গতবছর (২০২৫) ফেব্রুয়ারিতে, জীবনের শেষ সাক্ষাৎকারে সুবিমল বসাক বলছিলেন, বিহারের হিন্দিভাষীদের মধ্যে বাংলাভাষার প্রচলনের কথা— ‘অনেক হিন্দিভাষী আবার বাংলা বুঝতে-বলতেও পারত। যারা পূর্ণিয়া, দ্বারভাঙ্গা ইত্যাদি জায়গা থেকে এসছিল, তারা তো ভালো বাংলা বলত। অনেকসময় আমি ভুলে গেলে ধরিয়েও দিত। একবার বিদ্যাসাগরের মায়ের নাম ভুলে গিয়েছিলাম, এক বিহারিই— পূর্ণিয়ার ছেলে— মনে করিয়ে দিল নামটা।’ সুবিমল নিজে পাটনায় বেড়ে ওঠায়, সেখানকার মানুষজনের সঙ্গে আদানপ্রদান ছিল সহজ ও স্বাভাবিক। সেই সূত্রে, পাঁচের দশক থেকে, হিন্দি সাহিত্যিক ও পত্রপত্রিকার সঙ্গেও গড়ে উঠেছিল যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা। আর সেইসব সাহিত্যিকদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন একজনই— ফণীশ্বরনাথ রেণু (১৯২১-১৯৭৭)।

১৯৭৫ সালে, কৃত্তিবাস পত্রিকায় এক নিবন্ধে সুবিমল লেখেন— ‘রেণুজীকে প্রথম দেখি ১৯৫৮, পাটনায় রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমে। সেদিন তিনি গীতা পাঠ করেছিলেন। তখন, প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি মিশনে যেতেন। তার আগে ‘ময়লা আঁচল’ বেরিয়ে গেছে, ‘পরতি পরতিকথা’ও। ময়লা আঁচলের পটভূমি বিহারের গণ্ডগ্রাম, সময় ১৯৪৬-৪৭-৪৮। তাঁর অধিকাংশ গল্প ও উপন্যাসের পটভূমি গ্রামাঞ্চল। তিনি একাধারে বিবেকানন্দের ভক্ত, সুভাষচন্দ্রের ভক্ত।…’ এহেন ফণীশ্বরনাথ রেণু, হিন্দি সাহিত্যের বিশিষ্ট এক লেখক, ছিলেন সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘শিষ্য’। আর সুবিমল, রেণু-র। পাঁচের দশকের শেষদিক থেকে রেণুর মৃত্যু পর্যন্ত অটুট ছিল তাঁদের যোগাযোগ; বস্তুত, তা এক অর্থে পারিবারিকই হয়ে উঠেছিল।
প্রথমে উল্লিখিত সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরে, হিন্দি সাহিত্যিকদের বাংলা চিঠি তুলে ধরার চেষ্টা থাকবে। সাহিত্যের ভাষা হিন্দি হলেও, বাংলা লেখাতেও তাঁদের কেউ-কেউ যে পিছিয়ে ছিলেন না— তা-ও বোঝা যাবে এই পরিসরে।
প্রথমেই ফণীশ্বরনাথ রেণু। সুবিমলের সংগ্রহে রেণু-র তিনটি চিঠি খুঁজে পেয়েছি। প্রথমটি ১৯৬২ সালের। পড়ে নেওয়া যাক—
পাটনা
২১.১২.৬২
ভাই সুবিমলবাবু,
আপনার দুই চিঠি যথাসময়েই পেয়েছি। জবাব দিতে দেরি হয়েছে। লতিকা তাদের কলেজের তরফ থেকে মুজফ্ফরপুর গেছে Camp এ গত শনিবার। তারপর দিনই আমার পুর্ণিয়া যাইবার কথা— কিন্তু আর যাওয়া হইল না। —নানান কারণে পত্রোত্তর দিতে বিলম্ব হইয়াছে। ক্ষমা করিবেন। সাগরময়বাবুকে চিঠি লিখতে পারলাম না।
আপনি কবে ফিরছেন? কোনো প্রকাশকের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে কি? রাজেন্দ্র যাদবকে কি রকম দেখলেন— রাজেশ কেমন লাগল— কি কথা হ’ল। লিখে জানাইবেন। আমি এখন দোটানায় আছি— বাড়ি মানে পুর্ণিয়া যাই না এখানে থাকি। Arts & Artist কে স্বর্ণকীটের অনুবাদ কোরে দিয়েছি। অনুবাদ ওদের পছন্দ হয়েছে। January র মাঝে ওরা Produce কোর্বে।
আশা করি ভালই আছেন।
আমার প্রীতি নমস্কার গ্রহণ করিবেন। আমার জন্য ওখানকার মিষ্টি খেজুর গুড়ের সন্দেশ নিয়ে আসিবেন। ইতি—
রেণুজী
