মেথডিস্ট চার্চ
অক্সফোর্ডের ক্রাইস্ট চার্চ কলেজের শিক্ষিত এবং চার্চ অফ ইংল্যান্ডের অভিষিক্ত পুরোহিত জন ওয়েসলি, তাঁর ভাই চার্লস ওয়েসলি এবং আরও কিছু ছাত্র মিলে, ‘হোলি ক্লাব’ গঠন করেন এবং একটি ‘পবিত্র ও নিয়মতান্ত্রিক’ জীবনযাপন শুরু করেন। এই ক্লাবের সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে প্রভুর ভোজ গ্রহণ করতেন (Holy Communion), নিয়মিত উপবাস করতেন, বিনোদন থেকে বিরত থাকতেন, এবং অসুস্থ, দরিদ্র ও জেলবন্দিদের নিয়মিত পরিদর্শন করতেন। তাদের জীবনযাপনের এই নিয়মতান্ত্রিক ও পদ্ধতিগত রীতির জন্য ব্যঙ্গ করে ‘মেথডিস্ট’ তকমা দেওয়া হয়েছিল। তবে হোলি ক্লাবের নেতা জন ওয়েসলি এই উপহাসকে সম্মানের উপাধিতে পরিণত করেছিলেন।
ঊনবিংশ শতকের কলকাতায় মেথডিস্টদের দু’টি শাখার উপস্থিতি ছিল— একটি হল ওয়েসলেয়ান মেথডিস্ট, অপরটি মেথডিস্ট এপিসকপাল।
এদের মধ্যে ওয়েসলেয়ান মেথডিস্টরা কলকাতা শহরে প্রথম উপাসনালয় নির্মাণ করেন। ১৮৬২ সালে ওয়েসলেয়ান মিশনারি রেভারেন্ড জেমস ব্রুডবেন্ট, যিনি ফোর্ট উইলিয়ামের একজন চ্যাপলিন ছিলেন, সদর স্ট্রিটে এক চ্যাপেল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন অনুভব করেন। তিনি এবং মি এইচ জি হাইফিল্ড যৌথভাবে এই চ্যাপেল তৈরির কাজে ব্রতী হন, যেখানে সামরিক বাহিনীর লোকজন এবং সাধারণ নাগরিকরা উভয়েই উপাসনা করতে পারবে।
‘নেটিভ’দের জন্য নির্মিত গির্জায়, এসেছিলেন স্বয়ং রামকৃষ্ণ পরমহংস! পড়ুন: গির্জানগর পর্ব ৩
তাঁদের যৌথ প্রচেষ্টা সফল হয়েছিল। ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত, সদর স্ট্রিটে অবস্থিত ওয়েসলেয়ান মেথডিস্টদের এই উপাসনালয়টি আগে ওয়েসলেয়ান মেথডিস্ট চার্চ নামে পরিচিত ছিল, তবে বর্তমানে এটির নাম সি.এন.আই ওয়েসলেয়ান চার্চ। এই চার্চ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।

