‘…গনগনে আঁচের মধ্যে শুয়ে এই শিখার/ রুমাল নাড়ছি/ নিভে গেলে ছাই ঘেঁটে দেখে নেবেন/ পাপ ছিল কিনা…’
জনপ্রিয় হতে চাওয়াই ছিল তাঁর পাপ। তা নিয়েই চলে গেলেন স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাভাষার জনপ্রিয়তম কথাসাহিত্যিক, শংকর। সাহিত্য সমালোচকরা সামনের দু’দিন তাঁর চিতা থেকে উদ্ধার করবেন জনপ্রিয়তার তত্ত্বভস্ম, ‘এক ব্যাগ’ মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি আর বইমেলায় ছাউনি করে সই-ছবি বিলি নিয়ে হওয়া যাবতীয় আলোচনায় কিন্তু অধরা থেকে যাবেন, সেই বছর সতেরোর মণিশংকর— সস্তার লাল কেরোসিনের আলোয় বাবার পুরোনো দস্তাবেজের পিছনে যাঁর পেন্সিলে লেখা ঠিকানাবিহীন পাণ্ডুলিপি পড়ে সাগরময় হন্যে হয়ে উঠেছিলেন লেখককে খুঁজে পাওয়ার জন্য।
১৯৫৪ থেকে ধারাবাহিকভাবে ‘দেশ’-এ প্রকাশিত হওয়ার সময় থেকে আজ অবধি প্রায় সমান জনপ্রিয়তা নিয়ে থেকে গেছেন পাঠকপছন্দের শীর্ষে। প্রথম লেখা, যার গ্রন্থসংস্করণে নাম হয় ‘কত অজানারে’। শতাধিক মুদ্রণ হওয়া ‘চৌরঙ্গী’ বা ‘স্বর্গ মর্ত পাতাল’কে কীভাবে জনপ্রিয়তা-তত্ত্বের একমাত্রিকতায় ব্যাখ্যা করা যায় জানি না। অধ্যাপক শিশিরকুমার দাশ বলেছিলেন, ‘জনপ্রিয়’ আর ‘জনরঞ্জন’ আদতে আলাদা। এককালিক জনপ্রিয়তা নিয়ে সমকালের চাহিদা মেটানো বইকে দীর্ঘ সময় ধরে পাঠকপ্রিয় হয়ে থাকা বইয়ের সঙ্গে একসারিতে বসানো যায় না— তা করা হলে চিরায়ত আর জনপ্রিয়কে একই এজলাসে তোলা হয়।
শরৎচন্দ্র আর স্বপনকুমার যে আলাদা মানদণ্ডে বিচার্য তা বোঝার মতো বুদ্ধি অবশ্যই সমালোচকদের আছে, যদিও মোটাদাগে দুই-ই তাঁরা চিনতে চান, ‘পপুলার’ অভিধায়। জনরঞ্জনের নীতি নিয়ে না লিখলেও যে জনপ্রিয়তা পাওয়া সম্ভব, তা হামেশাই ভুলে যাই আমরা। সন্দেহ করি জনপ্রিয়তাকে। শংকর তাই চলে গিয়েও থেকে যাবেন আমাদের সন্দেহ-তালিকার শীর্ষে।

‘জনপ্রিয়’ শব্দটির দু’টি ভিন্ন তাৎপর্য রয়েছে। একটি, বহুবিক্রীত বা বাজারচলতি হওয়া। পুনর্মুদ্রণ আর সংস্করণ-সংখ্যায় যা সরাসরি প্রতিফলিত হয়। অন্য অর্থটি, অভিধার মাত্রা অতিক্রম করে কিছুটা লক্ষণাবাচক। ‘জনপ্রিয়’ সেখানে একটি তাচ্ছিল্যবাচক বিশেষণ। ‘বাজারচলতি’ হওয়া— এখানে আসলে ‘উচ্চরুচি’র সাহিত্যের বিপ্রতীপে ‘নিম্নরুচি’র বা ‘নন-সিরিয়াস’ একটি বাজারসর্বস্ব সাহিত্যিক অস্তিত্ব। কিন্তু এমনটা কি হওয়ার কথা ছিল?
