সালতামামি
যুদ্ধ থেকে শান্তি— এই দুই সীমানার মধ্যে অজস্র চোরাস্রোত। বিগত বছর, ২০২৫ জুড়ে এমন নানা চোরাস্রোত বয়েছে। বিশ্বরাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতি, নানা ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বছরের প্রথম ‘চোখ-কান খোলা’।
গাজা, যুদ্ধ, সংকট
বছরের শুরুটা হয়েছিল যুদ্ধবিরতি দিয়ে। ১৯ জানুয়ারি, ২০২৫ ইজরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়, মধ্যস্থতা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কাতার এবং ইজিপ্ট। ঠিক হয় হামাস ও ইজরায়েল, দু’পক্ষই যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ঠিক হয়, যুদ্ধবন্দিদের হস্তান্তরের দায়িত্ব নেবে রেড ক্রস। ঠিক হয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে বাড়ানো হবে সহায়তা।
মার্চ মাসে হঠাৎই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল। প্রথমে, ২ মার্চ ইজরায়েল সহায়তা বন্ধ করল। তারপর ১৮ মার্চ ইজরায়েল আবার আক্রমণ শানাতে শুরু করল। দাবি করল, প্রথম যুদ্ধবিরতি ভেঙেছে হামাস-ই। এবারের সংঘাতের তীব্রতা অনেকটাই বেশি। এমনকী, ব্রিটিশ রেড ক্রস দাবি করে, দায়িত্বরত কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক নিহত হয়েছেন যুদ্ধক্ষেত্রেই।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ কি হঠাৎই অশান্ত, না কি নেপথ্যে লুকিয়ে অন্য অঙ্ক? ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ১৭…
পরিস্থিতির এই আচমকা বদলের মধ্যেও কিছু ঘটনা আশ্চর্যভাবে এই অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ আলোর ঝলকানি হয়ে দেখা দেয়। প্রথমত, হলিউডের তাবড় অভিনেতারা, আবিশ্ব তাবড় ফুটবলাররা ইজরায়েলের এই টানা আক্রমণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন। মার্ক রাফেলো থেকে ব্র্যাড পিট, জেনিফার লরেন্স থেকে অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, হাভিয়ের বার্ডেম থেকে কেট ব্ল্যানচেট, ডুয়া লিপা থেকে সেলেনা গোমেজ— হলিউডের একটি বিরাট অংশ প্যালেস্তাইনের পক্ষে কথা বলেছেন, সই করেছেন বিভিন্ন খোলা চিঠিতে, এমিজ থেকে অস্কারের মঞ্চে প্রতিধ্বনিত হয়েছে সেই স্বর। ফিফা-র ওপর ক্রমশ চাপ বেড়েছে ফুটবল বিশ্বকাপের কোয়ালিফায়ার থেকে ইজরায়েলকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য। তৈরি হয়েছে ‘ভয়েস অফ হিন্দ রাজাব’-এর মতো ছবি, যা বিশ্বজুড়ে বিবিধ চলচ্চিত্র উৎসবে তুমুল আলোড়ন ফেলেছে। ইতালির এক কার্ডিনাল, মাতেও জুপ্পি গাজায় নিহত শিশুদের নাম তাঁর প্রার্থনায় পাঠ করেন সাত ঘণ্টা ধরে।

মে থেকে অগস্ট রক্তস্নান চলেছে গাজায়। স্কুল থেকে হাসপাতাল ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। শিশুমৃত্যুর খতিয়ান বেড়েছে। দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে। একের পর এক দৃশ্যে কেঁপে উঠেছে বিশ্ব। ১৩ জুন থেকে ২৪ জুন চলেছে ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধ। তারপর, আবারও এসেছে যুদ্ধবিরতি, অক্টোবর মাসে। ভিটেছাড়া মানুষ ফিরেছে গাজায়। কিন্তু আতঙ্কের মেঘ মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলজুড়ে এখনও ঘনিয়ে।
শান্তির নোবেল, যুদ্ধের বার্তা?
ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন মুলুকের চরম দক্ষিণপন্থী এই রাষ্ট্রনেতা শান্তির দূত হয়ে উঠছেন, এমন কথা তাঁর অতি অনুগামীও, এমনকী, মনে মনেও বিশ্বাস করে না। কিন্তু নোবেল পুরস্কার ঘোষণার আগের মুহূর্ত অবধি চলেছে তুমুল চাপানউতোর। ট্রাম্প কি এবার নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রাপক? যুদ্ধবাজির হুংকার বিভিন্ন সময় যে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষ্য হয়ে উঠেছে, হঠাৎই তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য প্রাপক কীভাবে হয়ে উঠলেন, এই প্রশ্নে অনেকেই উত্তাল হয়ে উঠেছিল তখন। বারবার ভেসে উঠছিল একটি ভিডিও, যেখানে ইজরায়েলের রাষ্ট্রপ্রধান নেতানিয়াহু ট্রাম্পের হাতে তুলে দিচ্ছেন নোবেল শান্তি পুরস্কারের সুপারিশ-পত্র।

