প্রিয় সুবিমল: পর্ব ১৩

‘ফালগুনীকে হাংরি আন্দোলনে নিয়ে এসেছিল সুবিমলই’— মলয় রায়চৌধুরী কথাটা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে বলেছিলেন, না তাঁর কোনও লেখায় পড়েছিলাম, মনে পড়ছে না। তবে ফালগুনী রায়ের সঙ্গে সুবিমল বসাকের ঘনিষ্ঠতার কথা চর্চিত। হাংরি জেনারেশনের প্রথম পর্বের সদস্য নন ফালগুনী, (জন্ম ১৮৪৫)। ১৯৬৫ সালে, সুবিমল-মারফত আন্দোলনে প্রবেশ তাঁর। সুবিমল লিখছেন—
‘জেব্রা ১ম বার হবার পর, একদিন, তখন বিকেল, ফাল্গুনী এসে হাজির আমার আস্তানায় যেহেতু যোগাযোগের ঠিকানা ঐ। …মনে পড়ে, সেদিন ফাল্গুনীকে নিয়ে শেয়াল-দা ষ্টেশনে বসে অনেকক্ষণ গল্প করি। ফাল্গুনী সদ্য পাঠ-সমাপ্ত কবিতা গোছা থেকে ১টি কবিতা দেয়, মাত্র ১টি কবিতা। জেব্রা-২ সংকলনের প্রস্তুতি চলছিল, এবং ওই কবিতা ছাপা হয়। পরে আমাদের অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে।’

মলয় রায়চৌধুরী সম্পাদিত জেব্রা-২ পত্রিকায় ফালগুনীর কবিতা ‘অন্‌ডো-কোষ-এ ঝলোমলো দিন’ প্রকাশিত হয়। আশ্চর্যের বিষয়, সুবিমলের বিপুল পত্রসংগ্রহের ভাণ্ডারে, ফালগুনীর একটিমাত্র চিরকুট খুঁজে পেয়েছি— তারিখ লেখা না-থাকলেও, আন্দাজ, ১৯৬৫ সালের নভেম্বর মাসের কোনও-এক মঙ্গলবার।

মাননীয় সুবিমল বাবু,

   এসেছিলুম, আপনি নেই। ‘জখম’ পড়ে যথার্থই জখম হয়েছি (ভাবার্থে)। আমার ‘শিব’ (কোন কোন মানুষেরা কামাতুর জীব) কবিতাটা জেব্রার ডোরাকাটা দাগ হবে কি? ‘জখম’-এর একটা রিভিউ লিখেছি— কি করব’।

শ্রীফাল্গুনী রায়
৩০, রতন বাবু রোড,
কলিকাতা – ২

একই চিরকুটের উল্টোপিঠে লেখা— ‘দরজায় তালা, তাই।’

জখম— মলয় রায়চৌধুরীর কাব্যগ্রন্থ, প্রকাশ পায় ১৯৬৫-র জুনে। ফালগুনী সুবিমলের বাড়িতে এসে তাঁকে না-পেলে, মাঝেমধ্যেই চিরকুট রেখে যেতেন। এটি তেমনই এক। কিন্তু বাকি চিঠিগুলি কই? আর কি পত্রবিনিময় হয়নি তাঁদের?

কফি হাউসের নীচে, কেন সুবিমল বসাকের গায়ে হাত তুলেছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়? পড়ুন: প্রিয় সুবিমল পর্ব ১২

খুঁজতে-খুঁজতে পাওয়া গেল আরও কয়েকটি বয়ান। ১৯৯৫ সালে, সমীর রায়চৌধুরী সম্পাদিত ‘হাওয়া ৪৯’ পত্রিকায় সুবিমল ফালগুনীকে নিয়ে একটি গদ্য লিখেছিলেন। সেই গদ্যেরই মধ্যে-মধ্যে উল্লিখিত রয়েছে কয়েকটি চিঠি। চিঠিগুলি সম্ভবত সমীর রায়চৌধুরীকে দিয়ে দিয়েছিলেন সুবিমল, তাই তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, সুবিমলের গদ্যটি পরবর্তীতে বিভিন্ন জায়গায় পুনর্মুদ্রিত হলেও, সচেতনভাবেই বাদ দেওয়া হয়েছে ফালগুনীর চিঠিগুলি। বর্তমান পর্বে, পত্রিকার পাতা থেকে, সেই চিঠিগুলি পর-পর তুলে ধরা হল—

