আইনের ধূসর অঞ্চল

Private Ditective

আপনাদের কাছে কোন ধরনের কেস এখন বেশি আসছে?’ প্রশ্নটা করতেই পালটা উত্তর এল, ‘আপনি কোন ধরনের কেসের কথা শুনলে বেশি খুশি হবেন?’ আমতা-আমতা করে বললাম, ‘যে-ধরনের কেস বেশি আসে, সেই ধরনের কেসের কথাই বলুন!’ লোকটি গম্ভীর গলায় উত্তর দিল, ‘পরকীয়া বেশি চলছে, বিয়ের আগে ছেলে-মেয়ের চরিত্র যাচাই বেশি চলছে।’ কথাটা শেষ করেই ফোন কেটে দিলেন। অন্য একটি নম্বরে ফোন করলাম। সেখানে এক মধ্যবয়স্ক মহিলা ফোন ধরে বললেন, ‘কী ব্যাপারে সাহায্য করতে পারি?’ সঙ্গে-সঙ্গে বললাম, ‘তথ্য দিয়ে।’ ফোনের ওপার থেকে উত্তর এল, ‘তথ্য দেওয়ার জন্য আমরা পারিশ্রমিক নিই।’ পালটা বললাম, ‘আপনাদের কাছে এখন কী ধরনের কেস বেশি আসছে?’ মহিলা কর্কশ গলায় উত্তর দিলেন, ‘ওটা সিক্রেট।’ বলেই ফোনটা কেটে দিলেন।

এরপর একজন অল্পবয়সি মেয়ে। মিহি গলায় জানতে চাইলেন ফোন করার কারণ। কারণ বলতেই ফোনটা অন্য একজনকে দিলেন। গম্ভীর গলা পেলাম, ‘হ্যালো।’ শুনে বুকের ভিতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। মনে হল শার্লক হোমস স্বয়ং ফোন ধরেছেন। সিনেমায় যেমন হোমসের গলা, অবিকল একইরকমের স্বর। তারপরে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এখন কলকাতার বাজারে গোয়েন্দাদের হালহকিকত, বলবেন?’ প্রশ্নটা শুনে একটু নীরব থাকেলন। তারপর আচমকা হেসে উঠলেন। একটা কবিতা বলে ফোনটা কেটে দিলেন। ‘‘কবিতা, তুমি কেমন আছো?’/ ‘যেমন থাকে ভালোবাসার মানুষ অপমানে।’’— বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই কবিতাটির সঙ্গে প্রাইভেট গোয়ান্দাদের সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই; তবুও উনি যে কেন এই কবিতাটি বললেন, এই রহস্য সমাধান করতে কালঘাম ছুটে গেল।

আরও পড়ুন: রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়, এপস্টিন ফাইল হয়ে উঠল প্রকাশ্য লজ্জার দলিল! লিখছেন আদিত্য ঘোষ…

টিভির পর্দায় ফেলুদা, ব্যোমকেশ, কিরীটী, শার্লক দেখে বড় হওয়া মধ্যবিত্ত বাঙালির মনে-মনে চিরকাল গোয়েন্দা হওয়ার বড্ড শখ। পরবর্তীকালে কাকাবাবু বড়পর্দায় এলেন। একেনবাবু এলেন। এলেন আরও অনেকে। বাড়তে লাগল প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটদের দাপট। যদিও ছোট থেকে প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর শব্দটা শুনলেই ভেসে আসত একজনের নাম, ‘প্রদোষ সি মিটার’। বুকের মধ্যে একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চ তৈরি হত, ব্যাকগ্রাউন্ডে ভেসে আসা সেই নস্টালজিক মিউজিক এখনও শিহরন জাগায়। এখনও মনে হয়, ইশ, যদি একবার গোয়েন্দা হতে পারতাম! কিন্তু বাস্তবে কেমন আছেন কলকাতার প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটররা? কীভাবে দিন গুজরান হচ্ছে তাদের?

