ভেজা চালতাফুলের গন্ধ
ছেঁড়া জবাফুলের মতো বরিশাল থেকে চলে এসেছিল দিদিমার দল। বাঁশবনের ভেতর দিয়ে সাদা-সাদা থানকাপড়ে ঘোমটা দেওয়া অভিজ্ঞ, প্রাচীন বুড়ো-বুড়িরা সব।
একটু-একটু করে শীত শেষ হয়ে আসছে। বৈশাখী ঝড়ে ঝরে যাবে জেনেও একগাছ আমমুকুল। বোলের ভেতরে ধীরে-ধীরে কোকিলপাখিরা বসে আছে। অনাবাদি জমি দুঃখের টিলা হয়ে শুয়ে। এইখানে হাতে-হাতে ঘরবসতি তোলো। এখনই মাটির বা মুলিবাঁশের বেড়ার ঘর সম্ভব নয়। উপেন, তাঁবু এগিয়ে দাও। হরেন, উপযুক্ত বাঁশ কেটে আনো। শিশুবালা, জল দিয়ে ধুয়ে দাও ইন্ডিয়ার মাটি।
মহাভারতের যুদ্ধশিবিরের মতো তাঁবু ফেলে ছাউনি করো। কুলুঙ্গি হবে একদিন। লক্ষ্মীপ্রতিমা আসবে। এইবার ধীরে-ধীরে থাকা। থাকো। তোমাকে ভুলতে পারি না সবুজ-করুণ বরিশাল। কত নদীনালা ছিল আমাদের! সুপুরিবনে শব্দ হত সবসময়। গাছের গুঁড়িতে কান পাতলে গাঙের ধ্বনি শোনা যায়। কী কী নিয়ে এসেছিলাম আমরা? নববধূ যে পাথরের থালায় দুধআলতায় এসে দাঁড়াত সংসারে আগমনের প্রথম দিনটিতে, সেই স্মৃতিপাত্র। একটি শঙ্খ। কুলিপিঠে করার একটি ছাঁচ। মাছ ধরার পলুই। সব নষ্ট ও ধূলিসাৎ হয়ে গেছে ধীরে, অনিবার্যভাবে। ও-দেশ আমি কিছুই দেখিনি, কিন্তু শুনে-শুনে আত্মসাৎ করেছি সর্বস্ব। তৈজসপত্র হারালেও বুকের ভেতরে, রক্তের ভেতরে, মুখের গোপন চেম্বারে রত্ন লুকনোর মতো গল্প বয়ে এনেছিল মা-মাসি, দিদিমারা। মা-মুখের ছেলে আমি। সেসব গল্প আমার বুকের দু’টি অদৃশ্য স্তনের ভেজা দুধদাগের মতো লেপ্টে থাকে।
হলুদ পাতার মতোই পথে-পথে উড়ে বেড়ানো আমাদের জীবন। যেমনটা বলেছিলেন জীবনানন্দ দাশ! লিখছেন পৃথ্বী বসু…
মায়ের অবিকল মেচেতা দাগ আমার গালে। হাত কাঁপে লিখতে গেলে। কী তাহলে রয়ে গেল আমাদের ভেতরে? আমার মধ্যে? সেই আশ্চর্য পরানকথা। গপ্প নয়; পরানকথা। কলমির জঙ্গলে, বেলেমাছের পেটের ভেতরে যার জন্ম। দিনের বেলা কখনও বলা যাবে না এই পরানকথা। তাতে ভাতের হাঁড়ি ফেটে যাবে। রাত্রি হোক।
চাঁদের আলো ঘন হয়ে আসুক। ডালিমকুমার আমাদের পাশটিতে এসে বসো। ওর ঘোড়াকে গাছে বেঁধে দাও। জল ও খাবার দাও। এই ধুলো ও কাদা মেখে কবিতা পড়লাম একদিন। জীবনানন্দ দাশের কবিতা। ‘বনলতা সেন’ নয়। ‘মহাপৃথিবী’ নয়। ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ নয়। ‘রূপসী বাংলা’। না, ‘রূপসী বাংলা’ নয়। আমার প্রিয় বইয়ের নাম— ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা’। সেখানে তুলট কাগজে লেখা প্রাকৃতিক কালি দিয়ে আমার দেহের চামড়ায় উল্কির মতো লেখা হয়ে গেল এই কবিতা, আর আমি সম্পূর্ণ বদলে গেলাম।
কোথাও দেখিনি, আহা, এমন বিজন ঘাস— প্রান্তরের পারে
নরম বিমর্ষ চোখে চেয়ে আছে-নীল বুকে আছে তাহাদের
গঙ্গাফড়িঙের নীড়, কাঁচপোকা, প্রজাপতি, শ্যামাপোকা ঢের,
