ডুব দে রে মন কালী বলে
ডুব দে রে মন কালী বলে— ছোটবেলা থেকেই রামপ্রসাদী গানটা শুনে আসছি। কালীঘাট নাটমন্দির টু গঙ্গার ঘাট, রেডিও টু বাবা-র গলায়! শুনতাম, আর ভাবতাম, অনেক ভেবেছি কিন্তু কোথায় ডুব দেব ঠিক বুঝতে পারিনি। ছোটবেলায় কালীকুণ্ডে কোনওদিন ডুব দিইনি, আতঙ্কে। ওখানে দেবীর আঙুল পড়েছিল। এখন তা গর্ভগৃহে আছে। স্নানযাত্রার দিনে স্নান করানো হয়। সেই কালীকুণ্ডে ডুব দেব কী! গঙ্গায় দিইনি— জোয়ারে ভেসে যাব, ভাঁটার কাদায় আটকে পড়ব। আর বাকি থাকে লেক— লেকের জলে মৃত্যু লেখা, অসংখ্য ঝাঁঝি হাত বাড়িয়ে আয় আয় করে ডাকে। তাই জলে নামার সাহস পাইনি।
তবু এখন কালীঘাটের পথে ঘাটে মানুষে ডুব দিলে যে কত কিছু হাতে গায়ে ঠেকে! কোনও কোনও সময় শ্বাস বন্ধ হলেই, দমকা অক্সিজেনও এসে পড়ে।
ছোটবেলায় একটা সিনেমা দেখেছিলাম— ‘মহাতীর্থ কালীঘাট’। দেখেছিলাম কি? না কি পরে দেখেছিলাম, টিভিতে? ইউটিউবে দেখলাম ছবিটি ১৯৬৪-তে রিলিজ করেছিল। তাহলে পরেই দেখেছি টিভিতে। কিন্তু শৈশবে পুকুরে চান করার সময় হাতে ‘মহাতীর্থ কালীঘাট’ বড্ড বেশি করে হাতে ঠেকে গেল। কারণ, নিজের বেড়ে ওঠার জায়গাটকে নিয়ে যদি হিক্কাবাজি না থাকে তাহলে আর শৈশবের পুকুরের জলে নামা কেন?
বানের জলের উচ্চতার দাগ ছিল কালীঘাট বাজারের গেটে! জয়ন্ত দে-র কলমে পড়ুন ‘অলিগলির কালীঘাট’ পর্ব ১৩…
তার অনেকদিন পরে সুমন মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘কাঙাল মালসাট’-এ দেখলাম কালীগঙ্গার ঘাটের ধারে ফ্যাতাড়ুদের। তারা গঞ্জিকা সেবন করছে। দেখেই মনের ভেতরটা জমে ক্ষীর! মনে হল, আহা আহা ওদের জন্য পোয়াটাক দুধের ব্যবস্থা হোক। সঙ্গে একটা লাড্ডু দিই, লাড্ডু সহযোগে দুধ। জমে যাবে।


আসলে বড় হওয়ার পরেও কালীঘাট আমার কাছে টুকরো টুকরো রঙিন কাচের মতো। কখনও পায়ে ফুটলেও, চোখেও ঘোর লাগে। তবে স্কাইওয়াক বড় কেমন যেন। যারা ওখানে হাত ধরাধরি করে রিলস বানায় বানাক, শান্ত পথে হেঁটে যায় যাক, আমি নীচ দিয়েই চলি। পথের ধারে অজস্র দোকান স্যান্ডো গেঞ্জি পরা ছেলে বুড়ো। একসময়ে ওখানে ছিল অনেক চেনা মুখ। ক্রমশ সে মুখগুলো কালের নিয়মে হারিয়ে গেছে। এখন খোঁজ করলেই শুনি— সে তো নেই, তার ছেলে আছে বা তার মেয়ে আছে। আগে পথের ধারে মহিলা বিক্রেতাদের দেখা যেত না। এখন সবাই বেরিয়েছে লড়ে নিতে। না-হলে চলবে কেন?
