অলিগলির কালীঘাট : পর্ব ৫

একদিন ওই ইংলিশের মুখে…

কালীঘাটে বাংলা চলে। বাংলা ক্যালেন্ডার। বাংলা মদ।— এমন বাংলা দেব না— এই বাংলা হল খিস্তি। আর আমাদের ছিল বাংলা মিডিয়াম। ইংলিশ মিডিয়াম হল বোস ডাক্তারের মেয়ে বিবি।

বিবিরা থাকত ঠিক কালীঘাট বাজারের উল্টোদিকে জ্যোতির মেডিসিন দোকানের ওপরে। তিনতলায়। বিশাল চারতলা বাটা-র জুতোর বাক্সের মতো বাড়ি। আমাদের সময় স্কুলে স্কুলে ওয়ার্ক এডুকেশনে ওইরকম বাড়ির মডেল বানানো হত। এটাও ছিল ওইরকম একটা ফ্ল্যাটবাড়ি। ওইসব বাড়ির মালিকরা ছিল ছোট-ছোট জমিদার। তারা কলকাতা শহরে বাড়ি বানিয়ে ভাড়া দিত। সব ফ্ল্যাটই ভাড়ার। এইসব ফ্ল্যাটের অনেকেরই গাড়ি ছিল, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি ছিল, কারও কারও মাথায় গল্ফ ক্যাপ থাকত, যা আমাদের কাছে টুপি। তখন জানতাম না, টুপির নানা নাম ও মাহাত্ম্য আছে। তখন আমাদের কাছে টুপি মানেই হয় গান্ধী, নয় হ্যাট। আর এদের অনেকেরই গুপি-যন্ত্রের মতো ছোট সাদা বা খয়েরি কেঁউ-কেঁউ, ঘেউ-ঘেউ কান ঝোলা লোমওয়ালা একটা কুকুর থাকত। সব মিলিয়ে বেশ একটা আলাদা ব্যাপার। এদের মায়েরাও ঠিক আমাদের মায়েদের মতো মা-মা নয়। এদের মা-রা নীচে নামলে হাউসকোট পরে নামত। কারও-কারও চুল ছাঁটা ঘাড় পর্যন্ত। চশমাগুলো অবশ্যই সোনালি ফ্রেম। চোখগুলো ললিতা পাওয়ারের মতো। আমাদের মা-দিদিদের কাছে তখন শাড়ি, আটপৌড়ে করে পরা। তখন আমাদের মা-দিদিদের কাছে নাইটি ব্যাপারটা জনগণতান্ত্রিক হয়ে ওঠেনি।

আমাদের খিদ্দারা থাকত কালীঘাটের অন্দরেই! জয়ন্ত দে-র কলমে পড়ুন ‘অলিগলির কালীঘাট’ পর্ব ৪…

এরকমই একটা বাড়িতে গৌতমরা থাকত। ওদের বাড়ির অন্দরমহলে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। পরে সে গল্প করা যাবে, আপাতত বোস ডাক্তারের মেয়ের কথাই বলি। এইরকম একটা বাড়িতে থাকতেন বোস ডাক্তার। কোথায় ডাক্তারি করতেন জানি না, কীসের ডাক্তার ছিলেন তাও জানি না। এই বোস ডাক্তারের মেয়ে বিবি, তার চোখে হাইপাওয়ার চশমা, সেটা মাঝে-মাঝেই চোখের ঘের-টোপ পেরিয়ে নাক থেকে গড়িয়ে পড়ত। সে বন্ধুদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলত। আর সেটা বেশ চিৎকার করে। ওই বাড়ির লোকজনদের ঘুড়ি কাটার জন্যই আমাদের অনেকেই ঘুড়ি ওড়াত! ওই বাড়ির একটা ঘুড়ি কাটলে সব বাড়ি থেকেই ভোকাট্টা আনন্দ-ধ্বনি উঠত। ওদের ঘুড়ি উড়লেই আমরা সবাই ঝাঁপিয়ে পড়তাম। আমি কোনওদিন ঘুড়ি ওড়াইনি। পারতাম না। আমার ঘুড়ি— পেটকাটি চাঁদিয়াল— সব ছিল আলাদা।

