বাদ-অনুবাদ
এক দশকেরও বেশ কিছু আগের এক শীতের সকাল। যেহেতু ডিসেম্বরের পার্ক স্ট্রিট, তাই বছর শেষের প্রস্তুতির জন্য ধীরে-ধীরে প্রস্তুত হচ্ছিল দোকান, রেস্তোরাঁ, ফুটপাথ। আরও অনুচ্চকিতভাবে তৈরি হচ্ছিল সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজও, যার সামনে দাঁড়িয়ে আমি তাকিয়ে ছিলাম ধোঁয়া আর কুয়াশায় ধূসর এক আকাশের দিকে, ভাবছিলাম অসময়ে বৃষ্টি হবে কিনা!
আমি জানতাম না, দু’তলা থেকে একজোড়া ধূসর চোখ আমাকে দেখছিল। আর ঘড়ি দেখছিল। এর ঠিক তিন মিনিট পরে যখন আমি সেই ধূসর চোখের মুখোমুখি হলাম, তখন তিনি আমায় দেখে হাসি মুখে বললেন— ‘আমি দেখছিলাম আপনি সময় মতো আসেন কিনা! দেরি হলে কিন্তু আমি আপনাকে ইন্টারভিউ দিতাম না।’ আমি ভাবলাম যাক, আমার সময়ানুবর্তিতার বাতিক, যেটা নিয়ে আমি কলকাতার বন্ধুবৃত্তে ক্রমে বেশ খানিকটা কোণঠাসা ও কুন্ঠিত হয়ে পড়ছিলাম, সেটা একবার অন্তত কাজে লেগে গেল। আমি চারপাশে তাকালাম। নিপাট পরিষ্কার অনাড়ম্বর ঘর। একটি বিছানা, টেবিল, চেয়ার, তাতে কিছু বই খুলে রাখা, কাগজ, কলম, স্পষ্টতই কোনও কাজের মাঝে এসে পড়েছি আমি, দক্ষিণ দিকে জানালা, যা কলেজের গেটের দিকে খোলা, যেখান থেকে তিনি আমার আসাটি দেখছিলেন এবং ঘড়ি মেলাচ্ছিলেন।
বাইবেল অনুবাদের সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে ছিল নীলচাষের ইতিহাস? পড়ুন: বাংলার বাইবেল পর্ব ৩
একটি চেয়ারে আমায় বসতে বললেন, আর একটিতে আমার সামনে এসে বসলেন। বয়সের কারণে একটু ন্যুব্জ, কিন্তু দেহে বা মনে কোনও ক্লান্তির লেশ নেই, যেন এখনই সাইকেল চালিয়ে পাঁচ মাইল চলে যেতে পারেন। আমি খানিকটা প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ হয়ে তাঁকে দেখতে লাগলাম— বাংলা বাইবেলের জীবন্ত কিংবদন্তি, ফাদার খ্রীস্তিয় মিংঙো। সজল বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ক্যাথলিক বাইবেলের অনুবাদক। দুই খণ্ডের সটীক মঙ্গলবার্তা বাইবেল বাংলার খ্রিস্টিয় সাহিত্যের ভাণ্ডারে এক অবিস্মরণীয় সংযোজন।
ক্যাথলিকরা বাইবেল অনুবাদের কাজে এসেছেন অনেক পরে। ক্যাথলিক ধর্ম সন্ত জেরোম কৃত ল্যাটিন বাইবেলকে প্রামাণ্য মনে করে। যেটি ভালগেট নামে পরিচিত। অনেক কিছুর মধ্যে এই অনুবাদও ছিল মার্টিন লুথারের প্রতিবাদের একটি অন্যতম কারণ। লুথার বাইবেল জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন, আর তাই প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্ম ভিন্ন হওয়ার পর থেকেই, লুথারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিভিন্ন ভাষায় বাইবেল আসতে শুরু করে। কিন্তু ক্যাথলিকরা ভালগেটে হাত দিতে চাননি। তাই সারা পৃথিবীতে তাদের মিশনারিরা ছড়িয়ে পড়লেও, এবং খ্রিস্টের বাণী প্রচার করলেও বাইবেল তাঁরা অনুবাদ করেননি। অনেক সময়ে প্রয়োজন মতো ছোট-ছোট অংশ যে ভাষান্তর করেননি তা নয়, কিন্তু সম্পূর্ণ বাইবেলটি অনুবাদ করা নিয়ে ভ্যাটিকানের কড়াকড়ি ছিল। আর ভ্যাটিকানে পোপের নির্দেশের বাইরে ক্যাথলিকরা এক পা-ও ফেলবেন না তা বলাই বাহুল্য।



