এলোমেলো কথা কিছু, জীবন আসলে সেইসব কথার কোলাজ। এই ট্র্যাপিজের খেলা, এই মুখের রং মুছে ফেললেই চাপা কান্নার বিষাদঅপেরা। সিনেমার খসড়ার মতো অগোছালো, সার্কাসের মতো প্রস্তুতি-অপ্রস্তুতির মঞ্চমহড়া। মহড়া দিতে দিতেই অর্ধেক জীবন পার হয়ে যায়, তারপর সঠিক লাফটা দিতে আমরা শিখে যাই ঠিক। শিখে যাই খেলা দেখানোর মন্ত্রগুপ্তি! এই সামান্য জীবন, না পারতে পারতে একদিন হঠাৎই একটু পেরে যাওয়া, এটুকুই তো বেঁচে থাকা। একটা নিটোল সার্কাস।
একটি ন’বছরের ছেলে জানে, সে লাফটা দিতে পারবে না। ফেব্রুয়ারির দার্জিলিং, লম্বা লাইনে ছ’নম্বরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা দেখছে, তাকে ওই ছয় বাই চার কাঠের স্ক্রিং বোর্ড লাফিয়ে পার হতে হবে। ‘আমি জানি আমি পারব না। আমার প্রচণ্ড ভয় করছে।… আমি হাঁদার মতো দৌড়ে কোনোমতে লাফ দিলাম।’
ছেলেটা সেদিন পারেনি, কিন্তু পরে একদিন পেরেছিল। সেই যে লাইনের পিছনে সেদিন ছেলেটা ফিরে গিয়েছিল পাছায় হরদীপ সিংয়ের থাপ্পড় খেয়ে, সেই ছেলেটা পরে একদিন বুঝেছিল, সে ঠিক পারবে। যেভাবে অনেকটা বড় হয়ে যাওয়ার পর একদিন ছেলেটা স্ত্রীকে বলে, আমি কোনওদিন খারাপ কাজ করব না। আমি ভাল কাজ করব। ছবিতে অভিনয় করার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে গ্রামে থেকে ব্লাড ডিসেন্ট্রি হয়ে যায়, সে প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে বলে, সে বাড়ি চলে যাবে। পারবে না অভিনয় করতে। তারপর আয়নায় নিজেকে দেখে। সিদ্ধান্ত নেয়, সে করবে কাজটা। কারণ ততদিনে চরিত্র আর সে একাকার। কোথায়ই বা পালাবে! সে তো শিল্পী দিনের শেষে!
আরও পড়ুন : কলকাতা নয়, ‘ক্যালকাটা’-কে ভালবাসতেন প্রীতিশ নন্দী! লিখছেন অঞ্জন দত্ত
ছেলেটার নাম, বা লোকটার নাম অঞ্জন দত্ত। আমাদের কাছের নাম, ভালবাসার নাম। তাঁর আকাঁড়া আত্মজীবনীটি পড়ে লিখতে বসে তাই একটু একটু তোতলাতে হয়। নৈর্ব্যক্তিক থেকে এই বই সম্পর্কে কিছু লেখা হয়তো মুনশিয়ানার পরিচয়। কিন্তু এই আত্মজীবনীর প্রতিটি অক্ষর আদতে বেপরোয়া। শিকড়ে গাঁথা, কিন্তু বোহেমিয়ান ঘোড়ার মতো। অঞ্জন দত্তকে আমরা যেভাবে চিনতে চাই, সেভাবে তিনি নিজেকে চেনাবেন না। চেনাবেন তাঁর নিজের ছন্দে। জীবন, ওপর-ওপর দেখলে আদতে সময়ানুক্রমিক, কিন্তু ক্রম তো ঘেঁটে যাবেই। স্মৃতি কখনও ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। কখনও কোনও বৃত্ত সম্পূর্ণ হতে সময় লেগে যাবে অনেকদিন।