আমার কথা থাক, বন্ধু গৌরের কথা বলি। আমাদের গৌরের ঘুড়ি ছিল বগল-কাটি বোস ডাক্তারের মেয়ে। যদিও ওকে নিমাইদা বারবার সতর্ক করে দিয়েছিল। বলেছিল— ইয়েস, নো, থ্যাঙ্কু ইউ নিয়ে ওদিকে তাকিও না। ডক্টর বোসের মেয়ে সাক্ষাৎ মা কালী! ইংরেজির হাড়িকাঠে ফেলে বলি দিয়ে দেবে।

আমাদের গৌর হেসে বলেছিল, ‘নিমাইদা আমি একটু বেশি জানি— শুধু ইয়েস নো থ্যাঙ্ক ইউ নয়— পুরো আই লাভ ইউ বলব।’

নিমাইদা নিজের বুকের পাকা বঁড়শির মতো লোমে বিলি কেটে বলেছিল, ‘তুই কাঠ খাচ্ছিস— তোকে আঙরা হাগতে হবে!’

‘যদি ফার্নিচার হাগি— তোমার অসুবিধা আছে!’

গৌর খুব মজার ছেলে। ভীষণ স্পোর্টিং। কোনও ম্যাচেই ও চান্স পেত না। সেটা নিয়ে ও রাগও করত না। ও জানত, ও টিমে থাকা মানেই একটা গোল ফালতু হজম করা। গৌর একা-একা সারাক্ষণ গোলপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে নানা অঙ্গভঙ্গি করত। সবাই ওকে পছন্দ করত। কিন্তু সেটা দিয়ে বোস ডাক্তারের মেয়ে বিবিকে কায়দা করা যাবে না। তবু চোখ তো মানে না, মন আরও দ্রুতগামী। তবে আমরা বিবিকে বেশ সমীহ করতাম। বড্ড উদ্ধত। ওর স্কার্ট ছিল হাঁটুর অনেকটা ওপরে, জামার হাতা থাকত না। অনন্যসুন্দর বগল দেখা যেত। ওর ভাল নাম সুরঙ্গমা। কিন্তু ওই মেয়ে তার বগলের জন্য বিখ্যাত ছিল, তাই আমরা ওই মেয়ের নাম দিয়েছিলাম— বগলা বোস। সংক্ষেপে বিবি।

বিবির প্রেমে পড়েছিল আমাদের গৌরাঙ্গ।

বিবির জন্য গৌর দিনরাত স্কুলবাসে আসা-যাওয়ার সময় দাঁড়িয়ে থাকত। আমরা বলতাম— গৌর ওখানেই গোলকিপিং করছে। নিমাইদার ভাষ্য ছিল— গৌর এখানেও বগলের তলা দিয়েই গোল খাবে। একসময় সবাই ওকে বগলি গৌর বলে ডাকা শুরু করল। গোলকিপারে খেলা গৌরের নাম কেন বগলি হয়েছিল— তা নিয়ে খুব সন্দেহ আছে। দিনরাত ওই বিবির বগল দেখার জন্য, না বগলের তলা দিয়ে গোল খাওয়ার জন্য, সেটা একসময় গুলিয়ে গিয়েছিল?

মিলির দিদি একটা বাজে ছেলেকে বিয়ে করার জন্য মিলিকে ওর বাপ-মা খুব পাহারা দিত। আমার ময়ূরপঙ্খি ঘুড়ি ছিল মিলি। কালীঘাট রোডে একটা বিখ্যাত ঘুড়ির দোকান দেবালয়। এখনও আছে। কতরকম ঘুড়ি সেখানে। শুধু আমার কৈশোর নেই। মিলির কেমন এক বোন ছিল আমার বোনের বন্ধু, তার নাম নূপুর। নূপুরের পুতুলের সঙ্গে আমার বোনের পুতুলের বিয়ে হয়েছিল। সেখানে লুচি, আলুর দম আর হারান মাঝির কড়াপাকের সন্দেশ খাওয়ানো হয়েছিল। সেই নুপূর বলেছিল— মিলির হার্টে ফুটো আছে!

