প্রলাপ কিংবা দুঃখ
হাংরি আন্দোলনের গোড়ার দিকের যে দু’তিনজন সদস্য আজও জীবিত রয়েছেন, কবি ত্রিদিব মিত্র তাঁদের মধ্যে অন্যতম। কোনও অন্তর্দন্দ্বে না-জড়ানো ত্রিদিব, হাংরি জেনারেশনের বিতর্কিত সংখ্যায় লেখা না-থাকা ত্রিদিব, মামলা না-হওয়া ত্রিদিব ছিলেন অপেক্ষাকৃত নীরব সৈনিক। আর, সুবিমলের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল প্রগাঢ়। ত্রিদিবের সঙ্গে আলাপ-প্রসঙ্গে সুবিমল ডাইরিতে লিখছেন (২২.১.৬৪)—
‘সকালে রোদ্দুর মেখে ত্রিদিব মিত্রের পোষ্টকার্ড এল। হাওড়ার ত্রিদিব মিত্র। একদা কফিহাউসে হারাধনের মারফৎ আলাপ হয়েছিল। হারাধনই আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। ‘ইঙ্গিত’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করবে— তার জন্য কবিতা চেয়েছে। অনুবাদ কবিতা। শমশের বাহাদুর সিংহের কবিতার কথা বলেছিলাম। আধুনিক কবি। তার একটি অনুবাদ কবিতা এবং স্বরচিত আমার একটি কবিতা পাঠিয়ে দিলাম। আমার কবিতাটি সাম্প্রতিক রচনা।’
ত্রিদিবের যে-পোস্টকার্ডের কথা সুবিমল বলছেন, তা এটি—
From ‘INGEET’
প্রিয়বরেষু,
আপনার সঙ্গে আর দেখা হয়ে ওঠে নি। কুশলে আছেন, আশা করি। আধুনিক হিন্দী কবিতার অনুবাদ দু’একটা পাঠাবেন শীগগির— কারণ, পত্রিকার কাজ অনেকটা এগিয়ে গেছে। আগামী সপ্তাহের মশ্যে আপনার লেখা পাচ্ছি আশা করি, সম্ভব হলে হিন্দী কবিতাটিও পাঠাবেন, তাতে সুবিধা হবে।
প্রীতি ও সদিচ্ছা রইল। শৈলেশ্বর, সুভাষ, হারাধন সব কেমন আছে— কাজের চাপে সময় করে উঠতে পারছি না ‘কফি হাউস’ যাবার, তাছাড়া যা গলযোগ গেল সে কথা পুনরুক্তির প্রয়োজন নেই বোধহয়। ইত্যাদি ইত্যাদি
আপনার পরিকার কতদূর এগোলেন
ইতি
ত্রিদিব কুমার মিত্র
১৬/১/৬৪
সুবিমলকে লেখা ত্রিদিবের প্রথম চিঠি এটিই। সুবিমলের লেখা পাওয়ার পর ত্রিদিব যে-জবাব দিয়েছিলেন (২৭.১.৬৪), তার অংশবিশেষ তুলে ধরা যেতে পারে— ‘… আপনার পত্রিকার নাম, কি ছাপাচ্ছেন, বা অন্যান্য কিছু কি করছেন জানি না। আমার পত্রিকাও সরস্বতী পূজা নাগাদ বার হচ্ছে। সম্ভব হলে বিজ্ঞাপন বিনিময় করা যেতে পারে— উভয়ের সম্মতি থাকলে।’ তবে ‘ইঙ্গিত’ পত্রিকাটি শেষাবধি বেরিয়েছিল কিনা সন্দেহ, কেননা সুবিমলের পাঠানো লেখাটি মুদ্রিত হয় ত্রিদিবেরই সম্পাদনায় ‘উন্মার্গ’ পত্রিকায়, ওই ১৯৬৪ সালেই। তখন ‘উন্মার্গ’-এর পরিচয় ছিল— ‘একটি অনিয়মিত ও পরীক্ষামূলক সংকলন’।

