আইনস্টাইনের আরামকেদারা
প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু। সুকুমার রায়ের গল্প ‘হেঁশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি’ থেকে অনুপ্রাণিত এই চরিত্র, জানিয়েছেন স্রষ্টা সত্যজিৎ রায়। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস, দৈবক্রমে যদি অ্যান্ডরের সঙ্গে তাঁর আলাপ হত, তবে এরকম আরও একটি তাক লাগানো চরিত্র পেতেন বাংলার পাঠক। বাক্তিগতভাবে আমার সৌভাগ্য নিউ জার্সি প্রবাসী ড. নূপুর লাহিড়ির বন্ধু অ্যান্ডরকে কাছ থেকে চেনা। আদতে জার্মান হলেও মার্কিন নাগরিক অ্যান্ডরের আসল নাম অন্য কিছু। কিন্তু শঙ্কু যেমন সত্যিই কোনও বাঙালির পদবি হয় না, তেমনই অ্যান্ডর নামটাও অলীক, নিজেই নিজেকে দিয়েছে প্রৌঢ় বয়সে পৌঁছে, কারণ সে উপলব্ধি করেছে, ‘অ্যান্ড’ এবং ‘অর’ হল পুরো ইংরেজি ভাষার সারমর্ম। বিষয়টি কোনভাবেই তর্কাতীত নয়, কিন্তু এ-বিষয়ে প্রশ্ন তুলে দীর্ঘ রাত আমার ঘুমহীন কেটেছিল নূপুরদির শান্তিনিকেতনের বাড়ির বারান্দায়, বছর ত্রিশেক আগে। তারপর আর কখনও এই দুঃসাহস করিনি। এমনকী, নূপুরদির সঙ্গে কলকাতায় ছুটি কাটাতে এসে ‘পদ্মাবত’ সিনেমা দেখার প্রস্তুতি হিসেবে গভীর মনোযোগে উইলিয়াম ডালরিম্পলের বই পড়ার বাড়াবাড়ি দেখেও অ্যান্ডরকে প্রশ্ন করিনি। অতএব, নিউ জার্সিতে গিয়ে বৃদ্ধ সাহেবের সঙ্গে পাঙ্গা নেওয়ার মানেই হয় না। ওর বাড়িতে যাওয়া ওর মিউজিয়ামটা দেখার লোভে। সেজন্য অবশ্য লাঞ্চে অ্যান্ডরের প্রিয় গোট চিজ (বোটকা গন্ধ লাগে আমার) সহযোগে পাঁউরুটি খেতে হয়েছে, নুপুরদির বাড়ির ভাত-ডিমের ডালনা ছেড়ে। কিন্তু মিউজিয়ামটা যা বানিয়েছে অ্যান্ডর একা হাতে, দেখলে তাক লেগে যায়। সঙ্গে ওর অসাধারণ ধারাভাষ্য।
যদিও প্রোফেসর শঙ্কুর মতো বিজ্ঞানী নয় অ্যান্ডর, ৬৯টা ভাষার জায়গায় হয়তো গোটাপাঁচেক জানে, প্রায় সবকিছুর ব্যাখ্যা করে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, তবু ওর সংগ্রহ দেখা একটা অভিজ্ঞতা। বাড়ির চৌহদ্দিতেই আর-একটা বাড়ি বানিয়েছে যার বেসমেন্টে ওই ব্যক্তিগত মিউজিয়াম। সেখানে বাবুই পাখির বাসা থেকে উল্কাপিণ্ডের টুকরো, রবীন্দ্রনাথের শতবর্ষের ডাকটিকিট থেকে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাবরজিনালদের বাসন পর্যন্ত কত কী যে আছে! আর আছে নানা দেশের অসংখ্য বাদ্যযন্ত্র, যার বেশিরভাগই বাজাতে পারে অ্যান্ডর। ভারতের সেতার থেকে উজবেকিস্তানের রাবাব, সঙ্গে আফ্রিকার আদিবাসীদের নাম না-জানা বাজনা, গুসকরার দোতারা, গানবাজনা ভালবাসা কেউ ওখানে ঢুকলে বেরোতেই চাইবে না। আছে শ’খানেক বাঁশি। বছর পনেরো আগেও বছরে অন্তত ক’টা দিন অ্যান্ডরের বাঁশির সুরে মাতাল থাকত শান্তিনিকেতনের অবনপল্লির বাতাস, যখন নূপুরদির সঙ্গে আসত এদেশে।
আরও পড়ুূন : নিউ ইয়র্কে লাইন দিয়ে ফ্রি-তে ডিম পাওয়ার অভিজ্ঞতা এখনও মনে পড়ে!