‘ভাই সুবিমলবাবু’— এই সম্বোধন আশ্চর্য করে। চিঠিতে কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। ‘লতিকা’, সুবিমলের ‘লতিকা বৌদি’, রেণু-র স্ত্রী। তিনি ছিলেন বাঙালি। সুবিমলকে লেখা ওঁর কয়েকটি চিঠিও খুঁজে পেয়েছি। ‘সাগরময়’— সাগরময় ঘোষ, ‘দেশ’ পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক। রাজেন্দ্র যাদব ও রাকেশ (মোহন রাকেশ) পাঁচের দশকের হিন্দি গদ্যকার। সুবিমল তখন কিছুদিন কলকাতায় এসেছিলেন, রাজেন্দ্র ও রাকেশও তখন কলকাতায়— রেণু-র চিঠিতে তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাতের খোঁজ। রেণুর হস্তাক্ষর বাঙালিদের মতোই সহজ ও স্বাভাবিক। আড়ষ্টতাহীন।
2/30 R. Nagar
Patna-4
22nd Aug ’65
সুবিমলবাবু—
আপনার পাঠানো Telegram এবং মানুষ আমরা যথাসময়েই পেয়েছি। রাত্রে Central এ রাখলাম। পর দিন সকাল থেকেই আমাদের বাড়িতে এনে রাখি। ওর ভাগ্য ভাল। সেদিন সারা দিন আমার বাড়িতে সুন্দরী-অসুন্দরী (কিন্তু সবাই M.A.) মেয়েদের আনাগোনা— ‘সংযোগ’ আর কি?
সমীর এসেছিল। তার সঙ্গে দুদিন দুমকায় ঘুরে এসেছে— কালকে। ভারি খুশি!
আর সব খবর কি?
হ্যাঁ— আমরা (আমি এবং সমীর) ওর নাম দিয়েছি ‘দেবু’—। ও আপনাকে ভীষণ ভালবেসে ফেলেছে। সর্বদাই আপনার নাম করে।
মলয়বাবুর কি খবর?
সুভাষের আমার চাবির অনুবাদ হওয়া উচিত!—
চিঠি দিবেন। ইতি—
রেনুজী
চিঠিতে উল্লিখিত ‘মানুষ’টি হলেন আমেরিকান কবি ডেভিড গারসিয়া। কলকাতায় মলয় রায়চৌধুরী ও সুবিমল বসাকের সঙ্গে কয়েকদিন কাটানোর পর, ১৭ আগস্ট ডেভিড রওয়ানা দেন পাটনায়, ফণীশ্বরনাথ রেণু ও সমীর রায়চৌধুরীর কাছে— এ-তথ্য পাওয়া যায় সুবিমলের ডাইরি থেকে। ‘আমার চাবি’— সুভাষ ঘোষের গদ্যগ্রন্থ।

১৯৭৬ সালে ফণীশ্বরনাথ রেণু-র গল্পগ্রন্থ ‘তিসরী কসম’ ও ১৯৮২-তে ‘ফণীশ্বরনাথ রেণুর শ্রেষ্ঠ গল্প’ বইদুটি অনুবাদ করেন সুবিমল। ২০১৮-য় সুবিমলের স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়— ‘রেণু, সেলাম রেণু’। সে-বইয়ে সুবিমল পরবর্তী চিঠিটি গ্রন্থিত করেন। আমরা, প্রাসঙ্গিকবোধে, সেই চিঠিটিও আলোচনায় আনলাম।
পাটনা/১৫.৬.৭৩
ভাই সুবিমলবাবু,
দিল্লী থেকে ফিরে এসে আপনার দুটো চিঠি পেলাম। আমি দিল্লীতে মিটিং সেরে All India Institute of Medicine এ ভর্ত্তি হয়েছিলাম— Check up এর জন্য। চেক-আপের পরে ওরা একটা নতুন থের্যাপি (Hyper-thermo-Therapy) তে আমার চিকিৎসার পরামর্শ দিলেন। ওদের কাছে একটা মেশিন আছে— পেটে রবরের ট্যুব সহ একটা ব্যালুন গিলিয়ে— ওই মেশিনের দ্বারা পেটের Acid Freez করা হয়— একেবারে Freezing Pointএ…। ২০ দিন পরে ওরা বললেন আবার ৬ সপ্তাহ পরে আসতে— তখন Freez করা হবে। আবার July 15th দিনটা যাওয়ার কথা।
আপনার চিঠির সঙ্গে সুনীলের হাতে শঙ্খ বাবুর চিঠিও পেলাম। ওনাকে ডাকযোগে জবাব পাঠাচ্ছি। আমি 25th June ’73 নাগাদ আপনার ঠিকানায় আমার লেখা নিশ্চয় পাঠিয়ে দিব— লেখা দিল্লীতেই আরম্ভ কোরেছিলাম।
আমি শঙ্খবাবু কে লিখছি যে উনি 27th/28th June পর্যন্ত লেখা নিশ্চয় পেয়ে যাবেন।
আপনার থ্রু দিয়ে লেখা পাঠানোর মানে বুঝতেই পারছেন।
NBTর— নানা ঝামেলা— ওদের Translator আগে থেকেই Select করা থাকে। ওদের Translatorদের প্যানেলে নাম লেখাতে হয় ইত্যাদি। আমি কিন্তু দুগ্গালের সঙ্গে কথা না বলে হাল ছাড়ছি না। দেখুন শেষ পর্যন্ত কি হয়।
আপনার চিঠির জবাব— লেখার সঙ্গেই পাঠাবো ভেবেছিলাম।
আপনি কেমন আছেন? দশগছছা কোন পত্রিকায় বেরুচ্ছে?