অঞ্জন দত্ত-র ‘চলো লেট’স গো’ যাঁরা দেখেছেন, যাঁরা দেখেছেন ‘দত্ত ভার্সেস দত্ত’, তাঁরা জানেন, সেইসব সিনেমার আখ্যানের গতিবিধি ঠিক চেনা ছন্দে এগোয় না। সময় লাফায়, ওই স্ক্রিং বোর্ডের ওপরের লাফের মতো, সেসব ছবির ন্যারেটিভে। দে’জ পাবলিশিং প্রকাশিত ‘অঞ্জন নিয়ে’ বইটা আদতে অনেকগুলো লাফের সমগ্র। যেমন আমরা অনেকটা পরে জানতে পারি, দার্জিলিংয়ের সেন্ট পলস স্কুলের হোস্টেলে যে ছেলেগুলি শারীরিকভাবে নিগ্রহ করত ছেলেটাকে, ছেলেটা তাদের একজনকে একদিন ঘুরিয়ে একটা ঘুষি মেরেছিল।
জীবন আসলে কোনও উপন্যাস নয়। অঞ্জন দত্ত বইয়ের ব্লার্বে লিখছেন, ‘আমার জীবন অনেকটা— অনেকটা কেন, প্রায় পুরোটাই গপ্পের মতো।’ সেই গল্প আমাদের জানা গোল গল্পের ছকে মোটেও এগোয় না। বলছেন বারবার, জীবনটা সার্কাস। পাঠকের কাছে বারবার প্রশ্ন ছু়ড়ে দিচ্ছেন, ‘কেন বলছি জীবনটা সার্কাস বুঝতে পারছেন?’ কিন্তু সার্কাস নিটোল নয়। এই বাঘের খেলা, তো এই ট্র্যাপিজ শুরু। তাই গল্প হলেও, তা কখনও এই সময়ে দাঁড়িয়ে, কখনও হঠাৎ পিছিয়ে যায় অনেকটা।
অঞ্জন দত্ত বলেন সেই কলকাতার গল্প, যে কলকাতায় বাঁচতেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। শ’বার থেকে বেরিয়ে তিনি অঞ্জন দত্তর থেকে তিরিশটা টাকা নিয়ে উঠে পড়ছেন ট্যাক্সিতে। আশীর্বাদ করছেন, ‘বড় হয়ে আল পাচিনো হও।’ এই আশীর্বাদ সেই কলকাতায় করা যেত। সেই কলকাতায় এক তরুণের নাটক দেখে উৎসাহ দিতে দ্বিধা করতেন না ধরণী ঘোষ ও শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়রা। সেই কলকাতায় থাকতেন কফিহাউসের কিংবদন্তি রাজা চট্টোপাধ্যায়রা, যিনি নাকি, ব্যাঙ্কের চেয়ে চেনা মানুষকে বিশ্বাস করতেন বেশি টাকা জমা রাখার জন্য। সেই তিনি ধূপকাঠি কানের পাশে গুঁজে রাখতেন, জিজ্ঞেস করলে বলতেন, ‘চারিদিকে যা দুর্গন্ধ!’

