অলিগলির কালীঘাট : পর্ব ৮

জীবন ঘিরে দোকানদারি

একটা সময় ছিল, যখন রাস্তার এপারে কালীঘাট হকার্স কর্নার, মোদি কাটরা। ট্রামলাইনের ওপারে কালীঘাট লক্ষ্মী কাটরা, গণেশ কাটরা। এখন স্কাইওয়াকের বাঁদিকের সিঁড়ি হকার্স কর্নারের দিকে নেমে গেছে। আর কোনও কাটরার অস্তিত্ব নেই। স্বার্থের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে সব আগুনে পুড়েছে।

আগুন একটা দারুণ হাতিয়ার! ওখানে এখন সব বড় বড় বাড়ি, দোকান। এই হকার্স কর্নারগুলো ছিল পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মানুষের জীবন-জীবিকার জায়গা। খুব সস্তায় ওখানে জামাকাপড় পাওয়া যেত। আমাদের কাছে কাটরাগুলো খুবই প্রিয় ছিল দুটো কারণে, প্রথমত, ওখানে জমজমাট কালীপুজো হত। ভূত-কঙ্কাল সাজিয়ে, অন্ধকার গুহা বানিয়ে কালীপুজোর সময় বিস্তর গা-ছমছমে আনন্দ। কালীপুজোর পরদিন ছিল দেদার খিচুড়ি, ল্যাবড়া, কোনও তুলনা হবে না। আমরা গরিব, বড়লোক সব বন্ধুরাই কালীপুজোর পরদিন ওখানে খেতাম। আমাদের জন্য বিশেষ আদর-আপ্যায়ন থাকত। কেননা, এইসব কাটরাদের বেশিরভাগ মানুষই ছিল ফুটবলপ্রেমী, এদের কারও-কারও টিমও ছিল। আমরা কেউ না-কেউ সেই টিমের হয়ে খেপ খেলতে যেতাম। কোথায় না গিয়েছিলাম! নৈহাটি, রানাঘাট, বনগাঁ। ম্যাটাডোরে চেপে চলে গিয়েছি ম্যাচ খেলতে। এটা দ্বিতীয় কারণ।

গলির কাপ্তেন, বড়দের কালীঘাট ও গুপ্তধন! ‘অলিগলির কালীঘাট’ পর্ব ৯…

এদিকের ফুটপাতের ওপর ছিল ডালা পাতা দোকান। হাজরা মোড় পেরিয়ে বসুশ্রী সিনেমা হল থেকে শুরু হয়ে প্রায় রাসবিহারী ছুঁইছুঁই নানা ধরনের দোকান ছিল। মূলত জামাকাপড়, কিছু জুতোর দোকানও ছিল। এর মধ্যে রমরমা ছিল উজ্জ্বলার সামনের দিকের দোকানগুলো। কিন্তু মেট্রোরেলের কাজ শুরু হলে হাহাকার পড়ে গেল, ফুটপাথ জুড়ে মাটির পাহাড়। দোকান পেতে বসা দূরের কথা, মানুষের হাঁটাচলা করার জায়গা নেই। অনেক মানুষ বেকার হয়ে পড়ল। কালীঘাট পার্কের দিকে ছোট-ছোট টিনের ঘর করে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ওদিকে খদ্দেররা গেল না। ওদিকটা অন্ধকার, ওদিকটা ভাগাড়। তখন যোগেশ মাইম হয়নি। ওখানে ছিল লেডিস পার্ক। সন্ধেবেলা কুকর্মের আখড়া। খদ্দেররা সব দল বেঁধে চলে গেল গড়িয়াহাটের দিকে। ঝলমল করে উঠল গড়িয়াহাট।
আমাদের এখনকার মধ্যবিত্ত আর চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগেকার মধ্যবিত্ত সম্পূর্ণই আলদা ছিল। তখনকার মধ্যবিত্তদের মূল বাজারই ছিল এই হকার্স কর্নার, ফুটপাতের দোকান। তারপর ভবানীপুর, গড়িয়াহাট।
আমাদের সেই গ্রামতুতো মাসিদের পরিবার তখন ধুঁকছে। ওদের তিনটে দোকান ছিল উজ্জ্বলার ফুটে। দেখতাম, দাদারা দল বেঁধে বিভিন্ন ফুটে বসার যেই চেষ্টা করত, তাদের পুলিশ এসে ঠেঙিয়ে তুলে দিত। তার ওপর ছিল স্থানীয় মস্তানদের অত্যাচার।