ধরা যাক ‘চৌরঙ্গী’-র কথাই। বহিরাগত মধ্যবিত্ত কথকের চোখের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে সাহেবি কলকাতার রহস্য। জালের মতো বুননে সাদারল্যান্ড, রোজি-উইলিয়াম, স্যাটা বোস, করবী গুহ বা মার্কোপোলো চরিত্রগুলির প্রেম-বিরহ-বিচ্ছেদ-বেদনার আলাদা-আলাদা গল্প, কেন্দ্রীয় আকর্ষণ কনির স্ট্রিপটিজে কলকাতার উচ্ছন্নে যাওয়া নিশিজীবন। সমকালীন কলকাতার এইসব পরতে বাস্তবেও তো রয়েছে মিস শেফালিদের না-বলা গল্প। গিমিক বলতেই পারেন। কিন্তু এসব চমৎকৃতির আড়ালেও তো থাকে কলকাতার চালচিত্র বদলের সমাজ-ইতিহাস, সাহেবদের থেকে সংস্কৃতির ব্যাটন অবাঙালি ব্যাবসায়ীদের কাছে হস্তান্তরের গল্প। প্রতিদ্বন্দ্বীতায় ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে থাকা বাঙালি, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা থেকে পরের দশকে একটা চাকরির জন্য যে কোথায় নেমে যাবে, তা ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন-অরণ্য’, ‘তীরন্দাজ’ অবধি সহজেই পড়ে ফেলা যায় শংকর-এর লেখায়।
কলির কলকাতায় চাকরিজীবন দিনগত পাপক্ষয়; হতে পারে সেখানে অরাজনৈতিক সত্তার টিকে থাকার সুবিধাবাদী নীতি থেকে নৈতিক উত্তরণের পথ জানা নেই শংকরের। ‘কত অজানারে’, ‘চৌরঙ্গী’, ‘ঘরের মধ্যে ঘর’— বইগুলিতে তাঁর নীতিনিষ্ঠ কথকের চাকরিও তো তাই কখনও স্থায়ী হয় না। শংকর বরং উৎসাহ দেন স্বাধীন ব্যাবসায়িক উদ্যোগে। ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’, ‘আশা আকাঙ্ক্ষা’-র মতো উপন্যাসগুলিই কেবল নয়, রমাপ্রসাদ গোয়েঙ্কা বা সুব্রত রায়ের মতো উদ্যোগপতিদের জীবনকেও নানাভাবে লেখায় তুলে ধরার মাধ্যমে তা খানিক অনুমান করা সম্ভব। তাঁর ‘বিত্তবাসনা’, ‘কাজ’, ‘এবিসিডি লিমিটেড’ উপন্যাসগুলিও নানাসময়ে ব্যাবসা বা শিল্পক্ষেত্রের জটিলতাগুলিকে তুলে ধরতে চেয়েছে।
স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালির পরিবর্তিত কর্মজীবন শংকরের লেখার অন্যতম অভিলক্ষ্য, সেই হিসেবে তাঁকে বাঙালির আর্থিক ইতিবৃত্তের সাহিত্যিক রূপকার বলাটা দোষের কিছু হবে না। কিন্তু এই শংকরকে নিয়ে তো সেভাবে কেউ কথা বললেন না। বাঙালি নায়কের কর্মজীবনে অভিনিবেশ করাটাই হয়তো শংকরের সর্বজনীন জনপ্রিয়তার কারণ; আর সেখানেই নিহিত সেই জনপ্রিয়তাকে অস্বীকারের রাজনীতির সূত্র। সাধারণত বাংলা সাহিত্যের বুদ্ধিজীবি পাঠক-সমালোচক-সাহিত্যিক, যাঁদের নিয়ে বাংলা সাহিত্যচর্চার মননশীল পরিসরটি টিকে আছে— শংকরের লেখা নিয়ে ততটা উচ্ছ্বসিত হননি।

বাংলা সাহিত্যের চেনা ধরন— কাহিনিতে নায়ক-নায়িকার অর্থনৈতিক ভাষ্য নয়, বরং সামাজিক বা মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব-জটিলতার ভাষ্যটি তৈরি করা। চেতনাপ্রবাহের এলোমেলো ধাক্কা না সামলে, বহির্বাস্তবতার অসার উপকরণমাত্র হয়ে, প্র্যাগম্যাটিক নায়ক কাঁধে ব্যাগ দুলিয়ে অফিস যাচ্ছে, ব্যাবসার অন্ধিসন্ধি চিনে নিচ্ছে— এহেন কেজো ভাবনাই মননশীল সাহিত্যপাঠকের কাছে ‘ভালগার’ নয় কি?
‘পুতুল নাচের ইতিকথা’য় কে জানতে চায় শশীর ডাক্তারিবিদ্যের বহর, ডাক্তারখানার অর্থনীতি অথবা তার পেশাগত রাজনীতির মাত্রা? কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠক ‘এ জীবন লইয়া কী করিব?’— আদি কোনও মৌল প্রশ্নের উত্তরসাধনায় উপন্যাসে অভিনিবেশ করেন না, তাঁদের বাসনা একটি সহজ জীবনদর্শনকে কাহিনিতে খুঁজে পাওয়া; কিছুক্ষেত্রে আরেক ধাপ এগিয়ে, নিজের জানা-বোঝাকে কাহিনির প্রতিফলিত আদর্শ দিয়ে প্রত্যয়িত করিয়ে নেওয়া। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তো সেই কবেই বলেছিলেন, বাংলা উপন্যাসের পৃষ্ঠপোষক ‘প্রাক চল্লিশ ডেলি-প্যাসেঞ্জার’ ও ‘উত্তর চল্লিশ পৌরস্ত্রী’। পুরনাগরিক পাঠককে গুরুত্ব এবং প্রকাশককে ব্যাবসা দেওয়া শংকরের মতো লেখকদের বিদ্যাচর্চার পরিসর অপরায়িত করবে, শুধুই ‘বেস্টসেলার-লিখিয়ে’ তকমায় চিনতে চাইবে তাতে আশ্চর্যের কী?

