প্রিয় সুবিমল: পর্ব ১৮

অনুবাদ-বাদানুবাদ

মৃণাল সেন ও সুবিমল বসাকের যোগাযোগের সেতু এক কিংবদন্তি হিন্দি সাহিত্যিক— মুন্সি প্রেমচন্দ। ১৯৮০ সাল। সে-বছর প্রেমচন্দের জন্মশতবর্ষ। আর পাকেচক্রে সে-বছরই মৃণাল সেনের সঙ্গে আলাপ সুবিমলের। কীভাবে শুরু হয়েছিল তা?

২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮০। ভারতীয় ভাষা পরিষদে সুবিমলের সঙ্গে দেখা সাহিত্যিক ও সাহিত্য অকাদেমির প্রাক্তন সেক্রেটারি ড. প্রভাকর মাচওয়ে-র। সুবিমল ওই তারিখে ডাইরিতে লিখছেন— ‘… ড. মাচওয়ে জানালেন, মৃণাল সেন প্রেমচন্দের একটি গল্পের অনুবাদ চান। ‘মুক্তিমার্গ’। সম্ভবতঃ ফিল্ম করতে চান। মাচওয়ে সাহেব একটি চিঠি লিখে দিলেন।’

সুবিমলের সংগ্রহে সেই চিঠি পেয়েছি। বয়ান এরকম—

22-2-80

My dear Mrinal Sen,

   You wanted the translation of Premchand’s ‘Mukti-Marg’. My friend Sri Subimal Basak has translated many stories of Premchand. Kindly see him and discuss with him— he can help you in a literal translation from Hindi to Bengali.
With love

Youes sincerely
P. Machwe

খালাসিটোলা প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত কী বলেছিলেন সুবিমল বসাককে?
পড়ুন ‘প্রিয় সুবিমল’ পর্ব ১৭…

পরের দিনই মৃণাল সেনকে ফোন করেন সুবিমল। ডাইরিতে তাঁদের কথোপকথন বিস্তারে লেখা (২৩.০২.৮০)—
‘মৃণাল সেনকে telephone করলুম। উনি নিজে ফোন ধরেছিলেন, তখন একটা। গলার কণ্ঠস্বর ভারি, ওজন দিয়ে বলা। কিন্তু ইংরেজী বাক্য বেশী ব্যবহার করছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তফাৎ এই যে উনি মোটেই ইংরেজী ব্যবহার করেন নি। ড. মাচওয়ের কথা উল্লেখ করে বললেন, আমি National Library তে গিয়েছিলুম— এবং গল্পটির নাম ‘মুক্তিমার্গ’। সেদিন তাকে ভুল বলেছিলুম। যাই হোক, Unesco থেকে প্রকাশিত একটি অনুবাদ গ্রন্থে পেয়েছি। অনুবাদটি ভালো। অমৃত রায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। এখানে একজন হিন্দুস্তানী বন্ধুর সহযোগিতায় কাজ এগোচ্ছে। আপনি ড. মাচওয়েকে বলবেন, পরে প্রয়োজন পড়লে আমি তাঁকে জানাবো। তারপর, আমার নাম জিজ্ঞেস করতেই বললেন— আপনার নাম শুনেছি। পরে, প্রেমচন্দের গল্পগুচ্ছে ‘কফিন’ নিয়ে বললেন— কি অদ্ভুত অনুবাদ। আমি ‘তিসরী কসম’ অনুবাদ করেছি শুনে জিজ্ঞেস করলেন— কি নাম রেখেছেন? বললুম— তিসরী কসম। ‘হিন্দি কথাগুচ্ছে ‘তৃতীয় প্রতিশ্রুতি’ নাম দিয়েছে। আক্ষরিক অনুবাদ কখনও হয় না।’ উনি ওটা পড়বেন— জানালেন। জানালেন— ময়ূখ বসু আপনার কথা বলছিলেন। আপনি সম্ভবতঃ প্রপোজাল দিয়েছেন। ওঁরা প্রেমচন্দের গল্প ছাপতে চায়। শুভেন্দু মুখার্জী (সাহিত্য আকাদমী) আপনার কথা বলছিলেন।’

