ফুটবল বিশ্বকাপ কি ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ কেবলই ফুটবলশৈলী প্রদর্শনের শ্রেষ্ঠ মঞ্চ হওয়ার কারণে? কেবলই ক্ষণজন্মা প্রতিভার ব্যক্তিগত মুনশিয়ানা বা যুগান্তকারী দলের চোখধাঁধানো ফুটবলের স্বাদ বিশ্বের কোনায় কোনায় পৌঁছে যাওয়ার কারণে? না কি তার বাইরেও থেকে যায় কিছু বৃহত্তর প্রেক্ষাপট, যা তাকে করে তোলে ‘মোর দ্যান আ গেম’? সম্প্রতি কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২৬-এ ‘সৃষ্টিসুখ’ থেকে প্রকাশিত সৌরাংশুর ‘রাজার মুকুট’ বইটি উসকে দিচ্ছে, এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এ-বই আদ্যোপান্ত খেলার বই। কিন্তু, এ-খেলা কেবলই সাইডলাইনের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই। তা গ্যালারি ছাড়িয়ে বৃহত্তর গ্যালারিকেও করে নিয়েছে খেলারই অংশ। বইয়ের উপজীব্য বিশ্বকাপ ফুটবলের ৯৬ বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ৩৩টি ম্যাচ। এখন প্রশ্ন হল, লেখক বা সংকলকের চোখে যা ‘শ্রেষ্ঠ’, তা পাঠকের চোখে প্রশ্নাতীত হবে না— এটাই দস্তুর। এখানে, মিশে যাবে স্বতন্ত্র ভাল লাগা, আবেগ, ফ্যানবয়িজম। ফলে, যে তেত্রিশটি ম্যাচ লেখক বেছে নেবেন, তাকে নস্যাৎ করে দেওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে পাঠকের। কিন্তু, এ-বইয়ের ক্ষেত্রে সৌরাংশু এই নির্বাচন প্রক্রিয়াটিকে নিয়ে গিয়েছেন যুক্তির দাঁড়িপাল্লায়। মূলত তিনটি সূচক পেয়েছে প্রাধান্য। এক, ম্যাচটির সামাজিক প্রেক্ষাপট; দুই, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং শেষত এর টেকনিক্যাল ও ট্যাকটিকাল ব্রিলিয়ান্স। গড়পড়তা পাঠকের কাছে এই তিন সূচক একত্রে সর্বদা ধরা দেয় না। কারও কাছে প্রাধান্য পায় আবেগ, কারও কাছে বা কেবলই টেকনিক্যালিটিস— কিন্তু এই তিনের যোগফলের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠ খেলাগুলিকে তুলে আনা নিঃসন্দেহে এ বইয়ের প্রধান ইউএসপি।
আরও পড়ুন : শুদ্ধাচারের যাত্রায় সব পথই মানুষী অস্বস্তির! ‘পড়ুয়ার দপ্তর’-এ লিখছেন জয়দীপ ঘোষ…
১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপের একটি ম্যাচের উদাহরণ তোলা যাক, যে-ম্যাচটি স্থান পেয়েছে এই বইতে। ইতালি বনাম অস্ট্রিয়া, সেমিফাইনাল খেলা। এ-লেখার শেষে আমরা জানতে পারি এক চমকপ্রদ গল্প। ম্যাথিয়াস সিন্ডেলারের গল্প। সিন্ডেলার, যিনি ১৯৩৪-এর বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার প্রাণভোমরা ছিলেন, ১৯৩৮ বিশ্বকাপে তাঁকে নিয়েই হইহই। নাৎসি জার্মানি সে-বার দখল করে নিল অস্ট্রিয়া। এ-বছরই অস্ট্রিয়া-জার্মানি ম্যাচে নাৎসি নেতাদের কড়া শাসানির মুখে অস্ট্রিয়ার খেলোয়াড়রা গুটিয়ে রইলেন প্রথমার্ধে। যে-অস্ট্রিয়া তার পাসিং ফুটবলের জন্য বিশ্ববন্দিত হচ্ছিল সে-সময়ে, সেই দলটাই যেন ভয়ে নিস্প্রভ। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে আর পারলেন না সিন্ডেলার। নিজের জাত চেনালেন শাসকের চোখে চোখ রেখে। গোল করলেন, ভিআইপি বক্সে আসীন নাৎসি নেতাদের সামনে সেলিব্রেট করলেন সেই গোল। তিনি জানতেন, এই ম্যাচের পর তিনি আর ফুটবল মাঠে ফিরবেন না। কারণ ফিরলে তাঁকে খেলতে হবে জার্মানির হয়ে, যা তিনি মেনে নিতে পারবেন না। ফেরেনওনি। বান্ধবীকে নিয়ে নিরিবিলিতে ভিয়েনায় একটা ক্যাফে খুলে দিন কাটাচ্ছিলেন।

কিন্তু ওই যে, সময়ের কিছু ক্ষত থাকে। সিন্ডেলারকে সেই ক্ষতের বাহক হতে হল। নাৎসিদের সঙ্গে টক্কর? হায়! দিনকয়েক পরেই একদিন রাতে নিজের বাসভবনে কার্বন মনো-অক্সাইড বিষক্রিয়ায় শেষ হয়ে গেলেন ম্যাথিয়াস সিন্ডেলার। তদন্তে দেখা গেল চিমনি ফেটে মৃত্যু! কিন্তু আসল সত্যিটা সকলের চোখের সামনে থেকেও যেন ছোঁয়া হল না তামাম দুনিয়ার।
ক্ষমতার কী ভয়ানক রূপ হতে পারে, তার প্রমাণ ছিল ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপ।
গল্পের পাশাপাশি যে পাঠক ভালবাসেন ফুটবলের টেকনিক্যাল ও ট্যাকটিকাল বিশ্লেষণ, তাঁদের জন্যই যথেষ্ট রসদ মজুত করেছেন লেখক এ-বইতে। যেমন ১৯৫০-এর বিখ্যাত বা কুখ্যাত মারাকানাজো। ব্রাজিল সমর্থকদের কাছে দুঃস্বপ্ন। সেই ম্যাচে কোথায় বাজিমাত করেছিল উরুগুয়ে? কেন প্রায় নিশ্চিত জেতা ম্যাচ হাতছাড়া হল? পাঁচের দশকের পর গুস্তাভ সেবেচের হাঙ্গেরির উত্থানপর্বের আগে এই মারাকানাজোর একটি দুরন্ত ট্যাকটিকাল বিশ্লেষণ পাওয়া যায় এ-বইতে যা ভাবনার রসদ দেবে পাঠককে। যাঁরা জোনাথন উইলসনের ‘ইনভার্টিং দ্য পিরামিড’ পড়েছেন, তাঁরা আরও ভালভাবে বুঝতে পারবেন সৌরাংশু সহজ ও সরল বাংলায় এই জটিল বিশ্লেষণগুলি কি নিপুণভাবে করতে পেরেছেন।

‘মিরাকল অফ বার্ন’ যে আদতে কেন মিরাকল নয়, ১৯৭৪-এর ফাইনালে রেনাশ মিশেল-জোহান ক্রুয়েফের টোটাল ফুটবল কোথায় হার মানল, বিরাশিতে জোগো বোনিতোর ধ্বংসাবশেষ থেকে কীভাবে ফিনিক্সের মতো উঠে এলেন পাওলো রোসি— এই একাধিক মিথ হয়ে যাওয়া ঘটনার নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধান করেছেন লেখক তাঁর ক্রীড়া-বিশ্লেষণক্ষমতার ওপর ভর করে।
বাংলা ভাষায় খেলা নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে একটি প্রবণতা প্রত্যক্ষ করা যায়, তা হল আবেগের প্রাচুর্য নতুবা আবেগহীন ট্যাকটিকাল চর্চা। সাহিত্য ও ক্রীড়াপ্রেমী পাঠকের রসাস্বাদন করতে এই দুইয়ের যে যথাযথ মিশ্রণ প্রয়োজন, তা আছে এ-বইতে।
তাই দিনশেষে এই বই কেবলই এক বিশ্বকাপের বই নয়, মাঠের খেলা ও মাঠের বাইরের বৃহত্তর খেলার নেপথ্যে যুক্তির ও পাল্টা যুক্তির যে সমস্ত তন্ত্রী খোলা পড়ে আছে এতকাল, তা জুড়ে জুড়ে এক চালচিত্র নির্মাণের প্রচেষ্টা বলা চলে।