১।

সোমবার, কুড়ি তারিখ
(ডিসেম্বর ৬৫)

মাননীয় সুবিমলবাবু,

   চিঠি পেয়েছি। গত সপ্তাহে পাটনা গেছিলুম। বোনের বিয়েতে। উত্তর দিতে দেরী হলো। আমি ‘জেব্রার ওপর কিছু লিখিনি, লিখেছি জখম এর ওপর। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের আলংকারিক বামন-এর একটি প্রবচনের ভিত্তিতে আমি জখমকে আলোচনা করেছি, মূল বক্তব্য: যদি মলয়বাবু শ্রীঘরে যেতে বাধ্য হন তবে সমরেশ বসু (বিবর) এবং বনফুল (তীর্থের কাক) কেন নির্বিবাদে বাড়িতে বসে দাড়ি কামাবেন, সেলের সোঁদা গন্ধ তাঁরাই বা শুকবেন না কেন? যাক গে, কেসের জাজমেন্ট কাদের প্রতিকুলে? বাইরে ছিলুম, সময়মত খবর সংগ্রহ করতে পারিনি। ফলাফলটা জানতে পারলে অযাচিত কৌতূহল দমিত হতে পারে, আর একটা কবিতা লিখেছি, খালি পড়ানোর জন্য আপনার কাছে যেতে ইচ্ছে করছে। কবে গেলে সুবিধা হবে, কবিতার নাম: শ্রীকৃষ্ণের স্বনির্মিত শ্লোক। আমি কাল (রবিবার) দুপুরে আপনার বাড়ি গিয়ে দেখি তালাবন্ধ, সামনের ভিৎটায় কতগুলো সদ্যলোক ব্যাডমিন্টন খেলছিল। মলয় রায়চৌধুরীর ঠিকানাটা পেলে ভাল হয়। এবং কোন বইয়ের জন্য তিনি অভিযুক্ত হয়েছিলেন, জানাবেন কি? আর নয়, আজ চলি।

৩০, রতনবাবু রোড শ্রীফাল্গুনী রায়
কাশীপুর, কলিকাতা – ২ 

২।

প্রিয় সুবিমল দা,

   অনেক খুঁজে আপনার বাড়ি পেলুম— ডানলপ থেকে হেঁটে এসেছি— বুঝতেই পারছেন tired as a stone: আপনার সংগে একদম দেখা হচ্ছে না— সুভাষের কাছে শুনলুম পর্শু নাকি সলিড খেয়েছেন— আমি ঐ দিন সাড়ে সাতটা নাগাদ কফি হাউসে গিয়েছিলুম— আজো কিন্তু দ্যাখা হ’ল না— আজ চলি

ফাল্গুনী রায়

৩।

সুবিমল বসাক সমীপেষু,

আমি এসেছিলুম, ডায়ারী আর কিছু খুচরো কবিতা ছিল আপ্নার কাছে সেগুলোর দর্কারে। বাড়ী যাচ্ছি। (কি মশাই, তুষার রায়ের গল্প-র চরিত্র হয়ে গ্যালেন? গল্প-কবিতা জুন দ্রষ্টব্য), দুটো চার্মিনার ছিল, শেষ করে দিয়েছি। অমৃত’য় বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধটা পড়ে ফেল্লুম, ভাল লাগলো। উন্মার্গ ২/১ টা দর্কার ছিল। কেমন আছেন? আমি কলকাতার সংগে ক্রমেই যোগাযোগ শূন্য হয়ে গ্যাঁজা আর সিদ্ধির মৌতাতে সন্ধে রাত কাটাচ্ছি বরানগর কাশীপুরে— প্রেম/ফাল্গুনী