ওই বছরই এপ্রিল মাসে মৃণাল সেনের বাড়িতে যান সুবিমল। ডাইরি থেকে জানা যায় সাক্ষাতের কাহিনি (১০.৪.৮০)— ‘মৃণাল সেন আজ দেখা করার সময় দিয়েছিলেন— ন’টার মধ্যে। আমি পৌঁছুলাম ন’টা দশ। বেশ লোকটি। প্রায় পৌনে এগারোটা নাগাদ গল্প হলো তার সঙ্গে। পড়াশুনা করে বেশ বোঝা গেল। এরি মধ্যে পুলিশের একজন এলেন তাদের পত্রিকা ‘আরক্ষার’ জন্য লেখা চাইতে। চার্লি চাপলিনে ছবির বিষয় নিয়ে পুলিশের চরিত্র সম্পর্কে লেখা দিলেন। পড়ে শোনালেন। যা নিঃসন্দেহে পুলিশের মনোমত নয়। পুলিশের জনসংযোগ বড়ো কম।’

প্রেমচন্দের পুত্র শ্রীপত রায়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই পত্রবিনিময় হত সুবিমলের। তাঁর সংগ্রহে হিন্দিতে লেখা সেসব চিঠি রয়েছে। যাই হোক, ওই বছরই সুবিমলের অনুবাদে প্রকাশ পায় প্রেমচন্দের গল্প সংকলন ‘পঞ্চপরমেশ্বর’, বেঙ্গল পাবলিশার্স থেকে। পরবর্তীতে প্রেমচন্দের আরেকটি গল্প সংকলন ‘দুই সখী’ (তিনসঙ্গী, ১৯৮৪) ও প্রবন্ধগ্রন্থ ‘জীবন সার’-ও (তিন সঙ্গী, ১৯৮৫) প্রকাশ পায়, অনুবাদক সুবিমল বসাক।

মৃণাল সেন সুবিমল-অনূদিত প্রেমচন্দের তিনটি গল্প চেয়ে নিয়েছিলেন— কেন, তার কারণ অজানা। তবে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার মৃণালের সঙ্গে তাঁর ফোন-মারফত কথা হয়েছিল; সম্ভবত তখনই চেয়ে থাকবেন গল্পগুলি। সুবিমল গল্পগুলি ফেরত চেয়ে যে-চিঠি দিয়েছিলেন, তার খসড়া খুঁজে পেয়েছি আমরা—

কলকাতা – ৫৬
২৬.১২.৮০

শ্রী মৃণাল সেন সমীপেষু,
সবিনয় নিবেদন, 

   প্রেমচন্দের যে তিনটি গল্প আপনাকে দিয়েছিলুম, আশাকরি সেগুলো পড়া হয়েছে। ইতিমধ্যে আরও কয়েকটি গল্পের অনুবাদ করেছি এবং গ্রন্থ প্রকাশের সম্ভাবনা আছে।
   গল্পগুলোর জন্য আমি কয়েকবার আপনাকে বিরক্ত করেছি। আপনিও ব্যস্ত থাকেন, ফলে অনেকসময় আমাকে ফিরে আসতে হয়। দয়া করে যদি আপনি ওগুলো বা’র করে রাখেন এবং কবে গেলে সেটা সংগ্রহ করা যায়, জানা থাকলে আমার পক্ষে সুবিধে হয়।