আমাদের চক্রবর্তীপাড়ায় ছিল পঞ্চাদাদের বাড়ি। পঞ্চাদারা ভাড়া থাকতেন টিনের বাড়িতে। বিশ্বনাথদা-শ্যামলদাদের ঠিক পাশের বাড়িতে। হয়তো ছোটখাট একটা চাকরি করতেন। মা দুই বোন আর স্ত্রী, শিশুকন্যা নিয়ে সংসার। আমাদের পাড়ার আর সবার মতোই পঞ্চাদাও ছিলেন ফুটবলপ্রেমী। ১৬ আগস্ট গিয়েছিলেন ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের খেলা দেখতে। তারপর পাড়ায় ফিরলেন ১৬টি শবের একজন হয়ে। আমরা তখন সবে বড় হচ্ছি। কিছুদিন আগে এক মফসসল টাউনে চিৎকার শুনেছিলাম— শিরায় শিরায় রক্ত/ আমি দেবদার ভক্ত! ঠিক তখন আমাদের রক্তে রক্তে ফুটবল। পঞ্চাদার মৃত্যু আমাদের বড় শোক দিয়েছিল। তার একমাস আগেই বাঙালি এক সর্বজনীন শোক পেরিয়ে এসেছে। সেসময় পাড়া ছিল একটা গোটা পরিবার। সারা পাড়া শোকে মূহ্যমান, ঘরে ঘরে যেন অরন্ধন। মা-মাসিমাকে দেখছি মুখে আঁচলচাপা দিয়ে চোখের জল মুছছে। সত্যি কথা বলতে কী, এখন তো বিষমদ খেয়ে মরলেও টাকা দেয় সরকার। তখন কিছুই ছিল না। পঞ্চাদা চলে গেলেন। সংসারটা ভেসে গেল। পঞ্চাদার স্ত্রী সংসার বাঁচাতে চাকরি করতে গেলেন। পঞ্চাদার মায়ের হাহাকার করা কান্না শুনতাম। পঞ্চাদার দুই বোন নামল জীবনযুদ্ধে। কোথায় কী? পরে তাদের দেখলাম কালীঘাট মন্দিরের আগে— একটা কাঠের পাটাতন পেতে সিঁদুর আলতা বিক্রি করতে। সে বড় করুণ দৃশ্য। ক্রমশ তারা কেমন যেন পাড়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। এই ঘটনার আগে আমি ওই চত্বরে কোনও আমাদের মতো পরিবারের মহিলাকে দোকানদারি করতে দেখিনি।
তখন চক্রবর্তীপাড়ায় অনেক টিনের বাড়ি ছিল। সেগুলো বেশিরভাগই ভাড়াটে বাড়ি। প্রকৃত অর্থে এক উঠোন বারো ঘর। এমনই বাড়িতে আমার প্রথমদিকের ছেলেবেলা কাটে। কালে-কালে সবই পাকা বাড়ি হয়েছে। কিন্তু সেসময় দেখেছি পাকা বাড়ির মানুষজন টিনের বাড়ির এই ভাড়াটেদের একটু হীন চোখে দেখত। এদের মধ্যে আবার কয়েকঘর বাঙাল আছে। তারা আসছে। ওদিকে বাংলাদেশ হয়েছে। আসছে না হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ছে। আমরা শুনছি, বাঙাল আজব জীব! তারা কেমন হুড়মদুড়ুম করে কথা বলে, কচুশাক ঝুলিয়ে বাড়ি ফেরে। একচেটিয়া মোহনবাগান সমর্থকদের মধ্যে বসে হঠাৎ ইস্টবেঙ্গলের গোলে কেমন লাফিয়ে ওঠে। আবার অনেক বাঙালবন্ধু সঙ্গসুখে মোহনবাগানী হয়ে গিয়েছিল। তাদের ভাষা শুনে কেউ কেউ— জার্মান কী করে এল? সন্দেহ প্রকাশ করলে— বলতে হতো আমাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে পালটে গেছে।
