মনে তো কত কিছুই হয়! প্রবাদপ্রতিম সাহিত্যিকের আকস্মিক প্রয়াণে গলা বুজে এলে প্রত্যেক সমঝদারেরই তো মনে হয়, কলমটা আর একটু নিয়ম করে ধরলে, যোগ্য উত্তরসূরির অভাব বোধহয় থাকত না। ক্রিকেটে প্রিয় দল হারলে পাড়ার রোয়াকে বসা বিশারদও আফশোসে হাঁসফাঁস করে— ঘরে বসে যে-বিপদটা সে তিন ওভার আগেই টের পেয়েছিল, এগারোজন পেশাদার মাঠে নেমেও তার হদিস পেল না কেন! ওটিটি-আসক্ত দর্শকের মনেও একই আক্ষেপ। হাত কামড়ে সে ভাবে, একটু সুযোগ পেলে সেও নির্ঘাত কাঁপিয়ে দিত কান কিংবা বার্লিন। কী এমন অন্যায় মনে হওয়া! দু-চারটে ফেস্টিভালের টিকিট কেটে, কয়েকখানা ইরানি ছবি দেখে, সাবটাইটেল-সহ কোরিয়ান সিনেমায় দীর্ঘশ্বাস ফেলতে পারলেই তো মনে হতে পারে বিশ্ব-চলচ্চিত্রের সিলেবাস মোটামুটি কভার হয়ে গেল। কিংবা ইউটিউবে সাত মিনিটের শর্টকাট পিএইচডি সেরে অনেকেরই মনে হতে পারে, নাগাল-বহির্ভূত বিষয়ে গা-জোয়ারি আস্ফালন করাটা তার গণতান্ত্রিক হক।
এই অগুনতি ‘মনে হওয়া’র আড়ালে আসলে চুটিয়ে বংশবিস্তার করছে এক সর্বজ্ঞতার বিকার, যা ইদানীং প্রায় মহামারীর চেহারা নিয়েছে। যুক্তিহীন আত্মবিশ্বাসকে আশকারা দেওয়া যে শেষ অবধি আত্মহননেরই নামান্তর, ঘুণাক্ষরেও টের পাচ্ছে না কেউ। একই মানুষ, কোনওরকম প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তো দূরের কথা, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রাথমিক পাঠটুকুও অনেক সময়ে না থাকা সত্ত্বেও, কোয়ান্টাম ফিজিক্স থেকে ভূ-রাজনীতি, মনোবিশ্লেষণ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস— সব কিছুর উপরই দিব্যি লাইভ কমেন্ট্রি করে চলেছেন। কারণ এমন এক বিবেচনাবিমুখ, কনটেন্টলোলুপ পর্বে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা, যেখানে অধ্যবসায়ের চেয়ে তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার কদর বেশি, যোগ্যতার চেয়েও আত্মবিশ্বাসী চাকচিক্যের বাজার বিপুল।
ডারউইন সেই কোনকালে বলেছেন, ‘ignorance more frequently begets confidence’; বার্ট্রান্ড রাসেল The Triumph of stupidity-তে আরও নির্মম ভাষায় বললেন, ‘stupid are cocksure and the intelligent full of doubt’। ডিজিটাল যুগ বোধহয় এই দুই পর্যবেক্ষণের মাঝখানের সমস্ত ব্যবধানটুকুও সপাটে মুছে দিয়েছে— অজ্ঞতা এখন শুধু আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয় না, সঙ্গে-সঙ্গে একটি সম্প্রচারমাধ্যমও পেয়ে যায়। তড়িঘড়ি রায় দেওয়ার এই ছিন্নমনস্ক সময়ে হাতুড়েকেও কেমন অনায়াসে এলেমদার বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। ছেঁদো চিৎকারসর্বস্বতাকে মেনে নেওয়া যায় পাণ্ডিত্যের স্বাক্ষর বলে।
আরও পড়ুন: মাঝবয়সে চশমা ছাড়া পৃথিবী ঝাপসা, কিন্তু আত্মবিশ্বাস HD!
লিখছেন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়….