বিবিকে নিয়ে গৌর পড়ে থাকত। অসীম ধৈর্য ওর। গোলপোস্টের নীচে যেন দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের তখন প্রেমে পড়ার বয়েস। আমি মেতে ছিলাম বাজারের ওপরে থাকা মিলিকে নিয়ে। কালীঘাট বাজারের ওপরে, রাস্তার দিকে দু’খানা ফ্ল্যাট ছিল। কে এগুলো ভাড়া দিয়েছিল, কে ভাড়া নিত, কে জানে? বাজারের ভেতর দিয়েই ওদের ফ্ল্যাটের সিঁড়ি। সেইরকম একটা ফ্ল্যাটে মিলিরা থাকত।

মিলির দিদি একটা বাজে ছেলেকে বিয়ে করার জন্য মিলিকে ওর বাপ-মা খুব পাহারা দিত। আমার ময়ূরপঙ্খি ঘুড়ি ছিল মিলি। কালীঘাট রোডে একটা বিখ্যাত ঘুড়ির দোকান দেবালয়। এখনও আছে। কতরকম ঘুড়ি সেখানে। শুধু আমার কৈশোর নেই। মিলির কেমন এক বোন ছিল আমার বোনের বন্ধু, তার নাম নূপুর। নূপুরের পুতুলের সঙ্গে আমার বোনের পুতুলের বিয়ে হয়েছিল। সেখানে লুচি, আলুর দম আর হারান মাঝির কড়াপাকের সন্দেশ খাওয়ানো হয়েছিল। সেই নুপূর বলেছিল— মিলির হার্টে ফুটো আছে!

হার্টে ফুটো মানে যে কোনও দিন…

নিমাইদা বলেছিল— হার্টে ফুটো মানে বুঝিস? যে কোনওদিন ফুটুর ডুম! শুধু শুধু হৃদয়ে বেদনার চারা পুঁতবি কেন?

‘ফুটুর ডুম’ কথাটার মাহাত্ম্য পরে একসময় বলা যাবে।

ঠিকই তো। কিন্তু মন মানে না। মিলিকে নিয়েই কবিতা লিখি। ওকে নিয়েই আমার কবি প্রতিভার উন্মেষ হয়েছিল। কত ডজন কবিতা যে মিলিকে নিয়ে লিখেছি, তা আর কহতব্য নয়। ছোটবেলায় যাদের প্রেমিকা মরো-মরো হয়, তারা সবাই কবি হয়ই হয়। আমিও কবি হলাম। সাউথ সাবার্বন স্কুল (মেইন)-এর স্কুল ম্যাগাজিনে একটা কবিতা জমা দিয়েছিলাম। তখন আমার ক্লাস এইট-নাইন হবে। ম্যাগাজিনের দায়িত্বে থাকা অঙ্কের স্যর তলব পাঠিয়ে টিফিন টাইমে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন টিচার রুমে। সবাই বসে— বললেন— এটা তোর লেখা? আমি ঘাড় নাড়লাম। স্যার বললেন— পড়। জোরে জোরে পড়। সব স্যরেরা যেন শুনতে চায়।

আমি কাগজটা নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে—

কী হল পড়ছিস না কেন? কবি হলে মঞ্চে উঠে কবিতা পড়তে হয়। এটা পড়। পড়ে শোনা—।

আমি বিড়বিড় করলাম। স্যর শুনতে পেলেন না। আমি বলতে চেয়েছিলাম— প্রেমের কবিতা জোরে জোরে পড়া যায় না, প্রতিবাদের কবিতা হলে জোরে পড়তাম। তবু পড়লাম। জীবনে সেই প্রথম আমার মঞ্চে কবিতা পড়া! মঞ্চই বটে! তখন খিল্লি কথাটা আবিষ্কার হয়নি, তখন চাটা কথাটাও বাজারে আসেনি। স্যর আমাকে ওই দুটোই করেছিলেন গম্ভীর মুখে।