হচ্ছিল ’৮০ সালের ১৬ আগস্টের কথা। তার কিছুদিন আগে ২৪ জুলাই গিয়েছে। মহানায়ক উত্তমকুমার মারা গেলেন। আমাদের স্কুল ছুটি। উত্তমকুমার সাউথ সাবার্বান স্কুলের ছাত্র ছিলেন। স্কুল ছুটি হলে আমরা দল বেঁধে চলে গেলাম উত্তমকুমারের ভবানীপুরের বাড়িতে। সে এক শোকযাত্রা দেখেছিলাম বটে। কান্নার রোল উঠেছিল হাজরা মোড়ে। রজনীগন্ধার মালা উড়ে আসছিল ব্যালকনি থেকে। তারও অনেক আগে দেখেছিলাম হেমন্ত বসুর শেষযাত্রা। বাবার কাঁধে চড়ে উঁচু থেকে দেখতে দেখতে অনেকটা পথ চলেছিলাম মিছিলে।
চক্রবর্তীপাড়ার এক বাড়িতে সাধন গুপ্তকে দেখেছি মিটিং করতে। তিনি অন্ধ ছিলেন। মিটিং শেষে কেউ যেন জিজ্ঞেস করলেন কটা বাজে— উনি পকেট-ঘড়ি থেকে সময় বলে দিলেন। চমৎকৃত হয়েছিলাম। জন্মান্ধ সাধন গুপ্ত ঘড়িতে আঙুল ছুঁয়ে সময় বলছেন।
শৈশবের পুকুরে তলিয়ে গেলে কত স্মৃতি হাতে ঠেকে। যেমন একটা জিনিস ভোট এলেই শুনি— অমুক কেন্দ্রে কলাগাছ দাঁড় করালেও জিতবে। তেমন এক কলাগাছের নাম হৈমী বসু। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি উনি এই কেন্দ্রে দাঁড়াচ্ছেন আর জিতছেন। কিন্তু আমার মতো পথচরা ছেলেও কোনওদিন হৈমী বসুর টিকিটি চোখে দেখিনি। তার একটা বড় কারণ, কংগ্রেসি প্রচার, ভোট মিটিং টানত না। সেখানে না হত গান, না নাটক। ওগুলো ছিল বামপন্থী দলগুলোর মিটিংয়ে। তাই হয়তো হৈমী বসুকে ভোট-মিটিংয়েও দেখিনি। আর অন্য সময় তো তিনি ডুমুরের ফুল! বরং প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি, সুব্রত মুখোপাধ্যায় আর লক্ষ্মী বোসকে দেখেছি কালীঘাটের সঙ্গে জড়িয়ে।
রবি ঘোষকে দেখেছি, সাদা হাফ প্যান্ট টিশার্ট পরে কালীঘাট হাইস্কুলের ছোট্ট মাঠে শীতের রাতে ব্যাডমিন্টন খেলতে। অনুভা গুপ্ত মারা যেতে মা-মাসি, পাড়ার মেয়ে-বউরা গিয়ে সিনেমার আর্টিস্ট দেখে এসেছিল। পরে কে কতটা সুন্দর তার চুলচেরা বিশ্লেষণ শুনেছি। আমি হাঁ-করা ছেলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সব মহলেই ঢুকে যেতাম অবলীলায়।