আদতে, স্বল্পজ্ঞানকে সাড়ম্বরে উদযাপন করাটাই প্রতিক্রিয়াপ্রবণ মানুষের সবচেয়ে বড় মচ্ছব। নিজের দৌড় সম্পর্কে বাড়াবাড়ি রকমের উচ্চ ধারণা পোষণ করাতেই তাদের ভরপুর আমোদ। যে যত বেশি অজ্ঞ, মনে-মনে সে ততই প্রাজ্ঞ। নিজেকে গা-জোয়ারি চ্যাম্পিয়ন ভেবে বসার এই মাতব্বরির খেলায় আমরা রোজই নাম লেখাই। আষাঢ়ে আত্মবিশ্বাসের পথকে ক্রমশ চওড়া করি। উত্তেজনাখোর কখনও নিজের অক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়ায় না। সে শুধু নির্বিকার মুখে পরে নেয় আত্মমুগ্ধ প্রজ্ঞার মুখোশ।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আত্মপ্রবঞ্চনার এই রমরমা কেন? শুধুই কি অনুমোদনের লোভ, বাহবা কুড়োনোর লালসা? তবে সামাজিক প্রশ্রয়ের নিরবচ্ছিন্ন জোগান যে তাকে পুষ্ট করছে সে-কথা অস্বীকারের উপায় নেই। না কি, এর পেছনে রয়েছে সদা-সক্রিয় এমন এক আত্মবিভ্রম, যা মানুষকে অনর্গল বিলিয়ে যাচ্ছে ভিত্তিহীন আত্মবিশ্বাসের ইন্ধন?
নব্বইয়ের দশকে সবজান্তা সিধু জ্যাঠাদের ভরা মেহফিলে এই নিয়েই সপাটে কামান দেগেছিলেন দুই মনস্তাত্ত্বিক— ডানিং এবং ক্রুগার। দীর্ঘ গবেষণা, বাহারি সমীক্ষার শেষে কিছু সন্দেহের গোড়ায় তাঁরা মেরেছিলেন কষে গিঁট। জানা গিয়েছিল মূর্খ, নির্বোধ বা অযোগ্যদের তিন নির্মম সত্য। প্রথমত, অযোগ্যরা নিজ সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে পেল্লায় উদাসীন। নিজস্ব যোগ্যতা বা দক্ষতার স্তর নির্ণয় করতে গেলেই তারা হরবখত ল্যাজে-গোবরে হয়ে পড়ে। জ্ঞানের যৎসামান্য পুঁজি সঞ্চয়ের আগেই নিজেকে সর্বজ্ঞ ঠাউরায়। দ্বিতীয়ত, দক্ষ ব্যক্তির যোগ্যতা এবং যোগ্য ব্যক্তির দক্ষতা নিয়েই এদের মনে যত সংশয়। আসলে, অন্যের পারদর্শিতায় এদের জন্ম এলার্জি, সব উৎকর্ষতা কেবল ঠিকরে বেরোয় অন্যের নিপুণতাকে খাটো করার বেলায়। নিজের বেলায় ষোল আনা, অন্যের বেলায় চার আনাও না, কেবলই তানানানা। তৃতীয়ত, তাদের চোখে যে-কোনও ধরনের অপারগতা, তা যতই স্বাভাবিক ও মানবিক হোক, অত্যন্ত অপমানের। ‘জানি না’ বা ‘শুনিনি’-গোছের উচ্চারণ তাই নিষিদ্ধ। ফলত সব ব্যাপারে তড়িঘড়ি নিজের অতিমূল্যায়ন করে, বিশারদ ফুঁকড়িয়ে, সবচেয়ে উঁচু সিংহাসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করাই এদের রোজকার রেওয়াজ।