ও সজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর অনুদিত মঙ্গলবার্তা বাইবেলের নবসন্ধি অংশের আখ্যাপত্র
বাংলাতেও তাঁর ব্যত্যয় হয়নি। অথচ এখানে ক্যাথলিকরা এসেছেন প্রোটেস্ট্যান্টদের অনেক আগে। সেই মুঘল আমলেই জেসুইট আর অগাস্টান পাদ্রীরা এখানে এসেছিলেন, এবং চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ, সাতগাঁ, ব্যন্ডেল, ইত্যাদি বহু জায়গায় তাঁদের গির্জা ও মিশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখানকার সমাজের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। বাংলা ভাষা সংস্কৃতিতে পর্তুগিজ প্রভাবেই তা স্পষ্ট। এমনকী প্রথম বাংলা বইও তাঁরা ছাপলেন, যদিও লিসবন থেকে রোমান হরফে— কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ আর ব্রাহ্মণ-রোমান ক্যাথলিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু বাইবেল অনুবাদ তাঁরা করলেন না। যদিও প্রভুর প্রার্থনা বা লর্ডস প্রেয়ারের আলাদা করে অনুবাদ পেলাম। কিন্তু ওই পর্যন্তই।
প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্ম বাইবেল নির্ভর। লুথারের তত্ত্ব ছিল ‘সোলা ফিডে’। একমাত্র ভক্তি ও বিশ্বাসই মানুষকে নিষ্কৃতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। সেই পথ তাঁকে বাইবেলই দেখায়। বাইবেলের বাক্যগুলিকে ভালভাবে বুঝে পড়লে, মানুষ তাঁর মধ্যে সেই নৈতিক জীবনের হদিশ পাবে যা তাঁকে প্রভুর নিকটে নিয়ে যাবে, এবং তাঁর মধ্য দিয়ে নিষ্কৃতি বা মুক্তির পথ সুগম করবে। এর জন্য কোনও মধ্যবর্তী সমন্বয়কারী তত্ত্ব নিষ্প্রয়োজন। তা সে গুরু হোক বা গ্রন্থ। মধ্যযুগে বাড়তে থাকা ল্যাটিন বাইবেলের অনেকানেক ভাষ্য, যারা প্রায়ই পরস্পরবিরোধী; এবং তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা পুরোহিততন্ত্রের ক্ষমতা লুথারকে ভাবিত করেছিল। তিনি এই প্রতিষ্ঠানগুলির বিরূদ্ধে নিজের তাত্ত্বিক অবস্থানকে দাঁড় করিয়েছিলেন। যার মূল কথাই ছিল ল্যাটিনের হাত থেকে বাইবেলের মুক্তি এবং পুরোহিতের হাত থেকে ধর্মের মুক্তি। তাঁর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া যেতে পারে ভাষ্য ও টীকাকে প্রান্তিক করে তোলা, যিশুকে প্রাধান্য দিয়ে মাতা মেরি, অন্যান্য বাইবেলের পৌরাণিক চরিত্রাবলীকে