আশা করি সপরিবার সানন্দে আছেন।
এখানকার বন্ধুমহলে আপনার চর্চা হয়। পুজোর আগে আপনি পাটনায় আসছেন না বোধ হয়। নমস্কার গ্রহন করুন। ইতি—
রেনুজী

এই চিঠির অন্যতম উল্লেখযোগ্য অংশ শঙ্খ ঘোষের প্রসঙ্গ। সেই প্রেক্ষিত বোঝার জন্য সুবিমলকেই উদ্ধৃত করা যাক, ‘রেণু, সেলাম রেণু’ বই থেকে—
“শ্রীশঙ্খ ঘোষ ও নির্মল্য আচার্য সম্পাদিত অরুণা প্রকাশনী, কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘সতীনাথ গ্রন্থাবলী’ প্রথম খণ্ড বেরিয়েছে ১৯৭৩-র গোড়ার দিকে। এর আগে ‘সতীনাথ স্মরণে’ নামক সংকলন গ্রন্থ বেরিয়েছে, সম্পাদনা করেছেন শ্রীসুবল গঙ্গোপাধ্যায়। সতীনাথের ওপর রেণুজি একটা পার্সোনাল প্রোজ ‘ভাদুড়িজি’ লিখেছিলেন ওই সংকলন গ্রন্থে। ‘সতীনাথ গ্রন্থাবলী’-তে সম্পাদকদ্বয় রেণুর লেখার অংশবিশেষ ব্যবহার করেছিলেন প্রসঙ্গত। সতীনাথের এত কাছের মানুষ হওয়ায়, শ্রীশঙ্খ ঘোষ সতীনাথ সম্পর্কিত আরও তথ্য এবং ছবির জন্য রেণুকে পত্র দেন। এবং এই সময়, ১৯৭২-এ ‘এবং’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিনে সতীনাথ সম্পর্কে আমার একটি লেখা বেরোয়, যা আমাকে শ্রীশঙ্খ ঘোষের কাছে নিয়ে যায়— সেই প্রথম। আমার কাছ থেকে রেণু সম্পর্কে কিছু খোঁজখবর নেন, তাঁর লেখা, উপন্যাস।
একদিন সন্ধ্যের দিকে, কলেজস্ট্রিটে সিগনেটের কাউন্টারে শ্রীশঙ্খ ঘোষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় আকস্মিক। উনি তখনই রেণুর নামে একটি চিঠি লিখে দেন— লেখা এবং সতীনাথের চিত্র— যদি কোনো সংগ্রহে থাকে। পরদিন আমার পাটনায় যাবার কথা ছিল, কিন্তু শেষাবধি যাওয়া হয়নি। সুনীল, যিনি রেণুর ‘কিতনে চৌরাহে’ রাজকমল চৌধুরির ‘মুক্তি প্রসঙ্গ’ কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ এঁকেছিল— তার মারফৎ পাটনায় পাঠাই। এবং সুনীলের হাত দিয়েই রেণু শ্রীশঙ্খ ঘোষকে চিঠি দিয়েছিলেন— আমি তা পৌঁছে দিই।
কিন্তু, রেণু লেখা তৈরি করে উঠতে পারেননি। সেই সময় অসুস্থ ছিলেন, হাসপাতালে চেক-আপ ইত্যাদি করাতে হয়। সিরোসিস ধরনের হয়েছিল।”

ফণীশ্বরনাথ রেণু মারা যান ১৯৭৭ সালের ১১ এপ্রিল। খবরের কাগজে প্রকাশিত তাঁর অসুস্থতা ও মৃত্যুসংবাদের বহু কাটিং সুবিমল সযত্নে সংরক্ষণ করেছিলেন। ওঁর ডাইরিতেও রেণুর মৃত্যু-পরবর্তী ঘটনাবলির বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে। প্রাসঙ্গিক অংশগুলি উদ্ধৃত করা হল—
১২ এপ্রিল ১৯৭৭
…রেডিয়োয় আজ সকালে খবরে বলেছে— রেণুজী কাল রাত্রে পাটনা হাসপাতালে মারা গেছেন। শুনেই মনটা সঙ্গে সঙ্গে বিমর্ষ হয়ে গেল। অপারেশান হয়েছিল শুনেছি, এবং তারপর প্রায় অচৈতন্য অবস্থায় তাঁর দিন কেটেছে। কিন্তু, এত তাড়াতাড়ি উনি আমাদের ত্যাগ করে যাবেন ভাবতে পারিনি। মনটা সারাদিন ভারাক্রান্ত রইলো, আরও বিষণ্ণ বোধ করছিলুম এই কারণে যে তখন ১টা লম্বা ছুটি নিয়েছিলুম, চলে গেলে বোধহয় শেষ সময়টা রেণুজীর কাছাকাছি থাকতে পারতুম। কেবল, সংসারের ঝামেলার জন্যই যাওয়া হলো না, তখন গেলেই ভালো হত।