আমরা গণহারে নিজেদেরকে প্রতারিত করি, স্বেচ্ছায় বাস করি স্ব-উপলব্ধির বায়বীয় বুদবুদে— এই সহজ সত্যির নাম দেওয়া হয়েছিল ডানিং-ক্রুগার এফেক্ট। প্রযত্নে, ডেভিড ডানিং এবং জাস্টিন ক্রুগার। তাঁদের এই পর্যবেক্ষণ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল, আত্মবিশ্বাস আর অভিজ্ঞতার ভিতর নাগাড়ে চলতে থাকা টাগ অফ ওয়ারকে। অনভিজ্ঞ ট্রাক-চালক হোক কি তারকা টেনিস-খেলোয়াড়— নানা স্তর, নানা পেশা, নানা পরিসরের মানুষই জায়গা পেয়েছিলেন তাদের সমীক্ষায়। চলেছিল বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ। দেখা গেল, আধুনিক জীবনযাত্রার এমন কোনও দুর্গম কোনই আর অবশিষ্ট নেই, যেখানে ডানিং-ক্রুগার এফেক্ট তার ছাপ ফেলেনি। ডানিং-ক্রুগার এফেক্টের মূল কথাটি ছিল সহজ: একেবারে শূন্য থেকে নতুন কিছু শেখা বা জানার গোড়াতেই এক ধরনের হুজুগে উন্মাদনা মানুষকে তাড়া করে বেড়ায়। আত্মবিশ্বাস তখন থাকে তুঙ্গে। এক পাতা উইকি, দু’কলম প্রতিবেদন, আর তিন মিনিটের ভিডিয়ো দেখে মনে হয়, এ-বিষয়ে আমি বিরাট কোনও কেউকেটা। শূন্য থেকে যৎসামান্য জেনে, আঙুলের এক ইঞ্চি দূরত্ব হেঁটেই সে ভাবে, তাকলামাকান পাড়ি জমালাম বুঝি। ফলত, অজ্ঞতার ভিতরেই সে কল্পনা করতে থাকে এক আজগুবি অগ্রগতি। কেননা, দোরগোড়াতে দাঁড়িয়ে সেটাকেই দিগন্ত বলে দিবারাত্রি জপ করলে, পথ হাঁটার দায় কি আর থাকে? উদ্যমের শিখাও তাই এক ঝলক জ্বলে উঠেই স্বভাবতই নিভে যায় দপ করে। ধৈর্য ধরে শেখার, না-বোঝাকে বুঝে ওঠার, বোঝাকে ক্রমশ গভীরতর করে তোলার যে-নিবিড় তাগিদ, তার লেশমাত্রও সে অনুভব করে না। সে চায় ফল, কিন্তু সাধনা নয়; চায় স্বীকৃতি, কিন্তু প্রস্তুতি নয়। সময়, একাগ্রতা এবং পরিশ্রমের একছটাক খরচ করতেও বেজায় আলিস্যি তার। আজ এই বিষয়, কাল অন্যটি, পরশু আর-একখানা; দেখনদার আগ্রহ কেবলই স্বতঃস্ফূর্ত বাঁক নেয় নিত্যনতুন বিষয়ে। কোথাও স্থির হয় না, কোথাও শিকড় গাঁথে না, কোথাও দীর্ঘ সহবাসে জড়িয়ে পড়ে না। উদ্দেশ্য যেহেতু সেই হামবড়াই, তাই আত্মবিশ্বাসে ভাঁটা পড়া তো দূরের কথা, তার দাপটই বরং বাড়তে থাকে উত্তরোত্তর।
তবে এই আত্মপ্রবঞ্চনার উৎসকে কেবল ব্যক্তিমানসের খেয়ালখুশি বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে। কারণ, এমন বিভ্রমের বীজ অনেক সময়েই পোঁতা থাকে আমাদের সামাজিকীকরণের গোড়াতেই। খেয়াল করে থাকবেন, ছেলেবেলা থেকেই আমাদের ভিতরে নানারকম অলীক আত্মবিশ্বাসের বীজ পুঁতে দেওয়া হয়। খোকাবাবু নিজ হাতে ভাত মাখল, কিংবা বহু কসরতে জুতোয় পা গলাতে পারল, আর অমনি গালে ঝপ করে এসে পড়ল আদুরে চুমু। পিংপং বলের একটা ক্যাচ ধরেছে কি না, তাতেই গোটা বাড়িতে পড়ে গেল হইচই। ছোটখাট সাফল্যে উৎসাহ জিইয়ে রাখতেই এই বিপুল প্রশংসার বহর, এবং তার প্রয়োজনও অনস্বীকার্য; কারণ প্রাথমিক কগনিটিভ দক্ষতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এমন উৎসাহ প্রায় অপরিহার্য। কিন্তু গোলমালটা বাধে পরবর্তীতে। সন্তানস্নেহে অন্ধ বাবা-মায়েরা অনেক সময়ে ভুলতে বসেন, সাময়িক উৎসাহ আর ভুয়ো আত্মবিশ্বাসে