হিজলের ক্লান্ত পাতা, বটের অজস্র ফল ঝরে বারে বারে
তাহাদের শ্যাম বুকে,— পাড়াগাঁর কিশোরেরা যখন কান্তারে
বেতের নরম ফল, নাটা ফল খেতে আসে, ধুন্দুল বীজের
খোঁজ করে ঘাসে ঘাসে-বক তাহা জানে নাকো, পায় নাকো টের
শালিখ খঞ্জনা তাহা; লক্ষ লক্ষ ঘাস এই নদীর দু’ধারে
নরম কান্তারে এই পাড়াগার বুকে শুয়ে সে কোন্ দিনের
কথা ভাবে; তখন এ জলসিড়ি শুকায়নি, মজেনি আকাশ,
বল্লাল সেনের ঘোড়া-ঘোড়ার কেশর ঘেরা ঘুঙুর জিনের
শব্দ হত এই পথে আরো আগে রাজপুত্র কতো দিন রাশ
টেনে টেনে এই পথে কি যেন খুঁজেছে, আহা হয়েছে উদাস,
আজ আর খোঁজাখুজি নাই কিছু— নাটাফলে মিটিতেছে আশ—

মেয়েলি হাত সকরুণ
ট্রেনে করে বাড়ি ফিরছি। এখন আমার পূর্ণবয়স্ক যুবকবেলা। অকারণে মনে পড়ছে বুদ্ধের সামনে দাঁড়ানো সন্তান-হারানো মায়ের মুখ। মৃত্যু প্রবেশ না-করা বাড়ির একমুঠি সরষেদানা চাই। সরষেখেত দেখলেই তাই শোক হচ্ছে। নীল মনসার মন্দির।
ট্রেন জানলার বাইরে সাদা কাছা জড়ানো এক শিশু ট্রেন দেখে হাত নাড়ছে। গলার সুতোয় ধাতুর চাবি জড়ানো। তলতলে ন্যাড়া মাথা। বাড়ির গেটে লতানে ফুলগাছ। টাটকা বিধবা মা দ্রুত এসে ছোঁ দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সন্তান।
গতকাল কল্যাণীতে জীবনানন্দ স্মারক বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিলাম। ফিরতে-ফিরতে এই দৃশ্য দেখে মনে পড়ল আমার গতকালের নীরব অশ্রুপাত। কাঠের প্যাঁচার সামনে বসে কবি জহর সেনমজুমদার বলছিলেন মঞ্জুশ্রী দাশের কথা। তাঁর জীবনের দৈন্য, দুর্গতি ও কষ্টের কথা। মাথা খারাপ সে মেয়ের। পথের পতঙ্গ সে যেন। জীবনানন্দের মেয়ে মঞ্জুশ্রী। কবির মতোই আউটসাইডার, একা ও ব্যথিত।
আকস্মিক পিতৃহারা শিশু দেখে মনে পড়ল না দেখা মঞ্জুশ্রীর মুখ। বাবার কবিতা বিষয়ে গবেষণা করতে চাইতে। তুমি সম্পর্কে আমার দিদি হও। মঞ্জুশ্রীদি, সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম, শালিকপাখির গর্ভের চেয়ে বড় কিছু রুদ্রপলাশ পেয়েছিলাম। তোমার বাবার জন্মদিনে সেইসব ফুল আমি বিছিয়ে রেখেছি তোমার বাবার ছবির নীচে। তুমি আমায় তোমার হৃদয়ের বোন ভেবো।
তোমরা যেখানে সাধ চ’লে যাও― আমি এই বাংলার পারে
র’য়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে;
দেখিব খয়েরী ডানা শালিখের সন্ধ্যায় হিম হয়ে আসে
ধবল রোমের নিচে তাহার হলুদ ঠ্যাং ঘাসে অন্ধকারে
নেচে চলে―একবার―দুইবার― তারপর হঠাৎ তাহারে
বনের হিজল গাছ ডাক দিয়ে নিয়ে যায় হৃদয়ের পাশে;
দেখিব মেয়েলি হাত সকরুণ― শাদা শাঁখা ধূসর বাতাসে
শঙ্খের মতো কাঁদে; সন্ধ্যায় দাঁড়াল সে পুকুরের ধারে,
খইরঙা হাঁসটিরে নিয়ে যাবে যেন কোন কাহিনীর দেশে―
‘পরণ-কথা’র গন্ধ লেগে আছে যেন তার নরম শরীরে,
কল্মীদামের থেকে জন্মেছে সে যেন এই পুকুরের নীড়ে―