সুবিমল বসাকের আঁকা ফালগুনী রায়ের স্কেচ

শেষ দুটি চিঠিতে সময়ের উল্লেখ না-থাকলেও বোঝা যায়, ষাটের দশকেই লেখা। ফালগুনীর ‘শ্রীকৃষ্ণের স্বনির্মিত শ্লোক’ কবিতাটির কোনও হদিশ পাওয়া গেল না— ওঁর সমগ্রেও নেই। তবে সুবিমলের কাছে ফালগুনীর সাতটি অপ্রকাশিত কবিতা সংরক্ষিত ছিল, যা হাওয়া ৪৯-এর ওই সংখ্যায় প্রকাশ পায় ও পরবর্তীতে ‘ফালগুনী রায় সমগ্র’-র অন্তর্ভুক্ত হয়। এ ছাড়াও আরেকটি চিঠির উল্লেখ করা যেতে পারে। ঠিক চিঠি নয়, কার্ড বা নিমন্ত্রণপত্র। হলুদ রঙের, ছাঁদটি বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রের। ১৯৬৮ সালে, সুবিমল বসাক সম্পাদিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ পত্রিকার তৃতীয় সংখ্যার প্রকাশ-সংক্রান্ত।

শ্রীশ্রী হাংরি জেনারেশনায় নমঃ

সবিনয় নিবেদন,

   আগামী ১৮ই চৈত্র ১৩৭৪ (ইং ১লা এপ্রিল ১৯৬৮) সোমবার আমার প্রজন্মের গদ্য-লেখক সুবিমল বসাকের সম্পাদনায় হাংরি জেনারেশনের পত্রিকা ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র তৃতীয় সংকলন প্রকাশ উপলক্ষে এসপ্ল্যানেড চাতালে রাত্রি ১০।।০ ঘটিকায় এক রাজকীয় অরগি অনুষ্ঠিত হইবে।

অতএব মহাশয়/মহাশয়া অনুগ্রহপূর্বক উক্ত রাত্রিতে স্বস্ত্রীলোক/স্বস্বামী চাতাল-চক্রে উপস্থিত হইয়া অপ্রত্যাশিত কাৰ্য্য সম্পন্ন করাইয়া বাধিত করিবেন।  পত্রদ্বারা নিমন্ত্রণের ত্রুটি মার্জনা করিবেন।

দুর্বিনীত—
ফাল্গুনী রায়

সুবিমলের ডায়েরিগুলি কালানুক্রমিকভাবে সাজালে, ১৯৬৭-৬৮র খণ্ডগুলিতে ফালগুনী-প্রসঙ্গ ভুরি-ভুরি। তবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি বছরের ডাইরি— ১৯৬৯-১৯৭৩ সালের, খুঁজে পাইনি। ফলে, শুধু ফালগুনী নন, ওই কালপর্বের আরও অনেকের প্রসঙ্গই অধরা থেকে যায়। ১৯৭৪-১৯৮১র খণ্ডগুলিতে ফালগুনীর প্রসঙ্গ নগণ্য— প্রায় নেই বললেই চলে। বোঝা যায়, সে-সময়ে যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে এসেছিল উভয়ের। ১৯৬৭ সালের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরা যেতে পারে (৪.১)—
‘সন্ধ্যার সময় ফাল্গুনী রায় এসেছিল। সেই দাড়িময় মুখ। গতকাল এসেছিল দেখা হয়নি। পাটনা থেকে ফিরেছে, মলয়ের কাছ থেকে কিছু কিছু বই পড়েছে। ওঁকে আমি সঙ্গে নিয়ে গেলাম কফিহাউসে— সামনেই তুষার ছিল।  তুষারের ও ছোট ভাই। ওঁকে সঙ্গে দেখে তুষার আজ বিশেষ কথা বললো না। ‘কেমন আছেন?’ লক্ষ করলাম, ফালগুনীও কেমন এমব্রাশিং বোধ করছে। ফাল্গুনীর একটি কবিতা এবার জেব্রায় যাচ্ছে।’

