সমাজ, সম্পর্ক, লড়াই
দেবী রায়ের সঙ্গে হাংরি আন্দোলনের সম্পৃক্তির তথ্য সুবিদিত। হাংরি বুলেটিনগুলির অধিকাংশেই প্রকাশক হিসেবে থাকত, হারাধন ধাড়া-র নাম। ‘দেবী রায়’ তাঁর ছদ্মনাম। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টাদের মধ্যে অন্যতম। সুবিমল বসাকের সঙ্গে তাঁর আলাপ ১৯৬৩ সালে, সুবিমল পাটনা থেকে কলকাতায় আসার পর। পরবর্তীকালে একটি স্মৃতিচারণে সুবিমল লিখছেন—
‘ছয়ের দশকের শুরুতে কফি হাউসের সিঁড়ি জানা ছিল, চিরকুট হাতে তুলে দিয়ে দেবী রায়ের সঙ্গে আলাপ, ধুতি শার্ট, বেকার, হাওড়ার কদমতলায় এক বস্তিতে বাস, কথাবার্তায় গ্রাম্য আন্তরিকতা। টেবিলে টেনে নিয়ে যায় হাত ধরে, সেখানে উৎপলকুমার বসু এবং পিটার অরলোভসকি। ‘মলয়ের বন্ধু, সুবিমল বসাক, পাটনা থেকে এসেছে।’ ক্রমে ক্রমে দেবী মারফত অন্যান্য বন্ধু-লেখকদের সঙ্গে পরিচয়।’
সুবিমলের সংগ্রহে থাকা চিঠিপত্রের মধ্যে, মলয় রায়চৌধুরী ছাড়া, সবচেয়ে বেশি বাংলা চিঠি সম্ভবত দেবী রায়েরই লেখা। বিপুল সেই পত্রগুচ্ছের মধ্যে থেকে সামান্য কয়েকটি আলোচিত হবে এই পর্বে। সমস্যা হল, চিঠিগুলির প্রেক্ষিত বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে, চিঠির বয়ানের অতিরিক্ত কোনও দলিল আমাদের হাতে নেই; কেন-না যে-চিঠিগুলি নির্বাচিত করেছি, সেই-সেই সময়কালে সুবিমলের ডায়েরি ফাঁকা বা বিক্ষিপ্ত।
৩১.১২.৬৩
একটা উপকার করবেন বিমল? ৩৬/৫, বেনেটোলা লেন (হরলালদার বাড়ীর পিছন দিকে— কলেজ স্ট্রীটের কাছে) শ্রীবানী প্রিন্টিং কোং— প্রেসের নাম। মালিকের নাম দেবকুমার দে। ১০ (দশটাকা) ওঁকে দিন এবং আমার হয়ে বলবেন সমীর রায়চৌধুরীর কবিতার বইটা এবার ছাপতে শুরু করুন, দ্রুত। আমি সামনের শনিবার সন্ধ্যায় ওঁর সঙ্গে দেখা করছি, আপনিও থাকবেন কফি হাউসের দরজায় ৫।।. নাগাদ। চিঠি পাওয়া মাত্র টাকাটা পৌঁছে দিন, তারপর আমি আপনাকে গিয়ে টাকা দেবো। অনুরোধটা রাখবেন।
বইটা প্রেসের জন্য কিছু দেরী হয়েছে, আরো দেরী হয়েছে আমার ব্যস্ততার জন্য। আর দেরী হবে না কেননা উপস্থিত আমার হাতে কোনো কাজ নেই। বহুদিন আমার কিছু লেখা হবে না।
আপনার হিন্দী matter রেডি রাখুন একবার শুনবো তারপর ঐ দিন-ই প্রেসে দিয়ে দেওয়া যাবে।
সমীর রায়চৌধুরীর কাব্যগ্রন্থ ছাপা শেষ হলেই আমার গল্পগ্রন্থ এবং মলয়ের কাব্যগ্রন্থ ছাপা শুরু হবে। এবং আপনারও…
চিঠি পাওয়া মাত্র যাবেন ওখানে, প্লীজ।
দেবী রায়
পু: manuscript প্রেসে আছে।
এসব কথা দ্বিতীয় ব্যক্তি যেনো না জানে। বইগুলি কাউকে না জানিয়ে ছাপা হচ্ছে দুম করে বের করা হবে।