‘প্রাইভেট ডিটেকটিভ’ শব্দবন্ধটির উৎপত্তি উনিশ শতকের মাঝামাঝি আমেরিকায়। ১৮৫০ সালে শিকাগোতে স্কটিশ-মার্কিন অনুসন্ধানকারী Allan Pinkerton প্রতিষ্ঠা করেন Pinkerton National Detective Agency। এই সংস্থা নিজেদের বিজ্ঞাপন ও নথিপত্রে প্রথম ‘ব্যক্তিগত ভাড়াটে গোয়েন্দা’ শব্দটি ব্যবহার করে। স্বাধীনতার আগে ভারতে গোয়েন্দা মানেই ছিল সরকারি বা ঔপনিবেশিক প্রশাসনের অংশ। পুলিশ এবং সিআইডি রাজনৈতিক নজরদারি বা অপরাধের তদন্ত করত, কিন্তু সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত সমস্যার (বৈবাহিক সন্দেহ, পারিবারিক প্রতারণা বা ব্যাবসায়িক প্রতারণা) জন্য আলাদা করে কোনও পরিষেবা ছিল না। ফলে ব্যক্তিগত তদন্তের ধারণাটাই ছিল অনুপস্থিত।

স্বাধীনতার পর, বিশেষ করে ছয় ও সাতের দশকে শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজের প্রসার ঘটতে শুরু করলে ছবিটা বদলাতে শুরু করে। কলকাতা, মুম্বই, দিল্লি, চেন্নাইয়ের মতো শহরে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ বা সেনাকর্মীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ছোট-ছোট তদন্ত সংস্থা খুলতে থাকেন। অফিস বলতে অনেক সময়ে একটা ছোট ঘর, একটা টেবিল-চেয়ার, কয়েকটা ফাইল আর একটা ফোন— এই ছিল মূল পরিকাঠামো। কাজও ছিল সীমিত। পাত্র-পাত্রী যাচাই, স্বামী বা স্ত্রীর ওপর নজরদারি, ব্যাবসায়িক অংশীদারের অতীত খোঁজা বা ঋণখেলাপি শনাক্ত করা। নয়ের দশকে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর এই পেশা নতুন মোড় নেয়। কর্পোরেট সংস্কৃতি, বহুজাতিক সংস্থা, প্রতিযোগিতা— এসবের ফলে কর্পোরেট ইনভেস্টিগেশন বড় বাজার হয়ে ওঠে। সংস্থাগুলি কর্মচারীর ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই, ডেটা চুরি, আর্থিক প্রতারণা বা আভ্যন্তরীণ তথ্য ফাঁস রুখতে প্রাইভেট গোয়েন্দাদের সাহায্য নিতে শুরু করে।

সমীক্ষা বলছে, ভারতে প্রাইভেট গোয়েন্দাদের গোটা বাজারের সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বৈবাহিক ও সম্পর্কভিত্তিক তদন্ত। পাত্র বা পাত্রী বিয়ের আগে সত্যিই যে চাকরি করে কি না, আগে কোনও সম্পর্ক ছিল কি না, পরিবারিক আর্থিক অবস্থা ঠিক কী— এসব যাচাই করতে অসংখ্য পরিবার এখন প্রাইভেট গোয়েন্দার দ্বারস্থ হয়। আবার বিয়ের পর সন্দেহ তৈরি হলে, স্বামী বা স্ত্রীর গোপন সম্পর্ক, মিথ্যা অফিস-ট্রিপ, লুকোনো খরচ ইত্যাদির প্রমাণ সংগ্রহের জন্যও গোয়েন্দা ভাড়া করা হয়। বিভিন্ন এজেন্সির হিসেব মিলিয়ে দেখা যায়, এই ম্যাট্রিমনিয়াল ও পোস্ট-ম্যারিটাল নজরদারিই মোট কেসের প্রায় ৫০ থেকে ৭০%; কখনও-কখনও তারও বেশি।