ক’দিন পরে একজন স্যর আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। তিনি সুধাংশুবাবু স্যার। বলেছিলেন— কবিতা লিখছ, মন দিয়ে লেখো। ছেড়ো না। এখনও সুধাংশুবাবু স্যরের সঙ্গে আমার মাঝে-মাঝেই দে’জ পাবলিশিং-এ দেখা হয়ে যায়।

আমার সেই কবিতা স্কুল ম্যাগাজিনে ছাপা হয়নি। তা নিয়ে দুঃখ নেই, নিজেকে প্রবোধ দিয়েছিলাম— অঙ্কের টিচার কবিতার কী বোঝে হে! অঙ্কের সঙ্গে প্রেম আর কবিতা দুটোরই যোগ নেই। যাই হোক, পরে অবশ্য আমার অনেক কবিতা অনেক ছোট-বড় কাগজে, পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তিন-তিনটে কবিতার বইও প্রকাশ পেয়েছে। অনেক মঞ্চে কবিতা পড়েছি। কিন্তু সেদিন থেকে সবার সমানে কবিতা পড়ার ভয় ভেঙে গিয়েছিল। আমরা কবিতা বন্ধুরা শুনত। কেউ কেউ আমাকে ‘কবি’ ‘কবি’ বলে ডাকাও শুরু করেছিল। আমিও খুব পাঞ্জাবি পরতাম। গোল গলা নয়, গুরু পাঞ্জাবি। এদিকে আমি মিলির দুঃখে মরো-মরো— আসন্ন সেই দিনের অপেক্ষায় আছি। কবে কী ঘটে যায়?

মিলি ছিল ছোটখাট ফর্সা, ফ্যাকাশে টাইপের। নির্ঘাত অ্যানিমিক ছিল। আমাদের খুব বন্ধু ছিল একটা ডানপিটে মেয়ে বুলগানি। সে একবার মুখ ভেটকে বলেছিল, তোর কী পছন্দ রে। ও সুন্দরী না ছাই! আর হলেও ফ্যাকাশে সুন্দরী!

আমি মিলিকে প্রায় রোজই দেখি, মায়ের পাহারায় কালীঘাট মহাকালী পাঠশালার দিকে যাচ্ছে, আসছে। এ-জীবনে কোনওদিন তার সঙ্গে কথা বলতে পারিনি। হয়তো সে সময় তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে আমি কেঁদেই ফেলতাম। শিয়রে মৃত্যু নিয়ে কী করে একটা মানুষ পড়াশোনার মতো কঠিন কাজ করে চলেছে? বরং সে হেসে-খেলে ঘুরে বেড়াবে— বাবা-মাগুলো পাষণ্ড!

সে-সময় ফি-বছর দু’একদিন বাংলা বন্‌ধ হত। আর বন্‌ধ মানে কালীঘাট রোডের ওপর ফুটবল কি জমজমাট ক্রিকেট ম্যাচ। সারাদিন বারান্দায় মিলি আর আমি কালীঘাট রোডে। বগলা বোস ছাতে, গৌর কালীঘাট রোডে। যেন আমরা দু’টি ভাই— কালীঘাট রোডে দু’জন দু’দিকে তাকিয়ে প্রেমের গাজন গাই!

কোনওদিন জানতে পারিনি, মুখোমুখি বাড়ি হলেও মিলির সঙ্গে বিবির কথা হয়েছিল কি না? না কি আমাদের মতো বাংলা মিডিয়াম আর ইংলিশ মিডিয়াম?

