চরিত্রের জন্ম হয়
‘ওগো পভু আমি তোমারই, তোমার জয় পরাজয় সব আমার— সেন্দুরের দিব্যি…’
‘দিল্লীর মসনদকে মনে হয় বিপদ সংকুল অরণ্য। আর সেই অরণ্যে একা বিচরণ করছি আমি। হা হা হা…’
‘ছার, তারকাঁটা পড়িলে মোর বিয়াও হবা না হয়। বৈশাখ মাসত বিয়াও ঠিক হইসে। উমরা কহিসে তারকাঁটার বেড়ার ভিতরত বিয়াও দিবা না হয়। মোর আব্বার জমি টাকা তামাল্লার শ্যাষ হয়া যাবে ছার!’
মাত্র তিনটি উক্তি বা উদ্ধৃতি। চরিত্রগুলির নাম উল্লেখ করলাম না, এটা পাঠকদের কাছেই ছেড়ে দিচ্ছি। এই উক্তিগুলো যেন আমার কাছে উপন্যাস-পাঠের পথ-নির্দেশকা।
একটা উপন্যাসের চরিত্ররা সবাই কি স্বপ্ন-দেখা ,স্বপ্নের ভেতরে বসবাসকারী মানুষ? হয়তো আংশিকভাবে সত্য। কেননা শুরু থেকেই তাদের একটা না একটা সমস্যা। কিন্তু তার থেকে উত্তরণের পথ দেখাচ্ছে তাদের নিজস্ব বেঁচে থাকার নেশা। বলা বাহুল্য, চরিত্ররা সেই নেশাগ্রস্ত মানুষ, যা তাদের জীবনকে নির্ধারিত ফলাফলের অপেক্ষা না করে ঠেলে দিচ্ছে জীবন-যাপনের একেক দিকে।
এই উপন্যাসের ভৌগোলিক পটভূমি জলপাইগুড়ি জেলার এক ক্ষুদ্র জনপদ দক্ষিণ বেরুবাড়ি। যে-গ্রামের তিন দিক ঘিরে আছে বাংলাদেশের সীমান্ত। স্বাধীনতার এগারো বছর পর ১৯৫৮ সালে নেহরু-নুন চুক্তির মাধ্যমে গ্রামের পাঁচটি মৌজা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে দিয়ে দেওয়া হয়। এই চুক্তির ভিত্তি ছিল র্যাডক্লিফ লাইনের টানা সীমানা। এই গ্রামগুলো ভারতের হওয়া সত্ত্বেও, সরকারি মানচিত্রে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। আবার এই গ্রামগুলো বহুচর্চিত ‘ছিটমহল’-এর গ্রামও নয়। এই সব গ্রামের বাসিন্দা ভারতের ভোটার, রেশন কার্ডধারী; ভারতের স্কুল, হাসপাতাল, পঞ্চায়েত— সকল সরকারি ব্যবস্থার অংশ, অথচ দেশের মানচিত্রে গ্রামের উল্লেখ নেই। উদ্ভব হয় এক নতুন সরকারি শব্দবন্ধ— Adverse Possession— অর্থাৎ এই গ্রামগুলোর ভূখণ্ড বাংলাদেশের হলেও বাসিন্দারা ভারতের নাগরিক। অতীতে পাকিস্তান, আর ১৯৭১-এর পর থেকে বাংলাদেশ বারবার এই গ্রামগুলোর ওপর তাদের দাবি জানায়। এর প্রতিবাদে ‘বেরুবাড়ি জমি রক্ষা কমিটি’ এই চুক্তির বিরোধিতা করে ঐতিহাসিক আন্দোলন গড়ে তোলে।
উপন্যাসের সূত্রপাত কুড়ুম নদীর পাড়ে নেতাজি মন্দির থেকে, ‘হঠাৎই সকালের নির্জনতা চুরমার করে মন্দির থেকে একটা আর্ত চিৎকার, ‘মহাদেবরে ও মহাদেব…এইঠে আইসেক…তামাল্লায় শ্যাষ হয়া গেল মহাদেব…’