এর পরের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে কর্পোরেট বা ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন সংক্রান্ত কাজ। নয়ের দশকের পর থেকে কর্পোরেট সংস্কৃতি বিস্তৃত হওয়ায় কোম্পানিগুলো কর্মচারীর অতীত, শিক্ষাগত যোগ্যতা, অপরাধমূলক রেকর্ড বা আর্থিক আচরণ যাচাই করতে প্রাইভেট তদন্তকারীদের সাহায্য নিতে শুরু করে। অনেক সময়ে পার্টনারশিপ বা বড় বিনিয়োগের আগে ডিউ ডিলিজেন্স করানো হয়। অর্থাৎ, এইটে দেখে নেওয়া, কোম্পানি সত্যিই ট্যাক্স দেয় কি না, মালিকের নামে পুরনো মামলা আছে কি না বা কোনও প্রতারণার ইতিহাস রয়েছে কি না। শিল্পমহলের পর্যবেক্ষণ বলছে, এই ধরনের কর্পোরেট ও ব্যাবসায়িক তদন্ত মিলিয়ে প্রায় ১০ থেকে ২০% কেস আসে। এছাড়াও মিসিং-পার্সন বা নিখোঁজ মানুষের অনুসন্ধান সংখ্যায় তুলনামূলকভাবে কম হলেও সংবেদনশীলতার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ি ছেড়ে পালানো কিশোর-কিশোরী, পরিবার ছেড়ে হারিয়ে যাওয়া বৃদ্ধ বা সন্দেহজনকভাবে নিখোঁজ কোনও ব্যক্তি— এইসব ক্ষেত্রে পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি পরিবার প্রাইভেট গোয়েন্দার সাহায্য নেয়। তারা হাসপাতাল, স্টেশন, লজ, সোশ্যাল মিডিয়া, স্থানীয় সূত্র— সব জায়গায় খোঁজ চালায়। সাধারণত মোট কাজের ৫ থেকে ১০% এই ক্যাটাগরিতে পড়ে। ডিজিটাল যুগে আরেকটি নতুন ক্ষেত্র দ্রুত বাড়ছে। সাইবার ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তদন্ত। সোশ্যাল মিডিয়ায় স্টকিং, অনলাইন ব্ল্যাকমেলিং, নকল প্রোফাইল, ডেটিং অ্যাপ প্রতারণা— এসব সমস্যায় ভুক্তভোগীরা প্রমাণ জোগাড় করতে প্রাইভেট তদন্তকারীর দ্বারস্থ হচ্ছেন।

ভারতে এই পেশার বড় অংশটাই অসংগঠিত ও লাইসেন্সবিহীন হওয়ায় নির্দিষ্ট বেতনকাঠামো, ইনসিওরেন্স বা আর্থিক নিরাপত্তা কিছুই নেই। বেশির ভাগ তদন্তকারী ফ্রিল্যান্স বা ছোট এজেন্সির হয়ে চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন। ফলে মাসের আয় নির্ভর করে কেসের উপর— কখনও কাজের চাপ, কখনও একটানা ফাঁকা। এই পেশায় নিয়মিত বেতনভুক্ত কর্মচারীর সংখ্যা কম। বেশির ভাগই কেস অনুযায়ী পেমেন্ট পান। অনেক এজেন্সিতে ফিল্ড অপারেটিভদের দৈনিক ভাতা ৮০০ থেকে ১,৫০০ টাকার মধ্যে; সঙ্গে কেসভিত্তিক বোনাস। মাসে যদি কাজ ভাল থাকে, আয় ২৫–৩০ হাজারে পৌঁছতে পারে। কিন্তু খারাপ সময়ে তা ১০–১৫ হাজারেও নেমে আসে। কেসভিত্তিক চার্জের ক্ষেত্রেও একটা স্পষ্ট শ্রেণিবিভাগ আছে। সাধারণ নজরদারি বা একদিনের সারভিলিয়েন্সে ৪–১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। প্রি-ম্যাট্রিমনিয়াল বা ম্যারিটাল কেসে পুরো প্যাকেজ ২৫–৮০ হাজার হতে পারে, আবার জটিল হলে লাখ টপকায়। কর্পোরেট ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন বা ব্যাবসায়িক তদন্তে তুলনামূলক বেশি টাকা। এই অঙ্ক কয়েক লাখ পর্যন্ত যায়। কিন্তু এই বড় অঙ্কের কাজ আসে হাতে-গোনা কিছু এজেন্সির কাছে। ছোট সংস্থাগুলোর আয় মূলত ম্যারিটাল কেসেই সীমাবদ্ধ। ফলে পেশার উপরের স্তর আর নীচের স্তরের মধ্যে আয়বৈষম্য বেশ প্রকট। তবে এই পেশার একটা অন্য দিকও আছে। যেসব এজেন্সি বহু বছর ধরে বড় শহরে কাজ করছে এবং কর্পোরেট ক্লায়েন্ট পেয়েছে, তাদের আয় তুলনামূলক স্থিতিশীল। অভিজ্ঞ তদন্তকারীরা ধীরে-ধীরে নিজস্ব নেটওয়ার্ক বানিয়ে নেন আইনজীবী, পুলিশ, ইনফর্মারদের সঙ্গে; যারা তাদের কেস জোগাড়ে সাহায্য করে। এই স্তরে পৌঁছতে পারলে মাসে ৬০–৮০ হাজার বা তার বেশি রোজগার সম্ভব। তবে অধিকাংশই নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের মধ্যে ঘোরাফেরা করেন।