গৌণ করা, এবং বিশেষ করে বিভিন্ন খ্রিস্টিয় সন্তদের উপাসনাকে চ্যালেঞ্জ করা, বিশেষ করে তাঁদের মূর্তি নির্মাণের মাধ্যমে। ফলে প্রোটেস্ট্যান্টরা বাইবেলের অনুবাদ ও বাইবেল নির্ভর প্রচারের ওপর বিশ্বাস করতেন বেশি। কেরিও মনে করতেন যদি এ-দেশীয়দের হাতে নিজের ভাষায় বাইবেল তুলে দেওয়া যায়, তাহলে বাইবেলই তাঁদের পথ দেখাবে ও ‘অন্ধকার থেকে আলোর’ দিকে নিয়ে আসবে। অন্যদিকে ক্যাথলিকরা চারশো বছর ধরে ভারতে থেকেও কখনও বাইবেল অনুবাদের চেষ্টা করেননি। সেই অধিকারও তাঁদের ছিল না।
পরিস্থিতি ক্রমে পালটালো বিশ শতকের গোড়ায় এসে। দীর্ঘদিন ধরে বাড়তে থাকা দাবির মুখে, ভ্যাটিকান অবশেষে বাইবেল অনুবাদ সম্পর্কে তাঁদের সাবেক মনোভাব পালটালো, আর অনুবাদে মত দিল। অন্যান্য ভাষার সঙ্গে বাংলার জেসুইটরাও তৎপর হইয়ে উঠলেন বাইবেলকে বাংলায় নিয়ে আসতে। প্রোটেস্ট্যান্ট বাইবেলের সঙ্গে ক্যাথলিক বাইবেলের কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে। তাঁর মধ্যে প্রধান হল— বেশ কিছু অধ্যায়, যেগুলিকে ক্যাথলিকরা প্রামাণ্য মনে করলেও, প্রোটেস্ট্যান্টরা করেন না। এগুলিকে একত্রে ‘অ্যাপোক্রিফা’ বলা হয়। আর ক্যাথলিক বাইবেল চর্চা টীকা নির্ভর। দুই সহস্রাধিক বছর ধরে গড়ে ওঠা টীকা ও ভাষ্যের একটি বিস্তীর্ণ প্রতর্কের মধ্যে তাঁরা বাইবেলকে দেখায় অভ্যস্ত ছিল। তাই তাঁরা বাংলায় আনতে উদ্যোগী হলেন এই টীকার ঐশ্বর্যও, যার বেশিরভাগই ল্যাটিনে। এই টীকা আর ল্যাটিন নির্ভরতা নিয়েই ছিল লুথারের আপত্তি।
বাংলায় প্রথম উদ্যোগ নেন জেসুইটরা। রেভারেন্ড ফাদার ডেসরোচার্স প্রথম উদ্যোগ নেন, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের উৎসাহে। পরে ফাদার দন্তেন আর সজনীকান্ত দাস তাঁর কাজটিকে পরিবর্ধন করেন ও খানিকটা পরিমার্জনও করেন। মূলতঃ এঁদের উদ্যোগেই শুরু হয় ক্যাথলিক বাইবেলের প্রথম বাংলা অনুবাদ। এটি বেশি দূর এগোয়নি। যদিও এই দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থটির একটি কপি কলকাতার প্রভু যিশু গির্জার লাইব্রেরীতে আছে। তার সূচনাটি এইরকম। সেখানে ফাদার এঙ্গেলবার্টও ছিলেন যিনি ফাদার মিংগোর মতোই বেলজিয়ান এবং বাংলায় ও বাইবেলে সুপণ্ডিত, সর্বোপরি বাংলা বাইবেল নিয়ে তাঁর অগাধ জ্ঞান।
মধ্যযুগে বাড়তে থাকা ল্যাটিন বাইবেলের অনেকানেক ভাষ্য, যারা প্রায়ই পরস্পরবিরোধী; এবং তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা পুরোহিততন্ত্রের ক্ষমতা লুথারকে ভাবিত করেছিল। তিনি এই প্রতিষ্ঠানগুলির বিরূদ্ধে নিজের তাত্ত্বিক অবস্থানকে দাঁড় করিয়েছিলেন। যার মূল কথাই ছিল ল্যাটিনের হাত থেকে বাইবেলের মুক্তি এবং পুরোহিতের হাত থেকে ধর্মের মুক্তি।
