাপট তুঙ্গে ওঠায় তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই প‍্যাটেল সেনাবাহিনীর কাছে বিমান হানার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেনাবাহিনী সম্মত হয়নি। সেনাবাহিনী বলেছিল, বিমান থেকে বোমাবর্ষণে বহু নিরীহ গ্রামবাসীর মৃত‍্যুর আশঙ্কা আছে ১৯৫৫ সালে মধ্যপ্রদেশের ভিন্দের কাকেকাপুরায় এক বটগাছের নীচে বসে থাকা অবস্থায় গোর্খা সেনারা তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন ইন্সপেক্টর বিনোদচাঁদ চতুর্বেদী। সেনাপুলিশের ওই অভিযানে মান সিংয়ের অগ্রজ ভাই নবাব সিং, মান সিংয়ে ছেলে তহশিলদার সিং, মান সিংয়ের দলের সদস‍্য লুক্কা মহারাজ, রূপ সিং-সহ অনেকেই ধরা পড়েন। মান সিংয়ের দলের অবসান ঘটে। যাঁদের নামোল্লেখ করলাম, তাঁদের সকলেরই ফাঁসির সাজা হয়েছিল।

ওই সময়েই চম্বলে শান্তির উদ‍্যোগ নিয়ে গ্রামে-গ্রামে কাজ করছিলেন সর্বোদয়ীরা। সে-সময়ে সর্বজনমান‍্য সর্বোদয়ী নেতা বিনোবা ভাবে চম্বলে এবং দিল্লিতে তৎপরতা চালিয়ে নবাব সিং, তহশিলদার-সহ ২০ জনের ফাঁসি রদ করেন। বিনোবাই তখন বলেন, এরা দস‍্যু নয়, এরা বাগি। হিন্দি ‘বাগি’ শব্দটির অর্থ  বিদ্রোহী। আমরা যখন চম্বলে যাই তখনও সর্বোদয়ীরা চম্বলে শান্তির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বাগি নেতারা অনেকেই সর্বোদয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সে-সময়ে ছিলেন শান্তির প্রচারক। মান সিং-পুত্র তহশিলদার সিং ছিলেন সর্বোদয়ী নেতা।

আমরা যখন চম্বলে যাই, শতবর্ষ পার করেও মান সিংয়ের বড়ভাই নবাব সিং রাঠোর ছিলেন বেঁচে। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর, আগ্রা জেলার খেরা রাঠোর গ্রামের বাড়িতেই থাকতেন তিনি।

তিন-চারদিন বেহড়ে ঘোরা পর আমরা ঠিক করলাম নবাব সিংয়ের কাছে যাব। চাচা মোহর সিংও বললেন, উনকো পাস যাও, আশীর্বাদ লে লাও। চম্বলের বাগিরা সবাই তাঁকে ভক্তি করে। তোমরা তাঁর সঙ্গে দেখা করলে, সবাই তোমাদের কথা জেনে যাবে। তোমাদের কোথাও কোনও বিপদ হবে। ফস করে সৌগত বলে বসল, জয়পুরে আমাদের সম্পাদক সাহের বন্ধু বড়-বড় কর্তাদের চিঠি দিয়ে দিয়েছেন…। চাচা বললেন, ওসব খত ফেক দো।

চম্বল কৃষিসমৃদ্ধ। কৃষিকাজে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ট্রাক্টর ব‍্যবহার হয়। ওই রকম একটা ট্রাক্টর আমাকে আর সৌগতকে নামিয়ে দিল কয়েক কিলোমিটার দূরে উসেতঘাটে, চম্বল নদীর কিনারে। কুমির আছে চম্বল নদীতে। উসেতঘাট, এখানেই ওপার থেকে চম্বল নদী একহাতে (আগের একটি এনকাউন্টারে তাঁর ডান হাতটি কনুই থেকে বাদ গিয়েছিল) সাঁতরে আসছিল পুতলিবাই, পুলিশের গুলিতে তিনি মারা যান। যতদূর মনে পড়ে, মোটর চালিত একটি জলযানে আমরা চম্বল নদী পেরোলাম। চম্বল নদীতে ফেলে দিলাম জয়পুরে আমাদের হাতে দেওয়া ওই সব চিঠি। উসেতঘাটেই সৌগত তার জলের বোতলে চম্বলের পানি ভরে নিয়েছিল। ঢক-ঢক করে আমরা চম্বলের জল খেলাম। আমি এবং সৌগত দু’জনেই তাই এত রেগে যাই, তাই এত উৎপাত করি।

চম্বল পেরিয়ে আমরা উত্তরপ্রদেশের পিনহাটে পৌঁছলাম। পিনহাট বাসঘাঁটি থেকে উত্তরপ্রদেশ রাজ‍্য পরিবহনের আগ্রাগামী বাসে চড়লাম। মাঝপথে পড়বে মান সিং-নবাব সিংয়ের গ্রাম খেরা রাঠোর। এ-বাসেও আসনগুলির ওপরে লেখা: ভরি বন্দুক লে কর ন বৈঠ। অর্থাৎ গুলি ভর্তি বন্দুক নিয়ে বসো না।

এই বাসেও আমরা প্রচার চালালাম: আমরা পত্রকার। চম্বলের বাগিদের কাহানি লিখতে এসেছি। এখন যাচ্ছি ঠাকুর নবাব সিংজির কাছে। পিছনে টানা আসনটিতে দলবল নিয়ে কাঁধে বন্দুক আমাদের সমবয়সি এক তরুণ বসেছিলেন। উঠে এসে হাত বাড়িয়ে বললেন, আপনারা আমাদের বাড়িতেই যাচ্ছেন, আমাদেরই মেহমান আপনারা। আমি মুন্না সিং রাঠোর, আমি মান সিং-নবাব সিংয়ের নাতি….