অবশেষে নোবেল শান্তি পুরস্কার এল। এবং সেই পুরস্কার পেলেন মারিয়া কোরিনা মাচাদো। কে এই মারিয়া কোরিনা মাচাদো? ভেনেজুয়েলার সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘ ‘সংগ্রাম’-এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর মতো রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রায় ভেনেজুয়েলা আক্রমণ করার আহ্বান জানানো। বলা বাহুল্য, এই পুরস্কারের পর থেকেই নানাভাবে উত্তাপ বাড়তে থাকছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে।
ডানদিক-বামদিক, মামদানি ও লাতিন আমেরিকা
সাম্প্রতিকের বিশ্বরাজনীতিতে সবচেয়ে বড় চমক, জোহরান মামদানির নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হওয়া। খোদ ট্রাম্প যাঁকে ‘কমিউনিস্ট’ বলে চিহ্নিত করেছেন, ডেমোক্র্যাট হয়েও সরাসরি বাম রাজনীতির প্রচারক যিনি, যিনি বলেন নেতানিয়াহু নিউ ইয়র্কে প্রবেশ করলে তাঁকে গ্রেফতার করবেন, তাঁকে কিনা খোদ মার্কিন মুলুকের মানুষই নির্বাচনে জিতিয়ে আনছেন। ট্রাম্পের যাবতীয় বিষোদগার যদিও গলে জল হয়ে গেছে মামদানি হোয়াইট হাউসে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর। মীরা নায়ারের পুত্র, উগান্ডার নাগরিক, অধ্যাপক মাহমুদ মামদানির পুত্র জোহরান মামদানি নানা কারণে মার্কিন রাজনীতিতে স্বতন্ত্র স্বর হয়ে উঠেছেন।


অন্যদিকে চিলে-তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বামপন্থী জেনেট হারাকে পরাজিত করে জয়ী হলেন অতি-দক্ষিণপন্থী হোসে আন্তোনিও কাস্ট। বিপুল ভোটেই জয়ী হয়েছেন কাস্ট। লাতিন আমেরিকায় বামপন্থী আন্দোলনের পরাজয়ের আভাস নানাভাবেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে বক্তব্য অনেক তাত্ত্বিকেরই।
গণঅভ্যুত্থানের নতুন ব্যাকরণ
২০২৫ অভ্যুত্থানের বছর। কখনও কেনিয়া উত্তাল হয়েছে দেশজোড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে। কখনও তুরস্কে এরদোগানের বিরুদ্ধে পথে নেমেছে মানুষ পিকাচু বা ব্যাটম্যান সেজে। নেপালে তথাকথিত জেন জি উত্তাল করেছে দেশ, পথে নামিয়ে এনেছে সরকারকে। যদিও নিন্দুকরা বলেছেন, ২০২৪-এর বাংলাদেশের মতোই, এই আন্দোলনের শুরু স্বতঃস্ফূর্ত হলেও পরে তা পরিচালিত হয়েছে কিছু স্বার্থান্বেষী শক্তির দ্বারা। পেরু, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স সর্বত্র নানাবিধ অভ্যুত্থান ঘটেছে। কিন্তু প্রতিটা অভ্যুত্থানের ছক আলাদা। থাইল্যান্ডে মিম হয়ে উঠছে বিদ্রোহের চিহ্ন, তো নেপালে সরকারি ভবনে ঘটছে অগ্নিসংযোগ। বিশেষ করে জেন জি-র রাজনীতি নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়ের নানা পরত। তবে জেন জি-র মানসপট এখনও অস্পষ্টই।
যুদ্ধ ও গৃহযুদ্ধ
২২ এপ্রিল, ২০২৫। ভারতের ইতিহাসের কালো দিনের তালিকায় আরও একটি সংযোজন। পহেলগাঁও-এ সন্ত্রাসবাদী হামলায় নিহত হলেন ২৬ জন ভারতীয় নাগরিক। তৎক্ষণাৎ চেনা বিভাজনের অঙ্ক কষা শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেই বিভাজনের নাট্য বদলে গেল দ্বিপাক্ষিক সংঘর্ষের মাত্রায়। ভারত সরকারের ‘অপারেশন সিঁদুর’ (৭ মে থেকে শুরু) হয়তো সফল হল, হয়তো কর্নেল সোফিয়া কুরেশি বা উইং কম্যান্ডার ভোমিকা সিং-রা সাংবাদিক সম্মেলনে এসে সম্প্রীতির বার্তা দিলেন। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়া কী করল? সরকারের বদলে যুদ্ধ তারাই ঘোষণা করল। আতঙ্ক ছড়ানো হল নির্বিচারে। এই সুযোগে বিভেদের বীজ বপন করা হল সযত্নে। সাতপাঁচ না ভেবেই দেশের নাগরিকদের একাংশ ‘যুদ্ধ যুদ্ধ’ হুংকার ছাড়ল। অর্থনীতির কী দশা হবে, জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে কি না, এসব নিয়ে দ্বিতীয় চিন্তা না করেই।


আর দেশের ভেতর কী ঘটে চলল? বাঙালি অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর এন্তার আক্রোশ, বাংলা ভাষাকে সরাসরি কেন্দ্রীয়ভাবে নিশানা করা। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন, বা এসআইআর শুরু হল দেশজুড়ে। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলার মাঝেই দেখা গেল অতি-প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ। সোনালি বিবিকে পাঠিয়ে দেওয়া হল বাংলাদেশে। সোনালি বিবি অন্তঃসত্ত্বা, সোনালি বিবি ভারতীয় নাগরিক। সোনালি বিবি নানা লাল ফিতের ফাঁস পেরিয়ে ফিরলেন বটে, কিন্তু নাগরিক হিসেবে এই ক্ষত তাঁর পাওনা ছিল? ত্রিপুরার ছাত্র, ২৪ বছরের অ্যাঞ্জেল চাকমা গণনিগ্রহে নিহত হওয়ার আগের মুহূর্তে বললেন, আমি ভারতীয়, চিনা নই। একথা তাঁকে বলতে হল। জাতি, ভাষা, ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে যে জাতীয় ঐক্য নিয়ে যুদ্ধের সময় বড়াই করা হল, তার আদত বাস্তবটা কি তবে এটাই?