কবি তুষার রায়, ফালগুনী রায়ের দাদা। দু-ভাইয়ের মধ্যে বিশেষ বনিবনা যে ছিল না, তার উল্লেখ বিভিন্নজনের লেখায় মেলে। ১৯৬৮-র ডাইরি পড়ে বোঝা যায়, ফালগুনীর প্রতি সুবিমল কিঞ্চিৎ ক্ষুব্ধ ও অভিমানী, কারণ শৈলেশ্বর ঘোষ-সুভাষ ঘোষেদের ‘ক্ষুধার্ত’ পত্রিকার সঙ্গে তাঁর সংযুক্তি। তবে তার মধ্যেও খালাসিটোলায় উভয়ের নেশার মৌতাত চলছিলই। ডায়েরি থেকে ফালগুনী-সংক্রান্ত আরেকটি প্রসঙ্গ তুলে ধরা যেতে পারে—

১৪.০৭.৬৮
সকালে ফালগুনীর বাসায়। ও জানালো, কাল অনেক কিছু ঘটে গেছে। খালাসীটোলায় সুভাষ, দেবী, শৈলেশ্বর, ফালগুনী ছিল— কফিহাউস থেকে গেছে।
…তারাপদ দায় ‘কয়েকজন’ নিয়ে এসেছিল। বলে— আমি H.G. থাকলে ওর shape আলাদা নিত। শৈলেশ্বর বলেছে— সে যোগ্যতা নেই। ফালগুনী বলেছে— উইথড্র করুন কথাটা।
তারাপদ বলে— সুনীল শেষ ভদ্রলোক, শক্তি শেষ legend ইত্যাদি। সব উইথড্র করতে বলে। কয়েকজন-এর জন্য লেখা চেয়ে বলে তারাপদ— অশ্লীলতা না-থাকলে ছাপবো। সুভাষ খুব কৌতুহলী হয়েছিল। সম্ভবতঃ ও লেখা দেবে।

ফালগুনী-সুবিমলের সম্পর্ক বুঝতে, ডায়েরির এই অংশেও নজর দেওয়া যাক—

৩০.০৭.৬৮
ফালগুনী এল রাত্রে— নেশাগ্রস্ত অবস্থায়। ও একটা লেখা পড়ে শোনালো। বেশ ২ দিকে নৌকায় পা রেখে এগিয়ে চলেছে। আমি চাইনা, ফালগুনী আমার তাঁবেদারীতে থাক— কিন্তু, আমার সঙ্গে ‘বিট্রে’ যেন না করে। ওর ঐ চালাকী গুলো সত্যি খারাপ লাগে। তবুও হয়তো ওর প্রতি আমার ভালোবাসাবোধ আছে। আমার ব্যক্তিগত কিছু খবরও ওকে আমি বলেছি। এসেই নেশার বস্তুর খোঁজ করে— কিছু নেই। বাড়ীতে ওঁকে আজ অনেক কিছু বলেছে— ওঁর ১টা চাকরীর দরকার। লিখে যাচ্ছে অনেক। তবে, ওঁর লেখায় প্রায় একঘেয়েমি এসে যাচ্ছে মনে হয়। 

ফালগুনী রায় মারা যান ৩১ মে, ১৯৮১ তারিখে, প্রায় নীরবেই। সুবিমল সে-খবর পান প্রায় মাসখানেক বাসে, ২৮ জুন, বাসুদেব দাশগুপ্তের কাছ থেকে। ২৫ জুলাই, রতনবাবু ঘাট শ্মশানে, ফালগুনীর স্মরণসভা আয়োজিত হয়। সেই উপলক্ষে ছাপানো হয় একটি লিফলেটও। আহ্বায়ক সুভাষ ঘোষ। লিফলেটে লেখা ছিল, উপস্থিত থাকবেন ফালগুনীর বন্ধুরা— ‘শৈলেশ্বর, প্রদীপ, বাসুদেব, সুবো, সুবিমল, আপ্পা, অরুণেশ, সেলিম, জীবতোষ, অরুণ, সূর্য, কমলেশ বৈদ্য প্রমুখরা সমবেত হবেন ও স্মরণ করবেন তাঁদের হারানো স্বজনকে’। ওই লিফলেটের পিছনে সুভাষ ঘোষের চিঠি, এসে পৌঁছেছিল সুবিমলের ঠিকানায়—