তাছাড়া, সেদিন টাকাটা পাঠালুম, সেটাও সম্ভবত হাতে পৌঁছয়নি। মা’র চিঠি পেয়েছি, রেণুজীর কথা রেডিয়োয় রোজ, বলছেন— একবার এসে দেখে যাও। কি যে ভুল হয়ে গেল।
হৃষীকেশ মুখো এসেছিল অফিসে। গতকাল ওর অফিসে সাক্ষাৎ পাইনি, ‘অধুনা সাহিত্য’ বেরিয়েছে। এ সংখ্যায় লেখার জন্য পীড়াপীড়ি করলো। দেবো। ও চলে যাবার পর রেণু’র সম্পর্কে ১টা পার্সোনাল প্রোজ লিখতে বসলুম— এবার নিশ্চয়ই প্রয়োজন পড়বে। একটু বাদে প্রভাত চৌধুরী, শ্যামল রায় এলেন— শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় পাঠিয়েছেন। রেণু’র সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য দিতে হবে। ছবি, তাঁর সম্পর্কে লেখা, তাঁর গল্প এবং অন্য কিছু। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে telephone যোগাযোগ করলুম। ঠিক হলো।…
বিশ্ববাণীতে গিয়ে ‘তিসরী কসম’ আনলুম। টাকাটা দিল বটে, তবে দেরীতে। রাস্তায় উৎপল বসু’র সঙ্গে দেখা। সন্দীপন কাল বলেছিল চলে গেছে। রেণু’র সম্পর্কে বললেন, তাঁর জীবন যে এমন adventurous ছিল জানতুম না। উৎপল সপরিবারে south এ আছে। Dowden এর সাথে Januaryতে দেখা হয়েছে। আবার যেতে পারে। Freelance করছেন পুরোপুরি। বেশ মোটা হয়েছে। মুখে চুরুট তার।
১৩ এপ্রিল ১৯৭৭
…আজ আনন্দবাজার, যুগান্তর, অমৃতবাজারে রেণুজীর মৃত্যুসংবাদ ছাপা হয়েছে।
অমৃতে ছুটীর পরে গিয়ে দেখি শ্যামল গঙ্গো নেই, কমল চৌধুরীকে দিয়ে আসি। পরদিন telephone করতে বলেন। ছবি এবং রেণুজীর ‘ওহে ক্যালকাটা’ লেখাটা ২/১ দিনের মধ্যে দেবো।…
১৪ এপ্রিল ১৯৭৭
লতিকা বৌদিকে একটা চিঠি দিলুম। দেয়া প্রয়োজন। আমার অপারগতা জানিয়েই চিঠি দিলুম। শেষ সাক্ষাৎ আমার হলো না। রেণুজীর আত্মার শান্তি কামনা করে চিঠি দেয়া।…
ফণীশ্বরনাথ রেণু-র প্রসঙ্গে এখানেই ইতি টানা যাক। পরের চিঠিটি ইংরেজিতে, রাজকমল চৌধুরীর (১৯২৯-১৯৬৭) লেখা। রাজকমল, অকালপ্রয়াত কবি ও সাহিত্যিক, হাংরি আন্দোলন থেকে প্রেরণা নিয়ে শুরু করেছিলেন হিন্দি ‘ভুখী-পীঢ়ী’ পত্রিকা। বেশ-কিছুদিন কলকাতায় কাটানোর পর, পাটনায় বসবাস শুরু করেন। যুক্ত ছিলেন ‘ভারত মেল’ সংবাদপত্রের সঙ্গে। তাঁর লেখা একাধিক হিন্দি চিঠি থাকলেও, ইংরাজি এই একটিই।
Rajkamal Chowdhury
Bharat Mail (Bi-Weekly)
Patna-1
8/1/64
Dear Shri Basak,
I expected a reply from you, and the publications of Hungry Generation from Shri. H. Dhara. Please let me know when are you coming over to Patna, and assure me that you will bring those publications with you.