ওই বছরেরই মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশ পায় সুবিমল বসাকের পত্রিকা ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’। তাতে অন্যান্য বই ও পত্রিকার বিজ্ঞাপন থাকলেও, ত্রিদিব মিত্র সম্পাদিত ‘ইঙ্গিত’-এর উল্লেখ নেই।
নস্করপাড়া, শিবপুর, হাওড়া
সু,
অনেকদিন হল তোমাদের খবর পাচ্ছি না। ঠিক কথা, চিঠি না লিখলে চিঠি পাবই কি করে। ভালোবাসায় ডুবে আছি আর ডুবে আছি কর্তব্যভারে— যা থেকে কিছু পরিমাণে তুমি তোমরা মুক্ত। গাঝাড়া দিয়ে কিছুতেই দাঁড়াতে পারছি না। মাঝে একদিন বাসুদেব, শৈলেশ্বর, দেবীর সঙ্গে দেখা। মলয়েরও খোঁজখবর নেই, কি ব্যাপার সব! এরকম বেপাত্তা হলে খুবই অস্বস্তির মধ্যে পড়ি— তোমাদের সঙ্গে পরিচয় এত নিবিড় একথা যেন বিশ্বাসই হতে চায় না। আসলে Physical existence একটা বিরাট ব্যাপার। তার গন্ধ, ছায়া বা ছাপের মর্য্যাদাও নিতান্ত কম নয়।
কেমন আছ এখন? লেখা চলছে কেমন? নতুন কি শুরু করলে। আমি এখন অত্যন্ত শ্লথগতি। পিছিয়ে পড়ছি বেশ বুঝতে পারছি। এবার দৌড়তে হবে দমবন্ধ করে। ‘জেব্রা’র খবর কতদুর বা অন্যান্য— সব কে কি করছ বা করছ আছ বা আছে লিখছ বা লিখছে ইত্যাদি ইত্যাদি আমাকে জানাবে সুনিশ্চিত সুবিমল বন্ধু আমার— তোমার নীরববন্ধু ত্রিদিব

সুবিমলের ডাইরিতে এই চিঠির কোনও উল্লেখ না-থাকায়, আলোচনা বিস্তারে নেওয়া গেল না। তবে ওই বছরই ত্রিদিব নতুন উদ্যমে ‘উন্মার্গ’ পত্রিকার পরিকল্পনা করেন ও তার প্রথম সংখ্যা প্রকাশ পায় ১৯৬৭ সালে। পরবর্তী চিঠিতে ‘উন্মার্গ’-প্রসঙ্গ উপস্থিত—
২০.১.৬৭
প্রিয় সুবিমল,
ইতিমধ্যে চিঠি পেয়েছ আশা করি।
মলয়ের চিঠি পেলাম।
ফেব্রুয়ারীতে আসছে কলকাতা।
জেব্রা বেরোতে দেরী হবে।
মলয় কলকাতায় কেস চলছে
High courtএ অথচ ক্ষুধার্তরা
চুপচাপ।
কেন?
মরে গেছে নাকি?
‘উন্মার্গ ফেব্রুয়ারীতেই বার করব।
পার ত আমার হয়ে বাসুদেবকে চিঠি
লিখে সুভাষ+শৈলেশ্বরদের মুখে
বা চিঠিতে ব্যাপারটা লেখ
বুঝিয়ে
এবং টাকার কথাও।
আমিও লিখছি।
তুমি কিরকম Donate করতে পারবে?