নীরবে পা ধোয় জলে একবার― তারপর দূরে নিরুদ্দেশে
চ’লে যায় কুয়াশায়,― তবু জানি কোনোদিন পৃথিবীর ভিড়ে
হারাব না তারে আমি― সে যে আছে আমার এ বাংলার তীরে।

কারুবাসনা আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে
‘কারুবাসনা আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে। সব সময়েই শিল্পসৃষ্টি করবার আগ্রহ, তৃষ্ণা, পৃথিবীর সমস্ত সুখ দুঃখ, লালসা, কলরব, আড়ম্বরের ভেতর কল্পনা ও স্বপ্নচিন্তার দুশ্ছেদ্য অঙ্কুরের বোঝা বুকে বহন করে বেড়াবার জন্মগত পাপ। কারুকর্মীর এই জন্মগত অভিশাপ আমার সামাজিক সফলতা নষ্ট করে দিয়েছে। আমার সংসারকে ভরে দিয়েছে ছাই-কালি-ধূলির শূন্যতায়। যে উদ্যম ও আকাঙ্ক্ষার নিঃসংকোচ সাংসারিকতা ও স্বাভাবিকতা স্বরাজপার্টি গঠন করতে পারত, কিংবা কংগ্রেস, অথবা একটা মোটর কার, কিংবা একটা নামজাদা বই বা চায়ের দোকান, অথবা একজন অক্লান্তকর্মী চেয়ারম্যানকে তৈরী করতে পারে, অসীম অধ্যবসায়ী উকিলকে,কিংবা সচ্চরিত্র হেড মাষ্টারকে, মুচিকে, মিস্ত্রিকে সেই আকাঙ্ক্ষা উদ্যম নেই আমার।’
‘কারুবাসনা’ নাটকে অভিনয় করতে হবে। এর আগে কখনও কলকাতার মঞ্চে ওঠা দূরে থাক, কলকাতাই ভাল করে যাইনি। গ্রামের ছেলে আমি। হাওড়া স্টেশনে নামলেই মাথা ঘুরত। পেটের ভাত চাল হয়ে যেত। শহরে কালিঝুলি, আন্ধার।
কিন্তু মঞ্চে অভিনয় করতে হবে একজন কবির চরিত্রে। কবির চরিত্রে অভিনয় করব? পারব? হাঁটু কাঁপে।
আলো জ্বলে ওঠে। দর্শক-আসনে বিখ্যাত সব নট বসে, কত জ্ঞানীজন-গুণীজন এসেছেন। মুখে লবঙ্গ নিয়ে ধীরে-ধীরে মঞ্চে ঢুকি। গলা সামান্য তুতলে যায়। তারপর আমি আর কথা বলি না। কথা বলে আমার ভূত।
বরিশাল গ্রামের নীল মনসার মন্দির, সামান্য অর্থের জন্য চূড়ান্ত লাঞ্ছিত বাবা-মা, মাছের গন্ধে ভরা গাঙের জল, মরে যাওয়া শালিখপাখি, সমাজের সবকিছু থেকে বাতিল একজন হিমমানুষ, ভয় যার পিছু নিয়েছে, অবসাদ, অসুখ আর দৈন্য তিনজন যার সতীন— সেই মানুষটির গলার স্বর আমার গলায় উঠে আসে। আমি কবিতা বলতে থাকি। নিজেকে মানুষ বলে মনে হয় না। এই স্বর আমার ভেতরে ছিল আমি জানতাম না।
আমি ভূতে পাওয়া গলায় বলতে থাকি জীবনানন্দ দাশের কবিতা—
আলো-অন্ধকারে যাই— মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে;
স্বপ্ন নয়— শান্তি নয়— ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;
আমি তারে পারি না এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে,
সব কাজ তুচ্ছ হয়—পণ্ড মনে হয়,
সব চিন্তা— প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়, শূন্য মনে হয়।

খইরঙা হাঁস ও কাহিনীর দেশ
সেই দিন এই মাঠ স্তব্ধ হবে নাকো জানি—
এই নদী নক্ষত্রের তলে
সেদিনও দেখিবে স্বপ্ন—
সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে!