এরই আর-এক রূপ দেখতাম কালীঘাট বাজারের রাস্তায়। সকালের দিকে দশটা-এগারোটা নাগাদ হঠাৎ হল্লাগাড়ি আসত। চারদিকে চিৎকার-চেঁচামেচি, শোরগোল পড়ে যেত। চালবিক্রেতা মাসিরা প্লাস্টিকের ওপর ঢালা চাল তুলে নিয়ে এ-দোকান, ও-দোকান, এ-পাড়া, ও-গলির ভেতর গিয়ে লুকোত। তখন চালের কন্ট্রোল চলছিল। রেশনে চাল-গম মিলত। খোলা বাজারে চাল ছিল বেআইনি। আমরা রাস্তা থেকেই চাল কিনতাম। সেই চালের মাপ ছিল ছোট টিনের কৌটো। চালওয়ালি মাসিরা কৌটো মেপে চাল দেওয়ার সময় একটা আঙুল কৌটোর ভেতর ঢুকিয়ে দিত। কৌটোর তলা ভেতরদিকে ঢোকানো থাকত। চাল মাপে কম দেওয়ার জন্য নানা কায়দা করত। ওরা সবসময় পুলিশের হল্লাগাড়ির আতঙ্কে থাকত। টাকাপয়সা সব পেট-কোঁচড়ে রাখত। হল্লা এলেই প্লাস্টিকের চারকোনা ঘরে হুড়মুড় করে দৌড়ত। কিন্তু তাদের দৌড়ের সময় এতই তাড়াহুড়ো থাকত যে, সারা রাস্তায় চাল পড়তে-পড়তে যেত। এছাড়া হল্লাগাড়ি যারাই রাস্তায় বসে বিক্রি করত, তাদেরই ধরত। অনেককে দেখতাম, ধরা পড়ার আগের মুহূর্তে সব চাল বা আনাজ রাস্তায় ঢেলে দিত। সে কী অবর্ণনীয় অবস্থা!

এমনই একদিন মুক্তা এবং তার ভাইকে দেখলাম, রাস্তায় পড়ে যাওয়া চাল মুঠো-মুঠো করে কুড়োচ্ছে। মুক্তা তার ফ্রকের কোচড়ে আর ওর ভাই গায়ের জামা খুলে তার ওপর চাল তুলছে। সে এক দেখার মতো দৃশ্য।

আমি বাড়ি ফিরে সবিস্তার মাকে সেই গল্প করছিলাম। মা আমার মজা করা দেখে ঠাস করে গালে একটা চড় মেরেছিল। আমার মায়ের হাত ছিল খুব চালু, মুখের আগে হাত চলত। আমি একমাত্র ছেলে বলেও রেহাই পেতাম না। আমার মাসিমা বলল, ‘ওই নমু ওকে মারলি কেন?’ মা বলল— এত বড় ছেলে, এখনও এই বুদ্ধি হয়নি, মানুষ কত কষ্টে রাস্তা থেকে চাল কুড়ায় জানে না, হেসে-হেসে যাত্রাপালা করছে।

আমি বোকা ছিলাম। গালে হাত ঘষতে ঘষতে বললাম, ‘কষ্ট মুক্তাদের কোথায়? ওরা তো চাল পাচ্ছে। কষ্ট তো চালওয়ালি মাসিদের— যাদের চালগুলো রাস্তায় পড়ল।’

মা বলেছিল, তুই চাল কুড়োসনি কেন? তোর ঘরে খাবার আছে বলে। ওদের নেই— ওরা কুড়িয়ে খাচ্ছে। ওদের দেখে তুই হাসছিস কেন? সারাদিন তো মুক্তার পিছন-পিছন ঘুরিস। তোর গায়ে কেউ একটা আঁচড় কাটলে ও আগে গিয়ে তাকে মেরে আসে। আর তুই তার কষ্ট দেখে মজা পাবি।

তারপর বড় থেকে বুড়ো হয়েছি। আমি বারবার দেখেছি, বিভিন্ন বয়সে আমি মাতৃশক্তিরই সাহায্য পেয়েছি। কেউ না-কেউ ঢাল হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়েছে। আমাকে সাহস দিয়েছে, হাত ধরেছে। একটু ভাবলে দেখি, এক নয়, একাধিক নারী আমার চলার পথে কাঁটা সরিয়েছে।

