গির্জানগর: পর্ব ৩

Representative Image

উপনিবেশ, ধর্ম, বৈষম্য

‘নেটিভ খ্রিস্টান’ শব্দবন্ধটি শুনলে প্রথমে মাথায় আসে দু’টি নাম—‌ দোম আন্তোনিও এবং কৃষ্ণ পাল। ‌ দোম আন্তোনিও ছিলেন ভূষনার এক জমিদার বংশের সন্তান, তিনি জলদস্যুদের দ্বারা অপহৃত হয়েছিলেন; পরে আরাকানে, দাস বিক্রির হাট থেকে তাঁকে উদ্ধার করে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা দিয়েছিলেন এক ক্যাথলিক পাদ্রী। দোম আন্তোনিওকে আমরা মনে রেখেছি বাংলা ভাষায় (রোমান হরফে) মুদ্রিত গদ্যের অন্যতম নিদর্শন ‘ব্রাহ্মণ রোমান ক্যাথলিক সংবাদ’ এর রচয়িতা হিসাবে।  অপহৃত না হলে হয়তো, তিনি কখনও খ্রিস্টান হতেন না। তবে কৃষ্ণ পাল খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন স্বেচ্ছায়। সূত্রধর পরিবারে জন্মগ্রহণ করা এই কৃষ্ণ পালের ঘটনা স্বল্পচর্চিত হলেও, তিনি ছিলেন উইলিয়াম কেরি কর্তৃক ধর্মান্তরিত প্রথম খ্রিস্টান।

কেরি দেশীয় ধর্মান্তরিতদের সম্পর্কে তাঁর জার্নালে লিখছেন— 

‘…we have to rebuke them sharply; sometimes to expostulate; sometimes to entreat; and often, after all, to carry them to the throne of grace, and to pour out our complaints before God. Our situation, in short, may be compared to that of a parent who has a numerous family. He must work hard to maintain them; is often full of anxiety concerning them; and has much to endure from their dulness, their indolence, and their perverseness. Yet still he loves them, for they are his children, and his love towards them mingles pleasure with all his toil.’

১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট পাশ হওয়ার আগে পর্যন্ত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনস্থ জায়গাগুলিতে মিশনারি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও মিশনারি কর্মকাণ্ড একেবারে রোধ করা সম্ভব হয়নি।

গির্জা নির্মাণের জন্য জমি দিয়েছিলেন রাজা নবকৃষ্ণ দেব-এর মতো গোঁড়া হিন্দুরাও! পড়ুন: ‘গির্জানগর’ পর্ব ২…

স্কটিশ মিশনারি এবং প্রাচ্যবিদ জন নিকোল ফারকুয়ার বলেছেন যে, অনেক আগে থেকেই সরকার ও খ্রিস্টান মিশনারিদের মধ্যে কিছুটা সহযোগিতা ছিল। এটি সম্ভব হয়েছিল কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগের কারণে, যারা খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দশকে বাংলায় এসে পৌঁছেছিলেন ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি সোসাইটি, সোসাইটি ফর প্রোমোটিং ক্রিশ্চিয়ান নলেজ, লন্ডন মিশনারি সোসাইটির প্রতিনিধিরা। 

১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট পাশ হওয়ার পর থেকে, বাংলায় আরও নতুন-নতুন মিশনারি দলের আগমন হয়। ১৮১৩ সাল পরবর্তী সময়েই কলকাতায় খ্রিস্টিয় উপাসনালয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং কলকাতায় নেটিভদের জন্য নির্দিষ্ট গির্জাগুলিও নির্মাণ হয়।

মূলত‌ প্রোটেস্ট্যান্টপন্থীরাই কলকাতার  নেটিভ গির্জাগুলির  নির্মাতা। বাঙালি বা দেশীয় প্রোটেস্ট্যান্টদের উপাসনাবিধি অনুবাদের উদ্যোগ বহু আগে নেওয়া হলেও, ক্যাথলিকদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ছিল অন্যরকম, তাঁদের খ্রিস্টযাগ (Mass) হত ল্যাটিনে। দ্বিতীয় ভ্যাটিকান কাউন্সিলের (১৯৬২-১৯৬৫) পরে, এই রীতি পরিবর্তন হয়ে দেশীয় ভাষায় খ্রিস্টযাগের প্রচলন হয়।