এস. এন. ব্যানার্জি রোডের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা অসমন্ড মেমোরিয়াল চার্চটিও (১৮৬৮) একসময়ে সদর স্ট্রিটের গির্জাটির মতো ওয়েসলেয়ান মেথডিস্ট চার্চ নামে পরিচিত ছিল।
১৮৬৪ সালে তেইশ বছর বয়সি ওয়াল্টার অসমন্ড (একজন মেথডিস্ট মিনিস্টার) মিশনারি ইভাঞ্জেলিস্ট এবং সমাজকর্মী হিসাবে কলকাতায় এসেছিলেন দরিদ্র মানুষদের সেবা করার জন্য। মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিতে এস. এন. ব্যানার্জি রোডের গির্জাটির নামকরণ হয় ‘অসমন্ড মেমোরিয়াল চার্চ’। গির্জাটির চারটি মণ্ডলী রয়েছে; যার মধ্যে তালতলায় একটি বাংলা ও একটি সাঁওতালি। এছাড়া পটারি রোডে রয়েছে কামারডাঙা চ্যাপেল এবং বন্ডেল রোডে বালিগঞ্জ চার্চ।
কলকাতায় মেথডিস্টদের ধর্মপ্রচার নতুন মাত্রালাভ করে মেথডিস্ট এপিসকপাল শাখার আগমনে। এই শাখার মিশনারিদের মধ্যে জেমস মিলস থোবার্নের নাম ও অবদান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। থোবার্ন আইরিশ অভিবাসী পরিবারের সন্তান, জন্মেছিলেন ওহিওর সেন্ট ক্লেয়ারভিলে। ১৮৫৭ সালে আলেগেনি কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর, মেথডিস্ট এপিসকপাল চার্চের মিনিস্ট্রিতে যোগদান করেন এবং ১৮৫৯ সালে চার্চ মিশনারি কর্তৃক ভারতে প্রেরিত হন।
তবে থোবার্নের আগে মেথডিস্ট এপিসকপাল শাখার হয়ে ১৮৭৩ সালে কলকাতা শহরে ধর্মপ্রচার করতে এসেছিলেন উইলিয়ম টেলর। নিজেদের গির্জা না থাকার কারণে, তিনি কলকাতার বিভিন্ন উপাসনালয়গুলিতে উপাসনা শুরু করেন। প্রথমে সদর স্ট্রিটের ওয়েসলেয়ান চার্চে, ক্রমে আমেরিকান জেনানা মিশনের হলে, ধর্মতলার ইউনিয়ন চ্যাপেলে, এবং শেষপর্যন্ত ইংলিশ ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিদের এন্টালিতে অবস্থিত চ্যাপেলে উপাসনা করেন। প্রথমদিকে এইসব খ্রিস্টিয় মিশনারিরা যেভাবে মেথডিস্টদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেটার ফলে তাঁরা ধর্মপ্রচারের ক্ষেত্রে খানিকটা উপকৃত হয়েছিলেন। উইলিয়ম টেলর কলকাতাকে ‘প্রাচ্যের প্যারিস’ (‘The Paris of the East’) নামে ডাকতেন।


টেলরের উদ্যোগে জিগজ্যাগ লেনে একটি ভাড়া নেওয়া জায়গায় গড়ে উঠেছিল মেথডিস্টদের একটি অস্থায়ী উপাসনালয়।
থোবার্নের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ‘মাই মিশনারি অ্যাপ্রেন্টিসশীপ’ বইতে থোবার্ন লিখেছেন, তিনি এক সময়ে বাংলা ব্যাকরণ বই সংগ্রহ করে অল্পবিস্তর বাংলা ভাষা শেখার চেষ্টা করেছিলেন।
কলকাতা শহরে থোবার্ন প্রথম উপাসনা করেন ১৮৭৪ সালের ২৫ জানুয়ারি। থোবার্নের ক্ষেত্রেও ব্যাপ্টিস্টরা তাঁদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, থোবার্ন প্রথম উপাসনাটি করেছিলেন, তাদের চ্যাপেলে। জানা যায়, উপাসনার জন্য একসময়ে থোবার্ন করিন্থিয়ান থিয়েটারও ভাড়া নিয়েছিলেন।

মেথডিস্ট গির্জার মহিলারা প্রতি সাবাথের সন্ধ্যায় বৌবাজার যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তাদের উদ্দেশ্য ছিল বোর্ডিং হাউস এবং মদের দোকান গুলিতে গসপেলের বার্তা পৌঁছে দেওয়া। তাঁরা যাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন, তাঁদের সঙ্গেই গান গাইতেন এবং প্রার্থনা করতেন; আমন্ত্রণ জানাতেন ধর্মতলার চ্যাপেলে অথবা করিন্থিয়ান থিয়েটারের (শীতকালীন উপাসনা এখানেই হত) প্রার্থনায় যোগদান করার জন্য। থোবার্ন লিখছেন— ‘Our ladies had heard of the famous Woman’s Crusade in Ohio, and during the cold season of 1875 a few of these devoted sisters resolved to make an attempt of the same kind in Calcutta. They accordingly made their appearance one Sunday afternoon in a street infested with liquor shops and began to talk, sing, and pray with the seamen whom they found in large numbers. Their success surpassed their most sanguine expectations. They were received with great respect, and many of the rough but really generous-hearted men wept beneath their words.’
বর্তমানে লেনিন সরণিতে মেথডিস্টদের গৌরবোজ্জ্বল সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘থোবার্ন মেমোরিয়াল মেথডিস্ট চার্চ’। লেনিন সরণিতে ‘সেন্ট্রাল মেথডিস্ট এপিসকপাল চার্চ’ আরও একটি মেথডিস্ট গির্জা দেখতে পাওয়া যায়, আগে এই গির্জাটির প্রতিষ্ঠালগ্ন লেখা ছিল ১৯২৩, তবে বর্তমানে সেটি বদলে ১৮৭৪ করা হয়েছে।