তপশ্রী গুপ্তর কলমে ‘ডেটলাইন’ পর্ব ৪০…
এখন দু’জনেই বয়সের ভারে বন্দি নিউ জার্সির বাড়িতে। অ্যান্ডরের বাড়ির পিছনে আছে একটা ছোট্ট বাগান। ফুলের বাগান নয়, লতাগুলোর বাগান। বিশাল কাঁচি নিয়ে গাছ ছাঁটতে-ছাঁটতে অ্যান্ডর এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়ে কত কথা বলে। সামান্য একটা রঙিন উলের বলের যে এত মাহাত্ম্য, অ্যান্ডরের মুখ থেকে না-শুনলে জানা-ই হত না। ‘এটা হল কসমস ইন মিনিয়েচার। ক্ষিতি, অপ, মরুৎ, তেজ, ব্যোম— এক-একটা রং এক-একটা শক্তির প্রতীক। বিপুল এই মহাবিশ্বের ঐক্য ধরা পড়েছে গোল উলের বলে। এত যে কিছু আলাদা-আলাদা জিনিস চারপাশে, সব কিন্তু আসলে উলের এই প্যাঁচের মতো জটিল অথচ পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত।’ বাগানের একধারে গর্ত, বোধহয় অ্যান্ডরেরই তৈরি করা। সেখান থেকে খরগোশ উঁকি মারলে অ্যান্ডর তাদের গাজর খেতে দেয়। আমার তো মনে হচ্ছিল, অ্যালিসের মতো গর্ত বেয়ে চলে যাই ওয়ান্ডারল্যান্ডে।

প্রকৃত অর্থে ভুবনবিখ্যাত বিজ্ঞানীর বাড়িও রয়েছে এই প্রিন্সটনেই। যে-সে নাম নয়, থিওরি অফ রিলেটিভিটি-র আবিষ্কর্তা অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। E=mc²। বাড়ির ঠিকানা ১১২, মার্কার স্ট্রিট। বাইরে থেকে দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে, কারণ সাদা রঙের দোতলা বাড়িটি ব্যক্তিগত মালিকানার। মৃত্যুর আগে আইনস্টাইন বলে গেছিলেন, এই বাড়িটি যেন মিউজিয়াম না হয়, কোনওভাবেই যেন সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া না হয়। সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে অবশ্য কোনও বাধা নেই। ১৯৩৫ থেকে ১৯৫৫, দীর্ঘ কুড়ি বছর আইনস্টাইন এই বাড়িতে কাটিয়েছেন। তখন তিনি গবেষণা করতেন ইন্সটিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি-তে। সামনের ফুটপাত ধরেই রোজ হেঁটে যেতেন কাছের কর্মক্ষেত্রে। নাৎজিদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে আইনস্টাইন আমেরিকায় বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। মার্কিন নাগরিকত্ব নেন জার্মানি ছেড়ে আসার কয়েক বছর পর। বিজ্ঞান-সাধনার পাশাপাশি তিনি হিটলার-বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। জার্মানি থেকে পালিয়ে আসা উদ্বাস্তু ইহুদি পরিবারের শিশুদের জন্য তাঁর প্রিন্সটনের বাড়ির দরজা খোলা থাকত। বার্ট্রান্ড রাসেল থেকে জওহরলাল নেহরু, এই বাড়িতে পা রেখেছেন বহু বিখ্যাত মানুষ। অসাধারণ বেহালা বাজাতেন এই আত্মভোলা পদার্থবিদ। তাই বাজনার আসরও বসত সপ্তাহে একদিন।