১৮২৬ সালে আমহার্স্ট স্ট্রিটে, চার্চ মিশন চ্যাপেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন আর্চডিকন কোরি। প্রথমে চ্যাপেল হিসাবে গড়ে উঠলেও, পরে এই উপাসনালয় গির্জা রূপে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানে এই গির্জাটির নাম হোলি ট্রিনিটি চার্চ। বাঙালি উপাসকদের জন্য এই উপাসনালয়ে বাংলা ভাষায় উপাসনার প্রচলন হয়েছিল। আর্চডিকন কোরির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে, এই গির্জাকে স্থানীয় মানুষজন বলতেন কোরি চার্চ। বহুদিন পর্যন্ত গির্জার দক্ষিণ দিকের রাস্তাটির নাম ছিল ‘কোরি চার্চ লেন’। কোরির স্মৃতি ফিকে হয়ে এলেও, এই গির্জার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে আরও এক বিদেশির নাম। তিনি হলেন রেভারেন্ড জেমস লং। তিনি এই উপাসনালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীনবন্ধু মিত্রের নীল দর্পণ নাটকের অনুবাদ করার অপরাধে তাঁর উপরে হাজার টাকা জরিমানা ধার্য হয়েছিল, অন্যথায় কারাবাস। এই পরিস্থিতিতে হাজার টাকা দিয়ে তাঁকে উদ্ধার করেছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। যদিও, মনে করা হয় এই নাটকের অনুবাদক ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এই গির্জায় একবার মথুরবাবুর সঙ্গে এসেছিলেন স্বয়ং রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব।

ডাফ চার্চ

বিধান সরণিতে অবস্থিত কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের গির্জা বা ক্রাইস্ট চার্চ তৈরির পেছনে  উদ্দেশ্য ছিল ‘অ-খ্রিস্টান’ নেটিভ এলাকায় খ্রিস্টধর্ম প্রচার। সে-কারণে গির্জা নির্মাণের জন্য, প্রথমে কলেজ স্কোয়ারে হিন্দু কলেজের কাছে কেনা হয়েছিল একখণ্ড  জমি। কিন্তু  ১৮৩৮ সালের ৭ জুলাই ভিত্তি স্থাপনের দিন তৎকালীন ডেপুটি গভর্নর আলেকজান্ডার রসের কাছে প্রতিবাদ জানান হিন্দু সমাজের নেতারা। রস বিশপ ড্যানিয়েলকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করে প্রতিবাদীদের হাতে একটি চিঠি দেন। চিঠিটি নিয়ে তাঁরা সেদিনই দেখা করেছিলেন বিশপের সঙ্গে। এদিকে হিন্দু কলেজ কর্তৃপক্ষও কলেজ-সংলগ্ন গির্জা নির্মাণের প্রকল্পটিকে ভাল চোখে দেখেননি। কারণ তাঁদের চোখের সামনে আলেকজান্ডার ডাফের প্রচেষ্টার ফলে মহেশচন্দ্র ঘোষ, কৃষ্ণমোহন  বন্দ্যোপাধ্যায়, গোপীনাথ নন্দী, আনন্দচন্দ্র মজুমদারের মতো হিন্দু কলেজের ছাত্রদের ধর্মান্তরিত হওয়ার দৃষ্টান্ত ছিল। কলেজ কর্তৃপক্ষের আবেদনে বিশপ উইলসন ৭ জুলাই গির্জার ভিত্তি স্থাপনের অনুষ্ঠান স্থগিত রেখেছিলেন। এরপর বিশপের বাড়িতে প্রতিবাদীরা সমবেত হন, সেখানে মেডিকেল কলেজের সম্পাদক ডেভিড হেয়ার এবং হিন্দু কলেজ কর্তৃপক্ষের পক্ষে প্রসন্নকুমার ঠাকুরের সঙ্গে বিশপের কথাবার্তা হওয়ার পরে,  কলেজ স্কোয়ারের জমিটি হিন্দু কলেজকে দিয়ে দেওয়া হয় এবং তার বিনিময়ে হেদুয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে  চার্চ নির্মাণের জন্য এক খণ্ড  জমি ও আঠারোশো টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়। এই জমিতে তারপর নির্মাণ করা হয় ক্রাইস্ট চার্চ । এই গির্জার প্রথম প্রেসবাইটার-ইন-চার্জ হয়েছিলেন একজন বাঙালি খ্রিস্টান— রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি বাংলা ভাষায় বাঙালি খ্রিস্টানদের ধর্মোপদেশ দিতেন। রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন পরবর্তী সময়ে বিশপ কলেজেরও অধ্যাপক হয়েছিলেন।

ক্রাইস্ট চার্চ

কলেজ স্কোয়ারে গির্জা নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে যারা বিশপ উইলসনের কাছে গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন রামবাগানের রসময় দত্ত। এই রসময় দত্তের পাঁচ পুত্রের মধ্যে তিন পুত্র ক্রাইস্ট চার্চে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন, এদের মধ্যে পুত্র গোবিন্দচন্দ্রের দুই কন্যা অরু এবং তরু ও দীক্ষিত হন এই গির্জায়। পরবর্তীকালে এই তরু-ই হয়ে ওঠেন ইংরেজি ভাষার বিশিষ্ট কবি।