আমি কলেজের পর মিলির কোনওদিন খোঁজ রাখিনি। তারপর তো কালীঘাট ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে গিয়েছিলাম। অনেকদিন পরে কালীঘাট রোডের পথচিত্রে মিলি ভেসে উঠল।

মিলি অজান্তে আমাকে কবি বানিয়ে দিয়ে গিয়েছে। সেই কবি থেকেই প্রমোশন পেয়ে পেয়ে আজ কত লেখাই তো লিখছি। কত বই হচ্ছে। দুটো টাকাও পাচ্ছি। একজীবন লেখা নিয়েই কাটিয়ে দিলাম। লেখা দিয়েই সব গড়লাম। আসলে এসব গোপন কথা বলা যায় না। বলি, অন্যের কথা বলতে গিয়ে— বগলের তলা দিয়ে যেভাবে বল গোলে যায়!

আমাদের নাইন হয়ে গেল কিন্তু গৌর আর বদলাল না। সকাল সন্ধে জ্যোতির মেডিসিনের দোকানের সামনে ফিল্ডিং করে যায়। বিবির স্কুলে যাওয়ার সময় আর ফেরার সময় গৌর ওরফে বগলিকে ঠিক পাওয়া যেত ওখানে। কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরের দিকে মাঠেও যেত না।

কিন্তু তার আগে একদিন সত্যি বড় বলটাই গৌর বগলের তলা দিয়ে গলিয়ে ফেলল। সে নাকি এক বিচ্ছিরি দৃশ্য। বিবি একনাগাড়ে ইংরেজিতে গৌরকে ঝাড় দিয়ে যাচ্ছে, আর গৌর ওর সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। ওকে নাকি বিবি মারতে বাকি রেখেছে। কারণ, গৌর নাকি বগলা বোসকে একটা ডায়েরি দিতে গিয়েছিল— হ্যাপি নিউ ইয়ার বলে!

ডায়েরি? বগলি কোথা থেকে পেল? আমাদের না দিয়ে বগলাকে দিল? আমি ডায়েরি পেলে কবিতা লিখতাম।  ঠিক হয়েছে শালা ঝাড় খেয়েছে। এটা আমাদের প্রাথমিক ভাব ছিল। কিন্তু পরে ওর থম মারা মুখ দেখে আমাদের খুব দুঃখ হয়েছিল। রাগ জমেছিল। বগলা বোস নাকি ডায়েরির দু’মলাট ধরে ওর চোখের সামনে ছিঁড়ে ফেলেছিল। আরও কীসব কীসব বলেছিল— যা গৌর বোঝেনি। ইংরেজি ছিল? আমাদের সবার প্রশ্ন ছিল, বাপ তুলে গালাগাল দিয়েছে নাকি? গৌর বোঝেনি। নিশ্চয়ই দিয়েছিল।

নিমাইদা বলেছিল— ‘বাপ তুললে ঠিক আছে, কিন্তু ডাঙ্কি মাঙ্কি বললে, ছ্যা ছ্যা! সবাই বলছিল— ওই মেয়েটা পুরো স্পোকেন ইংলিশের বই খুলে দিয়েছিল! পুরো চাপা কল। টালা নয়, গঙ্গার জল!’

তখন বাড়িতে-বাড়িতে টালা জলের টাইম কল যেমন থাকত, একটা করে গঙ্গার জলের কল থাকত। আর রাস্তায় থাকত চাপা কল। সেখান থেকে বগবগ করে গঙ্গার জল আসত। মুখ খুললেই হল।

গৌর শুধু একটা কথা বলেছিল— ও একটাও বাংলা কথা বলেনি, সব ইংলিশ! এত স্পিডে কী যে বলল— আমার চোখমুখ অন্ধকার করে দিয়েছিল। আস্তে আস্তে বললে বুঝতে পারতাম। উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতাম।  

যাই বলুক, ভাল কিছু বলেনি, আর ডায়েরিটা ছিঁড়ে দিল! আমরা ফুঁসছি— বদলা নেবে। বদলা চাই।

তখন সিনেমায় ‘মেরা গাঁও মেরা দেশ’ টপকে আমরা অমিতাভ যুগে ঢুকে পড়েছি। সবাই অ্যাংরি ইয়াংম্যান হব হব! বদলা নেব। বদলা চাই।

গৌর বলল, ‘ওকে তোরা কেউ কিছু বলবি না। যা হয়েছে তা আমার সঙ্গে, বদলা আমি নেব—।’

আমাদের সবার প্রশ্ন ছিল— কী করবি?

