বিভাজন-পূর্ব কালের অখণ্ড পঞ্জাব এবং সিন্ধ প্রদেশের অন্তর দিয়ে বহু নদী বয়ে গেছে দক্ষিণে সাগরের দিকে। সিন্ধু ছাড়াও রয়েছে ঝিলম, চেনাব, রাভি, বিয়াস, শতদ্রু। এইসব নদীর বিস্তীর্ণ অববাহিকায় একাদশ শতকের পরবর্তী সময় থেকে দীর্ঘ ছ’শো বছরে যে-সব সুফি ভাবধারার কবি ও সাধক কাজ করেছেন, তাঁদেরই মধ্যে থেকে নির্বাচিত কয়েকজনের রচনার সঙ্গে একটু কথাবার্তা বলাই আসলে লক্ষ্য।
ভক্তিবাদের এক তরঙ্গ অষ্টম থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত ভারতের অন্য নানা প্রান্তে যেমন প্রান্তজনের দিকে ছড়িয়ে দিয়েছিল পাখনা, কতক তেমনই, ভারতের এই অঞ্চলে সব ধর্মের মানুষের কাছে গিয়েছিল সুফিসন্তদের সুর। আজকের ভারতের ঘৃণালাঞ্ছিত রাজনীতির বয়ানে এসব অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। তবু মনে রাখা যাক, তৌহিদে আস্থাশীল সাধকের হাতে রাধা-কৃষ্ণ, সোহ্নি-মেহের, হির-রান্ঝা বড় সমাদরে এসেছিলেন। ইতিহাস খুঁড়ে সর্বদা মসজিদ বা মন্দির নয়, ‘রাশি রাশি দুঃখের খনি ভেদ করে’ প্রায়শই শোনা যায় ‘শত জল ঝর্ণার ধ্বনি।’ তার কিছু রেশ এখনও ঘুরে বেড়ায় হিন্দি-অবধি গানের সুরে। বাংলা ভাষাতেও তার কিছু ভাগ যদি পাওয়া যায়— এই আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এসেছে এই কলাম— ‘সিন্ধুপারের সুফি’।
শাহ আব্দুল লতিফকে নিয়ে পড়ুন ‘সিন্ধুপারের সুফি’ পর্ব ৫।
সুলতান বাহু-কে নিয়ে পড়ুন ‘সিন্ধুপারের সুফি’ পর্ব ৪।
শাহ মাধো হুসেইন-কে নিয়ে পড়ুন ‘সিন্ধুপারের সুফি’ পর্ব ৩।
বাবা ফরিদকে নিয়ে পড়ুন ‘সিন্ধুপারের সুফি’ পর্ব ১ ও ২।
সচল সর্মস্ত
সুফি কবি ও সাধক মনসুর হাল্লাজের যে-কথাটি নিয়ে এত আলোড়ন, যে-কথা তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল মরণে, সকলেই জানেন সেই বাক্যটি হল ‘আনা আল হক্’। সংক্ষেপে সেটি এখন দাঁড়িয়েছে আনাল হক। এও সকলের জানা, এর অর্থ হল ‘আমিই ঈশ্বর’। উপনিষদের ‘অহম্ ব্রহ্মাস্মি’— এই মহাবাক্যের সঙ্গে তাকে মিলিয়ে দেখার চল আছে। এক হিসেবে মিল আছে বইকি, কিন্তু সে একেবারে খাপে-খাপে মিল নয়।
শাস্ত্রমতে আল্লাহ্-র একশত নাম। সে-সবই আসলে তাঁর এক-একটি পরিচয়। যেমন, তিনি হলেন ‘আল খালিক’— সমস্ত কিছুর স্রষ্টা, নির্মাতা; তিনি ‘আল গফ্ফার’— সর্বদা ক্ষমাশীল, কিংবা ‘আর্ রহমান’— পরম দয়ালু। এরই মধ্যে তাঁর একটি পরিচয়, তিনি আল হক্— পরম সত্য। হাল্লাজ যখন বলেছেন ‘আনা আল হক্’, তখন নিজেকে তিনি সরাসরি আল্লাহ্ বা তাঁর সমকক্ষ বলেননি। লক্ষনীয়, তিনি ‘আমিই আল খালিক’ কিংবা ‘আমিই আল গফ্ফর’ বলেননি, বলেননি আমি-ই স্রষ্টা কিংবা আমি-ই পরম করুণাময়। তাঁর বেছে নেওয়া কথাটি হল হক্, ‘সত্য’। ‘হক্’ শব্দে প্রথমত ‘সত্য’ বোঝায়, লক্ষণায় তা আল্লাহ্কেও চিহ্নিত করে। অতি গোঁড়া ব্যাখ্যাকারেরা ধরে নিয়েছিলেন, হাল্লাজ নিজেকেই আল্লাহ্ বলছেন— যা আসলে ভয়ানক ঈশ্বর-বিরোধিতা। ফলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কতকটা সক্রেটিসের বিচারের মতো পরিস্থিতি— হাল্লাজ কি ফিরিয়ে নেবেন নিজের কথা? তিনি কি ক্ষমা চাইবেন শেষে? না, তা হয়নি।