আশা করি ‘কেন’ বুঝতে পাচ্ছেন।
সুবিমলকে লেখা দেবী রায়ের প্রথম চিঠি সম্ভবত এটিই। সম্বোধন ‘বিমল’ নামে— এই সম্বোধনে হাংরি বন্ধুদের মধ্যে মাত্র দু’জনই চিঠি লিখেছেন, তাও গোড়ার দিকে— মলয় রায়চৌধুরী ও দেবী রায়। বিমল, অর্থাৎ বিমল কুমার বসাক— সুবিমল বসাকের প্রকৃত নাম। তবে লেখালিখির ক্ষেত্রে, পাঁচের দশকের কয়েকটি গল্প ছাড়া, ‘সুবিমল বসাক’ নামটিই ব্যবহার করেছেন বরাবর। এই চিঠিতে সমীর রায়চৌধুরীর যে-কাব্যগ্রন্থের কথা বলা হচ্ছে, সেটির নাম ‘জানোয়ার’, প্রকাশ পায় ১৯৬৪ সালে।

দুপুরে, অফিসে
প্রিয় বিমল
তোমার চিঠি পেলুম। উৎপল (ও শৈলেশ্বর) এসেছিলেন। রবিবার মন্দ কাটে নি নদীর পাড়ে শুয়ে, গলা ভিজে ছিল কিছুটা। তাই আরো ভালো লাগছিল।
দেশে গিয়েছিলে? খবর নিয়ো। অর্থাৎ আমি শনিবার তোমার কাছে খবর নেবো।
ম্যাটার প্রেসে চলে গিয়েছে, সম্ভব হলে শক্তির লেখা পাঠিয়ে দাও। এক দিনেই পেয়ে যাবো।
মন খারাপ এখন। বুক-পিঠ ব্যথা— পায়ের গাঁট…
কাল ভোরে ঘুম ভেঙ্গে, ভীষণ শীত পাচ্ছিল। কিছুই পেলাম না। ছ’পাউন্ড ওজন কমেছে, খবর। চোখের কোনে কালি আরো স্পষ্ট। কোনো কিছুই, বোধহয়, ফেরৎ পাবো না। ফেরৎ পাই নি।
মলয়ের চিঠি পেয়েছি, লিখেছি। কলকাতার আঁতালেকচুয়াল বৃন্দ এখনো নগ্ন হতে পারেন নি! কমার্শিয়াল পত্রিকার অফিসে গিয়ে তাদের চেহারা, বমি-লেখা হাজির করুক। পরে, সম্বর্ধনা— সবার আগে আমি দেবো। ভান ভালো জিনিষ না, বিমল।
আমি কিছু লিখছি না, লিখলেও পছন্দ হচ্ছে না।
ভালোবাসা নিয়ো।
দেবী রায়
২৭/৪
‘জানোয়ার’ কবে নাগাদ কলকাতায় ছাড়া হবে?
১৯৬৪ সালে লেখা এই চিঠি। ততদিনে দেবী-সুবিমল সম্পর্ক আরও পোক্ত হয়েছে, সুবিমলও সম্পৃক্ত হয়েছেন হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে। পরবর্তী চিঠিটি সেই সম্পৃক্ততারই অন্যতম চূড়ান্ত রূপ।

৫।৯।৬৪
বিমল
দুঃখ বোধ করেছো— ভালোই, যেহেতু কোনো কারণ উল্লেখ করো নি, সুতরাং উপশমের কোনো রাস্তাও বাতলাতে অক্ষম।
আমি, ১৬.৯.৬৪ তারিখে বাড়ী যাবো। রাত ৮-৩০ মিঃ পর সমীর রায়ের বাড়ীতে যাবো। গতকালের আগের দিন, লালবাজার যেতে হোল— ভারপ্রাপ্ত অফিসারদের সঙ্গে, কাল জামিনে (৫০০) খালাস, পাশে কেউই ছিল না, সমীর রায় ছাড়িয়ে আনলেন আমাকে। এ্যারেস্ট হওয়ার দিন, মলয়কে Telegram করেছিলাম, কোনো উত্তর পাই নি। সম্ভবত: ওকেও নিয়ে আসবে কলকাতায়। কারোরই কোনো খবর পাচ্ছি না। ১৭.৯.৬৪ ব্যাঙ্কশাল কোর্টে কেস। শৈলেশ+সুভাষ জামিনে খালাস।
প্রায় পৌনে একশটাকা প্রথম দিনেই খর্চা, সমীর রায় কে ফেরৎ দিতে হবে দুটো ইনসটলমেন্টে। কিছু টাকাপত্র দাও— এ সময়!