কালীঘাট বাজারে যে-কোনও বাজারের মতো আলু-পিঁয়াজের আলাদা দোকান ছিল। আলাদা দোকান ছিল ডিমের। আশ্চর্য লাগে, শুধু কুমড়ো বিক্রি করার জন্য একটা দোকান! শুধু কুমড়ো বিক্রি করে কি একটা পরিবার চলে যেত? এখন প্রশ্ন করলে উত্তর মেলে না। হয়তো তখন আমাদের খুব সামান্য চাহিদা ছিল। হয়তো মিটে যেত— এখন বাড়ির পর ফ্ল্যাট। ছোট ফ্ল্যাট থেকে আর-একটু বড়। গাড়ি একটা না থাকলে হয়? গাড়ি থাকলেও এটা ছোট, এসইউভি হলে সবাই মিলে হইহই করে যাওয়া যেত। শুধু পোস্টঅফিসে টাকা জমানো নয়, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, এসআইপি, মিউচুয়াল ফান্ড— এই আমরা এখনকার মধ্যবিত্ত।

ডিমের দোকানি এক কাকুকে এখনও আমার মনে আছে। তার তর্জনী ছিল হাফ-কাটা। ফরসা, খুব সুন্দর দেখতে, অনেকেটা লাফিং বুদ্ধর মতো। আমি ডিম নেওয়ার সময় বলতাম— দেখে দাও কাকা। হাফ তর্জনীর ওপর ডিম রেখে আলোর সামনে ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে কাকা দেখত। আর আমি তার আঙুল দেখতাম।
ওই কাটা আঙুল আমাকে খুব টানত, কেন জানি না।

মাঝে-মাঝে একটু বেলার দিকে মা আমাকে পাঠাত, ডিমকাকার দোকান থেকে ভাঙা ডিম কিনে আনতে। ওই দোকানে অনেক কম দামে ভাঙা ডিম পাওয়া যেত। কিনে আনতাম। কখনও-কখনও ডিমকাকা আমাকে একটা ভাঙা ডিম বেশি দিত। ফাউ। বলত— এটা তোর জন্য। কাকা একটা পেনসিল দিয়ে চিহ্ন করে দিত। আমি বাড়িতে ফিরে আগেই সেটা খেতাম। আমার ফাউ, আমি খাব।
তখন বাজারের ভেতর মুরগির মাংসের দোকান ছিল না। পরপর দু-তিনটে খাসির মাংসের দোকান, আর ছিল কচ্ছপের মাংসের দোকান। বড়-বড় কচ্ছপের খোল দোকানের সামনে নারকেল দড়ির জালের গায়ে ঝোলানো থাকত। এমনই অনেক খোল ছিল, যা ছোটখাট বসার জায়গা হতে পারে। আমি ঠিক করেছিলাম, একটা খোল দিয়ে জলচৌকি করব, একটা আমার চাই। এক বন্ধু-দাদা যে বাজারে পাঁঠা কাটত, তাকে দিয়ে কচ্ছপের দোকানিকে রাজি করিয়েই ফেলেছিলাম, কিন্তু বাধ সাধল মা— ওই খোল বাড়ি ঢুকলে আমি তোর পিঠে ভাঙব। আমি অনেক যুক্তি দিয়েছিলাম— বাঘের ছালে বসে সাধুরা যে ধ্যান করে! আমার কোনও যুক্তিই ধোপে টেকেনি।

সে-সাধ পূর্ণ হয়নি। তবে সে-সাধ ঘোলে মিটেছিল, আন্দামানের ভরতপুর বিচে কচ্ছপের খোলের ওপর বসে ডাব খেয়েছিলাম।

মুরগি-চিকেনের প্রথম স্বাদ পেয়েছিলাম কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যর কবিতায়। মনে আছে তো ‘একটি মোরগের কাহিনী’? সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মস্থান হল ৪৩ নং মহিম হালদার স্ট্রিট। তাঁর মাতামহর বাড়ি ছিল এখানে। তার পাশেই যুবমৈত্রী ক্লাব। নামী দুর্গাপুজো। পরের দিকে বা এখনও আমাদের ক্লাব গড়মিল সংঘের কালীপুজো হতো।