মনসুর হাল্লাজকে নিয়ে সারাজীবন গবেষণা করেছেন ফরাসি গবেষক লুই ম্যাসিনিয়োঁ। হাল্লাজের বিচার এবং শেষ সংলাপের একটি চমকপ্রদ বিবরণ ও বিশ্লেষণ পাওয়া যাবে তাঁর চার খণ্ডের মহাগ্রন্থ ‘দ্য প্যাশন অফ আল্ হাল্লাজ: মিস্টিক অ্যান্ড মার্টার অফ ইসলাম’ বইতে। কোনও-কোনও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ উল্লেখ করে ম্যাসিনিয়োঁ দেখিয়েছেন, মৃত্যুর আগে হাল্লাজকে অসম্ভব কষ্ট দেওয়া হয়। সেই কষ্ট স্বীকার করেও হাল্লাজ তাঁর কথা ফেরত নেননি। সুফি ভাবুকের এই কাহিনি-পরবর্তী সময়ে আরও অনেক সুফি সাধকের কাছে হয়ে উঠেছিল প্রতীকী। অনেকেই তাঁকে গুরু মেনেছেন, হাল্লাজের চরম পরিণতিতে ভয় পাওয়ার বদলে তাঁর প্রতি অনুরক্ত হয়েছে বহু মানুষ। তাঁর মতো সত্যের খাতিরে নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার বাসনায় অধীর হয়েছে অনেকের কলম। শুধু সত্য কিংবা ঈশ্বর নয়, হক শব্দটি ক্রমে ব্যবহৃত হয়েছে পরমের প্রতি প্রেম বোঝাতেও। হক অর্থ সত্য, আর চরম সত্য হল প্রেম— এই দৃষ্টিভঙ্গি যিনি স্বীকার করেন, ঈশ্বরের সঙ্গে একাকার হতে মনসুরি পন্থার প্রতি তাঁর তীব্র আকর্ষণ থাকাই স্বাভাবিক।
আমরা আগের এক পর্বে সতেরো শতকের সুফি কবি সরমদের কথা বলেছিলাম— একটি কবিতায় তিনি প্রগাঢ় আবেগে লিখেছিলেন, বহুদিন মনসুরের কথা স্মরণ করে না পৃথিবী, বোধ হয় ভুলেই গেছে তাঁকে— ভুলে গেছে তাঁর আত্মনিবেদন ও কিছুতেই মাথা না-ঝুঁকিয়ে ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহসের কথা। নিজের একটি কবিতায় সরমদ তাই তীব্র সুখে নিজেকে মনসুরের উত্তরসূরি বিবেচনা করেছেন, চেয়েছেন মনসুরের পরিণতি তাঁকেও গৌরবে স্নান করিয়ে দিক। সিন্ধি সুফি কবিতাতেও বহুবার এসেছে হাল্লাজের প্রসঙ্গ। কিন্তু আঠারো শতকের সিন্ধি কবি সচল সরমস্ত (১৭৩৯-১৮২৭) ছাপিয়ে গেছেন সকলকে। বারংবার তাঁর কবিতায় টগবগ করে উঠেছে মনসুর হাল্লাজের স্বর। এতবার মনসুর-স্মরণ আর কেউ-ই বোধহয় করেননি। সংগতভাবেই সচল সরমস্তকে কেউ কেউ বলেছেন সিন্ধের মনসুর, সিন্ধি হাল্লাজ।
মনসুর হাল্লাজ ছাড়াও সচলের আর প্রিয় কবি ছিলেন আত্তার— সেই যাঁর কথা আমরা লিখেছি আগে এক কিস্তিতে— ফারসি ভাষার কবি ফরিদউদ্দিন আত্তার, ‘মতিক উত্ তায়ের’ বা ‘পাখিদের মহাসম্মেলন’ নামক দীর্ঘ মস্নভির লেখক তিনি— সেই আত্তারের কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে এসেছে সচলের গানে:
অ্যায় দিলা খুশ্বু জি ঝাক আত্তার জার জানম রসীদ…
হে হৃদয়! শাহ্ আত্তারের সেই মধুর সৌরভ
প্রবেশ করেছে দেখো, আমার অন্তরে।
আর ছিলেন মৌলানা রুমি। সচলের সমস্ত কাব্যভাবনায় রুমির স্নিগ্ধ ছায়া সহজেই টের পাওয়া যায়। সেসব কথায় আসছি খানিক পরে।

২
সচল সরমস্ত তাঁর আসল নাম নয়। পারিবারিক সূত্রে পাওয়া নাম ছিল আব্দুল ওয়াহাব। জন্ম ১৭৩৯ সালে— সিন্ধের উত্তরভাগের দরাজ নামক এক খুব ছোট্ট গ্রামে। বাবার নাম সালাউদ্দিন— তিনি এক উদাসী মানুষ ছিলেন, তাঁর নামের সঙ্গে পারিবারিক সূত্রে জুড়ে আছে ফকির। সচলের পিতামহ— ফকির সাহিবদিনো (সচলের কোনও কোনও লেখায় এই নামও আছে ভনিতা বা তখল্লুস হিসেবে)— তিনিও একজন সুফি দরবেশ হিসেবেই পরিচিত। ছোটোবেলা থেকেই কাকা আব্দুল হক-এর সাহচর্য এবং অভিভাবকত্ব পেয়েছেন সচল। কাকাই ছিলেন তাঁর অধ্যাত্মভাবনার গুরু স্থানীয়— পির ও মুর্শিদ। সারা জীবনই একথা তিনি স্মরণ করেছেন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে।