নইলে কি যে হবে, ভাবতেই পাচ্ছি না।
মলয়ের খবর রবিবার/সোমবারের কাগজ মারফৎ জানতে পারবে, যেমন আমাদের জেনেছো।
মলয়/সমীরদাকে ক্রমাগত লেখো কলকাতার রণদা চৌধুরীর সঙ্গে কনসাল্ট করতে, উৎপলেরও ইচ্ছা তাই।
সমীর রায় দের সঙ্গে কথা বলতে বলো।
সমীর রায় পাশে আছে, থাকবেও। স্টেটসম্যান পত্রিকার অসীম রায়কে লেখো আনন্দবাজারের খবরের বিষয় আপত্তি জানিয়ে।
যে Hungry’র বদলে ‘অশ্লীল পুস্তিকা’ ইত্যাদি ছাপছে কেন? যুগান্তর/Statesman ত এদের মতো লেখে নি। এবং ‘দর্পণে’র হীরেন বসু ১৬, ম্যাঙ্গো লেন, কোলকাতা— জানাও— লিখে।
অফিসের ইন্টেলেকচুয়ালরা খুশি, কর্তাব্যক্তিরা অসন্তুষ্ট Suspension-এ ঠেলে দেবে কি না জানি না। এ বাজারে চাক্রী গেলে Suicide কোর্তে হবে।
কোনো বন্ধুবান্ধবের ((?) দেখা পেলুম না, নাম কেনার সময় অনেকেই ছিলো। বহুত বন্ধু হোলো!
এবার ভেবে চিন্তে করতে হবে।
ভেবেছিলুম বি.এ পরীক্ষায় appear হবো জানি না কি হবে!
চাক্রী বাক্রী না নিয়ে টানা হেঁচড়া করে!
আসলে খুব মন খারাপ।
মলয় topless ইত্যাদি করে, সম্ভবত: ঠিক করেনি।
অনেকদূর গড়িয়েছে!
বরং ১৬ সেপ্টেম্বর এসো, গোটাকয়েক দিনের ছুটি নিয়ে—
কাল ছাড়া পেয়ে কফি হাউসে গিয়েছিলুম, মুখের চেহারা পাল্টাতে দেখলুম।
বাড়ীতেও, খুব দুঃখজনক অবস্থায় আছে, পিছুটান বা তেমন আর্থিক সংগতি থাকলে ভয় ছিলো না।
মলয়, সমীরদা, তুমি এবং সমীর রায় ছাড়া আর কাউকে ভরসা করতে পাচ্ছি না।
প্রীতি জেনো
দেবী রায়
বর্দ্ধমান
১৯৬৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর যে-সমস্ত হাংরির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়, সে-দলে ছিলেন দেবীও। তাঁকে গ্রেপ্তার করে লালবাজারে নিয়ে যাওয়া হয় ৩ তারিখ। এ-চিঠিতে সে-প্রসঙ্গই উঠে এসেছে। দেবী রায় তখন বর্ধমানে চাকরিরত, সেখান থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় তাঁকে। সুবিমলও তখন কলকাতার বাইরে— কর্মসূত্রে মেদিনীপুরে। সমীর রায়— ‘মহেঞ্জোদারো’ পত্রিকার সম্পাদক।

দেবী রায় চিঠিতে লিখেছেন, ‘মলয় topless ইত্যাদি করে, সম্ভবত: ঠিক করেনি।’— এর প্রেক্ষিতটি বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। এ-প্রসঙ্গে পরবর্তীতে এক স্মৃতিচারণে সুবিমল লেখেন— ‘মলয়ের পাঠানো Fuck the Gangshalik School of Poetry নামে একটি কার্ডও আমি বিলি করি কলকাতার উপর মহলে, যেখানে Lindsay Street-এ topless দেখার জন্য আমন্ত্রণ। Topless শব্দটায় যৌন-গন্ধ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে পেছনে লেগে গেল।’ এই বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিই উঠে এসেছে দেবী রায়ের চিঠিতে।

পরের চিঠি—
(সু) বিমলের কী খবর এবং অন্যান্য খবর এবং কোলকাতার এবং ভিয়েৎনাম সম্পর্কে কোলকাতার বুদ্ধিজীবীরাই বা কী বলছে?