জানালে কিছুটা সাহস পাই।
এবং কাজে নামতে পারি।
জানুয়ারীর শেষ দিকে যাচ্ছি।
ইতিমধ্যে মতামত জানাও।
বাসুদেবকে চিঠি Post করছি।
ত্রিদিব মিত্র
শুধু ‘উন্মার্গ’ই নয়, ত্রিদিব মিত্র ও তাঁর স্ত্রী আলো মিত্র ধারাবাহিকভাবে আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সম্পাদনার কাজ করেছিলেন। সেগুলির মধ্যে ইংরাজিতে হাংরি নিউজলেটার ‘Waste Paper’, মলয় রায়চৌধুরীকে লেখা বিভিন্ন বিদেশির চিঠিপত্রের ইংরাজি সংকলন, মলয়কে লেখা বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকের চিঠির বাংলা সংকলন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

কি ব্যাপার?!
হঠাৎ ডুব মারলে?
‘প্রলাপদুঃখ’-টা লিখে ফেলো— ২/১ দিনের মধ্যে নিয়ে যাব।
‘হাবিজাবি’ আগেভাগে বার কোরে ফেল— প্র.দু. বেরোলে নিশ্চিত জেনে রেখো আ গু ন জ্বলে উঠবে বাংলাদেশে।
বেশী দিন আর বাঁচব না মনে হয়, এরপর।
ও.কে.
ত্রিদিব
২৪/১১/৭০
‘প্রলাপ দুঃখ’, ত্রিদিবের প্রথম কাব্যগ্রন্থ, প্রকাশ পায় ১৯৭০-এর ডিসেম্বরে। এই বই নিয়ে সুবিমল একটি দীর্ঘ গদ্য লিখেছিলেন— ‘ত্রিদিব মিত্রের প্রলাপ, ত্রিদিব মিত্রের দুঃখ’। এর আগে সুবিমলের ‘ছাতামাথা’ উপন্যাস নিয়ে ত্রিদিবও একটি গদ্য লিখেছিলেন, তার পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে আমার কাছে। সুবিমলের কাব্যগ্রন্থ ‘হাবিজাবি’ বেরোয় ওই ডিসেম্বরেই। প্রকাশক ত্রিদিবের স্ত্রী আলো মিত্র।
২৭/৬/৭৬
ডিয়ার সুবিমল
বহুদিন হোল চিঠি লিখব লিখব কোরেও লেখা হয়ে ওঠে নি। কতদিন?— দু-তিন বছর প্রায়। ভাবতেও অবাক লাগে কতগুলো দিন কেটে গেল যোগাযোগহীন। এভাবেই আরো অনেককেই চিঠি লেখার কথা ছিল আমার— লেখা হয়ে ওঠে নি। অথচ মনে মনে বহুবার তোমাদের প্রত্যেককে চিঠি দিয়েছি— তোমরা পাওনি হয়ত।
সরে এসছি কোলকাতা থেকে কেননা কোলকাতা আমার কাছে ক্রমাগত ভয়াবহ হয়ে উঠছিল। সুযোগ পেয়ে গেলাম। চলে এলাম। এখানেও যে ভালো আছি— তা নয়। প্রচণ্ড কাজের চাপে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে চেষ্টা কোরি সবসময়— যাতে কখনো নির্জনতায় নিজের মুখোমুখি একলা না দাঁড়াতে হয়। তবু পারি না। আগের মতই রাত্তিরে ঘুম আসতে চায় না— ভিড় করে পুরনো মুখ, শব্দ, টেবিল, বোতল, যৌথ ভ্রমণপঞ্জী, ইচ্ছা, স্বপ্ন— কুয়াশার মত প্রায়। চাঁদ হেলে পড়ে মাথার পিছনে। ঝিরঝির পাতারা হাওয়ায় হাওয়ায় তরংগধ্বনি তোলে। শূন্যতার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকি। উড়ে যায় খণ্ড খণ্ড মেঘের দল।
কিরকম আছ তুমি? তোমার বউ ও সন্তান! তোমার মায়ের খবর কি? —আর মস্তান ভাই-এর? অফিসে এখন কিভাবে গেলে তোমাকে পাওয়া যাবে জানিও।
সুভাষ, বাসুদেব, শৈলেশ্বর, ফাল্গুনী এদের সংগে দেখা হয় তোমার? কি কোরছে ওরা? জীবনের ধকল সইতে সইতে-ই জেরবার হয়ে গেল সব? এত যে উত্থান আমাদের? সামগ্রিক তীব্র আন্দোলন! তুমিও কি মৃতপ্রায়! কি জানি, বহুদূর গ্রামে, অন্য এক জগতে, কোলকাতা থেকে তিন শ’ বছর পেছনে পড়ে আছি— জানি না সঠিক কোথায় কী হচ্ছে— কে কি কোরছে?