কালীঘাট হাই স্কুলের মাঠ, লাগোয়া ছিল কালীঘাট ব্যায়াম সমিতি। কালীঘাট চত্বরে ফুটবল ক্লাবের সঙ্গে এমন অনেক ব্যায়াম সমিতি পাল্লা দিত। গঙ্গার ঘাটের দিকেও এমন এক ব্যায়াম সমিতি ছিল। তারপর এগলে জনকল্যাণ সমিতি। এদের দারুণ ক্লাব ব্যান্ড ছিল। জনকল্যাণ সমিতির পাশেই ছিল ভোম্বলের মামার বাড়ি। ভোম্বলের বাবলামামা ছিল নকশাল। খুন হয়ে গিয়েছিল। আমার মাকেও দেখেছি কাঁদতে। ওদিকে গেলে হা হুতাশ করতে। আসলে ওই যে সারা পাড়া একটা পরিবার। ভোম্বলের বাবা ছিলেন পুলিশ। আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল একটা মাঠ। কেউ বলত সাদা মাঠ। ওই মাঠে ঘাস হতো না। আবার কেউ বলত বাঘাদার মাঠ। ওই মাঠে খেলছিল দেবাশিস। কংগ্রেসি গুণ্ডা চিনা এসে তুলে নিয়ে গিয়েছিল এক শীতকালের দুপুরে। খুন করে ফেলে দিয়েছিল রাস্তায়। এখনও ভোট এলেই মনে পড়ে— সেই দেবাশিসের মা স্পষ্ট করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রকাশ্য জনসভায় ছেলের খুনিকে চিহ্নিত করতেন। গুণ্ডা তখন নেতা হয়ে গেছে প্রোমোশন পেয়ে।
কালীঘাট ব্যায়াম সমিতি ফি বছর উনিশ পয়সার সিনেমা করত। কার্ড ছিল এক টাকা। আমরা টিকিটহীন সিনেমা দেখতাম সুকুদাদের ছাদে বসে। আর বাজার পাড়ায় ছিল জলসা। তখন স্টার নাচিয়ে রুমকি ঝুমকি। মিন্টু দাশগুপ্তর প্যারডি গানের পর কেউ গান গাইতে চাইত না। দুই বেচারাও ছিল হিট। তার কিছুদিন পরে এল কিশোরকণ্ঠী গৌতম ঘোষ। তারপর মুন্না, সাবির। মধ্যরাত পর্যন্ত হিন্দি গান। কোথাও কোথাও হালকা মদের গন্ধ। সেই গন্ধ নাকে এলে কেমন যেন আমাদের নেশা-নেশা লাগত— তখন বড় হচ্ছি।
এই দেখতে দেখতে বড় হচ্ছি। মাঝে মাঝে মাথা গলাই ব্যায়াম সমিতির ভেতর। দেখি ব্যায়াম সমিতির ভেতর হাতে পায়ে বুকে সব পেশির গুলটি পাকানো মানুষজন লেংটি পরে ঘুরছে। তারা সুযোগ পেলেই এগিয়ে এসে আমাদের মতো হ্যাংলা চেহারাদের বলত— টেপ। টিপে দেখ। আমরা তাদের পেটে হাতে আঙুল বসানোর চেষ্টা করতাম। বাইসেপস-ট্রাইসেপস! কঠিন, শক্ত। ওরা সরু বেঞ্চের ওপর চিৎ হয়ে লোহা তুলত। ওদের ভাঙা গাল। আমরা যারা ফুটবল খেলতাম— তাদের মাথায় কেউ বা কারা ঢুকিয়ে দিয়েছিল দুটো মন্ত্র।— হ্যান্ডেল মারবি না, আর লোহা তুলবি না।
কালীঘাট ব্যায়াম সমিতি ফি বছর উনিশ পয়সার সিনেমা করত। কার্ড ছিল এক টাকা। আমরা টিকিটহীন সিনেমা দেখতাম সুকুদাদের ছাদে বসে। আর বাজার পাড়ায় ছিল জলসা। তখন স্টার নাচিয়ে রুমকি ঝুমকি। মিন্টু দাশগুপ্তর প্যারডি গানের পর কেউ গান গাইতে চাইত না। দুই বেচারাও ছিল হিট। তার কিছুদিন পরে এল কিশোরকণ্ঠী গৌতম ঘোষ। তারপর মুন্না, সাবির। মধ্যরাত পর্যন্ত হিন্দি গান। কোথাও কোথাও হালকা মদের গন্ধ। সেই গন্ধ নাকে এলে কেমন যেন আমাদের নেশা-নেশা লাগত— তখন বড় হচ্ছি।