Howard McCord ১৯শে জুলাই লিখেছে তোমার পাঠানো ‘জেব্রা’ পেয়েছে। অত্যন্ত আনন্দিত ভাষায় জানিয়েছে ‘দেখা হলে সংবাদ পৌঁছে দিতে’ অনুরোধ এবং সুবিধামত সৌজন্য-পত্র লিখেও জানাবে নিশ্চয়ই (অন্তত: আমারো তাই মনে হয়—) এবং সমস্ত শিক্ষিত বিদেশীরাই দারুণ ভদ্র এবং পত্রের উত্তর দেওয়া বা প্রাপ্তি সংবাদ জানানো একটা কর্তব্য অ ভদ্রতা বলেও মনে করে ইত্যাদি
রাস্তায়, অতর্কিতে একদিন যেমন জামার কলার ধরে চোখ রাঙিয়েছিলো শক্তি— ঠিক ঐ একই রকম ফ্লু’র আক্রমণে অল্পবিস্তর কাবু আমি এখন
দেবী রায়
২৯ জুলাই
নর্থ ভিয়েৎনামে অবিলম্বে বোমাবর্ষণ বন্ধ করা হোক— এটা অমানবিকতার পরিচয়—।।
‘Stop Bombing in N. Vietnam’ – Debi Ray

১৯৬৬ সালে লেখা এই চিঠিতে উঠে এসেছে ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের প্রসঙ্গ। দেবী রায়ের অবস্থান ও মার্কিন আগ্রাসন সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে এ-চিঠিটি জরুরি বলেই মনে হয়েছে আমাদের। জেব্রা— মলয় রায়চৌধুরী সম্পাদিত পত্রিকা।
অনেকগুলি চিঠির মধ্যে থেকে, মাত্র চারটি তুলে ধরা হল এই পর্বে। সম্ভব ও সুযোগ হলে, পরবর্তী কোনও পর্বে দেবী রায়ের আরও কয়েকটি চিঠি তুলে ধরার চেষ্টা করব। বস্তুত, সুবিমলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ সেভাবে ছিন্ন হয়নি কখনওই; নয়ের দশকে লেখা দেবী রায়ের একাধিক চিঠিও খুঁজে পেয়েছি সুবিমলের সংগ্রহে। এমনকী, বিগত বারো বছরে সুবিমলের সঙ্গে বিভিন্ন আলাপচারিতায় জেনেছি, দেবী রায়ের সঙ্গে তাঁর ফোন-মারফত যোগাযোগ প্রায়-নিয়মিতই ছিল; যেমনটি ছিল মলয় রায়চৌধুরী ও ত্রিদিব মিত্রের সঙ্গে।
এরপর যে-ব্যক্তির চিঠি নিয়ে আলোচনা, তিনি অরুণেশ ঘোষ— বাংলাভাষার এক গুরুত্বপূর্ণ কবি। হাংরি আন্দোলনের প্রাথমিক বছরগুলিতে অরুণেশ সে-দলে ছিলেন না, সাতের দশকে মূল হাংরিদের একাংশের সংস্পর্শে আসেন এবং পরিচিত হয়ে ওঠেন পরবর্তী প্রজন্মের অন্যতম হাংরি কবি হিসেবে। এ-প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে অরুণেশ বলেছিলেন— ‘৬০ দশকে হাংরি লেখকদের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। কলকাতা থেকে অনেকটা দূরে আমার অবস্থান। এদের লেখা কিছু পরে আমি পড়তে শুরু করি, অবশ্য তার আগে থেকেই আমি লিখতাম, আমার মতন লেখা।’

সুবিমলের সংগ্রহে অরুণেশের দু’টি চিঠি খুঁজে পেয়েছি। দু’টি চিঠির মধ্যে ব্যবধান দশ বছরের। প্রথমটি, ১৯৭৪ সালের। পড়ে নেওয়া যাক—
প্রিয় সুবিমল,
