মণিদা

মণিশংকরবাবু নয়. মণিশংকরদা। আমি ওই নামেই ওঁকে ডাকতাম। ওঁর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ হয়, ‘সীমাবদ্ধ’ ছবিরও অনেক আগে। ওঁর উপন্যাস অবলম্বনে ছবির নায়ক আমি, কিন্তু ওঁকে চিনেছি তারও আগে, অন্য সূত্রে। আমি যে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করি তখন, তারা ডানলপ কোম্পানির বিজ্ঞাপনের কাজ করত। ডানলপ কোম্পানিতে তখন বিজ্ঞাপন বিভাগেই কাজ করতেন মণিদা।  সেই সূত্রেই কিন্তু মণিদার সঙ্গে আলাপ।

সেসময় অ্যানুয়াল রিপোর্ট বলে একটি বিষয় হত। তার প্রতিটি পাতা ওঁকে দিয়ে সই করানো হত। তারপর সেটা প্রিন্টিংয়ে যেত। সেই সই করাতে আমি ওঁর হাওড়ার বাড়িতে যেতাম। উনি আমাকে হাওড়ার বিখ্যাত মিষ্টি নিখুঁতি খাওয়াতেন। তখন মণিদা ছুটিতে রয়েছেন। কেন? কারণ তিনি ওই ছুটিতে পুজোর উপন্যাস লিখতেন। এক সপ্তাহখানেক ছুটি নিতেন অফিস থেকে, তার মধ্যেই উপন্যাস লিখতেন। পরে জেনেছিলাম, উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি বা হোমওয়ার্কটা মণিদা আগেই সেরে রাখতেন। কিন্তু লিখতেন ওই এক সপ্তাহেই। এক সপ্তাহে একটা নভেল লেখা কি চাট্টিখানি কথা! কতটা মনোযোগ লাগে তার জন্য।

আরও পড়ুন: আমাকে মণিশংকর রায় বলে ডেকেছিলেন সত্যজিৎ রায়, শুধরে দিয়েছিলাম তখনই!
শংকরের লেখা ফিরে পড়া…

‘সীমাবদ্ধ’-র একটি দৃশ্যে বরুণ চন্দ

মণিদার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ধীরে ধীরে মধুর হয়ে ওঠে। শেষের দিকে যখন বিভিন্ন সভায় আসতেন, তখন উঠে দাঁড়াতে পারতেন, হাঁটতেও পারতেন অল্প, কিন্তু আসতেন মূলত হুইলচেয়ারে। আমি অনেক সময়ই সেই হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে গেছি। সেটা আমার ‘প্রিভিলেজ’। আমাকে দেখলেই ডাকতেন, ‘আরে বরুণ! এসো এসো আমার পাশে এসে বোসো!’ মানুষ হিসেবে তো ওঁকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতাম, সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এক বিরাট শূন্যতা তৈরি হল।

আমার মনে আছে, মানিকদা আমাকে বলেছিলেন, “‘সীমাবদ্ধ’-টা পড়ে রেখো!” কী কারণে, কিছু বলেননি। এছাড়াও আমাকে পড়তে বলেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সাদা বাড়ি কালো রাস্তা’। সেটা অবশ্য উপন্যাস নয়, বড় গল্প। পুজোর আগে গিয়েছিলাম ওঁর সঙ্গে দেখা করতে। তখনই আমাকে বলেছিলেন। উপন্যাসটা তখনই পড়া। পরে ‘সীমাবদ্ধ’-র চিত্রনাট্য হাতে পেয়ে দেখি, উপন্যাসের সঙ্গে তার যোজন দূরত্ব। তারপর উপন্যাসটা আমি আর পড়িনি। পরে একটি বক্তৃতায় শুনেছিলাম, উপন্যাসের সঙ্গে চিত্রনাট্যর কোথায় এবং কীভাবে পার্থক্য হয়ে যায়! সেটার পর আরেকবার উপন্যাসটা পড়ি, মানিকদা আর মণিদার ভাবনার মধ্যে কোথায় পার্থক্য হল, কেন হল— তা বোঝার জন্য। সেই তুলনামূলক পাঠ আমাকে অনেককিছু শিখিয়েছিল।