আইনস্টাইনের বাড়ির কাছেই বিখ্যাত প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি। যদিও নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী নিয়মিত অধ্যাপনা করেননি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে, কিন্তু যেমন এই শহরের সঙ্গে, তেমনই এই ইউনিভার্সিটির সঙ্গেও এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয় তাঁর নাম। পদার্থবিদ্যা বিভাগের সঙ্গে কাজ করতেন, এখানকার ল্যাবরেটরি ব্যবহার করতেন। তাঁর সাময়িক অফিসও ছিল এখানকার ফাইন হলে (এখন নাম জোনস হল)। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ফ্রিস্ট ক্যাম্পাস সেন্টারে আইনস্টাইন ক্লাসরুম নামে একটি ঘর সংরক্ষণ করা আছে। ভাবলাম বাড়িতে তো ঢোকা গেল না, অন্তত রুম ৩০২-তে ঢুকি। সময় যেন থমকে আছে সেই তিন-চারের দশকে। ছাত্রদের বসার কাঠের চেয়ার-টেবিল থেকে পুরনো বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, মনে হয় যেন এই এলেন ঝাঁকড়া সাদা চুলের আত্মভোলা অধ্যাপক।
আর দেখলাম আইনস্টাইনের প্রিয় আরামকেদারা। বিখ্যাত মানুষদের যে কত অদ্ভুত খেয়াল থাকে! বাংলাদেশের সাজাদপুরে রবীন্দ্রনাথের কাছারিবাড়িতে গিয়ে শুনেছিলাম এক আশ্চর্য গল্প। এক রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন বলেই কিছুটা অন্তত বিশ্বাস করেছি। এই বাড়িটি নাকি রবি ঠাকুরের এত পছন্দের ছিল যে, শরিকদের কাছে মামলায় হেরে যখন ছেড়ে দিতে হল, তখন তাঁর হৃদয় ভেঙে গেছিল। ‘ভালবেসে সখী নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে’ গানটি নাকি তখনই লেখা। নারী নয়, বাড়ির বিরহে। এই কাহিনি আদৌ সত্যি কি না, বলবেন গবেষকেরা।

আইনস্টাইনের আসবাব-প্রীতির গল্প কিন্তু সত্যি। নাৎজিদের চোখ এড়িয়ে একটা-দুটো নয়, পঁয়ষট্রিটা আসবাব তিনি চোরাপথে আনিয়েছিলেন জার্মানি থেকে প্রিন্সটনে। এর মধ্যে খুব প্রিয় আরামকেদারাটি দেখার সৌভাগ্য হল। হিস্টরিক্যাল সোসাইটি অফ প্রিন্সটন মাঝে-মাঝেই বিজ্ঞানীর আসবাবের প্রদর্শনী করে ‘আইনস্টাইন অ্যাট হোম’। সাদামাটা আর্মচেয়ারটি রাখা ছিল একটা ছোট ঘরের এক কোণে। আমরা ঢুকেই দেখি, একজন সেই চেয়ারটির কাঠের হাতলে উঠে ওপরের এসি মেশিন সারাচ্ছে। প্রথমে আমরা ভাবলাম, ভুল ঘরে ঢুকেছি। কিন্তু তারপরই মনে হল, এরকম পুরনো ডিজাইনের কোনও আরামকেদারা আমেরিকার কোথাও দেখা সম্ভব নয়, যদি না তার সঙ্গে ইতিহাসের যোগ থাকে। সেই ঘরে কারওকে না দেখে আমরাই অনুরোধ করলাম, ‘ভাই, নেমে এসো। এটা আইনস্টাইনের চেয়ার।’ সে অবাক চোখে তাকাল এবং জবাব দিল, ‘এসি না সারিয়ে নামতে পারব না।’ আমরাও নাছোড়বান্দা। কিন্তু কিছুতেই তাকে বোঝাতে পারলাম না।