গৌর ঠান্ডা গলায় বলল— আমি একদিন ওই ইংলিশের মুখে মুতব।

এই অলিগলির কালীঘাটের এ-কাহিনি এখানেই শেষ হলে হতে পারত, কিন্ত তা শেষ নয়। গৌর কোথায় মুতবে, না-মুতবে তার ব্যাপার, আমরা অনেকেই রাগের মাথায় হ্যান করেঙ্গা ত্যান করেঙ্গা বলি, করি কি? ভুলে যাই। একসময় রাগও কমে যায়। কিন্তু গৌর ভুলল না।

এতক্ষণ এই কথাটুকু বলার জন্য আমার এতখানি ভ্যানতারা কষা। গৌরের কথা বলতে বলতে মিলির কথা বলে ফেললাম। মিলি নয়, আবার আসি গৌরের কথায়।

তারপর গৌরকে আমরা আবিষ্কার করি অন্য রূপে। ও প্রতিদিন সকালবেলা পটুয়াপাড়ার মুখের বাসস্টপে গিয়ে দাঁড়ায়।

২০৪ নম্বর বাসে করে সকাল হলে, সাদা পাতার মতো টুপটাপ বিদেশি মানে ফরেনাররা নেমে পড়ে। বিশেষত শীতের সকালে তো অগুনতি। ওই বাসস্টপ থেকে গৌর সেই ফরেনারদের ক্যাচ করে। তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে, টক করতে করতে কালীঘাট মন্দির পর্যন্ত আসে। কী ভাবছেন? আমি কী লিখছি? খ্রিস্টান ফরেনাররা কালীঘাট মন্দিরে গিয়ে জিভ বের করা কালী দেখেন নাকি? আজ্ঞে না, তারা দলবদ্ধভাবে ঢুকে পড়ে কালীঘাট মন্দিরের পাঁচিল লাগোয়া মাদার টেরিজার মিশনারি অব চ্যারিটিজ-এর ‘নির্ম্মল হৃদয়’-এর ফিকে হলুদরঙা বাড়িতে।

তখনই ওই ছোটখাট ঘাড় কুঁজো সাদা শাড়ি পরা বিদেশিনী আমাদের চেনা মাদার সবার কাছে মাদার টেরিজা হয়ে ওঠেননি। তাঁকে দেখেছি, দেখেছি— অসুস্থ মানুষকে, বয়স্ক ভিখারিকে যত্ন করে তুলে নিয়ে যেতে। একবার আমরা বন্ধুরা সবাই তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে হাত পেতে গুঁড়ো দুধও নিয়েছি। নির্মল হৃদয়ের ঠিক ওই জায়গায় ভোর হলেই ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রা নামত। ওখানে মাঝে-মাঝে আমরাও যেতাম। আমরা যে শীতের সকালে তাঁকে কত দেখেছি— সঙ্গিনী দু’-একজনকে নিয়ে গুটি গুটি করে হেঁটে যেতেন। মাদার তখন আমাদের কাছে নির্মল হৃদয়ের মেমবুড়ি! তাঁর দেবীত্ব প্রাপ্তি হয়নি। পরে, তাঁর মৃত্যুর পরে মাঝে-মাঝে কেউ তাঁর কথা বললে কেমন যেন ঘোর-ঘোর লাগে। সত্যিই সেই তিনি ছিলেন, এই তিনি।