সেই কলকাতায় আসতেন টাংক্রেড দর্স্ত, যিনি ছেলের মতো করে ভালবেসে ফেললেন অঞ্জন দত্তকে, ডেকে পাঠালেন জার্মানিতে। সেই জার্মানিতে গিয়ে যখন অনটনে থেকে চূড়ান্ত অসুস্থ হয়ে পড়লেন অঞ্জন, তখন সেই টাংক্রেড ছেলের জামাকাপড় দিয়ে দিচ্ছেন অঞ্জনকে। সেই টাংক্রেডের সঙ্গে শেষবার অঞ্জনের দেখা হচ্ছে মিউনিখ চলচ্চিত্র উৎসবে। মৃণাল সেন অঞ্জন দত্তর সঙ্গে একপেগ রাম খেয়ে বলে ফেলছেন, আর তিনি সিনেমা বানাতে হয়তো পারবেন না। অঞ্জন তাঁকে ওসকাচ্ছেন, যদি ত্রিকোণ প্রেমের গল্প নিয়ে একটা ছবি তিনি করেন! দশ বছর বাদে সেই মৃণাল সেন বানিয়ে ফেলছেন ‘আমার ভুবন’। ফ্রাঞ্জ হাভার ক্রোয়েৎস অঞ্জন দত্তর করা তাঁর নাটকের প্রযোজনা দেখে মারমুখী হয়েছিলেন, সেই ক্রোয়েৎস অঞ্জন দত্তর সঙ্গে দিঘার সমুদ্র দেখে উদ্বেল হয়ে আর ফিরতে চাননি। বাদল সরকার অঞ্জন দত্তকে হরি ঘোষ স্ট্রিটের মাঝে ছেড়ে দিয়ে সারাদিন কলকাতায় ঘুরে খুঁজে নিতে বলছেন তাঁকে।
অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ক্লেটন রজার্স, ছন্দা দত্তর সহপাঠী, যেদিন মারা যাচ্ছেন, সেদিন শুটিংয়ের আউটডোরে গভীর রাতে হঠাৎ বাইরে দরজার ধাক্কা শুনে বিরক্ত হয়েছিলেন অঞ্জন দত্ত, সকালে উঠে দেখেছিলেন, খোয়া গেছে একটি সবুজ পাথর, যা তিনি কাছে রাখতেন সবসময়। সকালে উঠে জানতেন পারেন, মারা গেছে নেশাখোর ক্লেটন, যার নেশা ছাড়ানো যায়নি কোনওভাবেই। লোয়ার সার্কুলার রোড গোরস্থানে নিজের বাবাকে কবর দেওয়ার সময় যিনি অঞ্জন দত্তর কাছে অনুরোধ করেন, যদি তিনি অঞ্জনের সেক্রেটারি হতে পারেন! অঞ্জন স্বভাবতই সেই অনুরোধ রাখতে পারেননি। এই চাপা দুঃখ কি একা অঞ্জনের? ক্লেটনের জন্য পাঠকও একটু দুঃখ পাবেই। ফ্লুরিজে খানিক তাচ্ছিল্যেই আলাপ হওয়া খ্রিস কীভাবে হঠাৎ বন্ধু হয়ে গেল অঞ্জন দত্তর, এমনি এমনি তো নয়, গোয়েন্দার মতো তাঁকে খুঁজেছিলেন অঞ্জন, গোয়েন্দাকাহিনি তো তাঁর প্রিয়। দার্জিলিংয়ে এখন যেখানে রিংক মল, আর একটু এগিয়ে গেলেই বটকৃষ্ট পালের বাড়ি, উল্টোদিকে ছোট্ট রামজা বার, সেই রাস্তার নাম ছিল রানি ঘংবা রোড। ওই রিংক মলের পাশে এখনও রয়েছে জোয়িস পাব। ওই জোয়িস পাবের জায়গায় আগে নাকি ছিল চপ-কাটলেটের দোকান ‘দিলখুশ’। অনেকটা হাতিবাগানের ‘দিলখুশা কেবিন’-এর মতোই না, নামটা? তা সেই দিলখুশ ছিল পুরন ঘংবার বাবার। আর পুরন ঘংবা ছিলেন জোয়িস পাবের মালিক। পুরন ঘংবা-র প্রথম স্ত্রীয়ের ছেলে জোয়ি, যে তার সঙ্গে থাকত না। কলকাতায় ট্রিংকাসে বাজাতে বাজাতে আবার প্রেম, ফিরে যাওয়া দার্জিলিং, সেই জোয়ির নামে পাব। সেই পুরন ঘংবা অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রায়-শত্রু ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায় অঞ্জন দত্তর, কারণ পুরনের থাকার জায়গার বন্দোবস্ত হয় ঋতুপর্ণরই যোধপুর পার্কের ফ্ল্যাটে। সেই পুরন মারা যাওয়ার আগে বলেন, তাঁর আকাশে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। পুরনের শেষ কাজে যাননি অঞ্জন দত্ত। লিখেছেন, ‘বন্ধু আমার আকাশে। আমি গিয়ে কী করব?’