বছর তিনেক আগে শৈলেশ্বরের যে বইটা বেরিয়েছিল— পারলে পাঠিও। তোমার বা অন্য কারোর দিনলিপি কিছু বেরোল না কি— পারলে পাঠিও।
আমি খুব চুপচাপ আছি। হালছাড়া। একা। চোরাবালিতে ধীরে ধীরে ডুবে যাওয়া ছাড়া আর কোন পথ দেখছি না বলে হাল ছেড়ে ছেড়ে দিয়েছি নিজেকে চোরাবালির হাতে। কেবল দেখছি কিভাবে অবতরণ— ধীর অথচ নিশ্চিৎ অসহায় মৃত্যু— ভালোবাসা ছাড়া আর কি-ই বা দেবার আছে…
ত্রিদিব
পোস্টকার্ড না, চিঠি দিলে ইনল্যান্ড ব্যবহার কোর— চিঠি পড়া ও হাপিশ করায় সিদ্ধহস্ত কেউ কেউ আছে এখানে
সপরিবারে বা একাও চলে আসতে পারো। ভালো লাগবে। শাল ইউক্যালিপটাসের জঙ্গল, আঁকাবাঁকা লাল পথ, সবুজ দিগন্ত, সুবর্ণরেখা নদী,… বিশাল নির্জনতা…

সত্তরের দশকে, সরকারি চাকরির সূত্রে মেদিনীপুরের কেশিয়াড়িতে কিছুদিন ছিলেন ত্রিদিব। সেখান থেকেই লেখা এই চিঠি। সুবিমলের ডাইরিতে, চিঠি পাওয়ার পর প্রতিক্রিয়া (৬.৭.৭৬)—
‘বাড়ি ফিরে দেখি, ত্রিদিবের চিঠি এসেছে। ক-ত দিন বাদে। প্রায় দু’বছর। ওর খবরাখবর নেই, আমার খবর জানতে চায়। হঠাৎ ওর চিঠি পেয়ে আশ্চর্য হলুম। ও নিজেই আমাকে এড়িয়ে গেছে এতদিন, আজ, চিঠি পেয়ে ভালও লাগলো, এবং আহত বোধ করলুম। একটা জবাব না হয় দেব। ওর প্রতি আমার দুর্বলতা কাটিয়ে উঠেছি।’
সুবিমলের সংগ্রহে থাকা ত্রিদিব মিত্রের অনেকগুলি চিঠির মধ্যে থেকে সামান্য কয়েকটি আলোচিত হল। হাংরিদের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনে ত্রিদিব বিশেষ জড়াননি কোনোদিন। ১৯৭০-এ ‘প্রলাপ দুঃখ’, আর ’৭২-এ ‘ঘুলঘুলি’— এই দুটি কাব্যগ্রন্থের পরেই নিজেকে সরিয়ে নেন সাহিত্যজগৎ থেকে। পরবর্তী বছরগুলি অখণ্ড নীরবতার…
ডাইরির আরেকটি উল্লেখ দিয়ে ত্রিদিব-প্রসঙ্গ শেষ করা যাক। দীর্ঘদিন পর এককালের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মোলাকাত। তারপর? সুবিমলের বয়ানেই পড়ে নেওয়া যাক (৪.১২.৮২)—
‘আজ হঠাৎ ত্রিদিবের সঙ্গে রাস্তায় দেখা। Esplanade P.O. যাচ্ছিলুম। আমিই দেখে ডাকলুম। তারপর, আমরা একে-অপরকে তাকিয়ে দেখতে থাকলুম— প্রায় আটবছর পর দেখা। ও রোগা হয়েছে— চুল কমেছে। আমার স্বাস্থ্য নাকি ঠিক— তবে চুল পেকেছে ঝরে গেছে। প্রায় ঘন্টা দুয়েক গল্প চললো— আমার অফিসে গেল। আমার খবর রাখে। আমি অবশ্য ভূপেনের কাছ থেকে ওর খবর পেতাম। উত্তরপাড়ায় আছে, আলো লিলুয়ায় চাকরী করছে। এক মেয়ে এক ছেলে। লেখা-টেখা কিছুই হচ্ছে না, আমি অবশ্য গল্প করে গেলুম— কিন্তু