এই ‘শ্যাষ’ মানে ‘মন্দিরের দরজার তালা ভাঙা’। তারপর, ‘ট্রাঙ্কের মুখ খোলা। চারপাশে ছড়ানো বাসি ফুল বেলপাতার মধ্যে শুধু নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোসের মূর্তিটা অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।’ কিন্তু এর থেকেও বড় খবর হল দক্ষিণ বেরুবাড়িতে কুড়ুম নদীর পাড়ে একটি নেতাজি মন্দির রয়েছে, যেখানে নেতাজি পূজিত হন ঈশ্বররূপে। সেখানে একটি টিনের ট্রাঙ্কে সংরক্ষিত ছিল ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি-র মানচিত্রের তেল-সিঁদুর লাগানো কপি, যেখানে বেরুবাড়ির এই মানচিত্র বহির্ভূত এই গ্রামগুলোকে স্বাধীন ভারতের অংশ হিসেবে দেখানো ছিল— সেই চুক্তিপত্র ও ম্যাপটা চোর হাপিস করে দিয়েছে। এবং বলা বাহুল্য, ‘ম্যাপচুরির কথা শোনা মাত্র নেতাজি মন্দিরের মাঠে বসন্তের আকাশ ভেঙে পড়ে। একটা সর্বনাশ আর শঙ্কা মেশানো স্বর একসঙ্গে সকলের গলা থেকে বেরিয়ে এলো ‘হায় হায় হায়…কী হবে এলায়।’ দীর্ঘদিনের সঞ্চিত নয়নের মণিসম ম্যাপ আর চুক্তিপত্র যেন দক্ষিণ বেরুবাড়ির সমবেত আত্মা, চুরি হয়ে যাওয়াটা যেন এই ক্ষুদ্র জনপদের ওপরে নেমে-আসা অজানা ‘শঙ্কার কালো মেঘ’ বলেই গ্রামবাসীরা এভাবেই সাব্যস্ত করে।
এই অবিশ্বাস্য ‘ম্যাপ ও চুক্তিপত্র’ হারানো এবং ফিরে পাওয়া ও না-পাওয়ার টানাপোড়েন চলতে থাকে উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত।
এদিকে এই গ্রামেরই কান্দারু দাস গ্রামের ‘কমার্শিয়াল’ যাত্রাপালায় সর্বদা সম্রাটের ভূমিকায় অভিনয় করে, গ্রামে তার নাম ‘দিল্লির সম্রাট’। সে জগতটাকেই যাত্রাপালার মঞ্চ মনে করে, নিজেকে মনে করে সম্রাট বলে। হাটে মাঠে যাত্রার ডায়ালগ বলার মতোই কথা বলে, চাল চলন তার পালার সম্রাটের মতো। এই দলেরই প্লেয়ার গন্ধেশ্বর অধিকারী, সে যাত্রায় নারী সাজে। সে গরিব, জমিজমাহীন— যাত্রাপালা তার জীবনের ধ্যানজ্ঞান। গন্ধের বাড়ি ছিটসাকাতি গ্রামে— সীমান্তের অদ্ভুত অবস্থানে, কুরুম নদীর ধারে— গ্রামটি নোম্যান্সল্যান্ডে, ইন্ডিয়ার কাঁটাতারের বাইরে। ভারতীয় নাগরিক হয়েও তাকে প্রতিদিন সীমান্ত-চৌকি পেরোতে হয় বিএসএফের অনুমতি নিয়ে, সরকারি পরিচয়পত্র দেখিয়ে। গন্ধেশ্বর দিল্লির সম্রাট কান্দারুর অসম প্রেম-পিয়াসী।
