কবিতার বোমা
বোমাবর্ষণ হচ্ছে, কোত্থাও ‘ব্ল্যাকআউট’ নেই, যুদ্ধের সাইরেন নেই! কেউ ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন না, বরং যেখানে বোমা পড়ছে, সেই নির্দিষ্ট অঞ্চলে হুড়োহুড়ি করে ভিড় জমাচ্ছেন— ‘বোমা’ কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য। বোমা কোড়ানোর ভিড়? সারা বিশ্ব চমকে উঠেছে এ-হেন ঘটনায়। আসলে, এই ‘বোমা’— প্রাণঘাতী বোমা নয়! এ-‘বোমা’ কবিতার বোমা! যেখানে মারণ-আঘাত নয়, রয়েছে ছন্দের অভিঘাত।
এ-বছর জুন মাসের ২০ তারিখ, স্পেনের বার্সেলোনার ঐতিহাসিক অঞ্চল, প্লাসানোভা ও বার্সেলোনার ক্যাথিড্রাল-সংলগ্ন অঞ্চলে ঘটল— ‘বোমবার্ডমেন্ট অফ পোয়েম্স’ (‘Bombardeo de Poemas’)। ‘চিলে’-র শিল্পগোষ্ঠী, ‘ক্যাসাগ্র্যান্ডে কালেকটিভ’-এর এই আন্তর্জাতিক প্রকল্পে, একটি হেলিকপ্টার থেকে প্রায় এক লক্ষ কবিতা ছড়িয়ে দেওয়া হয় শহরের আকাশে। এই ‘বোমাবর্ষণ’-এ ছিল না কোনও ধ্বংসের বার্তা, ছিল না ক্ষমতার আস্ফালন। ছিল— কাগজের বুকমার্কে লেখা, চিলে ও কাতালানের প্রায় ১০০ জন কবির ‘স্প্যানিশ’ ও ‘কাতালান’ ভাষার কবিতা, ছিল স্বাধীনতা-স্মৃতি-প্রতিরোধ এবং মানুষের অস্তিত্বের সংগ্রামের কথা।
১৯৯৬ সালে, ‘চিলে’-র তিনজন কবি, শিল্পী— ক্রিস্টোবাল বিয়াঞ্চি, জাঁক প্রিয়েতো এবং জুলিও কারাসো মিলে, ‘ক্যাসাগ্র্যান্ডে কালেকটিভ’ প্রতিষ্ঠা করেন। ’৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত, কবিতাকে ঘিরে নানা কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে থাকলেও, মূলত ২০০১ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠান, যুদ্ধর স্মৃতি বহনকারী শহরগুলিতে ‘কবিতার বোমাবর্ষণ’-এর জন্য আন্তর্জাতিক পরিচিতি পায়।
কমেডিয়ানের কি কোনও দায়িত্ববোধ থাকতে নেই?
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ৩৫…
‘ক্যাসাগ্র্যান্ডে কালেকটিভ’-এর উদ্দেশ্য— ‘কবিতাবর্ষণ’ করে যুদ্ধ বা হিংসার স্মৃতিকে ভুলিয়ে দেওয়া নয়, বরং যুদ্ধের স্মৃতিকে মনে রেখে, যুদ্ধের ক্ষতকে অস্বীকার না করে কবিতার মাধ্যমে যুদ্ধবিরোধী বার্তা পৌঁছে দেওয়া। নির্মাণ করা শান্তি ও সংস্কৃতির নতুন ভাষ্য।

১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সালে, স্পেনে-গৃহযুদ্ধ চলাকালীন, বিমান-হামলায়, বার্সেলোনা শহরের প্লাসানোভা ও ক্যাথিড্রাল-সংলগ্ন অঞ্চল ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিশেষ করে ১৯৩৮-এ, প্লাসা দে সান্ত ফেলিপ নেরি-তে হওয়া বিমান-হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন শিশু-সহ বহু সাধারণ মানুষ। সেই স্মৃতিকে মনে রেখেই কবিতা বর্ষণের আয়োজন। প্রায় ৮৮ বছর আগে যেখানে হয়েছিল হিংসার উল্লাস, গোলা-বারুদের শব্দ, সেখানেই আজ কবিতার কুড়িয়ে নেওয়ার অবকাশ। একুশ শতকের এই সংঘাতমুখর সময়ে দাঁড়িয়ে এহেন যুদ্ধবিরোধী বার্তা বিশ্বের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, কম কথা নয়।