তেমন আন্তরিক অনুভব করলুম না। ত্রিদিব এতদিন avoid করে গিয়েছিল। আমি লক্ষ করেছি, যাদের সঙ্গে আমি আন্তরিক, নিঃস্বার্থভাবে মিশেছি— তারাই কিন্তু অকৃতজ্ঞতার প্রমাণ দিয়েছে। সত্যেন, সোনালী, দেবপ্রসাদ, অরুণ আইন, ধূর্জটী, ত্রিদিব— সকলেই। তাই, আর সাহস করি না। তবে একটা সময় সম্ভবত এগুলি মগজে কাজ দেয় না। ভালোও লাগে না। জীবনের সময় যত ফুরিয়ে আসে— ততই যেন এইসব অভিমান ইত্যাদি ফাঁপা মনে হয়।’
এরপর যে-ব্যক্তির চিঠি ও প্রসঙ্গ আলোচিত হবে, তিনি কবি অরণি বসু। সুবিমলের সঙ্গে তাঁর আলাপ ত্রিদিবের সূত্রেই। অরণির বয়স তখন মাত্র ১৭ বছর (জন্ম ১৯৫১)। সুবিমলের ডাইরিতে সেই মোলাকাতের উল্লেখ পাচ্ছি (৭.৭.৬৮)— ‘আমরা দু’জনে অরণি বসু’র সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। খালি গায়ে, ফুলপ্যান্ট— বয়স বেশী নয়। বলল— কলেজের অ্যাডমিশন নিয়ে ব্যস্ত, তাই ত্রিদিবের চিঠি পেয়ে দেখা করা সম্ভব হয়নি। ও আরো জানালো, কিছু কবিতা পাঠিয়েছে দমদমের ঠিকানায়। কিন্তু, তা তো পাইনি। জ্যাঠার হাতে পড়েনি— পড়লে পেতাম। নিশ্চই ওটা গায়েব হয়ে গেছে। ওর সঙ্গে তুষার রায়ের দেখা হয়েছিল— যুব উৎসবে। তুষার তো আমাদের againstএ অনেক কিছু বলে গেছে। অবশ্য, আমি অরণির কিছু brain wash করলাম। ছেলেটা মোটামুটি smart মনে হলো, কিছুদিন ঘুরলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’

সুবিমলকে লেখা অরণি বসুর প্রথম যে-চিঠি খুঁজে পেয়েছি, তা আলাপের মাসদুয়েক পরের—
সুবিমলদা, আপনার পাঠানো Post-Card পেয়েছি। আপনি আপনার আস্তানায় যেতে লিখেছেন, কিন্তু এতদূর থেকে আপনার বাড়ী পৌঁছতে পৌঁছতেই নটা বেজে যাবে। আলাপ-আলোচনা-আড্ডার সময় পাওয়া যাবে না।
হয় আপনিই কষ্ট করে কলেজস্ট্রীটে চলে আসুন (এলে খুব উপকার করা হয়) কিংবা কোন এক শনিবার (ছুটির দিন আমার পক্ষে যাওয়া অসম্ভব কারণটা সাক্ষাতে জানাবো) office কামাই করে দিন আমি কলেজ কেটে আপনার সঙ্গে দেখা করবো। আপনার সম্মতি পেলে ১৪/৯তেও হতে পারে। তবে কলেজ স্ট্রীট এলাকায় হলে আমার খুব ভাল হয়। গল্পকবিতা এখন আর কোনমতেই হাতছাড়া করবেন না। অমৃত’র কাটিংটা আমার কাছে আছে। লিফ্লেট পেয়েছি। ‘ছাতামাথা’ পেয়েছি। খুব তাড়াতাড়ি চিঠির উত্তর দেবেন।
শুভেচ্ছা জানবেন।
অরণি
২৫/৫/৭৫
অরণি তারিখটি বাংলায় লিখেছিলেন। ইংরাজি তারিখ জানা যায় পোস্ট অফিসের স্ট্যাম্প থেকে— ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৬৮। এর পরবর্তী ঘটনাক্রম সুবিমলের ডাইরির বেশ-কয়েকটি এন্ট্রি থেকে স্পষ্ট। পড়ে নেওয়া যাক একে-একে—