এছাড়াও পাশাপাশি দুটি নারী চরিত্র শাপলা ও জুলি এবং তাদের জড়িয়ে আরও অনেক চরিত্রের যাতায়াত, প্রত্যেকের আকাঙ্ক্ষা এবং পরস্পরের প্রতি টান ও টানাপোড়েনের নির্মাণ পাঠককে পাঠ থেকে চোখ ফেরাতে দেয় না। কেউ কি ভুলতে পারবে, ‘নেতাজী মন্দির’ থেকে ‘নকশাল ঠাকুরের থান’ নামক মিথের নির্মাণ? এমনকী কাশিয়াবাড়ি রেলস্টেশন-মাস্টার, যার কল্পনায় কেবলই নায়িকা সুচিত্রা সেন চলে আসে অনায়াসে এবং তাকে ঘিরেই তার অকিঞ্চিৎকর জীবন! আসলে কোনও চরিত্রই বা ঘটনা লেখকের চোখ এড়িয়ে যায়নি। ফলে বর্ডার-ভূত তাড়ানো মাকলে কবিরাজ থেকে গ্রামের কাঁটাতারের সমস্যা নিয়ে নেতাজিকে চিঠি লেখা কার্গিল ফেরত প্রাক্তন সেনাকর্মী কঠিন রায় ডাকাতি ছেড়ে কাওয়ালি গায়ক হওয়া কালু মণ্ডল বা বহুবারের পঞ্চায়েত ভোটে নির্বাচিত বরদা প্রধান, সবাই নিজস্ব গুণেই উপন্যাসে উপস্থিত। কাঁটাতার যেমন ঐতিহাসিক বাস্তব তেমনি কাঁটাতারের গা ঘেঁষে চলা ছোট্ট কুড়ুম নদীও যেন উপন্যাসে চরিত্র হিসেবে উপস্থিত। আখ্যানে বর্ণিত অনবদ্য সব চিহ্নসকল শেষ পর্যন্ত ‘নিউ ইন্ডিয়া অপেরা’কে প্রার্থিত চূড়ান্ত বিন্দুতে পৌঁছে দিতে পেরেছে।
দ্বিতীয় দীর্ঘস্থায়ী উল্লেখযোগ্য ঘটনা, বহুদিনের চেপে-রাখা যন্ত্রণা, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সমস্যা, জমি-জরিপ, কাঁটাতার বা বিএসএফ আউট-পোস্ট ইত্যাদি যা ইতিহাসের পাতায় কোথাও-না-কোথাও লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু এই উপন্যাসে কয়েকজন চরিত্রের বয়ানের দিকে তাকালে দক্ষিণ বেরুবাড়ির শ্বাস–প্রশ্বাস সম্যক ভাবে শুনতে পাওয়া যায়, যেমন, ‘দেশভাগের সময় র্যাডক্লিফ দিল্লিতে বসে যে বর্ডার টানলো আর সেই অনুযায়ী নেহেরু চুক্তি করল। ম্যাপ অনুযায়ী দক্ষিণ বেরুবাড়ির কয়েকটা গ্রাম চলে গেল ওই দেশে!’ কিম্বা বরদা প্রধান বলে ওঠে, ‘তোমরালা তো এইলা জানেন না… কত মাপামাপি কত চুক্তি কত বৈঠক… কলিকাতা হিল্লিদিল্লিই…হামার দ্যাশের নেতাগিলা কী জানে,স্বাধীনতার এত যুগ পরেও ভারতের এই মতন একখান গেরাম আছে, যেইটা গেরাম ভারতের মতো নাই, কিন্তু গেরামের ভারতের ভোটার তালিকাত মানষিলার তালিকাত নাম আছে!”
এদের উক্তিগুলি পড়লেই বোঝা যাবে, এর কোনটাই তাদের অধীনস্থ নয়। সবই সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে,জণগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া। এরা বৃহত্তর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্রীড়নক মাত্র! কিম্বা র্যাডক্লিক লাইনের ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’!