১৯১০ সালে আলেকজান্ডার ডাফের স্মৃতিতে, শিশির ভাদুড়ি সরণিতে অবস্থিত দ্য ইউনাইটেড ফ্রি মিশন চার্চ-এর নাম ডাফ চার্চ রাখা হয়। আমরা জানি, উত্তর কলকাতা জুড়ে বিস্তৃত ডাফের কর্মক্ষেত্র এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত জেনারেল অ্যাসেম্বলি ইনস্টিটিউশনের কথা। প্রসঙ্গত, এই প্রতিষ্ঠানেই পড়াশোনা করেছিলেন লালবিহারী দে। 

চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়ে লালবিহারী দে তাঁর শিক্ষক টমাস স্মিথের দ্বারা ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। ১৮৪৬ সালে তিনি ফ্রি চার্চ অফ স্কটল্যান্ড শাখার Catechist হিসাবে নিযুক্ত হন। এরপর ১৮৫১ সাল থেকে কালনার গ্রামে-গ্রামে ঘুরে ধর্মপ্রচার করার পর অবশেষে ১৮৫৫ সালে এই খ্রিস্টমণ্ডলীতে প্রথম বাঙালি আচার্য হিসাবে স্বীকৃত হন। কিন্তু আচার্য হয়ে দেখলেন মিশন পরিষদে শ্বেতাঙ্গদের স্থান আছে, কৃষ্ণাঙ্গদের নেই। ধর্মের নামে ঘটে চলা এই বর্ণবৈষম্য তিনি মানতে পারেননি । এই কারণে ডাফের সঙ্গে তাঁর যথেষ্ট বাদানুবাদ ও মনোমালিন্য হয়। এমনকী তিনি পদত্যাগ করতেও চেয়েছিলেন, ডাফ তাঁকে এক বছরের জন্য কালনা মিশনের সুপারিনটেন্ডেন্টের পদ গ্রহণ করতে অনুরোধ করেছিলেন এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন— তাঁর কাজের উপর কোনওরকম হস্তক্ষেপ করা হবে না। তাই লালবিহারী দে, পদত্যাগের সঙ্কল্প ত্যাগ করে চারবছর কালনায় থেকে গিয়েছিলেন, এরপর তাঁকে ডাফ চার্চের আচার্য  করে নিয়ে আসা হয়। ডাফ চার্চের প্রথম ‘বাঙালি মিনিস্টার’ হয়েছিলেন তিনি।

লালবিহারী দে’র জ্যেষ্ঠা কন্যার বিবাহ হয়েছিল কলকাতা হাইকোর্টের উকিল মণিলাল স্যান্ডেলের সঙ্গে। রাধারমণ মিত্রের ‘কলিকাতা দর্পণ’ থেকেই জানা যায়, মণিলাল স্যান্ডেলের পিতার নাম রেভারেন্ড হরিহর স্যান্ডেল। এলগিন রোডের সেন্ট মেরি’জ  চার্চের স্মৃতিফলকে ও এই নামটি পাওয়া যায়। সম্ভবত এই দুই হরিহর অভিন্ন । ১৮৫৭ সালে বিশপ উইলসন প্রথম ক্যাথিড্রাল মিশনারি হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন রেভারেন্ড হরিহর স্যান্ডেলকে। নিয়োগ পরবর্তী বছর থেকে তিনি শহরের কিছু বাঙালি খ্রিস্টানদের জন্য বাংলা ভাষায় উপাসনা শুরু করেন। উপাসনায় অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পরে  তিনি বাঙালি মণ্ডলীর জন্য একটি আলাদা গির্জা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। এলগিন রোডে অবস্থিত সেন্ট মেরি’জ চার্চটি  নির্মাণের জন্য তিনিই উদ্যোগ নিয়ে জমির ব্যবস্থা এবং অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছিলেন। এই গির্জাটি বাংলা ক্যাথিড্রাল নামেও পরিচিত।

কখনও বড়দিনের সকালে ক্রাইস্ট চার্চের প্রার্থনায় গিয়ে ‘O Come, All Ye Faithful’ এর সুরে ‘এসো ভক্তবৃন্দ, করো জয়ধ্বনি’ অথবা ‘Hark ! The Herald Angels Sing’  এর সুরে ‘শুন স্বর্গদূতের রব’ শুনলে এখনও অনেকে হয়তো বিস্মিত হবেন। তবে খাঁটি ইংরেজি সুরের উপাসনার ভাবটুকু গ্রহণ করে শহর কলকাতার বাঙালি খ্রিস্টানরা স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেছেন বহুযুগ আগেই।