দীর্ঘমেয়াদি মদত দেওয়া এক জিনিস নয়। শিশুকে সাহস জোগানো দরকার, কিন্তু তাকে নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে অবিরাম বিভ্রমে রেখে দেওয়া আসলে ঘুরিয়ে নিশ্চিত সর্বনাশকেই আদর করা। কারণ এই ভুয়ো আত্মবিশ্বাস একবার হাড়ে-মজ্জায় ঢুকে বসলে, তা আর সহজে নড়ে না; বরং ক্রমে তা স্বভাব, বিচারবোধ, এমনকী আত্মপরিচয়েরও অংশ হয়ে ওঠে। তখন প্রখর বাস্তবের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েও নিজেকে সংশোধন করার বদলে মানুষ আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরে নিজেরই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলা ছবিটাকে।

সাহিত্য, সিনেমা, ভাস্কর্য, স্থাপত্য, চারুকলা-সহ বিবিধ শিল্পের বাকতাল্লার কথা ছেড়েই দিলাম, একটা সাদামাটা উদাহরণ নিই। হাল ফ্যাশনের সঙ্গে দিব্যি খাপ খেয়ে যায় এমন কোনও বাদ্যযন্ত্রকে দিয়ে ডানিং-ক্রুগারের থিয়োরিটা মিলিয়ে দেখুন। খেয়াল করে দেখবেন, মানুষের আকর্ষণ প্রায়শই সেই বাদ্যযন্ত্রের প্রতিই, যেগুলো সাধনার চেয়ে সামাজিক প্রদর্শনীর পসরা হিসেবেই বেশি খাটে। ইউকুলেলে তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। পরিণত বয়সে কেউ নতুন কিছু শিখতে শুরু করলেই প্রায়শই এক অদ্ভুত বিপত্তি ঘটে। শেখার প্রকৃত যে কষ্ট, সময়, শৃঙ্খলা, বারংবার ভুলের বেইজ্জতি— এসবের মুখোমুখি হওয়ার আগেই তার আত্মবিশ্বাসের বুদবুদ গায়ে-গতরে ফুলতে থাকে। গাছের পরিচর্যাই হোক কি ইতিহাসচর্চা, কিংবা যোগব্যায়াম হোক কি গণিতে মকশো করা— দু’চারটে নাম, কয়েকখানা তথ্য, অল্প কিছু টেকনিক, কিছু টুকরো পরিভাষা— এই সামান্য জিনিসপত্র জোগাড় করেই সে নিজেকে এক ধরনের কর্তৃত্বের সিংহাসনে বসিয়ে ফেলে। শেখার চেয়ে বোঝানোর তৎপরতা, আর অনুশীলনের চেয়ে ঘোষণার তাগিদ তখন বেশি।
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই এর বাইরেও অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা নিজের তাগিদে লেখাপড়া, তালিম ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে চালিয়ে যান। তাঁরা বুঝে গিয়েছেন, বিষয় যাই হোক-না কেন, তাতে এলেমদার হয়ে ওঠা কোনো তাৎক্ষণিক কেরামতি নয়; বরং তা দীর্ঘকালীন, পরিশ্রমসাধ্য চর্চার ফল। কঠোর অনুশীলন, নিরন্তর উদ্যোগ ছাড়া শিকে যে ছিঁড়বে না, এটা তাঁরা হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছেন। তাই ক্যানেস্তারা পিটিয়ে শব্দ দূষণের বেদম হয়রানিটা তাঁরা স্বেচ্ছায় এড়িয়ে যান। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শিক্ষানবিশরা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতায় অনেকখানি এগিয়ে গেলেও আত্মবিশ্বাস সে অনুপাতে বাড়ে না। উলটে, ধারাবাহিক কৃচ্ছসাধনার ভিতর দিয়েও মুনশিয়ানার দোরগোড়ায় এসে অনেকেই হঠাৎ গভীর সংশয়ে ভোগেন, নিজের যোগ্যতাকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেন। কারণ, যত শেখা বাড়ে, ততই প্রকট হয়ে ওঠে না-জানার পরিসর; যত ভিত মজবুত হয়, ততই স্পষ্ট হয় স্থাপত্যের বিপুলতা। কিন্তু দৃঢ় সংকল্পে আরও কিছুটা এগোতে পারলে, সেই গাধার খাটুনির ফল এক সময়ে চক্রবৃদ্ধি হারে, সুদ-সমেত ফিরে আসে। সেই সঙ্গে ফিরে আসে হৃত আত্মবিশ্বাসও। আশ্চর্যের, ডানিং ও ক্রুগার দেখিয়েছিলেন, এক সদ্যোজাত অ্যামেচার এবং এক তুখোড় ওস্তাদের আত্মপ্রত্যয়ের উচ্চতায় অনেক সময়ে তেমন ফারাক চোখে পড়ে না; দুজনেই যেন তুঙ্গে। একজনের আত্মবিশ্বাস এসেছে অজ্ঞতা থেকে, আরেকজনেরটি দীর্ঘ অনুশীলন, ব্যর্থতা, সংশয় ও অর্জিত মুনশিয়ানার ভিতর দিয়ে। বাইরে থেকে দুটোকেই সমান দীপ্ত মনে হতে পারে; কিন্তু একটির ভিত ফোঁপরা, অন্যটির ভিত ইস্পাতকঠিন।
বাইরে থেকে এই দুই আত্মবিশ্বাসকে সমান জেল্লাদার মনে হওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আসল ধাঁধা। তার সুরাহা চাইলে ফিরে যেতে হয় তথ্যের ঢেউ সামলাতে মানবমস্তিষ্ক যে-নিজস্ব কৌশল রপ্ত করেছে, তার দিকে। মানবমস্তিস্ক নিঃসন্দেহে অনন্যসাধারণ। কয়েক লক্ষ বছরের তিল-তিল বিবর্তন তো একটি কারণেই— সেই যে, ডারউইনের ‘অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম’, জীববিজ্ঞানের নবম অধ্যায়ে ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’। করোটির ভিতর ঘাপটি মেরে থাকা কয়েক আউন্সের এই ঘিলু-সর্বস্ব যন্ত্রটিকে রোজই পাল তুলতে হয় তথ্যের এক অফুরান সমুদ্রে; সে-কথা ভাবতে বসলেই আপনি-আমি হাবুডুবু খেয়ে যাই। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন যে বেমক্কা, ঢাউস পরিমাণ তথ্যের সংস্পর্শে এসে গেরস্ত সামলায়, সেখান থেকে নির্বিচারে ছাঁটাই না করলে প্রকৃতিস্থতা বজায় রাখাটাই দস্তুরমতো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াত। সুতরাং ছাঁটাই-নীতি নির্ধারণ হলেই অকাজের জঞ্জালে সজোরে কিক। কিন্তু কী জঞ্জাল, আর কী প্রয়োজনীয়, সে-বিচার তো শূন্যে তৈরি হয় না; তাকে নিয়ন্ত্রণ করে শিক্ষা, বুদ্ধি, বিচারবোধ, বিবেচনা, অভ্যাস, এবং তাদের নিরন্তর অনুশীলন।