সচল তাঁর সময়ের রেওয়াজ-অনুযায়ী অতি অল্প বয়সেই সমগ্র কোরআন অধ্যয়ন করেছেন। কিন্তু শুধু কোরআনেই তাঁর জ্ঞানচর্চা সীমিত ছিল না। যথার্থ পণ্ডিত হিসেবে বেশ খ্যাতি ছিল তাঁর। আর সুখ্যাতি ছিল কবি হিসেবে— সাতটি ভাষায় লিখতে পারতেন, তাঁকে বলা হয়েছে ‘শায়র-ই হপ্ত্ জবান’। ‘হপ্ত্’ হচ্ছে সপ্ত। আরবি-ফারসি তো বটেই, তার সঙ্গে কর্তৃত্ব ছিল সিন্ধি, পাঞ্জাবি, হিন্দি, উর্দু আর সরাইকি (এটি আসলে পাঞ্জাবির বিশেষ এক বুলি) ভাষায় কবিতা লিখেছেন। আমরা আগের পর্বে যে শাহ্ আব্দুল লতিফের কথা লিখেছি, তিনি সচলের ঈষৎ পূর্বসূরি। লতিফ যখন মারা যান, তখন সচলের বয়স মাত্র ১৩। অন্তত একবার দেখা হয়েছিল এই দুই কবির— দরাজ গ্রামে গিয়েছিলেন লতিফ। তখনই কিশোর সচলের সঙ্গে তাঁর প্রথম মোলাকাত। ভারী তথ্য-প্রমাণ নেই ঠিকই, কিন্তু পরম্পরায় চলে এসেছে এই কথা যে, কিশোর সচলের জন্য খুব ইতিবাচক ভবিষ্যৎ-বাণী করেছিলেন লতিফ। সচলের কিছু আগেই এসেছেন পাঞ্জাবের ওসিন্ধি ভাষার শ্রেষ সুফি কবি বুল্লেহ শাহ্ (১৬৮০-১৭৫৭)— সচলের আঠারো বছর বয়স যখন, তখন বাবা বুল্লেহ্ শাহ্ মারা যান। কালের বিচারে তাঁর কথাই আগে লেখা উচিত, কিন্তু শ্রেষ্ঠ কবির কথা শেষ কিস্তিতে লিখব বলে ক্রম ভেঙে এই পর্বে আমাদের কবি সচল সরমস্ত।
আব্দুল ওয়াহাব যে ক্রমে পরিচিত হয়ে উঠলেন সচল সরমস্ত নামে— তাঁর আদত নামটি যে ধীরে ধীরে আবছা হয়ে গেল, তার পিছনে কোনও বিশেষ গল্প নেই। সচল নিজেই গায়ে পরে নিয়েছিলেন ‘সচল’ অভিধাটি, আর সরমস্ত শব্দটি সম্ভবত তাঁর অনুসারী-অনুগামীদের কাছ থেকে এসেছিল। ‘সচল’ শব্দটি কিন্তু আমাদের পরিচিত বাংলা শব্দ— যা কিছু চলমান, গতিশীল— তা নয়। এর মধ্যে আসল কথাটি হল সচ্— সত্য— সচ্ আল্ সর্মস্ত্। সত্যে যিনি মত্ত। কী তাঁর কাছে ‘সত্য’? ধ্রুপদি সুফি পরম্পরা মেনে বলা যায়, প্রেম ছাড়া অন্য সত্য নেই। প্রেমেই তিনি মাতাল। বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী, ইসলাম কিংবা কাফেরি (কুফ্রি), ধর্ম অধর্ম— কিছুই সেখানে প্রাসঙ্গিক নয়। এই ‘সুসময়ে’ এমনকী ইশ্বরেরও আলাদা কোনও মর্যাদা নেই— তিনিও আদতে প্রেমই। এমন কথায় যদি কেউ ঈশ্বর-অবমাননা খুঁজে পান, তাহলে সচল সরমস্ত রুখে দাঁড়াবেন কবিতায়। সিন্ধি কবিতার পরম্পরায় সচলের কথা বেশ আলোড়ন তুলেছিল ঠিকই, তবে তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, রুমি-আত্তার-হাল্লাজ— ফারসি-সুফি কবিতার এই ত্রয়ীর রচনায় প্রায় একই ধরনের কথা তাঁর সাতশো বছর আগে থেকেই বারবার উচ্চারিত হয়ে এসেছে। আমরা রুমির দু’টি রুবাই এখানে রাখছি তার নমুনা হিসেবে—
১
তোমার ভালবাসাই
নিঃস্ব করে দিয়েছে আমাকে, আমি গিয়েছি ফুরিয়ে।
খাবারে অনীহা দিনে,
সারা রাত ঘুম নেই চোখে।
কীভাবে তোমার প্রেম কী করেছে দ্যাখো—
আমাকে আমার শ্রেষ্ঠ শত্রু করে তুলেছে সে আজ।
২
ইসলাম ও কাফেরের পথ—
দু’টি-ই পেরিয়ে ওই দিকে
আছে এক প্রসারিত জমি।
তারই ঠিক মধ্যিখানে বসে আছে আমাদের প্রেম।
সাধুসন্তেরাই শুধু যায় ওইখানে,
বন্দেগিতে ঝুঁকিয়ে মাথাটি।
কাফের বা মুমিনের ওইখানে ঠাঁই নেই কোনও।
রুমির অনুসরণেই সম্ভবত সচল সরমস্ত বারবার তাঁর নিজের লেখায় বিশ্বাসী ও কাফেরের ভেদরেখা তুলে দিতে চেয়েছেন। আপাত অবিশ্বাসীকেও যদি টেনে নিতে না পারি নিকটে, তাহলে আমার গভীর বিশ্বাসই ঠুনকো হয়ে পড়ে। এই ভেদ যে করে, সে-ই আসল অবিশ্বাসী। সমস্ত মানুষই প্রেম, সত্য এবং পরমলগ্ন— জ্ঞাতসারে অথবা অজ্ঞাতে— এই আস্থা, এই স্থির সিদ্ধান্তই কেবল আমার জন্য বরাদ্দ। বলা বাহুল্য, এমন ভাবনা সহজে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার কথা নয়, সচল সরমস্ত তাই এক মহান ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত হন। একপক্ষ তাঁকে অনৈস্লামিক হিসেবে বাইরে রাখেন, আর একপক্ষ তাঁকে আরাধ্য বানিয়ে আটকে দেন। তার বাইরে আর একপক্ষও আছেন— তাঁরা আবার সচলকে ঘৃণ্য মুসলমানের বেশি কিছু ভাবতে চান না। এ-সবের বাইরে রয়ে যান আসল সচল, যিনি ইসলাম ত্যাগ করেন না, আবার প্রতিষ্ঠান যাকে ‘কুফ্রি’ বলে, তাকেও রাখেন যত্নে। তাঁর কবিতার পঙ্ক্তি তাই বিপজ্জনক, স্পর্ধায় উজ্জ্বল—