জিরাফ ১ম সংখ্যা (নব পর্য্যায়) পাঠালাম। এ সংখ্যা অবশ্য ভাল হয়নি। মার্চ-এপ্রিল ৮ পাতার বড় আকারে বেরোচ্ছে। আপনার আলোচনা বা নিবন্ধ বা কোন বুক রিভ্যু পাই। প্রতি সংখ্যায় সাহিত্য শিল্প চলচ্চিত্র ও অধিবিদ্যা বিষয়ক আলোচনা এবং কবিতা রাখব ভাবছি। (না, সরাসরি রাজনীতি নয়)। কিন্তু ভাল লেখা পাচ্ছি না। আপনার কোনরকম সাড়া না পেলে দুঃখ পাব, আগের চিঠিটির পাই নি।
ভালবাসা
অরুণেশ
১২/৩/৭৪

জিরাফ— অরুণেশ ঘোষ-সম্পাদিত পত্রিকা। এই চিঠিটি সম্পর্কে সুবিমল তাঁর ডাইরিতে (১৬.৩.৭৪) লিখছেন— ‘…দুপুরে ফিরে এসে দেখি, খামে চিঠি ও কাগজ। অরুণেশ ঘোষ ও জিরাফ। অরুণেশের এই প্রথম চিঠি। পড়ে জানা গেল, এর আগেও দিয়েছে, কিন্তু পাইনি। সম্ভবত: বাড়িঅলার কৃপা পড়ে থাকবে। জিরাফে— উৎপলকুমার বসু’র ১খানা চিঠি পেয়েছি— ভালো লেগেছে।’
এরপর, সম্ভবত সুবিমল অরুণেশের কাছে ‘আবহ’ পত্রিকার জন্য কবিতা চেয়েছিলেন। ডাইরিতে লেখা (৮.৫.৭৪) — ‘কবিতা ও চিঠি— অরুণেশ ঘোষের এল।’ চিঠিটি না-পেলেও (সম্ভবত ‘আবহ’ পত্রিকার সম্পাদক অসিত গুপ্তের কাছে সেটি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন সুবিমল), সুবিমলের জবাবি চিঠির অসম্পূর্ণ খসড়াটি খুঁজে পেয়েছি আমরা।
সুবিমল বসাক
15/44 নারিকেল ডাঙ্গা নর্থ রোড
কলকাতা – 11
700-011
21 মে 1974
আপনার চিঠি ও কবিতা পেয়েছি প্রিয় অরুণেশ। কবিতা আমাকে অ্যাপীল করেছে এবং উচিৎ জায়গামতো আমি তা পাচার করে দিয়েছি। অসিতবাবু জানিয়েছেন, এ সংখ্যায় সেটা যাবে, যদি না এখনকার ডামাডোলে পত্রিকার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়।
আমি এখন খুব কমই লিখছি, মানে লেখা হয়ে উঠছে না। পারিবারিক ঝামেলা, সাংসারিক চিন্তা, ডালরুটি রুজীরোজগারের সমস্যা খুব বেশী কাঁধের উপর চাপ দিচ্ছে, ফলে সময়ের অধিকাংশ তাতেই ব্যয়িত হয়ে যাচ্ছে। লেখা তৈরী না করতে পারার যন্ত্রণায় মন-মেজাজ খুব দূষিত হয়ে থাকে। একটা সমালোচনায় হাত দিয়েছি প্রায় মাসখানেক আগে, অদ্যাবধি শেষ করে উঠতে পারিনি। ওটা শেষ করে, ১টা গদ্যে হাত দেবো। মনে-মনে লেখা প্রায় গুছিয়ে রেখেছি, সময় করে বসে তৈরী করতে হবে। আমার গদ্য এমনিতে বড় হয়, এটা প্রায় ৬/৭ পাতা হবে। আপনি ৭ পাতা খরচ করতে পারলে ওটা পাঠাবো। জানাবেন।