২০.৯.৬৮
অরণি এসেছিল। দুপুরের দিকে ত্রিদিবেরও আসার কথা ছিল। সময় হয়েছে দেখে আমি নীচে নাবি— মুখটা ভুলে গেছিলাম। কমবয়সী ছোকরা, বাঙ্গালি চেহারা— হাসি ফুটে ওঠে। কফি হাউসে বসে অনেকক্ষণ আলোচনা হলো। হাংরি লেখা। ওই সকল শব্দ ও ব্যবহার করতে চায় না। না-করেও হাংরি লেখা লেখা চলে।…
বহুক্ষণ ঘোরাঘুরি হলো। লেখা নিয়ে আলোচনা ও কথাবার্তাও হলো অনেক। আগে ও নামের জন্য লিখছিল। পরে বুঝতে পেরেছে— নাম কোন ব্যাপার নয়— লেখাটাই মুখ্য! ছেলেটার মাথা খারাপ করতে অসুবিধে হবে না।
২১.৯.৬৮
ত্রিদিব আজও এলো না। বিকেলে অরণি এসে হাজির— টেলিফোন পাই। তলায় নেমে আসি— আজ ওকে একটু বেশী মাত্রায় ডোজ দিই। ও আমার কৃষ্ণার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল— সত্যি কি না। ওকে বারদুয়ারী নিয়ে যাই। খাওয়াই সামান্য। তারপর নানান ধরনের কথাবার্তা হতে ওকে বৌবাজারে নিয়ে রাস্তাটাও দেখাই। একদিনে অনেক অভিজ্ঞতা হয়। ও জানায়, আমি যেদিন ছবি আঁকতে যাবো ওদের কাছে— ওঁকে যেন নিয়ে যাই। ওদের ঘরের ভেতর বা কথাবার্তা জানার কৌতুহল হয়েছে।
১০.১০.৬৮
দুপুরে অরণি বসু এসেছিল অফিসে। ওকে নিয়ে বেড়ালাম— খেউড়ে’র জন্য লেখা ‘চুন-চুনা-চুন…চুন…’ পড়ে শোনালাম। ধীরে ধীরে ও বুঝতে পারছে লেখার ব্যাপার। ছেলেমানুষীবোধ এখনও প্রচুর পরিমাণে রয়ে গেছে। আবেগ ও কল্পনা দুটোই আছে এখনও।
দ্বিতীয় চিঠি—
সুবিমল দা,
আগামী পরীক্ষার জন্যে ভীষণ ব্যস্ততা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছি। অপঠিত পাঠ্য অধ্যায়গুলো এমনকি স্বপ্নেও হানা দিচ্ছে। পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসেবেই প্রায় সব কবিতাই ইতস্তত পাঠিয়ে কবিতা শূণ্য হবার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু তা হওয়া যায় না। ঝুলি ঝেড়ে আপনাকেও দুটো পাঠালাম, জানি না পছন্দ হবে কিনা। বহুদিন পরে আপনার চিঠি পেয়ে ভাল লাগল। ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ বড়সড় রকমের কিছু করছেন নাকি? এই নিদারুণ পরীক্ষাময় দুঃসময়ে চিঠিফিঠি পেতে বেশ ভাল লাগছে। পরীক্ষার পর একদিন জমিয়ে আড্ডা মারা যাবে।
আপনি ছবি আঁকছেন ইদানীং, P. Card থেকে তা স্পষ্টতই জানা গেল। আশা করি ভাল আছেন। মলয় রায়চৌধুরীর খবর কি? ‘খেউড়’ বেরিয়েছে?