ভারতে প্রাইভেট গোয়েন্দাদের গোটা বাজারের সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বৈবাহিক ও সম্পর্কভিত্তিক তদন্ত। পাত্র বা পাত্রী বিয়ের আগে সত্যিই যে চাকরি করে কি না, আগে কোনও সম্পর্ক ছিল কি না, পরিবারিক আর্থিক অবস্থা ঠিক কী— এসব যাচাই করতে অসংখ্য পরিবার এখন প্রাইভেট গোয়েন্দার দ্বারস্থ হয়। আবার বিয়ের পর সন্দেহ তৈরি হলে, স্বামী বা স্ত্রীর গোপন সম্পর্ক, মিথ্যা অফিস-ট্রিপ, লুকোনো খরচ ইত্যাদির প্রমাণ সংগ্রহের জন্যও গোয়েন্দা ভাড়া করা হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারতে প্রাইভেট গোয়েন্দাগিরি কোনও গ্ল্যামারাস বা দ্রুত ধনী হওয়ার পেশা নয়। বরং এটি এক ধরনের অনিশ্চিত, শ্রমসাধ্য, ছায়ার মতো কাজ— যেখানে রোমাঞ্চের চেয়ে অপেক্ষা বেশি, আর টাকার চেয়ে ধৈর্য জরুরি। শহরের অজস্র সন্দেহ আর পারিবারিক ভাঙনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারা কাজ করে, কিন্তু নিজেদের জীবনটাই থেকে যায় অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে। ভারতে প্রাইভেট গোয়েন্দাদের কাজের বাজারটা গভীরভাবে শ্রেণিনির্ভর। বিভিন্ন এজেন্সির অভিজ্ঞতা ও ইন্ডাস্ট্রি-পর্যবেক্ষণ বলছে, মোট ক্লায়েন্টের প্রায় ৭০–৮০% শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবার বা কর্পোরেট সংস্থা। এজেন্সিগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, ম্যারিটাল নজরদারির প্রায় ৬০% ক্ষেত্রে তদন্তের লক্ষ্য হন নারী, স্ত্রী, প্রেমিকা। অর্থাৎ এখনও নারীর ব্যক্তিগত জীবনই বেশি সন্দেহের কেন্দ্রে। তবে একইসঙ্গে পরিবর্তনও ঘটছে। শহুরে শিক্ষিত নারীদের মধ্যে এখন প্রায় ৩০–৪০% ক্লায়েন্ট নিজেই মহিলা, যারা স্বামীর প্রতারণা, আর্থিক গোপন লেনদেন বা দ্বৈত জীবন ধরতে গোয়েন্দা নিয়োগ করেন। নজরদারি তাই একতরফা পুরুষ-দৃষ্টি থেকে ধীরে-ধীরে পারস্পরিক সন্দেহের দিকে সরে যাচ্ছে। পেশার ভেতরেও লিঙ্গভিত্তিক বাস্তবতা আছে। অনেক সংস্থায় এখন মহিলা ফিল্ড অপারেটিভের সংখ্যা ২০–২৫% পর্যন্ত পৌঁছেছে।