জিরাফের ১ম সংখ্যায় উৎপলের চিঠিটা প্রকাশিত করে ভালো করেছেন। ‘সাহিত্য’ নামধারী যে সব আবর্জনা আজ চারিদিকে তৈরী হচ্ছে, সেই সব লেখকদের গালে ভেজা জুতোর কাজ দেবে। বস্তুত: প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থা সব কিছু গ্রাস করতে চায়। ভারতবর্ষের মাটী থেকে অনেক দূরে থাকার ফলে উৎপল হয়তো তেমন বিভ্রান্ত হয়ে পড়েনি। গত বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় তাঁর চিঠির কথা মনে করুন। একজন লেখক নিশ্চিত সামাজিক প্রাণী, তবে, তিনি কি লিখবেন— সেটা তাকেই স্থির করতে হবে। বস্তুত: লেখককে যে বিষয়ে ‘হন্ট’ করে বারংবার— তিনি তাই লিখবেন। আপনি যে সততা ও নিষ্ঠার কথা বলেছেন, আমাদের মনে আছে, স্বাধীনতা পরবর্তী বেশ কয়েক বছর বামপন্থী লেখকদের সম্পর্কে শ্রদ্ধা ছিল, যদিও তাঁরা সংখ্যালঘু ছিলেন। এখন তাঁরা সংখ্যায় অনেক বেড়েছেন, জনগণ সচেতন হয়েছেন, সৎপাঠকও বেড়েছেন, অথচো সেই সব বামপন্থী লেখকেরা খোঁয়ারে ঢুকে গেছেন যখন কিনা তাদের উচিৎ ছিল প্রতিরোধ ও যুদ্ধ ও বিদ্রোহ।

অরুণেশের দ্বিতীয় চিঠিটি দশ বছর পরের, ১৯৮৪ সালের। তিনি লিখছেন—
সুবিমল,
দীর্ঘ দিন পর আমাদের মধ্যে আবার যোগাযোগ গড়ে উঠছে। ‘জিরাফ’ বের হচ্ছে, আপনার লেখা চাই। আর জেব্রা বা হাংরি জেনারেশনের পুরানো সংখ্যা বা লিফলেট বা গুরুত্বপূর্ণ দলিল পত্র যা থাকে আমাকে পাঠাবেন। মলয় রায় চৌধুরীর কাছে কিছু পেয়েছি, মলয় আপনার কথা লিখেছে।
‘জিরাফে’র এই সংখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। মলয় কৃত ম্যানিফেস্টো আপনি অনুবাদ করে দিতে পারবেন কি? আমার পক্ষে সুবিধা হয়। প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা, মলয়ের তৎকালিন লেখায় চিন্তায় কী ছিল তা এই সময়ের তরুণ পাঠকের কাছে নিয়ে আসা আমার উদ্দেশ্য। অবশ্যই কোন কূট কাচাল নয়। তবু প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে বা দিয়েছে। আমি আপনার সাহায্য চাই।
মোটামুটি যা রাখব বা রাখতে চাই। ১) মলয়ের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকার ২) হাংরি ম্যানিফেস্টোর পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ (মলয় কৃত) ৩) মলয়ের দার্শনিক ও জীবন সম্পর্কিত ও কবিতা সম্পর্কে চিন্তা ধারার দু-একটি গদ্য। ৪) আর সমগ্র ব্যাপারটার ওপর আমার আলোচনা।
পরে চিঠিতে বিস্তারিত লিখবো। আপনার চিঠি চাই।
ভালবাসা
অরুণেশ
২০।৮
সুবিমল বসাকের ১৯৮৪ সালের ডাইরিটি মিসিং। ফলে, ‘দীর্ঘদিন পর যোগাযোগ গড়ে ওঠা’-র প্রসঙ্গে তাঁর মনোভাব ও জবাব কী ছিল, জানা গেল না। এর পরের আর-কোনও চিঠিও নেই।
(ডায়েরি ও চিঠিগুলির বানান অপরিবর্তিত)
ছবি সৌজন্যে: তন্ময় ভট্টাচার্য