নমস্কারান্তে, বিনীত
সুবিমল বসাক

মৃণাল সেন ১৯৭৭ সালে প্রেমচন্দের গল্প ‘কাফন’ অবলম্বনে ‘ওকা উরি কথা’ নামের একটি তেলুগু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। ১৯৮১ সালে ভারতীয় ভাষা পরিষদে প্রেমচন্দের শতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে অন্যতম বক্তা ছিলেন মৃণালও। ২৫ মার্চ মৃণাল যে-বক্তব্য রেখেছিলেন, তার খানিক আভাস পাওয়া যায় সুবিমলের ডাইরিতে (২৫.৩.৮১)—
‘… মৃণাল সেন realism সম্পর্কে বললেন— তিনি ফিল্মে realism সম্পর্কে তার ধারণা জানালেন। আকালের সন্ধানে বা একদিন-প্রতিদিন নিয়েও আলোচনা করলেন। কিন্তু গোলাম কুদ্দুস তাকে ‘বাস্তব’ সম্পর্কে বেশ আক্রমণ করলেন। মৃণাল বাবুর কয়েকটি ছবির ত্রুটীও বললেন। মৃণালবাবু প্রেমচন্দের কাফন অবলম্বনে ‘ওকা উরি কথা’ করেছেন— তিনি প্রেমচন্দকে কি ভাবে গ্রহণ করেছেন— তাও জানালেন। সেটা অনেকেরই আপত্তিজনক। তবে, গোলাম কুদ্দুস সাহেব তেভাগা আন্দোলন-এর কিছুটা স্মৃতিচারণা করলেন— যা দামী।’

ওই বছরই ২৪ মার্চ সাহিত্য অকাদেমি প্রেমচন্দের শতবার্ষিকী সম্পর্কে কলকাতা তথ্যকেন্দ্রে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন, তাতে আমন্ত্রিত ছিলেন সুবিমলও। ওদিন সন্ধ্যায় রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে অতিথিদের আপ্যায়িত করা হয়। সুবিমল বিকেলে যান সেখানে। সাহিত্য অকাদেমির রিজিওনাল সেক্রেটারি শুভেন্দুশেখর মুখোপাধ্যায় সুবিমলের আলাপ করিয়ে দেন তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে। সুবিমল ডাইরিতে লিখছেন (২৪.৩.৮১)— ‘… তারপর পাঁচটায় তথ্যকেন্দ্রে গেলুম। ওখানে পশ্চিমবঙ্গ তথ্য-সংস্কৃতি বিভাগ থেকে সম্মান ও চা-চক্রের আয়োজন। শ্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এসেছিলেন, পরিচয় করিয়ে দিলেন শুভেন্দুবাবু। কি বলবো— ইনি আধা বাঙ্গালী আধা বিহারী— খুব ভালো অনুবাদ করেন।’

তবে প্রায় বছরখানেক পেরিয়ে গেলেও, সুবিমল-অনূদিত গল্প তিনটি মৃণাল সেন ফেরত দেননি। আবার চিঠি লেখেন সুবিমল—

২৮ অক্টোবর ১৯৮১

শ্রী মৃণাল সেন
সমীপেষু,

   পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘প্রেমচন্দ গ্রন্থাবলী’ প্রকাশ করতে চলেছেন। কিছু অনুবাদের কাজ আমাকে দেওয়া হয়েছে। আপনার কাছে যে তিনটি গল্পের অনুবাদ রাখা আছে— সেগুলি যদি খুঁজে বার করে রাখেন, কোন একদিন গিয়ে আমি নিয়ে আসতে পারি
   আর যদি একান্তই না পাওয়া যায়— তাহলে আমায় দ্বিতীয় বার পরিশ্রম করতে হবে। অনুবাদে কিছুটা সময় যাবে। সময় অল্প।
   চিঠির প্রতীক্ষায়। শুভেচ্ছা সহ