How and where is Shri. Shakti Chattopadhyaya? Tell him that I met him a few times on Prabhas Babu’s table in Rupa & Co., and he was to give me his book “KUYOTALA”, by the could not.
Let me know about your own writings and studies.
With best new year wishes,
Yours sin.
RKC. 8/11/14

H. Dhara হলেন হারাধন ধাড়া ওরফে দেবী রায়। রাজকমল সম্ভবত বাংলা লিখতে অক্ষম ছিলেন, তাই ইংরাজিতে চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু বাংলা পড়তে (বলতেও কি?) সম্ভবত পারতেন, নইলে হাংরি জেনারেশনের দলিলপত্র ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘কুয়োতলা’ পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হতেন না। কলকাতার সাহিত্যজগতের সঙ্গে হিন্দি সাহিত্যিকদের তৎকালীন যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই সূত্রে।

তৃতীয় চিঠিটি রবি বর্মার। তিনি ছিলেন কেরালা থেকে প্রকাশিত হিন্দি পাক্ষিক ‘যুগপ্রভাত’-এর সম্পাদক। চিঠিটি উল্লেখযোগ্য একটিই কারণে। রবি বর্মা বাঙালি নন, কিন্তু সুবিমলকে চিঠি লিখছেন বাংলাতেই। শব্দচয়ন ও অক্ষরের ছাঁদে হিন্দির প্রভাব স্পষ্ট। হস্তাক্ষরও আড়ষ্ট। তারপরও, তাঁর এই প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়।
16-7-66
প্রিয় ভাই সুবিল,
পত্রের জন্য ধন্যবাদ। গল্প ‘যুগপ্রভাতে’ প্রকাশিত হইবেই।
সমর ও মলয়ের ‘আমার ভিয়েৎনাম’ ও হিন্দী ‘जखम’ প্রাপ্ত হইলো। ‘जखम’ এর সমালোচনা ‘যুগপ্রভাতে’ যথাসময়ে বেরুবে।
হংরী জনারেশনের একটি পরিচয়াত্মক লেখ লিখবার ইচ্ছা। সামগ্রী আমার কাছে আছে। সময়াভাবে কায়রূপে পরিণত হইলো না।
‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ অবশ্য আমাকে পাঠাইবেন
আশা করি সানন্দ আছেন
স্নেহাধীন
আপনার
রবি বর্মা
‘সমর’ প্রকৃতপক্ষে সমীর রায়চৌধুরী, ‘আমার ভিয়েৎনাম’ তাঁর কাব্যগ্রন্থ। মলয় রায়চৌধুরীর ‘জখম’ কাব্যগ্রন্থটি হিন্দিতেও অনূদিত হয়েছিল। প্রতিদ্বন্দ্বী— সুবিমল বসাক সম্পাদিত পত্রিকা।
এ ছাড়াও, সুবিমলের সংগ্রহে প্রচুর হিন্দি চিঠি রয়েছে, বিভিন্ন সাহিত্যিকের লেখা। পাঠের অপারগতা হেতু সেগুলি এখনও উদ্ধার করা যায়নি। গেলে, হয়তো বাংলার সঙ্গে বহির্বঙ্গের আদানপ্রদান সম্পর্কে আরও বিভিন্ন দিক উঠে আসবে। অনুবাদক হিসেবেও হিন্দি ভাষার সাহিত্যিকদের সঙ্গে সুবিমলের যোগাযোগ ছিল নিবিড়। তা অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ…
(ডায়েরি ও চিঠির বানান অপরিবর্তিত)
ছবি সৌজন্যে: তন্ময় চক্রবর্তী