অঞ্জন দত্তর এই জীবন বন্ধুত্বের।

এই জীবন বাদল সরকার, মৃণাল সেনের যেমন, তেমনই লিন্ডসে অ্যান্ডারসনের, কার্লো লিজানির, সিডনি লুমে-র, বা রবার্ট ডে নিরো-র, ভেনিসে একই উৎসবে তিনি পেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার, আর অঞ্জন দত্ত নবাগত হিসেবে অন্য একটি পুরস্কার। ডি নিরো আর অঞ্জন দত্ত হাত মিলিয়েছিলেন। এই জীবন অঞ্জন দত্তর ছোটবেলার শহর দার্জিলিংয়ের বিকাশের, যে অঞ্জন দত্তর চোখে চোখ রেখে বলেছিল, গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন তার অস্তিত্বের লড়াই। বলেছিল, সত্যিই কি তুমি আর আমি বন্ধু হতে পারি? না দিনের শেষে আমি তোমার বেয়ারা? আবার এই জীবন ছন্দা দত্তর ছোটবেলার শহর, বর্মার টাউনজি-র মাতাল, জুয়াড়ি, অথচ অনেকটা বড় মনের মানুষ, উইস্টন আর্চারেরও।
এই জীবন মার খাওয়ার, আহত হওয়ার, রক্তাক্ত হওয়ার। ছোটবেলায় সেন্ট পলসে বেতের বাড়ি খাওয়া হোক, বা জেলায় অনুষ্ঠান করতে একটি পয়সাও না দিয়ে যারা বন্দুক দেখিয়ে হুমকি দিল, তাদের খিস্তিই হোক— অঞ্জন দত্তর এই জীবন বারবার আঘাত পেয়ে পেয়ে এগিয়ে যাওয়ার। অভিনেতা তাকে কখনও মুখের ওপর দাঁড়িয়ে বলতে পারে, ‘আপনি খারাপ মানুষ’, কিন্তু তাতে কিছুই শেষ হয়ে যায় না। এই জীবন ক্ষমারও, স্কুলের সেই অত্যাচারী ছেলেগুলোকে তিনি ক্ষমা করে দেন।


এই জীবন আদ্যন্ত প্রেমের। যে প্রেমের জোরে বার্লিন থেকে অঞ্জন দত্ত চলে আসতে চেয়েছিলেন একটা চিঠি লিখে। এই জীবন ছন্দা দত্তর। যিনি ভালবাসতেন ক্লিফ রিচার্ডের গান, নিল ডায়মন্ডের গান। যাঁর সঙ্গে জোর করে বিয়ে দেওয়া হচ্ছিল একজনের, কিন্তু প্রেমিক-প্রেমিকা মিলে সেই পুরুষটিকে এই কলকাতা শহরের এক রেস্তরাঁয় বসে বুঝিয়ে বশে আনা গিয়েছিল। প্রেমে একটু বেশি মায়া পাওয়ার জন্য যাঁকে অঞ্জন বলেন, তিনি পালিত সন্তান। যার সঙ্গে রোম ঘুরে বেড়ান অঞ্জন, এক মধ্যবয়সি দম্পতির মতোই, আবার সিসটিন চ্যাপেল দেখে একা কেঁদে ফেলেন অঞ্জন। ইতালিতে গিয়ে চাইনিজ খান, হুইস্কি দিয়ে। এই জীবন সেই প্রথম প্রেমিকার, টেলিফোনের এপার থেকে হাঁটু মুড়ে অনুরোধ সত্ত্বেও যে থাকেনি, বহু বছর পর, অঞ্জন দত্ত বিখ্যাত হয়ে যাওয়ার পর তার সঙ্গে স্বামী-সহ দেখা হওয়ায় অঞ্জন দত্ত তাঁর কালো চশমাটা না খুলেই, হাসিমুখে কেবল বলে যান, ‘আমি ব্যস্ত আছি।’