আপনার বিশ্বস্ত
সুবিমল বসাক

দিনকয়েক পরেই এ-চিঠির জবাব দেন মৃণাল সেন—

14 Beltola Road
Calcutta 700056
Tel: 474799

নভেম্বর ৩/৮১

প্রিয় সুবিমলবাবু।।
   আপনার চিঠি পেয়েছি।
   আপনার লেখা তিনটেও পেয়েছি।
   বেশ কিছুদিন আপনাকে অনেক ঘুরিয়েছি, স্বাভাবিক কারণেই আপনি বিরক্ত হয়েছেন তাও বুঝতে পেরেছি। আমাকে ক্ষমা করবেন।
   আমি জানতাম আপনার লেখাগুলো হারায় নি, সমস্যা ছিল খুঁজে বের করা। এবং তা সম্ভব হয়েছে।
   যে কোনোদিন আমার বাড়িতে এলে পেয়ে যাবেন। আমি কলকাতায় বা বাড়িতে না থাকলে আমার স্ত্রীকে বলবেন।
   অনুবাদের বইটি বেরুলে আশা করি জানতে পারবো।
   নমস্কার। ইতি

মৃণাল সেন

কয়েকদিন বাদে মৃণালের বাড়িতে যান সুবিমল। ডাইরি থেকে জানা যায় সেদিনের কাহিনি (১৪.১১.৮১)—
‘মৃণাল সেনকে বাড়িতে গিয়ে পাওয়া গেল। একা ছিলেন। মাঝে বোম্বে গিয়েছিলেন। গীতা সেন দরজা খুলে দিলেন। আমার লেখা তিনটে (প্রেমচন্দ) ফেরৎ দিলেন। জিজ্ঞেস করলুম— করছেন মুক্তিমার্গ। ‘হ্যাঁ, করবো।’ তারপর ঘণ্টাখানিক তার সঙ্গে আলোচনা হলো। অঞ্জন ‘দন্দশূক’ দিয়ে গেছে। মৃণালবাবু ওটার পাতা ওলটাতে ওলটাতে নাকি দু-তিন লাইন পড়েছিলেন। অঞ্জন ওটা শুনে বক্রোক্তি করায় মৃণাল বললেন— আমি ক্যাজুয়ালি পড়ছি। আমি জানালুম, আসলে আপনার কাছ থেকে অমন আশা করিনি। আপনি তো আর establishmentar নন, commercial নয়— সুতরাং seriousness আশা করা গিয়েছিল। যাই হোক, Hungry Generation নিয়ে প্রসঙ্গ উঠলো। আমিও যে আন্দোলনের একজন— তা জানলেন উনি। প্রেমচন্দের গল্পগ্রন্থ দিলুম, গল্পগুলির প্রতিটির মোটামুটি ধারণা দিলুম তাঁকে। বাসুদেবের লেখাটার কথা জিজ্ঞেস করলো, বললুম— political। পড়ে দেখবেন। তারপর আমি বললুম— আমাকে কাজ দিন। বললেন— কি কাজ করবেন, union আছে। ‘আপনার সঙ্গে অ্যামেচার হিসেবে কাজ করতে চাই। আসলে যুক্ত থাকতে চাই…। তারপর জানালেন— ঠিকানা রইলো, জানাবো। আমার তো হিন্দি লোক আছে। তারপর সুরমা ঘটকের ঋতিক বইটার কথা উঠলো। ওদের মাঝে যে conflict তা উনি বলেননি, মদ খায় কেন? সেটাই ধরতে পারে না। জানালেন ঋত্বিক মদ খেয়ে মৃণালের বাড়ীতে কালীর ছবির দিকে চেয়ে বলতো— ‘এবার তোকে হুড়কো দেবো।’ বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কথা হলো— আমাদের বন্ধু ছিল এক সময়।’

মৃণাল সেন ১৯৭৭ সালে প্রেমচন্দের গল্প ‘কাফন’ অবলম্বনে ‘ওকা উরি কথা’ নামের একটি তেলুগু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। ১৯৮১ সালে ভারতীয় ভাষা পরিষদে প্রেমচন্দের শতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে অন্যতম বক্তা ছিলেন মৃণালও। ২৫ মার্চ মৃণাল যে-বক্তব্য রেখেছিলেন, তার খানিক আভাস পাওয়া যায় সুবিমলের ডাইরিতে (২৫.৩.৮১)—
‘… মৃণাল সেন realism সম্পর্কে বললেন— তিনি ফিল্মে realism সম্পর্কে তার ধারণা জানালেন। আকালের সন্ধানে বা একদিন-প্রতিদিন নিয়েও আলোচনা করলেন। কিন্তু গোলাম কুদ্দুস তাকে ‘বাস্তব’ সম্পর্কে বেশ আক্রমণ করলেন।…’