পরবর্তীতে যখন জেসুইটরা কোমর বেঁধে নামেন পূর্ণাঙ্গ বাইবেল অনুবাদে, তখন দায়িত্ব বর্তায় ফাদার খ্রীস্তিয়ান মিংঙোর ওপর। তবে এই দায়িত্বরও একটি ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাস জানতেই আমার ফাদারের কাছে যাওয়া আর এক ডিসেম্বরের ধূসর আকাশের পটভূমিকায় সেন্ট জেভিয়ারসের এক নিরাভরণ ঘরে তাঁর মুখোমুখি বসা। বাকিটা তাঁর বয়ানেই শোনা যাক, যা আমি নোট করে নিয়েছিলাম।
ফাদার দন্তেন আর সজনীকান্ত দাসের অনুবাদের কাজটি উৎসাহ ও উৎকৃষ্ট রূপে শুরু হলেও, নানান কারণে বেশিদূর অগ্রসর হয় না। থমকে যায়। এর প্রায় ৩০ বছর পরে সেন্ট জেভিয়ার্স থেকে একটি বাইবেল অনুবাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শুধু বাইবেল নয়, তাঁর সঙ্গে খ্রিস্টের বাণী সম্বলিত একটি পুস্তক এবং একটি খ্রিস্টিয় গানের সংকলন। কাজটি চার জনের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়— ফাদার দ্যতিয়েন, ফাদার পিয়ের ফালোন, ফাদার খ্রীস্তিও মিগনোন এবং ফাদার রবার্ট আতোয়ান।

প্রচলিত রীতি অনুযায়ী প্রথমে নিউ টেস্টামেন্টের অনুবাদ হবে, পরে পরিস্থিতি বুঝে ওল্ড টেস্টামেন্ট। ফাদার দ্যতিয়েন ম্থি, মার্ক ও লুকের সুসমাচার অনুবাদ করবেন, যেগুলিকে একত্রে সিনোপ্টিক গসপেলস বলা হয়। ফাদার ফালোন করবেন জোহানের সুসমাচার ও শিষ্যচরিত। ফাদার মিংঙো করবেন খ্রিস্টিয় বাণী-সংকলন। আর আতোয়ান করবেন পৌলের পত্রাবলী এবং শেষ গ্রন্থটি, রিভিলেশন্স। কিন্তু অনুবাদের খসড়া যখন তৈরি হল, তখন কারোরই পছন্দ হল না। সেই এক আক্ষরিকতার ঝোঁক, সাবলীলতার অভাব। ইতিমধ্যে ফাদার মিগনোর করা তিন খণ্ডের বাণীবিতান ও গীতসংহিতা খুবই জনপ্রিয় হল। তখন কাজটি সম্পূর্ণ ভাবে তাঁর ওপরেই ন্যস্ত হল। ৬১ বছর বয়সে তিনি হাত দিলেন নতুন করে সম্পূর্ণ বাইবেল অনুবাদের কাজে। সঙ্গে নিলেন কবি সজল বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ঠিক হল, খ্রিস্টিয় ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে শেষ কথা বলবেন ফাদার মিগনো আর ভাষার সৌন্দর্য বিষয়ে শেষ কথা বলবেন সজল বন্দ্যোপাধ্যায়।
দু’জনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমে মঙ্গলবার্তা বাইবেলের নবসন্ধি অংশটি প্রথম প্রকাশিত হল ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে। তার কিছু বছর পর, পুরাতন সন্ধিও প্রকাশিত হয়। এটি বাংলায় প্রথম ক্যাথলিক বাইবেল— পূর্নাঙ্গ ও সটীক। এর পরে বাংলাদেশের বেনেডিক্টাইন ক্যাথলিক সম্প্রদায়ও বাইবেল অনুবাদ প্রকাশ করেন। যদিও মঙ্গলবার্তার জনপ্রিয়তা বাংলাদেশেও যথেষ্ট। ফাদার মিংঙো প্রয়াত হয়েছেন, কিন্তু মঙ্গলবার্তা অ্যাপের মাধ্যমে যুবসমাজে এখনও খুবই জনপ্রিয়।
