চিত্রবিচিত্রকথা

বছর পঁচিশ আগের কথা। রবীন্দ্রভবনে কাজে কেটে গিয়েছে বেশ কিছুটা সময়। ইতিমধ্যে শান্তিনিকেতন অবনপল্লির বিশ্বভারতী কোয়ার্টার থেকে উঠে এসেছি সীমান্তপল্লির সদ্য-সমাপ্ত বাড়িতে। তবে ‘সমাপ্ত’ শব্দটা এখানে ব্যবহার করলে রীতিমতো সত্যের অপলাপ করা হবে। বাড়ির সীমানাঘেরা পাঁচিল তখনও পুরো হয়নি, সিঁড়ি দিয়ে নেমে সদর দরজায় গ্রিলের গেট বসানো তখনও বাকি। পূর্বপল্লিতে আমার শিক্ষক মানিদার ‘কৈলাস’ বাড়িতে গেলে তিনি প্রায়ই খবর নেন, বাড়ি কতদূর এগোল! একদিন বললেন, ‘তোর বাড়ি কবে দেখতে যাব।’ আমি একটু গলা নামিয়ে বললাম, বাইরের পাঁচিল দেওয়ার কাজ এখনও সারা হয়নি মানিদা, তারপর গেট বসলে আপনাকে নিয়ে যাব। অবশেষে কোনওমতে সারা হল সেই কাজ। মানিদাকে বাড়ি দেখাতে নিয়ে এলাম, বেশ খুশি হলেন, বসে গল্প করতে করতে কফি এল। তাঁর সম্মাননায় একটু বেশি যত্ন করে ঘন দুধে কফি বানানো হয়েছে। পেয়ালায় চুমুক দিয়ে মানিদা তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে মুচকি হেসে, চোখে রসিকতার ঝিলিক তুলে বললেন— ‘এ তো পায়েস হয়ে গিয়েছে।’ ওঁর সরস ঠাট্টায় আমরাও হেসে উঠলাম বটে, তবে বুঝতে বাকি রইল না, একটু কড়া কফি তাঁর পছন্দের। এদিকে আমার বছরপাঁচেকের পুত্র তখন ফাঁকা জায়গা দেখলেই ছবিতে ভরিয়ে তুলছে। খবরের কাগজ, পত্রপত্রিকা, বইখাতা, চিঠিপত্র কিছুই তার প্যাস্টেলের উদ্ধত আঁচড় থেকে রেহাই পাচ্ছে না। কাছেই পড়ে ছিল গাছপালা, জীবজন্তু, মানুষ আর ওর মতো করে আঁকা দুর্গাপ্রতিমার কয়েকটা ছবি। মানিদা সেগুলো বেশ মন দিয়ে দেখছিলেন, উৎসাহ পেয়ে আমি আর কয়েকটা আঁকিবুঁকি ঘর থেকে নিয়ে এলাম। এগুলোর বেশিরভাগ পুরনো ক্যালেন্ডারের পিছনে আঁকা। ক্ষুদে শিল্পীকে তখন কাগজের জোগান দিতে হয়রান, আশেপাশের বাড়ি থেকে বাতিল ক্যালেন্ডার সংগ্রহ করাই ছিল অন্যতম কাজ। ক্যালেন্ডারের পিছনে প্যাস্টেলের আঁচড়ে টানা পাতা ভর্তি ড্রয়িংগুলো দেখছিলেন মানিদা। মাঝে মাঝে ওঁর চোখ যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন ‘এইসব ছবি দেখলে আবার যেন প্রভাবিত হয়ে পড়ি, এদের ছবির মধ্যে নতুন করে ডুব দিতে ইচ্ছে করে।’ শুনে চমকে উঠলাম। চকিতে মনে হল, শিশুদের ছবিতে এমন কী আছে— যা কিনা কে জি সুব্রহ্মণ্যনের মতো শিল্পীকে প্রভাবিত করতে চায়? সে কি কেবল শিশুদের দৃষ্টির সারল্য, বিনোদবিহারী যাকে বলেছেন ‘ইম্প্রেশন’? সম্ভবত তাই। তাদের দেখবার চোখ কী আশ্চর্য সরল! এই সারল্য ফুটে ওঠে আকারের গড়নে, রেখার প্রাণময়তায়, দৃষ্টির অনাবিল স্বচ্ছতায়! তাই শিশুর ছবি এমন স্বতঃস্ফূর্ত, জোরালো, সপাট, জড়তাহীন। এমন ছবির ওপর বড়দের ‘মাস্টারি’ করতে গেলে হিতে বিপরীত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। 