প্রিয় সুবিমল,

   কফিহাউসে বা কলেজষ্ট্রীট পাড়ায় তোমাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি, দেখা পাইনি। শনিবারে আসছ নিশ্চয়ই। প্রীতি নিও

সুভাষ 

সুবিমল চিঠিটি পান ঠিক আগের দিন— ২৪ জুলাই। ওদিনের ডায়েরিতে লেখা— ‘…সুভাষের চিঠি পেলুম। কফি হাউস, কলেজ স্কোয়ারে আমার খোঁজাখুঁজি— পায়নি। শনিবার যেতে বলেছে। আমি যাবো ঠিক করেছি। কাল আবার একগাদা programme-এ ঠাসা। যাই হোক, আমি যাবো। সেদিন ফাল্গুনীর কয়েকটা কবিতা (unpublished) পেয়েছি।’

সুবিমলের সংগ্রহে একটি ছবি দেখেছিলাম অনেক বছর আগে— কয়েকজন ব্যক্তি বসে আছেন মাটিতে। ছবিটির পরিচয় জানতে চাওয়ায় সুবিমল জানিয়েছিলেন, ছবিটি তাঁরই তোলা, শ্মশানে, ফালগুনীর স্মরণসভায়। উল্লেখযোগ্য বোধে, সেই ছবিটিও সংযুক্ত করা হল এই পর্বে।

এরপর যে-ব্যক্তির চিঠি আলোচিত হবে, তিনি কবি অরুণ বসু। সুবিমলের সংগ্রহে অরুণের অনেকগুলি চিঠি পেলেও, এই পর্বে মাত্র তিনটি তুলে ধরা হল। প্রসঙ্গত, চিঠিগুলির অধিকাংশই ‘সম্পাদক’ অরুণ বসুর; ‘অজ্ঞাতবাস’ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন তিনি। আলোচ্য চিঠি তিনটি ১৯৭১-৭২ সালের; ওই সময়কালে সুবিমলের ডায়েরি খুঁজে না-পাওয়ায়, অপরপক্ষের ভাবনাচিন্তা বুঝতে পারা মুশকিলই। তবু, রইল…

দণ্ডপাণিতলা, নবদ্বীপ, নদীয়া

প্রিয় সুবিমল বসাক,

   চিঠি লেখার অভ্যাস একেবারেই না-থাকায় আপনাকে উত্তর দেওয়া হয়নি বলে আমি কিছুটা লজ্জিত। অজ্ঞাতবাস এবং আমার কবিতা সম্পর্কে আপনার সাথে আমিও একমত। এখনো সেরকম উল্লেখযোগ্য কিছু লিখতে পারিনি— আসলে যা আমি লিখতে চাই। আর কিছুদিন চেষ্টা ক’রে আমি বোধহয় লেখাটেখা ছেড়ে দোব। যাই হোক— সে সব এখনো দূরের ব্যাপার। আপনি পুজো অজ্ঞাতবাসে “কৃত্তিবাস, কৃত্তিবাসের পরের কবিতা বনাম হাংরি কবিতা”-এর ওপর একটা গদ্য লিখে দিন। মহালয়ার মধ্যেই কাগজ বেরোবে— সেই রকম হিশেব ক’রে যতোটা সম্ভব তাড়াতাড়ি লেখা রেডি ক’রে পাঠিয়ে দিন। আপনার সমস্ত লেখাই অত্যন্ত আন্তরিক এবং বিশ্বস্ত, আমি অনেক দিন থেকে লক্ষ্য করছি। লেখাটা তৈরি ক’রে অবশ্যই পাঠাবেন। না-পাঠালে এবারও পত্রিকার মান সঠিক বজায় রাখা যাবে না। খোলাখুলি সব লিখলাম।
  আশা করি ভালো আছেন। শৈলেশ্বর ঘোষকে আমাদের একজন হ’য়ে আপনি একটা কবিতা পাঠাতে বলে দেবেন। নানা কারণে বিশ্বাস করুন কোথাও আমার চিঠি লেখা হ’য়ে ওঠে না। ওঁকে আমার কথা বললেন— আমরা তো প্রায় একই যন্ত্রণার মানুষ।
  আপনি আমার আত্মীয়তা জানুন।