ইসলাম আমার মুখ-অবয়ব;
আর আমার চুলের ভিতর
অবিশ্বাস… কুফ্র্ নিহিত।

৩
সচল তাঁর কবিতায় রাম-রহিমের কথা তো লিখেইছেন— তাঁদের মধ্যে যে-কোনও ভেদ নেই, অন্য বহু সুফি ও ভক্তি সাধকের মতো তাঁরও এই স্থির বিশ্বাস। কিন্তু সম্ভবত তিনিই একমাত্র সুফি যিনি কবিতায় এমনকী, হনুমানের নামও উল্লেখ করেছেন।
সচল লিখেছেন, আল্লাহ বা ঈশ্বর কোনও বস্তু নয়, স্থির এক পাত্র নয়, ‘কোনও দ্বিধা নেই সাচু,/ সত্যই কেবল সত্য, আর কিছু নেই;/ এই সত্য শিখেছি গুরুর কাছে আমি।’ কিংবা লিখেছেন, ‘চূর্ণ করে দাও/ চিন্তা-চেতনার সব সীমানা-সর্হদ,/ হাল্লাজের অবাক-জগতে/ তবেই তো পাবে তুমি প্রবেশাধিকার।’ হাল্লাজের ভবিতব্য ছিল স্বাভাবিক— হত্যা করা হবে তাঁকে— তা তো জানতেন মনসুর নিজেও। মৌলানা রুমি একটি রুবাই-এ হাল্লাজ এবং প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে লিখেছিলেন, এ তো অনিবার্য। প্রেম যদি কাউকে নির্বাচন করে, যদি বেছে নেয়, তাহলে তখনই সেই নির্বাচিত মানুষের মাথায় শুরু হয় বৃষ্টিপাত, অঝোরে সংকট নেমে আসে। প্রেমিকের এই গুপ্ত রহস্যকথা ইশারায় বলেছিলেন মনসুর। তাই ঈর্ষার দড়িতে তাঁকে ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সত্য বিষয়ে হাল্লাজের সত্যবচনে বিপন্ন হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। হিংস্রতা দিয়ে তারা ঢেকে দিতে চায় সত্যকে।
ধর্ম এবং ধর্মবোধকে যারা আচরণে টেনে বাঁধতে চায়, যারা তাকে একটি কারবারে, অভ্যাসে ও সংস্কারে আটক করতে সদাব্যস্ত থাকে, সচল তাদের জন্য অজস্র কটাক্ষ রেখেছেন নিজের কবিতায়। যেমন এই লেখাটিতে—
জ্ঞানী হইনি, পণ্ডিতও না।
কাজি নই, মোল্লা নই, নই আমরা ধর্ম প্রচারকও।
এসব প্রতারকের উপযোগী যন্ত্রপাতি নেই আমাদের।
ও সচল, ঈশ্বরের ভালবাসা ছাড়া
অন্য কোনও শিল্পকলা শিখিনি কখনও।
একদিকে জ্ঞান, পাণ্ডিত্য ইত্যাদির অক্ষমতা প্রদর্শন, এদের থেকে নিজের দূরত্ব স্থির করে নেওয়া, অন্যদিকে শাসনকাজে সহায়ক কাজি কিংবা বিচারকের উল্লেখ, আর তারই সঙ্গে ‘মোল্লা’ শব্দের মধ্যে ধর্মপ্রধানের প্রসঙ্গ একসঙ্গে রেখেছেন সচল। সকলেই নানা ধরনের মিথ্যা বুনে চলেছে। যুক্তি, পাণ্ডিত্য, ধর্ম কেউই মানুষের আদত অর্থ খোঁজে না, বলে না মানুষ আসলে ভালবাসা-সম্ভূত, প্রেম থেকে প্রেমে গমনাগমনই তার স্বভাব। তা না জানিয়ে, কেবলই প্রতারকের মতো তারা নানা উপকরণে, নানা হিসেব-নিকেশে ভরে তোলে মানুষের জীবন। সচল জানাবেন, ভগবদ্প্রেম— ইশ্ক্-ই হকিকি ব্যতিরেকে অন্য কোনও শিল্প নেই তাঁর। এমন স্বীকারোক্তি ছাড়াও কিছু তির্যক প্রশ্নও তিনি রাখেন অবরে-সবরে। ধর্মভীরু আচরণময় বিশ্বাসীর কাছে তাঁর প্রশ্ন— কিছু শ্লেষও আছে এইখানে পাঠক নিশ্চয় লক্ষ করবেন—
আশ্রয় নিয়েছ তুমি
ধর্মে আর নমাজ-আসনে;
ভর দিয়ে আছ—
রাশি-রাশি কাগজ কুচিতে।
কেন যাও অসত্য প্রচারে,
দড়ির বাঁধনে কেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছ নিজেকে?