অবশ্য এরকম ঘোর-ঘোর আর একজনকে নিয়েও হয়। মনে হয়, সেই তিনি কি এই তিনি! কিন্তু আপাতত স্পিকটি নট থাকি। তাঁর ভাই একসময়ে আমার সহপাঠী, খেলার মাঠের নিত্যদিনের সঙ্গী। ঘরদোর, খাঁচার টিয়ে, বাড়ির সামনের নেড়িটি পর্যন্ত চেনা। তবু আবার গৌর বা বগলির কথায় ফিরি।

ক্রমশ গৌরকে দেখলাম পালটে যেতে—

গৌর তার ফুল প্যান্ট কেটে ছোট করে ফেলল। না তখন সেটা আমাদের কাছে আশ্চর্য চিজ। হাঁটু ছুঁই ছুঁই হাফ প্যান্ট— যার নীচের দিকে সেলাই করা নয়, উলুকঝুলুক সুতো ঝুলছে। ফরেনারদের মতো। তখন জিনস আসেনি মার্কেটে। জিন। আমরা সব টেরিকট, টেরিলিন, গ্যাবাডিনে। গৌরের জিনের প্যান্ট, কর্ডের প্যান্ট। জিনের প্যান্টের বাড়তি কাপড় কেটে হাঁটুর কাছে তাপ্পি দিয়ে পকেট করা হয়েছে! তারপর গায়ের জামা মানে শার্টের হাতা বিসর্জন হয়ে গেল। অনেক পরে দেখেছি, থুতনি থেকে লম্বা দাড়ি ঝুলছে। ওর চোখে চশমা উঠল, গোল গোল ফ্রেমের চশমা। চোখ খারাপ নয়, ফলস। হাতে সবসময় ইংরেজি পেপার। বিদেশিদের কাছ থেকে উপহার পাওয়া পেপারব্যাক নভেল। বেশ একটা আলাদা ব্যাপার, আলাদা দর্শন।

গৌর ওর জীবনটাই পালটে ফেলল। ২০৪ বাস থামলেই বগলি এগিয়ে যাবে— হাই-হ্যালো দিয়ে শুরু। শীতকাল হলে অবশ্যই ওর বগলে একটা কুকুর ছানা থাকবে। সাহেবরা জানে না— নেড়িকুত্তার বাচ্চাগুলো ছোটবেলায় বিউটিফুল থাকে!

আলিপুরের গোপালনগরে একটা পুরনো বাজার আছে। পুরনো ফার্নিচার থেকে যাবতীয় পুরনো জিনিস পাওয়া যায়। গৌর সেখান থেকে অদ্ভুত-অদ্ভুত জুতো, ব্যাগ, টুপি জোগাড় করেছিল। যা আমাদের কারও সঙ্গে মানানসই নয়। কিছু বললেই হাসত। হাসাত। ওর অনুপ্রেরণায় আমরা স্কুল কেটে নিউ এম্পায়ারে চলে গেলাম, সিনেমা দেখতে। ইংরেজি সিনেমার সঙ্গে চোখাচোখি হল!

গৌর একদিন সত্যি-সত্যি বাদামি সাহেব হয়ে গেল! শালা দেখিয়ে দিয়েছিল। জানি না, আমার মিলির মতোই ওর সঙ্গে বগলা বোসের কোনওদিন দেখা হয়েছিল কি না? গৌর নিজের জীবনটাই বদলে দিয়েছিল— পড়াশোনা আর বিদেশিদের সঙ্গে অনবরত নিরন্তন মেলামেশায় ভিন্ন এক জীবন পেয়েছে। গৌর কলকাতায় এসে দু’-একবার পুরনো পাড়ার বন্ধুদের এক জোট করেছিল গ্র্যান্ডে। ও আর এখন শুধু ইংরেজিতে নয়, অনেক ভাষাতেই ভেসে আছে। লন্ডনে থাকে। বিদেশিনী বউ। দোআঁশুলা বাচ্চা। এবং গৌর এখন সকালে ইতালিতে মোতে তো বিকেলে লন্ডনে হিসি করে!