আমি চলে যাব ব’লে
চালতাফুল কি আর ভিজিবে না শিশিরের জলে
নরম গন্ধের ঢেউয়ে?
লক্ষ্মীপেঁচা গান গাবে নাকি তার লক্ষ্মীটির তরে?
সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে!
চারিদিকে শান্ত বাতি-ভিজে গন্ধ-মৃদু কলরব;
খেয়া নৌকাগুলো এসে লেগেছে চরের খুব কাছে;
পৃথিবীর এইসব গল্প বেঁচে র’বে চিরকাল;
এশিরিয়া ধুলো আজ-বেবিলন ছাই হয়ে আছে।
একদিন ভেবেছিলাম ‘রূপসী বাংলা’ বইটির কবিতা পড়ার পর একটি ছবি বানাব। কিশোর বয়সের ইচ্ছে। একটি ছোট ক্যামেরায় তুলে রাখব। পড়তে পড়তে কাঠ-পেনসিলে নোটস রাখতাম। সেসব মিলিয়ে প্রথম দৃশ্য লেখা হয়েছিল। খাতাবন্দি হয়ে ছিল। আজ তুলে দিলাম জীবনানন্দে ভালবেসে ওঁর ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা’ বিষয়ক ছবির প্রথম দৃশ্যের খসড়া।
নোটস—
প্রথম দৃশ্য শুরু হয়। শিশু ঘোড়ার একটা কবর। ভাঁটফুলের জঙ্গল। এক উন্মাদিনী বসে আছেন। জলে ডুবিয়ে রাখা কয়েকটা ভেজা নৌকা। বাঁশবনে শুকনো পাতা উড়ছে। আসন্নপ্রসবা কিছু মহিলা বসে-বসে পায়ে আলতা পরছে। পাশে একজনের শাড়ির আঁচলে দাউদাউ আগুন। সেই আগুন থেকে হুঁকো ধরিয়ে দিচ্ছে এক কুলীন বুড়ো। চারপাশে অনেকগুলি বনশিউলি গাছ। গাছের গা থেকে সুতো বেঁধে সাদা-সাদা শঙ্খের ঘুমন্ত শাঁখা দোল খাচ্ছে।
একজন বটের ফলের মতো মা-হারা কিশোর তোলা উনুনে ভাত বসিয়েছে। মেসবাড়ির মতো বারান্দা। আবছা আলো। তালের হাতপাখায় উদ্দাম হাওয়া। নদীর পাড়ে শ্মশান। চিতা নিভে যাচ্ছে জলের বাতাসে। পালাকীর্তনের আওয়াজ। নদীতে বুকে ঘড়া নিয়ে মেয়েশব ভেসে যায়। অনেক আকাশের নীচে কুয়াশা, সেখানে একজন মানুষ আপনমনে পিণ্ডদান করছে নিজের। পাশের আঘাটা দিয়ে ওঁর সধবা মা মাথায় লক্ষ্মীঠাকুরন নিয়ে পুকুরের তলায় চলে যায়। শেতলার খড়বুকে মৌমাছি চাক বেঁধেছে। মৌরলা মাছ জলে। পাতার শব্দ। গেরস্থালির একসিন্দুক আমবাগানে খুলে রাখা। তার ভেতরে ছড়িয়ে পুরনো হলদেটে খাতা ও গুটিকয় কমলালেবু। গাছগুলি বিবাহগান গায়। বিচ্ছেদের গান গায়। কতগুলি হাঁস ব্যথাকে নীরব করে ডিম ফলিয়েছে। সেই হাঁসগুলি দৃশ্যকে পাখার ঝাপট মেরে উড়ে যায়। প্রথম দৃশ্য শেষ হয়।
জীবনানন্দ দূরের কবি নন। অনুভব করি। কলকাতার ভাড়াবাড়িতে থাকি। দু’মুঠো ফুটিয়ে খাই। পথ হাঁটি। সময় পেলেই পথ হাঁটি। মানিব্যাগে ওষুধ রাখা থাকে। টলে গেলে দ্রুত খেয়ে নিতে হবে। ক্লান্ত হয়ে নিঃসঙ্গ ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম থেকে উঠে দেখি মাথার বালিশের পাশে রাখা একটি শীতল লবঙ্গফুল।