অরুণ
২৬/৭/৭১

অরুণ বসু-র অনুরোধ মাফিক গদ্যটি লেখেননি সুবিমল। তবে যে-জবাব দিয়েছিলেন, সেই চিঠিটি মুদ্রিত ‘অজ্ঞাতবাস’-এর পৌষ ১৩৭৮ সংখ্যায়। সেখান থেকেই তুলে ধরা হল—

১৮, বিবেকানন্দ নগর
কলকাতা – ৫৬

কলকাতা/ ২ আগষ্ট ১৯৭১

প্রিয় অরুণ বসু,

   ‘কৃত্তিবাস, কৃত্তিবাসের পরে কবিতা বনাম হাংরি কবিতা’— এর ওপর গদ্য! মাই গড! এরকম একটা বিষয়ের উপর, আমার মনে হয়, এমন একজনকে দিয়ে লেখান— যে কোনদিন কৃত্তিবাস বা হাংরি জেনারেশনে লেখেন নি। ঐ রকম কাউকে লেখার ভার দিলে নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে। সমালোচনা বা আলোচনা যে এক নয়, তাতো জানেনই। তবে, অ্যাকাডেমিক লেখক নয়, প্রকৃত সৎ এবং দুঃসাহসী লেখকের প্রয়োজন। বাংলাদেশে অধিকাংশই তো ধামাধরাশ্রী, কফিহাউসেই তাদের আপোষহীনতা এবং বুর্জোয়া এস্টাব্লিশমেন্টের বিরুদ্ধে জেহাদ শোনা যায়।
  কৃত্তিবাসের কবিদের কি হাল লক্ষ্য করেছেন! ঘাড়গর্দান ফুলিয়ে তারা স্রেফ কোচাঝেড়ে রেডিয়ো স্টেশনে যাচ্ছে-আসছে। এবং যারা এখনো যায়নি, ‘বিদ্রোহ’ ‘বিদ্রোহ’ চেঁচাচ্ছে ও আড়ালে যুক্তি তৈরি করে রাখছে, কখন, কোন মুহূর্তে আঙুলের ইশারা পেলেই ছুটে যাবে, তারপর… তারপর… কুমড়ো বা টোমাটো কবি হওয়া ছাড়া কোন লোভ থাকবে না। শত্রুসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেই বুঝতে পারবেন, কাছায় টান পড়েছে। আপনি পত্রিকা বার করে যান। দরকার পড়লে ব্লাডব্যাঙ্ক থেকে ইনস্টলমেন্টে টাকা আদায় করুন। রক্তের ব্যবহার এভাবেই আরম্ভ করে দেয়া যাক্।
আমার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস রইলো।

সুবিমল বসাক

পরের চিঠিটি, তারিখ দেখে মনে হয়, সুবিমলের ওপরের চিঠিরই জবাব, অর্থাৎ একই ধারাবাহিকতার—