‘মুক্তিমার্গ’ নিয়ে মৃণাল শেষাবধি কোনও চলচ্চিত্র তৈরি করেননি। সুবিমল-অনূদিত প্রেমচন্দের দুটি গল্প— ‘সমস্যা’ ও ‘বিধ্বংস’, সংকলিত হয় পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রকাশিত ‘প্রেমচন্দ গল্পসংগ্রহ’ গ্রন্থে। 

পরের বছর মৃণাল সেনের দুটি চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা ডাইরিতে লিখে রেখেছেন সুবিমল। সে-দুটির উল্লেখ করেই এই পর্বে মৃণাল-প্রসঙ্গে ইতি টানা যাক।

১৬.২.৮২
মৃণাল সেনের ‘আকালের সন্ধানে’ দেখলুম। এক কথায় অপূর্ব। আমার মনে হয়, মৃণাল সেন এযাবৎ যা করেছেন— এটাই সুপার্ব। সামান্য দু-একটা ত্রুটি ছাড়া ছবিটা সুপার্ব। অভিনয়, উপস্থাপনা, আঙ্গিক, ডায়ালগ সবই একসিলেন্ট। দারুণ করেছেন। আমার মন এতদূর নাড়া খেয়েছে যে বিষণ্ণ বোধ করলুম। ‘অনন্যা’ থেকে একা-একা পায়ে হেঁটে বাড়ীতে ফিরলুম।
এবং ছবিটি, আধুনিক তো বটে— ফিল্মের ভাষায়ও একটা milestone.

৬.১০.৮২
‘খারিজ’ দেখলুম। শেষ সপ্তাহ। মৃণাল সেনের ছবি ‘একদিন প্রতিদিন’ থেকে পালটে গেছে। অভিনয় ভালো। অঞ্জন দত্ত ভাল অভিনয় করেছে— মমতাও। গল্পের শেষটা কেমন ত্রুটি মনে হলো প্রথমদিকে ছেলের মৃত্যু খবরে পাড়ায় যত ভীড়, পরে কিছু নেই। শেষে যেন অঞ্জন-মমতার কোন দায়-দায়িত্ব নেই— শুধু চুপচাপ এবং পাপবোধে আক্রান্ত। ভয় নেই, দুশ্চিন্তা নেই—
তবে, ভাল ছবি, এবং ভাল ছবি দেখার পর মন খারাপ হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয় যে-ব্যক্তির চিঠি আলোচিত হবে, তিনি সাহিত্যিক ও শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা রমানাথ রায়। তাঁর একটি চিঠিই পেয়েছি সুবিমলের সংগ্রহে।

কলকাতা

প্রিয় সুবিমল বাবু,

   আমরা বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনে একটা স্টল পেয়েছি। সেখানে তিরিশ বা চল্লিশ দশক থেকে ছোটগল্প ও কবিতার ধারাবাহিকতা দেখানোর চেষ্টা করা হবে। এতে আপনার সহযোগিতা চাই। আপনি যদি আপনার বই ‘ছাতামাথা’ কৃষ্ণগোপাল বাবুর কাছে রেখে যান তাহলে খুশী হব।

রমানাথ রায়
১৪.১১.৭২

চিঠিতে উল্লিখিত ‘কৃষ্ণগোপাল’ হলেন সাহিত্যিক ও ‘গল্পকবিতা’ পত্রিকার সম্পাদক কৃষ্ণগোপাল মল্লিক। সুবিমলের প্রথম বই ‘ছাতামাথা’ প্রকাশ পায় ১৯৬৫ সালে। 