প্রসঙ্গান্তর
বাংলায় বাইবেল অনুবাদের ইতিহাস দুশো বছরের ওপর। প্রায় আড়াইশো বছর। যদি বাইবেলের সঙ্গে বাঙালির সরাসরি যোগাযোগের ইতিহাস ধরি, তাহলে সময়টা পিছিয়ে গিয়ে চারশো বছর ছাড়িয়ে দেয়। কিন্তু তাও বাইবেল সেইভাবে বাঙালির হয়ে উঠলো না, যতটা হওয়ার কথা ছিল। ইউরোপীয় সাহিত্যের কিছু-কিছু মহৎ গ্রন্থ বরং বাঙালির অনেক বেশি প্রিয় হয়ে উঠেছে বাইবেলের তুলনায়। কোথাও যেন বাইবেলের শরীর থেকে বিদেশি অনুষঙ্গের সন্দেহ এত বছরের নিবিড় যাপনেও দূর হল না। এর একটা বড় লক্ষণ, বাইবেল অনুবাদের এত-এত নামের মধ্যে এককভাবে বাঙালি নামের বিরলতা। প্রথম থেকেই বাইবেল অনুবাদের সঙ্গে তাঁরা জড়িয়ে থেকেছেন কখনও অনামি সহকারী, বা ‘নেটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট’ হিসেবে; কখনও বাংলা শেখানোর মুন্সি বা ফন্ট তৈরির ওস্তাদ হিসেবে, বড়জোর সহযোগী হিসেবে, যার কাজ বাংলার বাগধারা বিশুদ্ধ করা, কিন্তু ধর্মতত্ত্বে তাঁর ভূমিকা গৌণ। পণ্ডিত ও মানবিক পাশ্চাত্য মিশনারিরা বাংলা ভাষাকে ঋদ্ধ করেছেন, তাঁদের প্রাণপাত পরিশ্রমের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে অমূল্য সম্পদ দান করেছেন। তাঁদের কীর্তিকে অমান্য করা সম্ভব নয়। আমার শুধু এটাই বক্তব্য যে, এই সুদীর্ঘ অনুবাদের ইতিহাসে ‘লক্ষ্যভাষা’র স্বাভাবিক ভাষকের উপস্থিতির অভাব বোঝায় যে, দীর্ঘ সময়ে এই সুমহান গ্রন্থটির সঙ্গে বৃহত্তর জাতিটির কোনও কারণবশত গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়নি। না হলে যে জাতির লিখনের অভ্যাস প্রায় প্রগলভতায় পর্যবসিত, এমনকী অনুবাদেরও, সেখানে এই খামতির কীই-বা কারণ থাকতে পারে?
দু’জন একক বাঙালি অনুবাদকের নাম আমার জানার মধ্যে আছে। প্রথমজনের নাম কে এন দাস ব্যাপ্টিস্টদের প্রকাশনা তালিকায় এঁর নাম আছে। ইনি ‘ছন্দে বাইবেল সার’ নামে সুসমাচারের একটি কাব্যানুবাদ প্রকাশ করেন। এটি বেশ আকর্ষণীয় একটি প্রয়াস। ম্থি রচিত সুসমাচারের একটি অংশ দিয়ে আমরা এই অনুবাদের সাধারণ ধরনটি আঁচ করতে পারি—
শোনো
করো দৃষ্টিপাত
কোনো এক কুমারী হবে সন্তান সম্ভবা।
সে কুমারী মাতা হবে পুত্র-প্রসবিতা।।
আর-খ্যাত হবে সে— পুত্রসন্তান।
‘ইম্মানুয়াল’ নামে, ব্যাপ্ত হবে তাঁর নাম।।
এই নাম এই বলে হউক অভিহিত।
‘ঈশ্বর মোদের সনে আছেন সতত’।।
১৮৪৬তে রামকৃষ্ণ কবিরাজ ‘ধর্মপুস্তক পাঠোপকারক’ নামে একটি বাইবেল পাঠের সহায়ক গ্রন্থও প্রকাশ করেছিলেন, যেটি রেভারেন্ড জর্জ পিয়ার্স পরে রিভাইস করেন। এই বইটি এমনিতে খ্রিস্টিয় ধর্মতত্ত্বের বই হলেও, এর শেষদিকে কিছু-কিছু অংশে ব্যাপ্টিস্টদের অনুবাদ পদ্ধতি বিষয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ আছে।