এই জীবন সিনেমার। যে সিনেমার জন্য বার্লিন থেকে ফিরে আসা। যে সিনেমা সিনেমা দেখতে-দেখতে শেখা। ‘লরেন্স অফ আরাবিয়া’ থেকে ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’। ‘সেই আরণ্যক’ বলে একটি টেলিছবির শুটিং করতে গিয়ে একটি তেড়ে আসা হাতিকে ক্যামেরায় ধরে ফেলেন অঞ্জন। হাজার ঝড়ঝঞ্ঝার মধ্যেও হয় ‘৫৪ মাইলস’ টেলিফিল্মের শুটিং। বারবার তিনি ভাবেন, তাঁর শিক্ষক বাদল সরকারকে কি তিনি নির্দেশ দিতে পারতেন চলচ্চিত্র নির্দেশক হিসেবে? ‘শিল্পী’-তে অভিনয় করতে গিয়ে তাঁত বোনা শেখা, অসুস্থ হয়ে পড়া, তারপরেও কিছুতেও ওই গ্রামের মায়া কাটাতে না পারা, ‘আরণ্যক’ টিভি সিরিজে অভিনয় করতে গিয়ে টাট্টু ঘোড়ায় তাঁকে তুলে দিয়ে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর বলা, লো অ্যাংগল শটে ঘোড়াকে দেখতে লাগবে ডাইনোসরের মতো। প্রযোজকের জন্য ভাল চিত্রনাট্যর ছবি ‘চৌরাস্তা’ খারাপ হয়ে যায়, অলিভার টুইস্টের হিন্দি ‘রাজু’, ইরফান খান-সহ বিবিধ অভিনেতারা যেখানে ছিলেন, তা বন্ধ হয়ে যায় প্রযোজকের দলাদলিতে। ইউনিটের সঙ্গে মনোমালিন্য হলে তাঁকে ছাড়া পাঁচটা শট নেওয়া হয়ে যায়, অভিমানে অঞ্জন দত্ত একা ফিরে আসেন দার্জিলিং থেকে। এই জীবন গানের। কবীর সুমন এই জীবনে রয়েছেন। রয়েছে এই শহরে হঠাৎ শুনে ফেলা বব ডিলান। কুড়িটা গান দিয়ে শুরু হওয়া জীবন ক্রমশ ঝলমলে হতে থাকে। গান গাইতে গিয়ে মনকেমন হয়, মাঝরাস্তায় ঝগড়া হয় সহকারীর সঙ্গে। এথেন্সে একজন রাস্তা আটকে বলে যায়, বেলা বোস গানটা ভালই লিখেছেন। এই জীবন নাটকের। সেই ছোটবেলায় প্রথম নাটকে অভিনয় করে সারারাত মুখের রং না মোছার, ভোরে ধীরে ধীরে কাঞ্চনজঙ্ঘা ফুটে উঠতে দেখার। ‘মারা সাদ’ থেকে ‘কিং লিয়র’, ইবসেনের ‘ডলস হাউস’ থেকে টাংক্রেডের নাটকে উলফ বিয়ারম্যানের গান, যিনি সেই ভাগ হওয়া দুই জার্মানিতেই প্রায় অপাঙ্ক্তেয় হয়ে ছিলেন, বাদল সরকার, সহ-অভিনেত্রী ছন্দা দত্ত, বার্লিনের থিয়েটারে পিটার স্টাইনের করা চেখভের ‘থ্রি সিসটার্স’ নাটকে কেটে আনা গাছ, জাঁ জেনের ‘ব্যালকনি’-তে উলঙ্গ অভিনেতাদের দেখা— এই জীবন ঠাসা অভিজ্ঞতায়। রঙে, বেরঙে। তবেই না সার্কাস! সার্কাসও তো দিনের শেষে পারফরমেন্স, ত্রুটিবিচ্যুতি-সহ। তাই সেই যৌবনে, এমার্জেন্সির সময় উৎপল দত্তর ‘অশান্ত ভিয়েতনাম’ নাটক যখন করতে যান অঞ্জন দত্তরা, দোর্দণ্ডপ্রতাপ উকিল বাবা ‘পবি’ ও মেসোমশাই ‘লর্ড’ সুরা-সহযোগেই পাহারা দিচ্ছিলেন উইংসের ধারে। মার্কিন সৈন্যের অভিনেতা ড্রেসের অভাবে খাকি উর্দি পরে স্টেজে ঢুকতে গেলে তাঁরা আটকে দেন, পুলিশ ভেবে।