সৌগত তার উপন্যাসে এই ব্যাপারটা এত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, একটা জনপদের প্রতি স্বাধীনতা উত্তরকালের রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি এবং তজ্জনিত স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার ইতিহাস পড়াটা অনেক সহজ হয়ে যায়। এই জনপদের সঙ্গে, এই জীবনের সঙ্গে— এক অবিরাম যাত্রা, এক অপেরা, এক তামাশার আখ্যান ‘নিউ ইন্ডিয়া অপেরা!’
একটু আগেই লিখেছিলাম সৌগত-বর্ণিত কুড়ুম নদীর কথা। হ্যাঁ,সব কিছু ছাড়িয়ে লেখক যে প্রকৃতিকে বর্ণনা করেছে সেখানেও সে অনন্য, যেমন ‘র্যাডক্লিফ সাহেবের টানা বর্ডারের মতো কুড়ুম দক্ষিণ বেরুবাড়ির নদী খেত মাঠ চা বাগান জঙ্গল গৃহস্থবাড়ির উঠোনের পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে। দক্ষিণ বেরুবাড়ির মাটি যেখানে কুড়ুমকে বাধা দেয়,সে দূর দিয়ে গোল করে ঘুরে আবার যমুনার শরীরের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করে। কুড়ুমের যমুনায় মেশার আকাঙ্ক্ষা অদম্য, চিরকালীন…কুড়ুম যমুনার কাছে এসে গোল গোল সাতটা পাক খায়, তারপর যমুনায় মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। মাটির ওপর জল দিয়ে অলিখিত চুক্তিপত্র সই হয়— এ যেন দুই নদীর সপ্তপদী’…
কিম্বা দিল্লির সম্রাটের বাড়ির বর্ণনা দিতে গিয়ে সৌগত লেখেন, ‘উঠোন ফুঁড়ে একটা শিমুল গাছ আকাশের দিকে উঠেছে। কয়েকটা বুলবুলি গাছে বাসা বেঁধেছে। যে কয়দিন ফুল আছে তারা থাকবে। বুলবুলিগুলো উড়ে এসে শিমুলের উঁচু ডালে বসলে দুই একটা ফুল উঠোনে ঝরে পড়ে…। শিমুলগাছে ফুল ধরলে গাছের পাতায় কচি সবুজ হালকা হলুদ রঙ ধরে। গাছের তলায় দাঁড়িয়ে ওপর দিকে তাকালে মনে হয় লাল ফুল,কচি সবুজ পাতা,হালকা পাতা যেন কেউ শিমুলফুলের আঠা দিয়ে আকাশে গায়ে সেঁটে দিয়েছে…।’
মনে হয় লেখক শুধুমাত্র ঔপন্যাসিক নন, একজন সংবেদনশীল কবিও বটে!
আর যেটা বলার গন্ধে ও শাপলার সাংসারিক সম্পর্কের ভেতরে যে প্রেম না-প্রেম কামনা আশ্লেষ যে শৃঙ্গার মিলেমিশে আছে, তা পাঠকের চোখ এড়ায় না।
আদতে লেখক যা লিখতে চেয়েছেন, সেটা হল ইতিহাস ভূগোল রাজনীতির ভেতরে আড়ালে থাকা একটা জনপদের জীবনের গল্প। যে-জীবন আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখ, মৃত্যু, প্রেম -প্রেমহীনতার ও মায়া-আখ্যান; যে মায়া জীবনের মায়া জন্মভূমির মায়া– যেন সব মিলিয়ে ‘নিউ ইন্ডিয়া অপেরা’র চরিত্র। আপনি যদি সাহিত্যের নিবিষ্ট পাঠক হন তবে বাংলার উত্তরের এই ক্ষুদ্র জনপদ নিয়ে লেখা এই উপন্যাস ‘নিউ ইন্ডিয়া অপেরা’ আপনাকে পাঠ করতেই হবে।