ধর্মাচার, নমাজ, শাস্ত্রপাঠ ধর্মপ্রচারযাত্রা সহ এমনকি তসবিহ্ বা জপমালা গণনার মতো কাজ— সবই তাঁর কাছে অদরকারি। ধর্মপালনের অর্থ যদি পরলোকে (কিংবা বেহেশ্তে) অপার সুখলাভের বাঞ্ছা হয়, যদি তাকে অন্য অর্থে ‘মোক্ষ’ বলে ডাকি, তাহলে তা শেষ পর্যন্ত লোভেরই অপর নাম হয়ে উঠতে পারে। প্রথম যুগের সুফি সাধক রাবেয়া বাস্রি লিখেছিলেন, আমি যদি ভয়ে কিংবা লোভে তোমার কথা ভাবি, হে ঈশ্বর, তাহলে শাস্তি দিও, বঞ্চিত ক’রো সব কিছু থেকে। তোমাকে তোমার জন্যই শুধু যদি-না কামনা করি, তবে ধিক্কার দেব নিজেকে। রাবেয়া বলেননি, অনেক পরে কথাটি বলবেন ‘চৈতন্যচরিতামৃত’-কার কৃষ্ণদাস কবিরাজ, মোক্ষের বাসনাই সব চেয়ে ভয়ানক ছল— তা তোমার থেকে বহু বহু দূরে নিয়ে যায়। মোক্ষ চাই না আমি, তোমাকে চাই। আর সচল জানাবেন, তোমাকে চাই বলাও অধিকন্তু আসলে। চাইব কী করে, আমি তো তুমিই।

৪
আমরা এই কলামের মধ্যে খটোমটো দার্শনিক তর্ক তুলব না গোড়াতেই বলেছি। কিন্তু এইটুকু অন্তত না-লিখলে অন্যায় হবে যে, সুফি ভাবধারায় বারো-তেরো শতকের আন্দালুসীয় দার্শনিক ইব্নুল আরাবি (১১৬৫-১২৪০) ইসলামি চিন্তাকাঠামোর মধ্যে থেকেই ‘ওয়াহাদাতুল ওয়াজুদ্’-এর যে প্রস্তাব রেখেছিলেন তা নিয়ে তাঁর সমকালে এবং উত্তরকালে বহু বিতর্ক হয়। মানুষ এবং সমগ্র সৃষ্টি-ই আসলে ঈশ্বরের প্রতিফলন, তা স্ব-তন্ত্র নয়, সৃষ্টি-স্রষ্টা আদতে একই। মানুষের মধ্যে ঈশ্বরেরই সারাংশ উপস্থিত— ইব্নুল আরাবির এই ধারণা বহু ইসলামি পণ্ডিত অস্বীকার করেন, কেননা তাঁদের মনে হয়, তার মধ্যে অদ্বৈতবাদের আড়ালে আসলে সর্বাস্তিবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে। কঠোর সমালোচনা এবং আক্রমণের সামনে পড়েছিলেন আরাবি। তিনি নিজেও মহাপণ্ডিত ছিলেন, শতাধিক দার্শনিক কেতাব এবং ছোট পুস্তিকার রচয়িতা হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে বেশ কোণঠাসা করেই রাখা হয়। অনেক পরে ষোলো-সতেরো শতকে শেখ আহমেদ সির্হিন্দি (১৫৬৪-১৬২৪) আরাবির পাল্টা একটি তাত্ত্বিক পরিসর গড়ে তোলেন— ‘ওয়াহাদাতুল শাহুদ’— যার মূল কথা হল, স্রষ্টা এবং সৃষ্টি একেবারেই পৃথক— ঈশ্বর-সৃষ্ট মানুষ কোনও বিশেষ মুহূর্তেই কেবল স্রষ্টার পরম অস্তিত্ব টের পায়। অর্থাৎ স্রষ্টা ঈশ্বর একজনই, তাঁর কোনও শরিক নেই, দ্বৈত নেই, কিন্তু তাই বলে জ্ঞাতা-জ্ঞেয় অদ্বৈত মেনে নেওয়া যাবে না— অর্থাৎ, সংক্ষেপে বললে ইব্নুল আরাবির পরম অদ্বৈত সরিয়ে এক সীমিত অদ্বৈত কিংবা বলা ভাল, আংশিক দ্বৈততার ধারণা হাজির করেন তিনি। এই দুই ঘরানার চিন্তাধারার মাঝে সচল সরমস্ত স্পষ্টভাবেই দাঁড়িয়ে আছেন ইব্নুল আরাবির পক্ষে। যেন আরাবিকে অনুসরণ করেই তিনি সোচ্চারে এমনও বলেন, প্রেমিক নই, আমি আসলে প্রেমের পাত্র, প্রেমাস্পদ— অর্থাৎ সকল প্রেমের আমি ‘লক্ষ্য’, কিন্তু ঘটনাচক্রে এই পৃথিবীতে এসে পড়েছি বলেই ইদানীং আমাকে প্রেমিক বলা হয়। কিন্তুই এ তো ক্ষণিক-যাপন, কিছু পরেই আমি পুনরায় আমার আসল ভূমিকায় ফিরে যাব। কিংবা বলা ভাল, প্রেমিক-প্রেমাস্পদ এক যুগল অবতারই আমার আসল পরিচয়। কিংবা আরও এককদম এগিয়ে বলা যায়, এই খণ্ড পরিচয়গুলিই সমস্যাজনক। আসলে প্রেমিক-প্রেমাস্পদ কোনও ভাগই নেই। আছে শুধু প্রেম। আমি প্রেমিকও নই, প্রেমাস্পদও নই। আমিই প্রেম। আমি সত্য।
ফারসি ভাষাতেও সচল কবিতা লিখেছেন প্রচুর— যদিও সেসব রচনার তেমন আলোচনা নেই, চর্চা নেই। আমরা তাঁর ফারসি রচনা থেকে প্রাসঙ্গিক দুই পঙ্ক্তি উদ্ধার করি এইখানে—
আগর খুদ রা গদা দানি গদাই
আগর খুদ রা খুদা দানি খুদাঈ।
নিজেকে ভিখারি ভাবো যদি,
তবে তুমি ভিখারি আসলে।
যদি ভাব খুদা,
তাহলে খুদা-ই।
ধর্মভীরু স্বভাবতই চমকে উঠবে এই উচ্চারণে। এর রূপকতা তার নজরে পড়বে না, সে কেবল ভাববে, প্রবল শক্তিমান ঈশ্বরের অথরিটিকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে বোধহয় এখানে, খোদা-বান্দার ভেদ, প্রভু-দাসের সমাচার বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে নির্ঘাত, এই মনে হবে তার। কাব্যের তির্যকতা সে অপছন্দ করে, কবিতার রহস্যময় অভিযাত্রায় তার আগ্রহ নেই। সে বুঝতে চাইবে না, এখানে ঔদ্ধত্য কিংবা অহংকার নেই, কেবল এইটুকু জানানো হয়েছে এখানে যে, আমার আর ঈশ্বরের দূরত্ব কেবল ভাবনাগত, অন্য তফাত নেই, ভিখারি আর খুদা আমার ভাবনার সামর্থে আলাদা হয়ে রন। অন্যত্র সচল এ-ও বলেন, স্বর্গই তাঁর স্বস্থান। কিন্তু এমনকী, স্বর্গ ‘আমির’ বিস্তার ধরে রাখতে অক্ষম— ‘স্বর্গ ত্যাগ করে/ এসেছি এ দুনিয়ায় আমি।/ সে দিব্য আসনে/ আমাকে আঁটিয়ে রাখা যায়নি আসলে।’ মানুষের দিব্যত্বে সচল নিঃসন্দেহ। তাঁর মানব-‘আমি’ এমনকী, স্বর্গ-ছাপিয়ে চলে গেছে।
এই সূত্রে সচলের একটি বড় লেখার তর্জমা এখানে রাখি— অনেকেই বুঝবেন এই লেখার মধ্যে একদিকে যেমন পূর্বসূরি রুমির ছায়াপাত স্পষ্ট, অন্যদিকে প্রায় একইরকম উচ্চারণ পাওয়া যাবে সচলের প্রায় সমকালীন, সিন্ধি সুফি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ভাবুক ও শিল্পী— বাবা বুল্লেহ্ শাহ্-র রচনায়। বুল্লেহ শাহ্-র লেখাটির কিয়দংশ আমরা পরের কিস্তিতে তর্জমা করে দেব। আপাতত দেখি, সচল লিখেছেন,
ওগো বন্ধু!