এই জীবন বাদল সরকার, মৃণাল সেনের যেমন, তেমনই লিন্ডসে অ্যান্ডারসনের, কার্লো লিজানির, সিডনি লুমে-র, বা রবার্ট ডে নিরো-র, ভেনিসে একই উৎসবে তিনি পেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার, আর অঞ্জন দত্ত নবাগত হিসেবে অন্য একটি পুরস্কার। ডি নিরো আর অঞ্জন দত্ত হাত মিলিয়েছিলেন। এই জীবন অঞ্জন দত্তর ছোটবেলার শহর দার্জিলিংয়ের বিকাশের, যে অঞ্জন দত্তর চোখে চোখ রেখে বলেছিল, গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন তার অস্তিত্বের লড়াই।
এই জীবন বাবার সঙ্গে সম্পর্কের হাজারও ওঠানামার। বাবাকে ভাল হাসপাতালে ভর্তি করতে না পারা, বাবার দেনা, বাবার রইসি মেজাজ, মুখে পাইপ, অভিনেতা হওয়া নিয়ে দ্বন্দ্ব, বাবার মৃত্যুদিনে শো করতে যাওয়া— সব মিলিয়ে একটা আলাদা সিনেমা। সার্কাসের একটা আলাদা খেলা যেন। সেই খেলা বদলে যায় গোডোর সঙ্গে। নীল দত্ত যখন দিল্লিতে চাকরি করতে করতে জানান অঞ্জন দত্তকে, গান গাইতে চান, অঞ্জন দু’হাত বাড়িয়ে দেন। ওই যে, বৃত্ত সম্পূর্ণ হতে সময় লাগে।


এই জীবন রাজনীতির সঙ্গে বোঝাপড়ার। নকশালদের রেখে যাওয়া ট্রাঙ্কের সব বই পুলিশের জন্য পুড়িয়ে দিতে বলা হয় অঞ্জন দত্তকে। মার্কসের কবিতা থেকে চে গুয়েভারার ‘বলিভিয়ান ডায়েরি’ তিনি পোড়ান না, কারণ সেগুলো সাহিত্য। বাকিগুলোও, মাওয়ের পুস্তিকা থেকে ‘দেশব্রতী’-র সংখ্যা কেবল কেরোসিনে ভেজে। পুলিশ কিন্তু আসে না। তার পরে, সেই নকশালরা চাইলেও, অঞ্জন আর বইগুলো ফেরত দেন না। যে একবার বই পোড়াতে বলে, সে কীভাবে বই ফেরত চাওয়ার দাবি জানায়! একঝলকে মনে পড়ে ‘হারবার্ট’, বিনু হারবার্টকে বইপত্রর পাশাপাশি, তাঁর অজান্তেই দিয়ে গিয়েছিল একটা ডিনামাইট। বই ক্ষেত্রবিশেষে, ডিনামাইটের মতোই শক্তিশালী হতে পারে।
এই জীবন গন্ধের, স্পর্শের। তামাক থেকে ট্যালকম পাউডার থেকে বিদেশি পারফিউম থেকে ঘাম, কত মানুষের গন্ধকে ডকুমেন্ট করেছেন অঞ্জন, কত কাঁদতে-কাঁদতে আশ্রয় খোঁজার মতো করে জড়িয়ে ধরার গল্প। এই জীবন আদতে, রক্তমাংসের।
