গির্জানগর: পর্ব ৫

Representative Image

কলকাতার সিনাগগ

ভারতের সঙ্গে ইহুদিদের সংযোগের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় বাইবেলে। সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর ‘বুক অফ এস্থার’-এ পারস্যের সম্রাট জারক্সিস/Xerxes (আহাসুয়েরাস/Ahasuerus)-এর ফরমানের উল্লেখ আছে, যেখানে তিনি ইহুদিদের সম্পর্কে বলেছেন, তাঁরা তাঁর সাম্রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে আছে— ‘ভারত থেকে সুদূর ইথিওপিয়া অবধি।’ সম্ভবত বালুচিস্তানে ইহুদিদের বসতি ছিল, যা সেই সময়ে ভারতের অংশ ছিল। কিন্তু এদের মধ্যে কেউ বেঁচে ছিলেন কি না জানা যায় না। যখন আমরা ভারতীয় ইহুদিদের কথা বলি, তখন আমরা তাঁদেরই বোঝাই, যাঁরা অনেক পরে ভারতে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। ভারতে আগমনের ক্রম অনুযায়ী এদেরকে তিনটি স্পষ্ট ভাগে চিহ্নিত করা যায়। বেনে ইজরায়েল, কোচিনি ও বাগদাদি।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ‘মেথডিস্ট চার্চ’ হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশি উদ্বাস্তুদের আশ্রয়কেন্দ্র! পড়ুন : গির্জানগর পর্ব ৫

১৭৬০ সাল থেকে পারস্য উপসাগরীয় বন্দর বসরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যকেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত হতে শুরু হয়েছিল এবং বসরা ও বাগদাদ থেকে যে-সকল ইহুদি ওই অঞ্চলের ইংরেজদের বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাঁরা ধীরে-ধীরে ভারতে চলে আসেন। প্রথমে তাঁরা পশ্চিম উপকূলীয় বন্দর সুরাটে বসতি স্থাপন করেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে আলেপ্পো বাগদাদ এবং বসরা থেকে আগত প্রায় একশো জন ইহুদিদের নিয়ে আরবিভাষী ইহুদি বণিকদের এক কলোনি গড়ে ওঠে সুরাটে।

ব্রিটিশ প্রেসিডেন্সি হিসাবে কলকাতা এবং তৎকালীন বম্বের উন্নতি ঘটায়, বন্দর হিসাবে সুরাটের গুরুত্ব কমে যায় এবং ওখানকার ইহুদি বণিকেরা এ-সকল দ্রুত উন্নয়নশীল বাণিজ্যকেন্দ্রে চলে আসেন। ব্রিটিশদের দ্বারা উৎসাহিত হয়ে, বিশিষ্ট ইরাকি পরিবারগুলি—  যেমন সাসুন, এজরা, এলিয়াস, গাব্বে, আব্রাহাম, এরা বণিক হিসাবে অথবা লার্জ কটন, পাট এবং তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের মধ্যস্থতাকারী হিসাবে সফল হন। কিছু বাগদাদি ইহুদি আফিমের ব্যবসা করেও ভাগ্য ফিরিয়েছিলেন।

ইহুদিরা কলকাতায় এসেছিলেন মূলত ব্যবসার সূত্রে। মনে করা হয়, কলকাতায় আসা প্রথম ইহুদির নাম, শালোম বেন অ্যারন বেন ওবাদিয়া হাকোহেন। তবে তার আগে লিয়ন প্রাগার নামে একজন ইহুদি বণিক কলকাতায় এসেছিলেন বলে জানা যায়। শালোম বেন অ্যারন বেন ওবাদিয়া হাকোহেন সিরিয়ার আলেপ্পো থেকে বোম্বাই, সুরাট, কোচিন, মাদ্রাজ হয়ে কলকাতায় এসে পৌঁছেছিলেন ১৭৯৮ (মতান্তরে ১৭৯৭) সালে। তাঁর জামাতা মোজেস ডুয়েক হাকোহেন ছিলেন কলকাতার ইহুদি সমাজের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। ইনি কলকাতার ইহুদি সমাজের প্রথম সভাপতি, রাবাই এবং মোহেল (ইহুদি ধর্মীয় বিধি অনুযায়ী যিনি খৎনা করেন) ছিলেন।