আমি যে আসলে কী তা বুঝি না কখনও।
কখনও ভেবেছি আমি হাতের পুতুল কারও,
না কি শুধু পুতুল-নাচানো দড়িখানি?
সখার হাতের কোনও খেলনা নাকি?
অথবা ঘুরন্ত লাট্টু?
না কি এক প্রাসাদ— যেখানে
থাকেন সম্রাট—
নানা ভাষাবিদ তিনি, মহা প্রাজ্ঞজন?
না কি আমি ধাবমান অশ্ব এক— ছুটিয়ে চলেছে অশ্বারোহী?
না কি সাগরের ঢেউ— ভাসিয়ে যে দেয় উপকুল?
অথবা হয়তো
মেহেদি গাছের ফুল— হৃদয়ে রয়েছে যার রুবি-লাল রঙ;
নতুবা গোলাপ ফুল— বুকে যার বসেছে সৌরভ;
কিংবা আমি ঝরনা কোনও— ভরে আছি মেঘ-ভাঙা জলের কণায়—
সূর্য কিংবা চন্দ্রমার বিম্বখানি নিয়ে।
কিংবা আমি আছি চিরকাল—
অনাদি সময় জুড়ে ঈশ্বরের ছায়া হয়ে আছি;
শূন্য আমি— তাও নই, নই…
সচল শিখেছে শুধু এইমাত্র গুরুর সকাশে—
খুদা ছাড়া কিছু নই আমি, খুদা— অনাদিকালের যিনি প্রভু…
ক’দিন আগেই আমাদের দেশে একদল উন্মত্ত ধর্ম-দুরাচারী সিন্ধের শ্রেষ্ঠ সুফি কবি বাবা বুল্লেহ্ শাহ্-এর নামাঙ্কিত সৌধে ভাঙচুর করেছে— উত্তরাখণ্ডের মুসৌরির কাছে। বই নষ্ট করেছে, ভাঙতে-ভাঙতে শ্লোগান দিয়েছে ‘জয় শ্রীরাম’। হায় রাম! হায় আমাদের মর্যাদা-পুরুষোত্তম। শ্রদ্ধাসহ যাঁর নাম এসেছে সচল কিংবা বুল্লেহ্ শাহ্-র কবিতায়, তাঁর নামই মুখে এল আক্রমণকারীদের? সচল সরমস্ত কিংবা তাঁর পূর্বসূরি বুল্লেহ্ শাহ্ জীবনকালে একদল ধর্মান্ধর দ্বারা সমালোচিত হয়েছিলেন। মৃত্যুর এতকাল পরে আর-এক দলের কাছে তাঁদের লাঞ্ছনা প্রয়াস। কিন্তু এও দেখতে পাচ্ছি বইকি, সব লাঞ্ছনা পেরিয়ে তাঁরা হেঁটে যাচ্ছেন ক্রমাগত, ছড়িয়ে দিচ্ছেন আমি-র খুশবু, প্রসারিত সত্তার সুবাস, প্রেমের কীর্তন।
সচলের কথায় ফলত অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেকে। কেউ আবার ভেবেছেন, এ আসলে কবির খামখেয়াল, উন্মাদনা। এই পথে সকলেই গেলে অনাসৃষ্টি কাণ্ড হতে পারে— এর গভীর ও সূক্ষ্ম তাৎপর্য সকলের পক্ষে আয়ত্ত করা অসম্ভব। তাই সচল তাঁর জীবনকালে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মপ্রধানদের কাছে ছিলেন বিপজ্জনক ব্যক্তি। সিন্ধু নদীর কূল বরাবর তাঁর গানের সুর একেবারে সাধারণ মানুষকে এখনও তৃপ্ত করে ঠিকই, কিন্তু মৃত্যুর পরে তাঁকে একজন পীর বানিয়ে, তাঁর মাজার গড়ে, সেখানে ভক্তিনম্র অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সচল সরমস্তকে অনেকখানি মোলায়েম করে নেওয়া গেছে। হাল্লাজের শিষ্য হয়তো এসব দেখে বিরক্তই হতেন। কিংবা বিরক্ত হবেন কী করে? সমস্ত সত্তা যাঁর প্রেমে একাকার, প্রেমিক-প্রেমাস্পদর বদলে নিজেকে স্বয়ং প্রেম বলে চিনতে চেয়েছেন যিনি, তাঁর কি বিরক্তির অবকাশ থাকে? সচল লিখেছেন,
কী আশ্চর্য কেরামত, দ্যাখো এ প্রেমের—
সব ধর্ম থেকে
আমাদের মুক্ত করে দেয় এই প্রেম।
মক্কা কেন যাবে?