চিঠি পেলেন কিনা জানাবেন। কবিতা ভালো লাগল কিনা তাও।
অরণি বসু
জীবনান্দের জন্মদিন
দুপুর ১-৩০
১৩৭৬
৫৩/১১, ধর্মতলা লেন
হাওড়া-২

১৯৭০-এর ফেব্রুয়ারিতে লেখা এই চিঠি। অরণির পাঠানো দুটি কবিতার একটি, ‘১৪৪ ধারাবিবরণী’, প্রকাশ পায় সুবিমল-সম্পাদিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ পত্রিকার চতুর্থ সংখ্যায়। অরণি ততদিনে ধীরে-ধীরে হাংরি জেনারেশনের নতুন প্রজন্মের কবিদের একজন হয়ে উঠছেন। নিজেও সম্পাদনা করছেন ‘উলুখড়’ পত্রিকা, প্রিতম মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।
শেষ চিঠিতে তারিখ নেই, তবে প্রসঙ্গ পড়ে মনে হয়, ১৯৭১-এ লেখা—
প্রিয় সুবিমলদা, আগে একদিন আপনার অফিসে এসে ফিরে গেছি, আজও যাচ্ছি।
প্রিতম যে গল্পটা দেবে সেটা যে বন্ধুর বাড়ী আছে সে সপ্তাখানেকের জন্যে বাইরে গেছে অতএব পরের সপ্তাহের আগে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
যাইহোক, শুনলাম প্রলাপদুঃখের ওপর আপনি একটা আলোচনা লিখেছেন সেটা কি উলুখড়ে দেবেন? যদি দেন তো শনিবার ৫টা/সাড়ে ৫টা নাগাদ অমলদার প্রেস বা কফিহাউসে আসুন আর তা না হলে ত্রিদিবদাকে পৌঁছে দিন।
শনিবার দিন যদি আসেন তো দেখা হবে। শিবপুরে চলে আসুন না একদিন।
অরণি
‘প্রলাপ দুঃখ’ নিয়ে লেখাটি সুবিমল ‘উলুখড়’-এ দেননি। ১৯৭২ সালে, স্বতন্ত্র বুলেটিন হিসেবে প্রকাশ পায় লেখাটি, ‘ত্রিদিব মিত্রের প্রলাপ, ত্রিদিব মিত্রের দুঃখ’ শিরোনামে। এরপর অরণির চিঠি আর খুঁজে না-পেলেও, তাঁর সঙ্গে সুবিমলের যোগাযোগ ছিন্ন হয়নি। পরবর্তীতে ‘আবহ’ পত্রিকার একাধিক সংখ্যায় অরণি বসুর কবিতা ছেপেছিলেন সুবিমল।
(ডায়েরি ও চিঠির বানান অপরিবর্তিত)
ছবি সৌজন্যে: তন্ময় ভট্টাচার্য