কিছুক্ষণ পর ছেলেটি নেমে এল বটে, কিন্তু তর্ক করার জন্য। এমনকী, আমি হাত দিয়ে তার স্নিকার্সের ছাপ মোছার পরও সে আবার উঠতে উদ্যোগী হল। অগত্যা আমরা করিডরে বেরিয়ে এখানকার কারওকে খুঁজতে লাগলাম। এক সাহেবকে ধরে নিয়ে আসা হল। তিনি কিন্তু আমাদের মতো উত্তেজিত নন। স্বাভাবিক গলায় বললেন, ‘তুমি ল্যাডার আনোনি কেন? ফার্নিচারস আর নট মেন্ট ফর দিস পারপজ।’ ব্যস এটুকুই, আইনস্টাইনের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করলেন না তিনি। এবার কিন্তু আইনের গেরোয় পড়ে সুড়সুড় করে নেমে এলেন এসি মেকানিক এবং মই আনতে ছুটলেন। যাক গে, দাওয়াই যাই হোক, এযাত্রা আইনস্টাইনের চেয়ার তো বাঁচল!

আইনস্টাইনের ‘অবমাননা’-র রেশ তখনও রয়ে গেছিল। মানে আমাদের উত্তেজিত আলোচনা তখনও চলছিল। এবং মনেপ্রাণে সব বাঙালিই কমবেশি বামপন্থী বলে (আমার বিশ্বাস রাজনৈতিক মতাদর্শ যা-ই হোক, বাঙালি ডিএনএ-গতভাবে পুঁজিবাদ-বিরোধী) আমেরিকানদের মুণ্ডুপাত করার সুযোগ ছাড়া যায় না। কিন্তু অচিরেই তাতে ছেদ পড়ল। এমন অপার্থিব দৃশ্যের সামনে চুপ করে দাঁড়ানো ছাড়া আর কী-ই বা করা সম্ভব?
সমারসেট বলে একটা জায়গা দিয়ে গাড়িটা যাচ্ছিল। এমনিতে নিউ জার্সির এই দিকটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা। বাড়িগুলো দূরে দূরে। কোথাও আদিগন্ত ভুট্টাক্ষেত। এরকম এক সোনালি মাঠের ওপাশে অগ্নিগোলক চোখ ধাঁধিয়ে দিল। পাহাড়, সাগরে সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত অনেক দেখেছি। অনেক মানুষের মুগ্ধ দৃষ্টির সঙ্গে মিলে গেছে আমারটাও। কিন্তু এই অখ্যাত আধা গ্রামের প্রান্তে নির্জন ভুট্টাখেতের ধারে এমন অলৌকিক সূর্যডোবার পালা আচমকা আসবে কে জানত!
বিশ্বাস করুন, এই সমারসেটে দাঁড়িয়ে আমার মনে পড়ল সিঙ্গুরের কথা। ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে সিঙ্গুরে তাপসী মালিকের বাবাকে ইন্টারভিউ করার সময় যখন তিনি কালচে জমির আঙুল তুলে বললেন, ওখানেই পড়ে ছিল মেয়েটার পোড়া দেহ, তখনও দিগন্তে আগুনের গোলা, মাটিতে লাল রং।
কোথায় সিঙ্গুর আর কোথায় সমারসেট! হয়তো খেতজমি আর সূর্যের অনুষঙ্গে স্থান-কাল-পাত্র পেরিয়ে এমন আশ্চর্য মনে পড়ে যাওয়া!