আরও পড়ুন : স্থাপত্য়ের উপনিবেশ ও স্থাপত্য়েের ইতিকথার দলিল এই বই!
লিখছেন অর্পণ ঘোষ…

বহুবছর আগের সেই স্মৃতি হঠাৎ উসকে দিইয়ে গেল একখানা বই। তার নিরিখেই এমন দীর্ঘ গৌরচন্দ্রিকা। এ-সব কথা মনে করিয়ে দিল শিল্প-বিষয়ে সদ্য প্রকাশিত একটি বইয়ের প্রথম প্রবন্ধের দিকে তাকিয়ে। গ্রন্থের শিরোনাম ‘পটে লিখা’, তার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যঞ্জনাময় সাব-টাইটেল— ‘রূপ, অরূপ আর স্মৃতির কহন’, লেখক মনসিজ মজুমদার। গ্রন্থনাম আর গ্রন্থকার একত্রে এই বইয়ের অন্দরমহল জুড়ে মুহূর্তে বিপুল আগ্রহ তৈরি করে দিল। সে বইখানা নিয়েই আজ দু’-চার কথা, না একে গম্ভীর শব্দবন্ধে গ্রন্থসমালোচনা কখনওই বলা চলে না। এ যেন চায়ের পেয়ালা হাতে শিল্পিত অবসর যাপন।

কে জি সুব্রহ্মণ্যন

ভূমিকা আর সূচি পেরিয়ে বইয়ের প্রথম লেখা— ‘ছবি: ছোটদের/বড়দের’। সে লেখা শুরু হয়েছে এইভাবে—“পারীর পিকাসো মিউজিয়ামে ১৯৫৪ সালে আঁকা একটি ছবি আছে। ছবির নাম ও বিষয় ‘ক্লদ আঁকছে’। ক্লদ পিকাসোর শিশু সন্তান, ফ্রাসোয়া জিলো তার মা। ক্লদের বয়স ছবিতে সাত।… কি আঁকছে ক্লদ? ক্লদের বাবা, শিল্পী পিকাসো, সে প্রশ্নের উত্তরে নীরব। ছবির নাম ‘ক্লদ আঁকছে’ হলেও, ছবিতে শিশুটি কিছুই আঁকেনি। আঁকার উদ্যোগ করছে বা আঁকতে শুরু করেছে।” এরপরেই এসেছে প্রবন্ধের সেই মোক্ষম অংশ— ‘পিকাসো নিজের আঁকা ছবিতে শিশু ক্লদের ছবি আঁকেননি। কারণ, আঁকলে তা পিকাসোর আঁকা হত। শিশু ক্লদের আঁকা হত না। ক্লদ কি করে পিকাসোর মতো ছবি আঁকবে? পিকাসোই বা কী করে শিশুর মতো আঁকবেন? এই দুই প্রশ্নে বিব্রত হয়ে পিকাসো ক্লদের ছবি আঁকার কাগজ সাদা রেখে দিয়েছেন। আমাদের এই অনুমান কি নিছকই ভিত্তিহীন?’ এভাবেই প্রশ্ন উঠে এসেছে শুরুর লেখায়।