সুবিমলের ডাইরি ঘাঁটতে ঘাঁটতে একবার রমানাথ রায়ের প্রসঙ্গও চোখে পড়েছে। তা অবশ্য বেশ কয়েক বছর বাদে, ১৯৭৮ সালের—

২৭.২.৭৮
‘… রমানাথ রায়— এই দশকের— সঙ্গে কাল রাত্রে ফেরার সময় দেখা। সুনীলের প্রশংসা করছিল, অথচ, আর সকলকে গালাগাল করছি। কৃত্তিবাসে ওর ধারাবাহিক লেখাটা ছেদ পড়ছে। ওদের সঙ্গে আমাদের লেখনগত মিল খুব কম। শক্তির খুব গালাগাল করল। লেখকরা যাকে পছন্দ করে না, ভাল লেখা সত্ত্বেও গালাগাল দেয়।’

তৃতীয় যে-ব্যক্তির চিঠি দিয়ে এই পর্ব শেষ হবে, তিনি কবি ও সম্পাদক তরুণ সান্যাল। চিঠিটিও অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক, ১৯৯৭ সালের—

২৭.৪.৯৭

কল্যাণীয় প্রিয় সুবিমল,

   তোমার ‘প্রত্নবীজ’ পেয়েছি এবং পড়ে ফেলেছি। সমাজের নীচতলার কালচার-এর প্রতিলিপি বলতে পারি বইটির লেখা। এক দিকে রয়েছে এই সমাজের মধ্যে প্রচণ্ড শক্তি। অন্যদিকে আছে উচ্চকোটি বর্ণশ্রেষ্ঠ ও ধনশ্রেষ্ঠ মানুষের প্রতি ভীতি ও শঙ্কা; বাঙালি বালকের চোখ দিয়ে দেখা পাটনা শহরের বহু নিন্দিত পল্লীর মানুষজনের প্রেম, ঘৃণা, যৌনতা, লোভ, হিংসা, যৌথভাবে আবেগ নিঃসরণ এবং ইত্যাদি। এই ‘উপন্যাস’টি সম্প্রতিকালে আমার পঠিত রচনাগুলির মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক নিঃশ্বাসে পড়েছি। ভাবছি, আবারও পড়ব। মলয়ের লেখাটি যোগ না করলেও চলতো। তাঁর একটি চমৎকার প্রবন্ধ সমীর রায়চৌধুরীর সম্পাদিত উত্তর উপনিবেশ বিষয়ক বইটিতে পড়েছি। হাংরি আন্দোলনে যেটুকু অপরিণত ব্যাপার ছিল— সে সব ঝরে গেছে। মেদ ঝরে যাওয়ায় সত্যিই এখন লেখাগুলি মনে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আরো এরকম রচনার প্রতীক্ষায় রইলাম।
   প্রীতি ও শুভেচ্ছা নিয়ো।

তরুণ সান্যাল

১৯৯৬ সালে প্রকাশ পায় সুবিমল বসাকের উপন্যাস ‘প্রত্নবীজ’। তা পড়েই তরুণ সান্যালের এই প্রতিক্রিয়া। বইটির শেষে ‘মলয় রায়চৌধুরীর সংযোজন’-শীর্ষক তিনপাতা গদ্য ছিল, মূলত ‘প্রত্নবীজ’ ও তার প্রেক্ষাপট নিয়েই।

তরুণ সান্যালের সঙ্গে সুবিমল তথা হাংরিদের সম্পর্ক অবশ্য বেশ পুরোনো। ১৯৬৫ সালে মলয়ের বিরুদ্ধে মামলা চলাকালীন, মলয়ের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তরুণ। সেই তথ্য বা কৃতজ্ঞতাটুকু বারবার ফিরে এসেছে তাঁদের লেখায়। হাংরিদের প্রতি তরুণের সহমর্মিতা টের পাওয়া যায় তিরিশ বছর পেরিয়ে, এই চিঠিতেও।