আরও একটা সাধ পূর্ণ হয়নি।

চক্রবর্তীপাড়ার মুখেই একটা অদ্ভুত জিনিসের দোকান ছিল। সেখানে পাওয়া যেত নানা ধরনের তামাক, হুঁকো ধরানো টিকে, গুল, গ্গগুল, ধুনো, কাঠ কয়লা। মাথার ওপর ঝুলত নানা ধরনের হুঁকোর খোল, গাঁজার কলকে। হুঁকো সাজতে নানারকম জিনিসের দরকার পড়ে, সব এখানে পাওয়া যেত। গাঁজার কলকে যখন মিলত, গাঁজাও মিলত নিশ্চয়ই। গুড়াকু তামাকও পাওয়া যেত। অনেককে দেখতাম তাই দিয়ে দাঁত মাজত। বিশেষত দুপুরের দিকে। দাঁত মাজার নামে একটু নেশাও হল। আর-একটা জিনিস এখানে পাওয়া যেত, তা হল পোস্তর খোলা। এই খোলার ভেতর পোস্ত থাকে। এই খোলা আগেরদিন ভিজিয়ে রেখে পরেরদিন দুপুরে খেলে বেশ খোলতাই নেশা হয়। আমি উচ্ছেদির নেতৃত্বে একবার জয়বতী মাসিমার করে রাখা পোস্ত-খোলার পুরো জলটাই খেয়েছিলাম। তার বদলে চায়ের লিকার রেখে, সেটা একচুমুক খেয়ে উচ্ছেদি বলল— এতে হবে না। ধরা পড়ে যাবি। এতে একটু হিসি করে দে। তারপর অনেকবার একই থিওরি দিদি আর ভাই মিলে। জয়বতী মাসিমা সেটা খেয়েও ব্যোম হয়ে থাকত। জয়বতী মাসিমা আসত আঁতুড় তুলতে। সেবার এসেছিল মাসিমার বড়বউমার বাচ্চা হতে। জয়বতী মাসিমা আমার ছোট বোন হওয়ার সময়ও এসেছিল। একবার আমার মায়ের কার্বাংকল হয়ে বড় কষ্ট পাচ্ছিল। জয়বতী মাসিমা আমাদের সাংসারিক কাজও করে দিত। আমার ছোটবোন যখন মায়ের দুধ খেত, আমারও তখন ওভাবে দুধ খাওয়ার প্রবল ইচ্ছে হত। মা দিত না, আমি জয়বতী মাসিমার শুকনো বুক ধরে ঝুলতাম। মাসিমা ছ’মাস, আট মাস থেকে প্রসূতি বাচ্চাকে তাগড়াই করে আবার অন্য বাড়িতে চলে যেত। যাওয়ার সময় আমার মা-বাবাকে দেখেছি তাকে প্রণাম করতে। মাকে কাঁদতে দেখেছি। সে যখন আসত, নানারকম নাড়ু, মিষ্টি বানিয়ে নিয়ে আসত। যখন যেত, নানারকম নাড়ু মিষ্টি বানিয়ে নিয়ে যেত। মাদার টেরিজা যদি গেঁওখালির নদীর ধারে জন্মাতেন, তাঁর গায়ের রং-ও নিশ্চয়ই আমার মা-মাসিদের মতোই হত। উনি আমার দেখা আর-এক মাদার। যিনি বিয়ে করেননি, সন্তান সুখ পাননি। শুনতাম, আমার জন্মের পরও জয়বতী মাসিমা আমাকে রোদে ফেলে তেল মালিশ করত। এখন যদি থাকতেন, তাহলে একটা কথা বলতাম, আমার নাকটার একটু যত্ন নিয়ে টেনে তুললে না! তাহলে এমন বুলডগের মতো ভোঁতা হত না।
আমার খুব সাধ ছিল, একটা হুঁকো কিনে তামাক সেজে ভুরুক-ভুরুক করে টানব। ভেবেছিলাম— বড় হয়ে হুঁকো কিনলে কেউ আর আপত্তি করবে না।
প্রতাপদার মা, যাকে আমি পিসিমা বলতাম, তিনি একটা কথা বলতেন— যখন শাড়ি রঙিন হল, তখন আমি বেধবা হলাম। কথাটা তখন ঠিক বুঝতাম না, পরে বুঝেছি, উনি সধবা থাকার সময় রঙিন শাড়ি সহজলভ্য ছিল না। রঙিন শাড়ি যখন বাজারে সহজলভ্য হল, তখন তিনি বিধবা হয়েছেন। আমার অবস্থাও হল তাই, যখন আমি রোজগার করলাম, ততদিনে ওই হুঁকোর দোকান উঠে গেছে। পোস্তর খোলাও কোথাও দেখি না। কচ্ছপের মাংস বেআইনি। সব চিকেন। সব মুরগি।