প্রিয় সুবিমল বসাক,

   এই মাত্র আপনার চিঠি পেলাম। লক্ষ্য করার মতো চিঠি। আমার পড়াশুনো খুবই কম, ফলে অনেক কথাই বুঝতে পারি না। যেমন আপনার চিঠির শেষ দিকটা আমি বুঝতে পারলাম না। আপনি নিজে থেকে একটা বিষয়বস্তু ঠিক করে নিয়ে লিখুন না! আমি ছাপবো। আপনার লেখা আমার ব্যক্তিগতভাবে ভালো লাগে। আপনার লেখা পেলে আপনার অহঙ্কারের চেয়ে পত্রিকার অহঙ্কার বেশি বাড়বে, আমি বিশ্বাস করি, বিশ্বাস করুন।
  আবার বলছি, আমার পড়াশুনো বড়ো কম, ভারি-ভারি কথাবার্তা আমি ধরতে পারি না। আমার এই অক্ষমতার জন্য আমি সবসময় আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। পাঁচজন লেখকের মতো আমিও— আমার লেখায় কোনো ‘বিদ্রোহ’ সৃষ্টি করতে এপর্যন্ত পারিনি। নানা কারণে আমি নিজেকে নিয়ে লজ্জিত— এর পরও যদি আপনারা আঘাত করেন তাহলে আমার রক্তের আর কোনো ভাষাই থাকবে না।
  আপনি কিছু লিখুন— অজ্ঞাতবাসের জন্য, নিজের মনের মতো ক’রে।
  অকৃত্রিম ভালোবাসা।

অরুণ
৪.৮.৭১

এরপর, বছরখানেক পরের একটি চিঠিতে নজর দেওয়া যাক—

প্রিয় সুবিমল,

   অজ্ঞাতবাস: ১১র কাজ এখনই শুরু করতে চাই। আপনার লেখা কবে নাগাদ পেতে পারি জানান। পৃষ্ঠা সংখ্যার জন্যে ভাববেন না। প্রয়োজন হলে একটাই মাত্র ভালো লেখা নিয়ে ‘অজ্ঞাতবাস’ বেরোবে। আপনি লেখা শুরু করুন। অজ্ঞাতবাস একটা সুনির্দিষ্ট এবং সুস্পষ্ট চরিত্র গ’ড়ে তুলুক এটা আমি চাই। নিজের সৎ-প্রচেষ্টা এবং বন্ধুদের আন্তরিক সহযোগিতার অভাব আমি অনেকদিন থেকে বোধ করছি। এবং এছাড়া নিজের লেখার ধার সম্পর্কেও আমি সজাগ। এর পরে হয়তো আর ‘নিছক প্রেমের পদ্য’ আমি লিখবো না। এই ধরণের নিছক লেখাগুলোর জন্য আমি সত্যিই লজ্জিত। কিন্তু, এছাড়া যে আমার কোনো উপায় ছিলো না, বিশ্বাস করুন! আমি এমনই একটা ভয়ঙ্কর সুন্দর কুৎসিৎ জায়গা থেকে উঠে আসছি…।
  আশা করি ভালো আছেন। ভালোবাসা জানাচ্ছি।

অরুণ
৭.৭.৭২

লেখা নিয়ে আত্মসংশয়ের ছাপ তাঁর একাধিক চিঠিতে। অরুণ বসুর কবিতাসংগ্রহ-র সম্পাদক গৌতম মণ্ডলের ভূমিকা অনুযায়ী, লেখালিখি শুরুর ১৭ বছর পরে প্রথম কাব্যগ্রন্থ বের করেন অরুণ; পরবর্তীতে সেই বইয়েরও অধিকাংশ কবিতা অস্বীকার করেন। প্রথম পর্বের সেই সংশয় ও দ্বন্দ্বেরই আভাস পাওয়া যায় সুবিমলকে লেখা চিঠিগুলির একাংশে, আর সে-কারণেই এগুলি গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয় যে-ব্যক্তির চিঠি দিয়ে আজকের পর্ব শেষ করব, তিনি কবি কবিরুল ইসলাম। হাংরিরা বিভিন্নজনকে তাঁদের বই ও পত্রিকা পাঠাতেন, পাঠিয়েছিলেন কবিরুলকেও। সুবিমলকে লেখা প্রাপ্তিস্বীকারই মূলত এই চিঠির বিষয়বস্তু।

Kabirul Islam
Department of English,
Suri Vidyasagar College,
P.O. Suri, Dt. Birbhum