বড়দের আর ছোটদের ছবির কথা বলতে গিয়ে মেলে দিয়েছেন অজস্র টুকরো কথা, অনুকথা, উসকে দিয়েছেন বিতর্কের স্ফুলিঙ্গ। দু’একটা প্রসঙ্গ ছুঁয়ে গেলে মন্দ হয় না। যেমন ছোটদের আর বড়দের ছবির সারকথাটা লেখক বলে দেন, পিকাসোর মুখ দিয়েই, “অনেক বয়সে পিকাসো একবার একটি শিশুদের প্রদর্শনী দেখতে এসে বলেছিলেন, ‘যখন আমার বয়স ছিল এই শিশুশিল্পীদের মতো তখন আমি রাফায়েলের মতো ছবি আঁকতে পারতাম। কিন্তু আমাকে সারাজীবন সাধনা করতে হয়েছে শিশুদের মতো ছবি আঁকার জন্য’।…”

পিকাসোর এই সংক্ষিপ্ত সংলাপের মধ্যেই কি ধরা রইলো বড়দের ছবি আর ছোটোদের আঁকা ছবির প্রকৃত সংজ্ঞা? এ যেন জীবনপ্রান্তে ‘খাপছাড়া’ বইয়ের শুরুতে বলে যাওয়া রবীন্দ্রনাথের ছোট্ট দু’টি ছত্র, ‘সহজ কথায় লিখতে আমায় কহ যে,/সহজ কথা যায় না লেখা সহজে’। কী আশ্চর্য! তাহলে কি সত্যিই পিকাসোর মতো শিল্পী বা রবীন্দ্রনাথের মতো কবিকে নিরন্তর সাধনা করতে হয় শিশুর মতো সহজ ছবি আঁকতে বা সহজ করে কথায় লিখতে? আমাদের মনে এমনই নীরবে শান দিতে দিতে এগিয়েছে এ-বইয়ের অন্দরমহল।

পাবলো পিকাসো

গ্রন্থসূচির দিকে তাকালেই বোঝা যায় গ্রন্থের বিষয়ের বৈচিত্র্য, ভাবনার বিস্তার। Abstract art প্রসঙ্গে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা ‘অরূপের রূপ ও ভাষা’-র পাশাপাশি গভীর বিষাদে ঘিরে থাকা ভ্যান গখের শিল্পীজীবন নিয়ে লেখাটি ‘আর্তি ও বিষণ্ণতার শিল্পী ভ্যান গখ’— পাঠকের মনে নিবিড় স্পর্শ রেখে যায়। মাত্র সাঁইত্রিশ বছরের জীবনে ভ্যান গখের ছবির সম্ভার আমাদের বিস্মিত করে। ঘনিষ্ঠ শিল্পীবন্ধুদের প্রশংসা পেলেও সমকালীন ফরাসি শিল্পীদের কাছে ভ্যান গখ একেবারেই সমাদর পাননি, ভাই থিও ছাড়া পরিবারের আর কারও সহানুভূতি মেলেনি। নারীর ভালবাসা তাঁর কাছে ছিল অপ্রাপনীয়, এমনকী, তাঁর গায়ে লেগেছে পাগলের মার্কা। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পীর এই বেদনার্ত উপাখ্যান পাঠককে স্তব্ধ করে দেয়। আবার কখনও একটু নড়েচড়ে বসতে হয়, যখন ‘যে যা পারে’ লেখার কেন্দ্রে এসে উপবিষ্ট হন তসলিমা নাসরিনের মতো সাহসী বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব, যাঁর লেখায় মৌলবাদের বিরুদ্ধে সর্বদা বিতর্কের ঝড় ওঠে।