ভারতে প্রাইভেট গোয়েন্দা পেশার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, তাদের জন্য আলাদা কোনও আইন বা লাইসেন্সিং ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ সরকারিভাবে এই পেশাকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো ‘Private Detective Regulation Act’ নেই। ফলে তারা পুলিশের মতো আইনি ক্ষমতা পায় না, আবার পুরোপুরি বেআইনিও নয়। সাধারণ নাগরিকের মতোই আইন মেনে কাজ করতে হয়। প্রাইভেট গোয়েন্দারা কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেন না। ফোন ট্যাপ করা, হ্যাকিং, গোপনে বাড়িতে ঢোকা বা ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করাও সম্পূর্ণ বেআইনি। ভারতীয় দণ্ডবিধি ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অধীনে এসব করলে তাঁদের বিরুদ্ধেই মামলা হতে পারে। তাই তাঁরা সাধারণত প্রকাশ্য জায়গায় নজরদারি, ফোটোগ্রাফি, সাক্ষাৎকার, নথি সংগ্রহ বা সোশ্যাল মিডিয়া পর্যবেক্ষণের মতো সীমিত পদ্ধতিতে তথ্য জোগাড় করেন। তবে আরেকটি বড় সমস্যা হল প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা। ডিটেকটিভদের তোলা ছবি বা ভিডিয়ো অনেক সময়ে আদালতে সন্দেহের চোখে দেখা হয় এবং সব প্রমাণ গ্রহণ করা হয় না। ফলে আইনগত সুরক্ষা কম, ঝুঁকি বেশি। সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারতে প্রাইভেট গোয়েন্দারা আইনের ধূসর অঞ্চলে দাঁড়িয়ে কাজ করেন।

বিশ্বজুড়ে প্রাইভেট গোয়েন্দাগিরি আজ স্বীকৃত হলেও নেপথ্যের পেশা। আমেরিকা ও ইউরোপের বড় শহরগুলোতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটররা কর্পোরেট প্রতারণা, বিমা জালিয়াতি, ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন ও সাইবার অপরাধের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেখানে কাজ অনেকটাই আইনি কাঠামোর মধ্যে, প্রযুক্তিনির্ভর ও ডকুমেন্টেশন-কেন্দ্রিক। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বৈবাহিক সন্দেহ ও সামাজিক টানাপোড়েন ঘিরেই এই পেশার চাহিদা বেশি দেখা যায়। ভারতের ক্ষেত্রেও শহরভেদে ছবিটা আলাদা। মুম্বইয়ে প্রাইভেট গোয়েন্দাদের দাপট সবচেয়ে বেশি। কর্পোরেট দুনিয়া, বলিউড ও হাই-প্রোফাইল ডিভোর্স কেস মিলিয়ে বড় বাজার তৈরি হয়েছে। দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলে ব্যাবসায়িক ও আইনি তদন্ত, ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই ও ডিউ ডিলিজেন্সের চাহিদা বেশি। বেঙ্গালুরুতে আইটি ও স্টার্ট-আপ সংস্কৃতির কারণে সাইবার ও ডিজিটাল তদন্ত দ্রুত বাড়ছে। তুলনায় কলকাতায় এখনও প্রি-ম্যারিটাল যাচাই ও সম্পর্কভিত্তিক নজরদারিই প্রধান কাজ। ফলে একই পেশা হলেও, বিশ্ব ও ভারতের বিভিন্ন শহরে প্রাইভেট গোয়েন্দাদের বাস্তবতা গড়ে উঠেছে ভিন্ন-ভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে।

তবুও প্রাইভেট গোয়েন্দার পেশা এক ধরনের খিদে। ছোটবেলায় টিভির পর্দায় দেখা, এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ। যে-রোমাঞ্চের জন্য দেশের বহু জায়গায় গজিয়ে উঠছে এমন এজেন্সি। তৈরি হচ্ছে অজানা ফেলু মিত্তিররা। তৈরি হচ্ছে ব্যোমকেশরা…