কলকাতা শহর বদলে যাচ্ছে দ্রুত। নিউ মার্কেট থেকে লোয়ার সার্কুলার রোড, বদলে যাওয়া রাস্তার নাম থেকে শহরের চরিত্র, সব পেরিয়েও অঞ্জন ডাক দেন, ‘আমার শহর বড্ডো মজার। রোজ উঠতে বসতে রাজনৈতিক নেতাদের গাল দিয়ে যাচ্ছেন। অথচ টুক করে ঢুকে পড়ুন ডেকার্স লেনে। চিকেন স্টু আর টোস্ট। গালাগালি ভুলে ভালো লাগবে। ভালো লাগবে সেই কলকাতাকে যেখানে শীতকালের ভোরবেলায় গড়ের মাঠে রুগ্ন ঘোড়াগুলো পক্ষিরাজের মতো লাগে। ভালো লাগবে সেই কলকাতাকে যেখানে বর্ষাকালে, সকালে টেরিটি বাজারে চীনে ব্রেকফাস্ট করলে,চারিদিকের নোংরামি মন থেকে হাওয়া হয়ে যাবে। গ্রীষ্মকালের ভ্যাপসা গরমে, মেট্রো গলির শ’বারে ঢুকে পড়ুন সন্ধেবেলা। সব বোকামি ভুলে যাবেন। আর যদি মদ্যপানে অরুচি থাকে তাহলে জাকারিয়া স্ট্রিট। ঘামতে ঘামতে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিরিয়ানি। আমার শহরে রাস্তার ফুটপাথে বই বিক্রি হয়, পুরোনো রেমন্ড শ্যান্ডলার। পুরোনো বেঠোভেনের রেকর্ড। সবই জানেন। কিন্তু শেষ কবে এসব উপভোগ করেছেন?’
অঞ্জন গোয়েন্দা গল্প ভালবাসেন। রুদ্র সেন ফিলিপ মার্লোর ভক্ত। ড্যানি ডিটেকটিভ এজেন্সির গোয়েন্দা সুব্রত শর্মা থাকে অঞ্জন দত্তর বাড়ির কাছেই, ডাক্তার লেনে। যে ডাক্তার লেনে অপূর্ব কাবাব পাওয়া যায়। কোন মাংসের? গোয়েন্দাগিরি করে জানতে হবে। কাছেই তালতলা থানা, যেখানে ‘প্রিয় বন্ধু’-র নায়ক অর্ণবের সেই দাদাকে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়ে প্রচণ্ড মারে। অঞ্জন এক গোয়েন্দার মতোই কলকাতার রহস্য বুঝে নিতে বলেন পাঠককে তাই। চিনেপাড়ার ফিশ সুমাই থেকে ‘টুং নাম’-এর অপূর্ব শুয়োরের মাংস তাঁর প্ররোচনায় খুঁজে নেওয়াই যায়। শ’বারে পয়সা দিয়ে প্রতিবার চাট কিনে ঈষৎ স্থূল ও লম্বা গ্লাসে ঢেলে নেওয়া যায় রাম, যা বহুবছর প্রিয় মদ ছিল অঞ্জনের। কলকাতায় মিশে যায় তাঁর দার্জিলিং, কখনও বার্লিন। বর্ণময় রামধনুটা ঘিরে ফেলে গড়ের মাঠ। এমন জীবন এখনও কলকাতা শহরে আছে।
তাই অঞ্জন বইটা উৎসর্গ করেছেন তাদের, ‘যারা জানতে চায়’। এত খাপখোলা, এত হৃদয়ের, ‘পলিটিকাল কারেক্টনেস’ নামক তাসের দেশের নিয়মকানুন ভাঙা এই জীবনের দলিল তাই তোলা থাকুক তাকে। ধুলো নিশ্চয়ই জমবে না।
অঞ্জন নিয়ে। অঞ্জন দত্ত। দে’জ পাবলিশিং। ৫৯৯.০০