এখন প্রশ্ন হল, কোনও লেখিকার জীবনের অভিজ্ঞতা-সিঞ্চিত জড়তাহীন সাহসের অক্ষরমালাই কি আধুনিক সাহিত্যের একমাত্র ভর হতে পারে? এ-প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ‘সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক’ হুমায়ুন আহমেদের কথা উল্লেখ করেছেন গ্রন্থকার, তাঁর জবানীতে মুদ্রিত হয়েছে, “তসলিমা অত্যন্ত সাহাসী মহিলা। মেয়েদের কিছু সমস্যা তুলে ধরেছেন। লিখতে গিয়ে তিনি অবসেশনে আক্রান্ত হয়েছেন, পুরুষসত্তাকে অস্বীকার করেছেন। তাঁর লেখা ওয়ান সাইডেড, একচক্ষু হরিণের কাজ। ‘জরায়ুর স্বাধীনতা দিতে হবে’— দ্যাটস ননসেন্স। ‘লজ্জা’ উপন্যাসটি জাতিগতভাবে আমাদের লজ্জায় ফেলে দিয়েছে।”

ভ্যান গঘের সেল্ফ-পোর্ট্রেট

হুমায়ুনের এই মত হয়তো সকলে মেনে নেবেন না, তাঁর এমন মন্তব্যের বিপরীতেও নিশ্চয় তর্ক উঠবে। বইয়ের পৃষ্ঠায় পাঠকের মনকে এইভাবে ঝাঁকিয়ে দিয়েছেন গ্রন্থকার। প্রায় প্রতি পাতায় পাতায় বিতর্কের গনগনে আঁচ— যা পোহাতে পোহাতে পাঠক এগিয়ে চলেন। আবার ‘নেই তাই’ প্রবন্ধে শিল্পকলার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রেক্ষিতে কঠিন প্রশ্ন তুলেছেন লেখক। স্পষ্ট করে জানিয়েছেন— ‘শিল্পকলায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ব্যাপারটা খুবই গোলমেলে। প্রথমত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অর্থ, পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকার স্বীকৃতি।’ আরও জোর গলায় তাঁর অভিযোগ ধ্বনিত হয়েছে—‘শুধু শিল্পকলায় নয়, সব কিছুতেই পশ্চিমের স্বীকৃতির তুল্য কিছু নেই।’ ভেবে দেখলে এ এক নির্মম সত্য, আজকেও পশ্চিমের সমালোচকদের কলমের প্রসাদ আমাদের শিল্পসাহিত্যের মহানির্ণায়ক! ভাবতে ইচ্ছে করে, এ কি অনন্তকাল ধরে চলবে?

এমন লেখার ফাঁকে ফাঁকে এসে জড়ো হয় ‘সুন্দরতা কি দেবী’ কি ‘পটে লিখা নারী’, ‘বঙ্গভঙ্গ, হিন্দুত্ব এবং দুটি ছবি’-র মতো ভাবনা-জাগানো লেখা। যেখানে হুসেনের আঁকা সরস্বতীর পাশাপাশি অবনীন্দ্রনাথের ‘ভারতমাতা’ বা নন্দলালের ‘সতী’ নিয়ে মুল্যবান আলোচনা বিস্তার পেয়েছে। পাশাপাশি দেখা যাবে ‘বাবার স্মৃতি’-র মতো মন আপ্লুত করা লেখা। সব মিলিয়ে মোট পনেরোটি লেখায় উঠে এসেছে বিচিত্র চিন্তার নানা উপাদান।

এ-বইয়ের শব্দেরা প্রশ্ন করতে চায়, আজকের ঘাড়নত বাঙালির মনে তর্ক উসকে দিতে চায়, বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া অনেক প্রসঙ্গ নতুন করে সামনে এনে ফেলে। ভুমিকায় গ্রন্থকার যদিও বলেন, ‘পাণ্ডিত্যপূর্ণ বা সারগর্ভ বলতে যা বোঝায়, তা এই লেখাগুলিতে নেই বলা যায়’— সে-কথা যে সত্যি নয়, তা অনুভুতিশীল পাঠকমাত্রেই স্বীকার করবেন। ‘রাবণ’ প্রকাশনা কে অজস্র সাধুবাদ এমন একটি বই আমাদের সামনে মেলে দেওয়ার জন্য।