সিউড়ি
১১.১১.৬৫

সবিনয় নিবেদন

   শ্রী মলয় রায় চৌধুরী প্রণীত তিনখানি গ্রন্থ যথাসময়ে পেয়েছি। অনুগ্রহ পূর্বক যে এগুলি আমাকে পাঠিয়েছেন এজন্য অশেষ ধন্যবাদ জানাই। সুযোগমতো এগুলি পড়ে আমার মতামত যথাসময়ে আপনাকে জানাচ্ছি। বারদুই ইতিমধ্যে পড়ে ফেলেছি কিন্তু এই মুহূর্তে কোনো মতামত তৈরি হয়ে ওঠেনি। খুবই শক্ত ব্যাপার।
  শ্রীমলয় রায় চৌধুরী সম্পাদিত ‘জেব্রা’ সংক্রান্ত পোষ্টকার্ড পেয়েছি। ‘জেব্রা’ সম্পর্কে আমি উৎসাহ নিয়ে আছি। সম্ভব হলে আমাকে পাঠাবেন। আমি দাম পাঠিয়ে দেব। বুক পোষ্টে পাঠালেই চলবে। এইভাবে আমাকে নিয়মিত পাঠাবেন। এমন আর্থিক অসুবিধের মধ্যে সারাক্ষণ থাকতে হচ্ছে যে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বার্ষিক চাঁদা পাঠিয়ে গ্রাহক হতে পারছিনে না। প্রতি সংখ্যা আমাকে পাঠানো হলে আমি অবশ্যই দাম পাঠিয়ে দেব।
  আশা করি আপনি কুশলে আছেন।
  চিঠি দেবেন।

নমস্কারান্তে
কবিরুল ইসলাম

পুনশ্চ।। একটি মেয়েলি কৌতূহল: আমার ঠিকানা পেলেন কোথায়? কোলকাতা গেলে কখনও আপনাদের সঙ্গে আলাপ হলে খুবই আনন্দিত হবো।

তখনও পর্যন্ত মলয়ের তিনটি কবিতার বই বেরিয়েছিল— ‘আমার অমীমাংসিত শুভা’, ‘শয়তানের মুখ’ ও ‘জখম’। এই বইগুলিই কবিরুলকে পাঠিয়েছিলেন সুবিমল। পরবর্তীতে, মলয় কবিরুলকে পাঠান সুবিমলের ‘ছাতামাথা’ উপন্যাসটি। সেটি পড়ে কবিরুল যে-জবাব দিয়েছিলেন (৭.১২.৬৫), তার অংশবিশেষ তুলে ধরা হল—
‘ছাতামাথা গ্রন্থটি আমার পক্ষে রিভ্যু করা অসাধ্য কাজ কেননা যে বিশেষ আঞ্চলিক ভাষায় গ্রন্থটির কথা-শরীর রচিত তার সূক্ষ্মতা, ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্য আমার কাছে একার্থে দুর্গম। দেখেছি, আঞ্চলিক ভাষা মাত্রেই কাব্যধর্মী এবং একমাত্র কবিতা— লিভিং পোয়েট্রি । পুরুষানুক্রমে পশ্চিমবাংলার বীরভূমে আমাদের বসবাস। কাজেই এই বাঙাল ভাষায় আমার প্রবেশ নিষেধ প্রায়। সেক্ষেত্রে এই গ্রন্থটির মূল্যায়ন? আমার আয়ত্তের বাইরে। তবে ছাতামাথা আমি আদ্যন্ত রুদ্ধশ্বাসে পড়েছি, বুঝেছি, অগ্নিমুখ আন্তরিকতা শিল্পীর এই প্রাথমিক শর্তে  গ্রন্থটি চিহ্নিত। এই শর্তে তিনি নক্ষত্রভেদে সমর্থ। একটি অনুচ্চারিত-পূর্ব স্বগতোক্তি। কবিতার সংগোত্র।’

‘ছাতামাথা’ আরও অনেককেই পাঠানো হয়েছিল। জবাবি চিঠির সূত্রে হদিশ মেলে তাঁদের। এমন সব ব্যক্তির নাম সে-তালিকায়, দেখে চমকে উঠতে হয়। পরবর্তী কোনও পর্বে আলোচিত হবে চিঠিগুলি…

(ডায়েরি ও চিঠির বানান অপরিবর্তিত)
ছবি সৌজন্যে: তন্ময় ভট্টাচার্য