মুরগি-চিকেনের প্রথম স্বাদ পেয়েছিলাম কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যর কবিতায়। মনে আছে তো ‘একটি মোরগের কাহিনী’? সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মস্থান হল ৪৩ নং মহিম হালদার স্ট্রিট। তাঁর মাতামহর বাড়ি ছিল এখানে। তার পাশেই যুবমৈত্রী ক্লাব। নামী দুর্গাপুজো। পরের দিকে বা এখনও আমাদের ক্লাব গড়মিল সংঘের কালীপুজো হতো।

সে-সময় আমরা কিন্তু মাটিতে বসেই খেতাম। আমাদের মতো মানুষদের ঘরে খাবার টেবিল আসেনি। সেই সঙ্গে আমরা মুরগি বা মোরগের স্বাদ পাইনি। বেশিরভাগ বাড়িতে মুরগির মাংস অচল ছিল।

তার মধ্যেই হঠাৎ একদিন আমার এক জ্যাঠার বাড়ি গিয়ে নতুন এক মুরগির দর্শন হল। সে মুরগি লাফায় না, ঝাঁপায় না, পালায় না, ডাকে না, থুম মেরে বসে থাকে। যেন ‘আমাকে মারো, এসো হত্যা করো’ বলে মৃত্যুর অপেক্ষা করে। জ্যাঠতুতো দাদা চাষ করছে। মুরগির চাষ। দাদার বাড়ি থেকে কেটে কুটে একটা মুরগি চলে এল আমাদের বাড়িতে। মা আমার মুখে মুরগির নট নড়ন-চড়ন বর্ণনা শুনে, ওঁক তুলতে শুরু করল। মেজদি বলল— মুরগি না, ওটা নির্ঘাত সাদা কোনও ব্যাঙ, নইলে থুম মেরে বসে থাকে? পালাবে না? আমি বললাম— এটা মুরগিও না মোরগও না। ওর নাম ব্রয়লার।

খুব কাতর আবেদনের পর বাবা রান্নার বাসন পেল। কয়লা ঘরের পাশে বসে ইট পেতে কাঠের জ্বালে ব্রয়লার রান্না হল। উচ্ছেদি ছাড়া মেয়েরা কেউ-ই খেল না। উলটে আমাদের খাওয়া দেখে কেউ-কেউ বমিও করল। আমি, বাবা, মেসোমশাই, দাদারা খেলাম—চিকেন-মুরগির ঝোল ভাত।

কালীঘাট অঞ্চলের গঙ্গায় বান আসার কথা কি আগে বলেছি? না বললে, পরে বলব। তার আগে কচ্ছপের গল্পটা বলে নিই।

সেসময় কচ্ছপভরা ট্রাক আসত কালীঘাট বাজারে সামনে। ট্রাকও এসেছে, গঙ্গায় বানও এসেছে। ট্রাক তাই মাল খালাস করেনি। খালাসিরা কোথাও খেতেটেতে গেছে। আমরা বেরিয়েছি বানের জলে হুটোপুটি করতে। এসব জায়গায় বাঁদর ছেলেদের অভাব ছিল না। তারা ট্রাকের ডালার গায়ে লোহার যে গজাল মারা থাকে, ইট দিয়ে ঠুকে ঠুকে তা তুলে দিয়েছে। ডালার আঙটা খুলে দিয়েছে। এবার অনেক কচ্ছপ মুক্তি পাবে। ডালা খোলার পর ঝুপঝাপ করে চার-ছ’টা বিশাল-বিশাল কচ্ছপ বা কাউট পড়ল বটে, পিচের রাস্তায় পড়েই, তারা গঙ্গার মাটি মেশানো জল পেল, হয়তো জীবনের আবার বেঁচে ওঠার আস্বাদ পেল— কিন্তু মুক্তি পেল না। কারণ তাদের পা-গুলো বাঁধা। যারা ডালা খুলেছিল তাদের সাহস নেই পায়ের বাঁধন কেটে দেওয়ার। কারণ, কচ্ছপ কামড়ালে মেঘ না ডাকলে ছাড়ে না। আমাদের হইহই চলছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই খালাসিরা চলে এল। ভাঁটার টান তখন শুরু হয়েছে, তার মধ্যেই নামানো চলল কচ্ছপগুলোকে, শেষ যাত্রার আগে সেই কচ্ছপগুলো একটু গঙ্গাজল আর মাটির স্পর্শ পেল, এই যা…।