নিজেরই চারপাশে ঘোরো, প্রদক্ষিণ করো।
তিনি ছাড়া কিছু নেই;
এই তো এখানে দেখছি আমাদের পবিত্র উদ্যান…
ক’দিন আগেই আমাদের দেশে একদল উন্মত্ত ধর্ম-দুরাচারী সিন্ধের শ্রেষ্ঠ সুফি কবি বাবা বুল্লেহ্ শাহ্-এর নামাঙ্কিত সৌধে ভাঙচুর করেছে— উত্তরাখণ্ডের মুসৌরির কাছে। বই নষ্ট করেছে, ভাঙতে-ভাঙতে শ্লোগান দিয়েছে ‘জয় শ্রীরাম’। হায় রাম! হায় আমাদের মর্যাদা-পুরুষোত্তম। শ্রদ্ধাসহ যাঁর নাম এসেছে সচল কিংবা বুল্লেহ্ শাহ্-র কবিতায়, তাঁর নামই মুখে এল আক্রমণকারীদের? সচল সরমস্ত কিংবা তাঁর পূর্বসূরি বুল্লেহ্ শাহ্ জীবনকালে একদল ধর্মান্ধর দ্বারা সমালোচিত হয়েছিলেন। মৃত্যুর এতকাল পরে আর-এক দলের কাছে তাঁদের লাঞ্ছনা প্রয়াস। কিন্তু এও দেখতে পাচ্ছি বইকি, সব লাঞ্ছনা পেরিয়ে তাঁরা হেঁটে যাচ্ছেন ক্রমাগত, ছড়িয়ে দিচ্ছেন আমি-র খুশবু, প্রসারিত সত্তার সুবাস, প্রেমের কীর্তন। গোটা দেশের মানুষের কাছে কীভাবে যেন পৌঁছে যাচ্ছে বাতাসবাহিত সেই সৌরভ। মৌলবাদীরা কেবল গাইঁতি আর শাবল চালাচ্ছে, ঘেমে উঠছে ক্রোধে, নিজের দিকেই ছিটকে আসছে ওদের ঘৃণা, ভাঙতে ভাঙতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ছে… আমরা তো জানি, বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে খুবই, হিংসা-সন্দেহ-ঘৃণা ডালপালা মেলে দিচ্ছে বেশ দ্রুত-ই, আশপাশের চেনা বন্ধুর মুখ রাতারাতি বিষে ফ্যাকাশে হয়ে যেতেও দেখছি। সেইসব ক্লান্ত, সন্ত্রস্ত, বিষ ও ব্যথায় জর্জর মুখে ঝরে পড়ুক বুল্লেহ্ শাহ্ আর সচল সরমস্তের বাণী ও কালাম। খানকয়েক মাজার ভেঙেচুরে যখন ক্লান্ত হয়ে বসবে ঘাতকরা, তখন শুনুক ওরা সচলের গান, মারকুটে মৌলবাদীদের জন্য গাওয়া হোক, প্রেম ছাড়া অন্য সত্য নেই, আরও একটু না-হয় কাটুক এই ভাঙনের কাল, অবশেষে ঠিক টের পাবে, প্রেম ছাড়া অন্য সত্য ছিল না কখনও…
তরজমা
১
সুন্দরের অপার বিভূতি-দ্যুতি
কে সইতে পারে?
বিরহে যে নিয়েছে আশ্রয়,
যে সফল যোগী।
প্রেমে যে রয়েছে বসে, সে কার শাসন মানে বলো…
সেই-তো প্রেমিক—
সত্তা যার নষ্ট হল দহনে-দহনে।
২
জেগে ওঠো মধ্যরাতে, আর
চালাও চরকাটি।
পূর্ণ মগ্নতায় বসো প্রার্থনায় তুমি,
হৃদয়ের সমস্ত উজাড় করে দাও।
নিজের সত্তার মাঝে থাকো ঘন হয়ে—
মুখ রাখো হাঁটুর উপর।
শ্বাস টেনে রাখো কিছুকাল,
সচল বলেছে—
তাকে চাও মন প্রাণ দিয়ে—
যে আছে অনেক দূরে, প্রজ্ঞাবান হও তারপর।
খোঁজো তাকে সকল সময়।
কথা বলো, চালাও সংলাপ— মেলে ধরো হৃদয়ের মুখ তার কাছে।
৩
যারা তাঁকে দেখেনি কখনও—
আপন সত্তার মাঝে পায়নি কোনও দিন,
দিব্য সুন্দরের খোঁজ,
ও সচল,
পাবে তারা অন্য কোন পথে?
সারা রাত কেবল আবৃত্তি করে কেটেছে তাদের…
৪
কী সুন্দর তুমি যে নিজেই,— তাকে জানো…
কেন সর্বদাই তুমি ডাক আল্লাহ্কেই?
তুমি তো নিজেই খুদা।
তুমিই তো শুনতে পাও ডাক—
তুমিই তো দেখো—
কোরান প্রমাণ এ-কথার।
দ্বিধা নেই সাচু—
দ্বৈত নেই— খোদা একা আছেন নিয়ত।
৫
এ তো সত্য!