আমি খুব একটা ফাংশন শুনতে যেতাম না। আমাদের বন্ধুদলের সব ছিল খুব জলসা-টান। আমি একাঙ্ক নাট্য প্রতিযোগিতা দেখতে যেতাম শ্মশানের আগের একটা ক্লাবে। ক্লাবের নাম মনে নেই। ওরা চাল-ডাল দিয়ে একবার দুর্গাঠাকুর বানিয়েছিল। ফুটবল খেলার সূত্রে ক্লাব থেকে ক্লাবে আমাদের বন্ধু। তারপর আমি ছিলাম এক নামকরা দাদার খুড়তুতো ভাই। আলাদা খাতির-যত্ন ছিল।
ক’দিন আমার এক পুরনো বন্ধুকে বললাম— আমাদের সেই চিন্টুর সঙ্গে কালীপুজোর চাঁদার তুলতে যাওয়ার কথা তোর মনে আছে? আমার কথা শুনে সে কেশে ফেলল। তারপর কঁকিয়ে উঠে বলল— আমার মনে নেই। কবে? না, না, না তো? তারপর একটু এগতেই— আঁতকে উঠল। বলল— তোর মনে আছে? তোর এত মনে থাকে কেন রে? তুই লিখবি নাকি? এসব কথা লিখিস না। এসব লিখলে তোর বউ-ছেলে কিছু বলবে না? নিজের কথা লিখলে লেখ। আমার নাম লিখিস না। তোদের লেখকদের ছাড় আছে, আমার বউ-বউমা নিয়ে সংসার। ঝামেলা হয়ে যাবে। তার অনেকক্ষণ পরে বলল— কিন্তু কী জানিস? এসব লিখলে, পড়লে এখন সব খারাপ বলবে। ঊনপঞ্চাশ-পঞ্চাশ বছর আগের কথা। আমরা কিন্তু খারাপ কিছুতে যায়নি। আসলে সবাই এখনকার কালীঘাটকে দেখবে, আমাদের সেই কালীঘাট ওরা চেনে না। আমরা খারাপ কোথাও যাইনি, খারাপ কিছু করিনি, চেনাজানা মানুষের বাড়িতেই যেতাম। এখানকার মানুষদের বাড়িতে। আমাদের পাপ ছিল না মনে।
পাপ! আমি হেসে ফেললাম।
সে বলল, ‘তবে আমার ওইদিন থেকে পাপ ঢুকেছিল মনে। বিশ্বাস কর। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত আমি কোনওদিন ওদিকে যাওয়া তো দূরের কথা, তাকাইনি পর্যন্ত। তোর কি তুই তো কালীঘাট ছেড়ে চলে গেলি, বেঁচে গেলি। আমরা পড়ে থাকলাম এই নরককুণ্ডে!’
নরককুণ্ড!
কালীঘাট বাজারের সামনের রাস্তার ওপর হত গড়মিল সংঘের পুজো। আমাদের নিজেদের মধ্যে তেমন গড়মিল ছিল না। সংঘের নাম হয়েছিল ‘গড়মিল’ সিনেমা থেকে। পরে সেই পুজো ফরওয়ার্ড ক্লাবের দিকে চলে গিয়েছিল। তখন সেখানে ছিল কালীঘাট ফাঁড়ি। এখন সেটাই থানা। বেশ বড় কালীপুজো। এখনও হয়। ডাকের সাজের কালীপ্রতিমা। আমরা দল বেঁধে চাঁদা তুলতাম। তখন এত বিজ্ঞাপনদাতা আসেনি। চিন্টু একবার চাঁদার দায়িত্ব নিল, পুরো গলির চাঁদার দায়িত্ব তার। ও তখন থেকে গলির চোরাগোপ্তা কার্তিক হয়ে উঠছিল।