কলকাতায় ইহুদিদের তিনটি সিনাগগ রয়েছে। নেভে শালোম, বেথ এল এবং মাগেন ডেভিড। এগুলির মধ্যে সবচেয়ে প্রথমে তৈরি হয়েছিল নেভে শালোম, পরে এটি ভেঙে ফেলা হয়, এবং ৯ এ, ইন্দ্র কুমার কারনানি স্ট্রিটের বর্তমান ঠিকানায় পুনর্নির্মিত হয় ১৯১২ সালে।  নেভে শালোমের ঠিক পাশেই রয়েছে সবচেয়ে বড় এবং দৃষ্টিনন্দন মাগেন ডেভিড সিনাগগ। এটি‌ নির্মাণ করেছিলেন ইলিয়াস ডেভিড এজরা, তাঁর পিতা ডেভিড এজরার স্মৃতির উদ্দেশ্যে। এছাড়া ডেভিড জোসেফ এজরা এবং এজেকিয়েল জুডাহ নামের দুই ইহুদির দ্বারা তৈরি হয়েছিল ‌পোলক স্ট্রিটের বেথ এল ‌ সিনাগগ। এগুলির বাইরে কলকাতায় আরও দু’টি ইহুদি উপাসনালয়ের অস্তিত্ব ছিল। একটি হল সদর স্ট্রিটের ‘শারে রাসোন’ এবং অপরটি হল ব্ল্যাকবার্ন লেনের ‘মাগেন আবোথ।’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে রেঙ্গুন থেকে আসা উদ্বাস্তু ইহুদিদের প্রার্থনার জন্য ব্যবহৃত হতো মাগেন আবোথ।

নেভে শালোম সিনাগগ

গির্জা, ‌মন্দির অথবা মসজিদের মতো সিনাগগের ও নিজস্ব নির্মাণ শৈলী রয়েছে। কলকাতার সিনাগগগুলিতে ঢুকলে তা স্পষ্ট ভাবে বোঝা যায়। কলকাতার প্রত্যেকটি সিনাগগে দু’ভাগে বসার  ব্যবস্থা রয়েছে, নীচের অংশে এবং সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠার পর গ্যালারির মতো নির্মিত অংশে। সিনাগগগুলির মূল দরজা দিয়ে প্রবেশ করার পর মুখোমুখি বিপরীত দিকের দেওয়ালে রয়েছে দরজা, প্যারোকেট (Parochet) নামে বিশেষ পর্দা দিয়ে ঢাকা দরজা গুলির আড়ালে রয়েছে ইহুদিদের পবিত্র গ্রন্থ ‘তোরাহ’ রাখার ব্যবস্থা। এছাড়া সিনাগগের কেন্দ্রে রয়েছে কিছুটা উঁচু মঞ্চের মতো স্থান, এই স্থানে প্রার্থনার সময়ে ইহুদি পুরোহিতরা বিশিষ্টদের নিয়ে দাঁড়াতেন।

এছাড়া বেথ এল সিনাগগে রয়েছে ‘মাতজা’ নামক রুটি বানানোর চুল্লি, পাসওভার পর্বে এই বিশেষ রুটির প্রয়োজন হয়,‌ বিভিন্ন ধর্মীয় আচারে যোগান দেওয়ার জন্য নির্মিত ওয়াইন তৈরির সেলারটিও এখনও রয়ে গেছে। এছাড়াও এই সিনাগগে রয়েছে ‘মিকভে’ নামক ধর্মীয়  রীতি অনুযায়ী স্নানের ব্যবস্থা।

ইহুদি প্রার্থনার সময়ে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম দশজন ইহুদি পুরুষের প্রয়োজন হয়, হিব্রু ভাষায় একে বলা হয় মিনিয়ান। বর্তমানে কলকাতা শহরে মিনিয়ানের জন্য ইহুদিরা অবশিষ্ট আছেন কি না জানা নেই। তবে তাঁদের তৈরি উপাসনালয়গুলি দেখতে গেলে প্রবেশের আগে দায়িত্বরত পরিচারকরা হাতে এগিয়ে দেন, মাথা ঢাকার জন্য বিশেষ টুপি ‘কিপা।

কলকাতা শহরের ইহুদিরা আজ প্রকৃত অর্থেই সংখ্যালঘু। তবে ঘিঞ্জি গলি, দোকানের পশরার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের সিনাগগ তিনটি শুধু ইহুদি ইতিহাসের সাক্ষী নয়, এর পাশাপাশি কলকাতা শহরের বহুমাত্রিক সংস্কৃতিরও অংশ।