‘ক্যাসাগ্র্যান্ডে কালেকটিভ’ ২০০১ সাল থেকে এই প্রকল্প আয়োজন করে আসছে। ২০০১-এ চিলের সান্তিয়াগো থেকে শুরু, ২০০২-এ ক্রোয়েশিয়ার ডুব্রোভনিক, যা ১৯৯১-’৯২ সালের যুগোস্লাভ যুদ্ধের স্মৃতি বহন করছে, ২০০৪-এ স্পেনের গুয়ের্নিকা, যা বহন করছে স্পেনের গৃহযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৩৭-এর বিমান হামলার স্মৃতি। ২০০৯ ও ২০১০ সালে যথাক্রমে, পোল্যান্ডের ওয়ারশ, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিমানহামলার স্মৃতি বহন করছে, এরপর বার্লিন হয়ে একে-একে— ২০১২, ২০১৫, ২০১৮, ২০২৫-এ— লনড্রেস, মিলান, মাদ্রিদ, রটারডাম, হয়ে ২০২৬-এর বার্সেলোনা। এ-পর্যন্ত প্রায় দশ জায়গায় আয়োজিত হয়েছে কবিতাকে ঘিরে এই উদ্যাপন-অনুষ্ঠান। লক্ষ করলে করলে দেখা যাবে, যে-জায়গাগুলো কবিতা-বর্ষণের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর প্রতিটিই, কোনও-না-কোনও সময়ে বোমারু বিমানের হামলার শিকার। যে-শহরে এক সময়ে মারণ-বোমা পড়েছে, সে-শহরে কবিতা ফেলবে ‘ক্যাসাগ্র্যান্ডে কালেকটিভ।’ এমনটাই তাদের উদ্দেশ্য বলে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য জাঁক প্রিয়েতো।





১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, চিলে-তে সামরিক অভ্যুত্থানের সময়ে, চিলে-র রাষ্ট্রপতিভ বন বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছিল। সেই হামলার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে, স্বৈরশাসক অগাস্তো পিনোচে-র ক্ষমতা দখল এবং চিলে-র গণতান্ত্রিক সরকার-পতনের স্মৃতি। ‘ক্যাসাগ্র্যান্ডে কালেকটিভ’-এর প্রতিষ্ঠাতা-সদস্যরা, এই সময়পর্বের দগদগে স্মৃতি বহন করেই বড় হয়েছেন। সেই স্মৃতিকে মনে রেখে, যুদ্ধবিরোধী বার্তা দেওয়াই তাঁদের সংস্থার উদ্দেশ্য। জুলিও কারাসোর মতে, তাঁদের প্রজন্ম, নিজেদের জন্মভূমির যে-অঞ্চলকে চিনেছে ধ্বংসের স্মারক হিসেবে, তাকেই কবিতার মতো সৃষ্টিশীল স্মারক দিয়ে মনে রাখা এই প্রকল্পের ভিত্তি।
বর্তমান যুদ্ধোন্মত্ত পৃথিবীতে যেখানে ক্রমশ দানা বাঁধছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা, যেখানে আজও গাজার আকাশে বোমা ফেলে আসছে ইজরায়েলের যুদ্ধ বিমান, সেখানে হেলিকপ্টার থেকে বোমার বদলে, এই পৃথিবীরই অন্য কোনও এক প্রান্তে ঝরে পড়ছে কবিতা! এমন সুদিনের জন্যই তো স্বপ্ন দেখা! এই সুদিনের জন্যই তো কবির সেই অমোঘ উক্তি— ‘ভয় নেই এমন দিন এনে দেব/ বোমারু জঙ্গি যত বিমানের ঝাঁক থেকে/ বোমা নয়, গুলি নয়, চকলেট, টফি রাশি রাশি/ প্যারাট্রুপারের মতো ঝরবে/ শুধু তোমারই তোমারই উঠোনজুড়ে প্রিয়তমা।’
এক নজরে দেখলে, এখনও পর্যন্ত ১০টি আলাদা স্থানে এই প্রকল্প আয়োজন করেছে ‘ক্যাসাগ্র্যান্ডে কালেকটিভ’। যা শুধু মাত্র যুদ্ধবিধ্বস্ত নয়, বার্লিনের মতো যুদ্ধাপরাধী অঞ্চলেও শান্তির স্মারক হিসেবে আয়োজন করেছে কবিতার এই বোমাবর্ষণ। আগামীতে, জার্মানির ড্রেসডেন-সহ, জাপানের হিরোশিমা, নাগাসাকি শহরে কবিতার বোমাবর্ষণ হবে বলে জানিয়েছেন সংস্থার সদস্যরা। অপেক্ষা সেই দিনের, যখন এ-পৃথিবীর সমস্ত যুদ্ধ থেমে গিয়ে বেঁচে থাকবে শুধু শান্তির অক্ষরমালা।