গলির ঘর-ঘর থেকে চাঁদা তোলা খুব কঠিন ব্যাপার। কেউ একবারে টাকা দেবে না। সবাই পরের দিন দেখাবে। আর নাম— সবাই পূজা, সবাই সুইটি! অনেকেই চাঁদা দেবে না বলে ফলস নাম বলত। চিন্টু তখন গলির অন্ধিসন্ধি চেনে। কোন মাসির ঘর তারও নাম জানে। চিন্টু বিলের কাউন্টারপার্টে ঠিকানার জায়গায় মাসির নাম লিখত। আমরা এক সঙ্গে আটজন-ন’জন যেতাম। বিশাল দায়িত্ব সেবার আমাদের। পাড়ার বড়রা বুঝিয়ে দিয়েছে— এই দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে। আমাদের এই কঠিন দায়িত্ব দিত না, যদি না চিন্টু চাইত। এসব ভাইয়া-বিশ্বদাদের গ্রুপই করত। আমরা দায়িত্ব পেয়ে চাঁদা তুলছি। সময় সকাল দশটা থেকে শুরু— বেলা দুটো আড়াইটে পর্যন্ত। কোনও-কোনও বাড়িতে চিন্টু জোর-জবরদস্তি করে বিল কাটছে। সত্যি বলতে কি আমার কোনওদিনই এই চাঁদা তোলার ব্যাপারটা ভাল লাগত না।
একদিন চিন্টু কোনও মেয়ের জন্য দু’টাকার বিল কেটেছে, সে একটাকার বেশি দেবে না। দিতে পারবে না। চিন্টু, মাজদা, রাজু ওর দু’টাকাই নেবে। মেয়েটি তার ছেলেকে খাওয়াবে বলে ভাত বাড়ছিল। সে বারবার বলছিল— আমার ছেলে অসুখে ভুগছে, আমি দিতে পারব না। আমরা শুনছি না। হঠাৎ দেখলাম, সে আমাদের ওপর রাগ করে হাঁড়ি থেকে ভাত আলুসেদ্ধ নিয়ে সিমেন্টের মেঝের ওপর ভাত মাখছে। আর রুগণ ছেলেটাকে মর-মর বলে, পিঠের চালে ধাঁই-ধাঁই করে চড় কষাচ্ছে। সে এক ভয়ানক দৃশ্য! চোখে সহ্য করা যায় না। আমরা সবাই বলছি— চাঁদা দিতে হবে না, চাঁদা দিতে হবে— ওকে মেরো না।
আমরা দুই বন্ধু চাঁদার গ্রুপ ছেড়ে পালিয়ে এলাম। কিন্তু যাব কোথায়। কিন্তু যাব কোথায়। চিন্টু, মাজদা, রাজুরা ঝামেলা পাকল। আমরা ফাঁকিবাজ। আমরা বয়কট হয়ে যাব। যেতেই হবে। আবার দু-তিনদিন পরে আমরা গেলাম। আমরা দুই বন্ধু ঠিক করলাম— একদম পিছনে থাকব। ওরা যা করে করুক। সেভাবেই চলছে।
চিন্টু দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে দ্রুত বড় হয়েছে। সে ভারী গলায় বলছে— আমি তোমাদের লোক বলে কম বিল কাটছি। বড়রা এলে ঘাড় ধরে টাকা আদায় করবে। নরমে-গরমে চাঁদা উঠছে।
অনেক সময় এইসব ঘরগুলোর ভেতরেও ঘর থাকে। ঘরের ভেতর আর একটা বা দুটো ঘর। এমনই একটা ঘরের সামনের ঘরে কেউ নেই। খাট, আলমারি, আলনা, চেয়ার আরও টুকিটাকি জিনিসপত্র দেখা যাচ্ছে। পর্দা তুলে আমরা দেখলাম ঘরের ভেতর কেউ নেই।
রাজু বলল, এই ঘরে কেউ নেই। তোরা দেখত— ভেতরের ঘরে কেউ আছে কি না?