আত্ম-সৃষ্ট আমরা সকলেই।
প্রতিটি মুখেই দেখি আমারই প্রচ্ছদ, আমি অসীম, অপার।
এ আশ্চর্য ভ্রমণকথায়
ইসলাম কোথাও নেই, নেই তার বিরোধী শিবিরও।
সব পরিচয়, সাচু, গেছে ধুয়ে মুছে—
জেগে আছে শুধু এক পরম বিস্ময়।
৬
জেনেছ নিজেকে? জানো, জানো…
মাটির গভীরে আছে সব রত্নরাজি।
দ্বৈততার ধুলোবালি
দাও উড়িয়ে দাও…
শুদ্ধ অনুভবী, তুমি ঠিক খুঁজে পাবে—
পাবে, খুঁজে পাবে শক্তি, আলোঝলোমল…
৭
প্রকৃতির পোশাক পরেই তুমি এসেছ জগতে।
স্বর্গ চেয়েছিলে,
স্বর্গের জিনিস তাই ঠাঁই পেল এই পৃথিবীতে।
যা-কিছু এখানে তুমি দেখ,
সবই আছে মানুষে নিহিত।
স্বর্গের সমস্ত চিহ্ন রয়েছে মানুষে।
৮
যদি টের পাও কোনওদিন
তোমার ভিতরে আছে অন্য কেউ, সাচু,
সেই ভ্রম
তোমাকে ডুবিয়ে দেবে নিজের ভিতর।
৯
সকলে সীমিত সাচু,
সীমায়িত সকল মানুষ।
পবিত্র মহান শুধু সে-ই—
সীমা যে পেরিয়ে চলে গেছে।
সে-ই শুধু সত্যিকার সাধু—
সীমানা পেরিয়ে
অপার ও সীমাতীত হয়েছে যে জন।
১০
রহিম আর রাম—
দুই-ই আসলে এক, বোঝো মন!
প্রেমের আহ্লাদে থাকো মজে।
কাফের-মুমিন ভেদ অলীক অসার।
দূর হোক অপরত্ব—
সকল মানব তাঁর-ই অশেষ প্রকাশ।
আমি-তুমি দুই-ই এক সাচু,
যে-মুহূর্তে নিজেকে নিবিড় করে টের পাবে তুমি।
১১
কোনও দ্বিধা নেই সাচু, তিনি এক, এক-ই।
নিজেরই রচিত নাট্য দেখে চলেছেন—
যেন এক রাজনের মতো…
কোথাও কোরান-পাঠে,
কোথাও বা শাস্ত্র-পাঠে রত—
কখনও যীশুর রূপে,
মহম্মদ হিসেবে কখনও—
কোথাও আবার হনুমান—
নিজের সৃষ্টিতে তিনি মোহিত নিজেই।
১২
বস্তু আর ছায়া তার— আসলে তো একই—
নজর নামিয়ে যদি দেখ,
চোখ-কান-জিভ যদি পাঠাও উচ্ছন্নে,
ডুবুরির মতো থাক ডুবে।
প্রেমিকেরা অমনই হারিয়ে থাকে—
অতলে, গভীরে।
তারাই কেবল সাচু, পরম সত্যের
ন্যায্য প্রচারক।
১৩
শুধুমাত্র প্রেমের পথেই—
আছে সত্য দিশা।
বাকি সবই সত্য-বিরোধিতা।
সম্পদের ভ্রম রচে দেন পণ্ডিতেরা।
তারা কোনওদিন, সাচু, সুফি পরিচয়
পাবে না, পাবে না…
১৪
সেই চির বিস্ময়ের ধ্যানে
সর্বদাই নত রাখো মাথা।
ভোর অবধি জারি থাক এই উপাসনা;
অভিজ্ঞতাগুলি
কদাচ এনো না সাচু
নিজের জিহ্বায়।
১৫
কেউ ভালবাসে মৃদু জলধারাটিকে,
কেউ ঝাঁপ দেয় নদীজলে।
ও সাহেবদিনা!
নিজেকে যে করেছে নাকচ,
সেই শুধু পেয়েছে নিজের মাঝে
অফুরান সাগরের রেশ।
১৬
দ্বিধার সকল পর্দা ছিঁড়ে ফেল তুমি—
এই কথা বলেছে মুর্শিদ।
সব সৃষ্টি জুড়ে সেই একেরই প্রকাশ—
যেভাবে সাগরে মিশে যায় জলকণা,
তুমিও মিলিয়ে যাও, সাচু, সেই ভাবে…
১৭
মৃত্যুই তো প্রেমিকের মহা উৎসব;
পরম আহ্লাদে
প্রণয়ের পানপাত্র ফুরায় চুমুকে।
ও সচল, শোনো,
শহিদি বরণ করে নেয় যে প্রেমিক—
সে আসলে মিলনপথের অভিসারী।
১৮
হৃদয়েই বানাও মন্দির।
ভিতরে পূজারী থাক প্রার্থনায় রত।
অন্য কোনও বন্দরের দিকে
অনুসন্ধানীর মতো যেও না, ও সাচু!
১৯
মন্দির-মস্জিদ নয় উপাসনা-ঘর।
যেখানে বিলীন হয়ে যায় আমি-তুমি—
সেইখানে সাচু, আমরা থাকি ঘর বেঁধে…
২০
ওইখানে কী ছিলাম?
কে হয়ে উঠেছি এখানে?
ওখানে যে নাম ছিল আমার বরাতে,
এইখানে ভিন্ন নামে আছি।
এখানে প্রেমিক হয়ে এসেছি, ও সাচু!
আগে কিন্তু প্রেমাস্পদ ছিলাম নিজেই।
২১
প্রেমাস্পদ ছিলাম নিজেই অইখানে;
এসেছি প্রেমিক হয়ে ইদানীং আমি।
এখানে আসার কোনও বাসনা ছিল না।
এনেছে তাড়িয়ে আহা, তবুও যে লোভ
সে কেবল সুন্দরের জন্য অভিলাষ।
‘আমি’টুকু খসে পড়ল যেই—
অম্নি সাচু সত্য হয়ে ফুটে উঠল যেন…