১৯৬১ সাল, তখনও বেরোয়নি ‘চৌরঙ্গী’, ‘বাংলা উপন্যাসের ধারা’ বইতে অচ্যুত গোস্বামী শংকরকে ‘রিপোর্টাজধর্মী সাহিত্যিক’ বলে সাহিত্য আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করছেন। ‘জনপ্রিয় সাহিত্যিক’ শংকরকে নিয়ে আলোচনা ও চর্চার বিদ্যায়তনিক ধারাটি মুখ্যত ১৯৮০-র পর থেকে শুরু হচ্ছে ক্ষেত্র গুপ্ত এবং গোপাল হালদারের বিশ্লেষণ দিয়ে— যথাক্রমে, একটি দৈনিকপত্রের আলোচনা এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক উপন্যাস-বিষয়ক বক্তৃতায়। যদিও শংকর-এর বিখ্যাত লেখাগুলি তার বহু আগেই বেরিয়ে গেছে, পাঠকমহলেও শংকর তার আগেই স্বীকৃত ও বহুবিক্রিত লেখক। যিনি বহুপঠিত ও চর্চিত— তাঁর লেখা যে সমালোচকের অগোচরে থেকে যাবে, এমনটা হতে পারে না। সুতরাং, ‘জনপ্রিয়’— যে তকমাটি শংকর-এর আলোচনায় ঘুরে ফিরে বারবার আসে, তা থেকেই সমালোচকদের ‘জনপ্রিয়তা’কে অস্বীকারের মনস্তত্ত্বটি পড়ে ফেলা যায়। এ থেকে প্রমাণ হয়, শংকর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কিছুটা উপেক্ষিতই।
শংকরকে নিয়ে প্রথমদিকের আলোচনাগুলি প্রায়শই অতি-সংক্ষিপ্ত। সাধারণত, একটি অনুচ্ছেদও বরাদ্দ নয় শংকরের জন্য, কখনও-বা একটি মাত্র লাইনে আরও পাঁচজন ‘জনপ্রিয়’ লেখকের সঙ্গে একসুরে উচ্চারিত হন শংকর। গোপাল হালদার, অলোক রায়, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ আলোচকের লেখায় শংকর যেন বাংলা কথাসাহিত্যের শুধু একটি পাদটীকা মাত্র। অচ্যুত গোস্বামী, ক্ষেত্র গুপ্ত, সুমিতা চক্রবর্তী, অলোক রায়, রবিন পাল ও অর্ণব সাহা-র মতো আলোচকরা শংকরকে সরাসরি ‘জনপ্রিয় সাহিত্য’-রচয়িতা হিসেবে দেখেছেন। আবার, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, গোপাল হালদার, হীরেন চট্টোপাধ্যায়, অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় প্রমুখেরা তাঁর সাহিত্যগুণ মেনে নিয়েও রাখছেন ‘জনপ্রিয়’-বর্গের মধ্যেই। বীরেন্দ্র দত্ত, নিতাই বসু বা শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়-কে এখানে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হিসেবেই দেখা চলে।
শংকরকে নিয়ে প্রথমদিকের আলোচনাগুলি প্রায়শই অতি-সংক্ষিপ্ত। সাধারণত, একটি অনুচ্ছেদও বরাদ্দ নয় শংকরের জন্য, কখনও-বা একটি মাত্র লাইনে আরও পাঁচজন ‘জনপ্রিয়’ লেখকের সঙ্গে একসুরে উচ্চারিত হন শংকর। গোপাল হালদার, অলোক রায়, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ আলোচকের লেখায় শংকর যেন বাংলা কথাসাহিত্যের শুধু একটি পাদটীকা মাত্র।
মধ্যবিত্ত মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেন বলেই কেবল উপন্যাস নয়, নিজের জীবন-সংগ্রাম পর্বের স্মৃতিকথামূলক রচনা অথবা রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের জীবন ও দর্শনকে বিষয় করেও লিখেছেন গবেষণাধর্মী লেখাপত্র, সেগুলিও একইরকম বাজারসফল। শংকর বিদ্যাচর্চার মহল বা বুদ্ধিজীবিপুষ্ট পুরস্কার-সমিতিসমূহের ভাবাবেগের তোয়াক্কা না করেই পেশাদার লেখকের নিষ্ঠায় নাগরিক মধ্যবিত্ত পাঠকসমাজের জন্যই লিখে গেছেন। এর পরিণতি? একটি সাক্ষাৎকারে নিজেই শংকর জানিয়েছিলেন, লেখকের আসল বেঁচে থাকার পরীক্ষা শুরু হয় মৃত্যুর পরেই। অতএব, শংকর এখন মহাকালের বিচারসভায় পাস অথবা ফেল হওয়ার অপেক্ষায়… ‘জনপ্রিয়তা’ শব্দটা কি তাঁকে মৃত্যুর পরেও ক্ষমা করবে না?