এখানে আরেক বিপদ আছে। ভাবনাচিন্তার বেলায় মানুষ চিরকালই আলসে। চিন্তা বললেই আরামকেদারায় কাত, আর ভাবতে বসলে সটান বিছানায় চিৎ। এই শব্দযুদ্ধ সে পারতপক্ষে এড়িয়েই চলে; নেহাত এড়ানো না গেলে মাঝের ধাপগুলো টপকে সোজা গিয়ে নামে ‘অতএব প্রমাণিত’-এর মধ্যবিন্দুতে। মানসিক শ্রম বরাবরই অস্বস্তিকর, কারণ তার হুজ্জত অনেক, বখরাও নামমাত্র। বরং নিজেকে পয়লা নম্বর প্রমাণের ভ্রান্তিবিলাসে রাখলে কেমন কলকে ফাটা মৌতাতটা জারি থাকে। আটের দশকের গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছিল, আত্মমগ্নতা বা আত্মরতি আসলে মস্তিষ্কেরই এক ধরনের প্রতিরক্ষামূলক কারসাজি, একরকম ডিফেন্স মেকানিজম। পর্বতপ্রমাণ প্রত্যাশার চূড়া থেকে বেইজ্জত হয়ে পা হড়কানোর একটা আগাম সুরক্ষাবলয়। হারার ভয়ে আগেভাগেই আব্বুলিশ। যুগ-যুগান্তরের বিবর্তনের লড়াইয়ের ভিত্তি কেবলই তো শারীরবৃত্তীয় টিকে থাকা নয়, মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও মানুষকে মাথা তুলে বাঁচতে হয়। হ্যাঁ, তাতে একটু ছলচাতুরির মাশুল গুনতে হয়, এই যা। যে-লোকটার সঙ্গে তর্কে হেরে যাই, যার যুক্তির সামনে পেরে উঠি না, তার থেকেও তো আমাকে বাঁচতে হবে। যে-লোকটার আলিশান মেধা আমার ভিতরে নিরাপত্তাহীনতার গুঁতো মারে, সে অনেক সময়ে ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া বাঘের চেয়েও বিপজ্জনক। জঙ্গলের সেই আদিম মানুষে-পশুতে লড়াই নাহয় থেমেছে, কিন্তু প্রতিপক্ষ কি তাতে অদৃশ্য হয়ে গেছে? মোটেই না। তাই প্রতিটা জীবনকে এক-একটা গল্প হয়ে উঠতেই হয়, যার শুরুটা জীবনপ্রসূত হলেও বাকিটা কল্পনা-আশ্রিত। যে যার নিজ গল্পের একচ্ছত্র একনায়ক। সেখানে নিজের প্রতিটি বেয়াদপির জন্যই হাতগরম একখানা জাস্টিফিকেশন মজুত থাকে, ন্যায়সঙ্গতার শিলমোহর মারা। যে-গল্পে আমি মুখ্য চরিত্র নই, বুঝতে হবে তার ন্যারেটিভ লিখছে অন্য কেউ। ‘আমিই সেরা’— এই কৌমার্যটুকু বাঁচিয়ে রাখতে মস্তিষ্ক তখন যা-যা পদক্ষেপ দরকার মনে করে, সবই যথেচ্ছভাবে করে যায়। তথ্য উপেক্ষা করা হোক, কিংবা অব্যর্থ কোনও গোঁজামিল গুঁজে দেওয়া, সবেতেই সে ধুরন্ধর খেলোয়াড়। তর্কে হেরে ভূত হলেও সে ভিতরে-ভিতরে এই মর্মে মগজধোলাই চালায় যে, শেষ পর্যন্ত জিতেছি আমিই। ছেলেবেলায় লুডোর বোর্ড উলটে প্রতিদ্বন্দীরা কেমন ‘জিতেছি, জিতেছি’ জিকির তুলে পাড়া কাঁপাত মনে নেই!
পাড়া আজও কাঁপে, যদিও জয়-পরাজয়ের ময়দান এখন সরে এসেছে মোবাইলের নীলচে স্ক্রিনে। লুডোর বোর্ড, ছক্কা-পাঞ্জা অনেক আগেই সরে গেছে যুগান্তরের আড়ালে। নিষ্কলুষ ছেলেবেলারও বয়স হল; সে এখন কালবেলার অদৃশ্য হাত হয়ে আমার মাগনা দাবিকে সশস্ত্র পাহারা দেয়। ব্যাটা ভাল করেই জানে, ওই রক্তমাংসের লোকটাকে একবার ভাববার উৎসাহ দিলেই সবার আগে ভেস্তে যাবে এই ফুরফুরে দিনগুজরান। তারপর কমফোর্ট জোনটাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে সে এক না একদিন হয়তো বলেই উঠবে— ‘এই আত্মসর্বস্ব দীর্ঘশ্বাস, উঁহু, এ তো কোনও সুস্থ মানুষের লক্ষণ নয়!’