দ্বিতীয়টি প্রকাশনাটি নতুন ও পুরাতন সন্ধি নিয়ে অনুদিত গোটা বাইবেল। করেছেন অরবিন্দ দে। প্রকাশ করেছে কলকাতার সি ডি প্রেস। প্রোটেস্ট্যান্ট বাইবেল হলেও, এটির সঙ্গে বাইবেল সোসাইটি ও ব্যাপ্টিস্ট বাইবেলের ভাষাগত ও কৌশলগত পার্থক্য আছে। প্রথমতঃ এটি সটীক। অনুবাদটির উদ্দিষ্ট পাঠক হিসেবে তিনি খ্রিস্টান ও অ-খ্রিস্টান— উভয়ের কথাই স্মরণে রেখেছেন। সেটি তাঁর টীকা রচনার ভাষাতেই পরিষ্কার। ভারতীয় বিশেষ করে হিন্দু ধর্মসংস্কৃতির পরিভাষার ব্যাপক ব্যাবহার লক্ষণীয়। আমরা ব্যাপ্টিসমের প্রেক্ষিতে ওনার ‘দীক্ষা’ শব্দ ব্যাবহারের কথা আগেই বলেছিলাম। এরকম আরও আছে। স্পষ্টতই তিনি বাংলার আধ্যাত্ম সাহিত্যের সঙ্গে সম্যক পরিচিত, আর সেই প্রেক্ষিতে বাইবেলকে রাখতে আগ্রহী। অনুবাদটির পুরনো সন্ধির অংশটি সাধু ভাষায়, ও নতুন সন্ধিটির অংশটি চলিত ভাষায় রচিত। অনুবাদক সূচনায় এঁর কারণও ব্যাখ্যা করেছেন। পুরনো সন্ধিটির প্রাচীনতা ও নতুনটির নৈকট্যকে বোঝাতে তিনি এমনটি করেছেন। কেন যে এই অনুবাদটি জনপ্রিয়তা পেল না, তা বলা কঠিন। তবে কাজটি নিঃসন্দেহে বিশেষ।

বাংলা বাইবেলে বাঙালির ভূমিকা নগণ্য। রামমোহন থেকে বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ থেকে কমলকুমার, বাইবেল ঘুরে-ফিরে এসেছে বহুবার, নানা ভাবে, কিন্তু তার নিজের জোরে, বাইবেল হিসেবে বাইবেল এসেছে কম। এরকম কি হতে পারে, যে চিহ্নসমবায়ের মধ্যে থেকে একটা টেক্সট বাঙ্ময় হয়ে ওঠে, যার মধ্যে থেকে সে কমিউনিকেট করে, এবং যাকে কেন্দ্র করে চিহ্নসমবায়টিও পুনঃরচিত হয়, সেই সমবায়টিই বাংলা বাইবেলকে ঘিরে গড়ে ওঠেনি? অথচ গড়ে ওঠার উপাদান সবই ছিল। তাহলে সমস্যাটা হল কোথায়? কেন আধ্যাত্মিক ভাবে না হলেও, বাইবেলের যে অসাধারণ গল্পভাণ্ডার, অল্প কিছু বাদ দিয়ে তা আমাদের কাছে ধরা দিল না, বা আমরা বাঙালি হিসেবে তাকে ধরতে পারলাম না? কিন্তু সেই বোধ ও রেফারেন্স আশ্রয়ী বিপুল ইউরোপিয় ও মার্কিন সাহিত্য— চসার থেকে টলস্টয় আর হুইটম্যান পর্যন্ত, সবাইকে আপন করে নিলাম? এদিকে সূচনার দুশো-চারশো বছর পরেও অরবিন্দবাবুকে উপায় ভাবতে হয়— গ্রন্থটিকে সম্প্রদায়ের বাইরে লোকপ্রিয় করে তোলা যায় কী উপায়ে? শুধু ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থায়, বা ব্রাহ্ম সংস্কার ও উনিশ শতকের শেষ ভাগের হিন্দু পুনর্জাগরণের বৃত্তে এর উত্তর খুঁজলে সেটি অসম্পূর্ণ হবে। কারণ তারও একটা, যাকে বলে, ব্যাক স্টোরি আছে। সে’টি খুঁজতে-খুঁজতে আমি পৌঁছে গেলাম আবার সেই উনিশ শতকের গোড়াতেই। সেখান থেক আরও, আরও পেছনে।