আমাদের দু’জনকে হুকুম দিয়ে ওরা দল বেঁধে পরের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। এই বাড়িতে সবাই চিন্টুকে চেনে, পটাপট চাঁদা দিয়ে দিচ্ছে। কোনও ঝামেলা নেই। আমি আর সেই বন্ধুটা সামনের ঘর পেরিয়ে ভেতরের ঘরের দরজায় গিয়ে ডাকব। দেখব— কেউ আছে নাকি। এমন সময় হঠাৎ সামনের ঘরের দরজা দড়াম বন্ধ করে একটা মেয়ে এসে দাঁড়াল। দাঁড়িয়েই সে মুহূর্তের মধ্যে গায়ে যা ছিল খুলে ছুড়ে ফেলে দিল— সেইসঙ্গে বলতে লাগল— ভালো করে দেখে নে— আমি চাঁদা দেব না— তোরা দেখ— পয়সা উসুল—
ঘরের ভেতরটা আধো অন্ধকার। দরজা জুড়ে নগ্ন একটা মেয়ে। গোটা একটা নারী শরীর— সে হাতদুটো একটু ওপরে দিকে তুলে দাঁড়াচ্ছে একবার, একবার কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াচ্ছে— ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে। আমরা দুজন ঘরের ভেতর। আমি ঠক ঠক কাঁপছি। আমার বন্ধুটি মুখ দিয়ে অ্যা-অ্যা করে অদ্ভুত একটা আওয়াজ করছে।
মেয়েটা বলে যাচ্ছে— তোরা দেখলি— তোরা আমার থেকে চাঁদা নিবি না বল— চাঁদা উসুল করে দেখে নে— চাঁদা দেব না— চাঁদা নিবি না বলে যা—
আমাদের মধ্যে কেউ একজন নিশ্চয়ই বলেছিলাম— চাঁদা নেব না। উত্তর পেয়ে সে হয়তো দরজা থেকে সরে গিয়েছিল। আর আমরা দু’জনে ছিটকে বেরিয়ে এসেছিলাম ঘর থেকে বারান্দায়।
চিন্টুরা ততক্ষণে এঘর-ওঘর করে বেঁকে অন্য বারান্দার দিকে চলে গিয়েছিল হয়তো। কেউ আমাদের দিকে নজর করেনি। আমরা পালিয়ে এসেছি। আমার বুকের ভেতর ঢকঢক করে হার্ট বাজছে। রোগা বুকের খাঁচা ছেড়ে যেন বেরিয়ে আসছে। আর আমার বন্ধুটা রাস্তায় এসেই হড়হড় করে বমি করল। পেটে তো কোনও খাবার নেই, শুধু টক জল!
অনেকদিন পরে ভেবেছিলাম— মেয়েটাকে দেখলে কি আমরা চিনতে পারব? আমরা শুধু দেখেছিলাম, সে মেয়ে ছিল। হ্যাঁ মেয়ে। নারী। যেমন মেয়ে বা নারী কোনওদিন আমি বা আমরা দেখিনি। সে কি দুটো টাকার জন্য আমাদের ব্ল্যাকমেল করছিল? নাকি মজা, সেরেফ মজা!

আমরা ফাঁকিবাজ আখ্যা পেলাম, কিছুদিন বয়কটও হলাম। তবু আমরা কাউকে বলিনি, কোনওদিন না। কিন্তু কালীঠাকুর এল মণ্ডপে। বিশাল এক কালীঠাকুর! তার অত বড় নীলরঙা শরীর। গলায় মুণ্ডমালাও পর্যন্ত নেই। পরে পরানো হবে। অন্য বছর আমরা বসে বসে শোলা কেটে কেটে সেলোফিন পেপারের ওপর আঠা দিয়ে মেরে ডাকের কাজের সাজসজ্জা দেখি। কিন্তু সে-বছর আমরা দু’জনেই কেন জানি না প্রতিমাকে ডাকের সাজ না পরানো পর্যন্ত তাঁর সামনে গিয়ে বসতে পারিনি। কেমন যেন চোখে সাহস ছিল না।
গুন্টার গ্রাস কলকাতায় ডুব মেরে ‘শো ইয়োর টাং’-এ কালীঠাকুরকে নিয়ে কী লিখেছেন বড় হয়ে পড়েছি। কিন্তু তার আগে আমাদের চোখে সত্যি হয়তো পাপ ছুঁয়ে গিয়েছিল! সব ডুবে অমৃত ওঠে না, হলাহলেও নীল হয়ে যেতে হয়!




