শোক ও বাহুল্য
‘স্লোগান, তুমি কার?’ এই প্রশ্ন আবারও উঠে এল রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়াত হওয়ার পর। একটি শুটিং-দুর্ঘটনায় সদ্য প্রয়াত হয়েছেন রাহুল। গতকাল ময়নাতদন্তের পর, যখন তাঁর মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়, তখন দক্ষিণপন্থী একটি দলের কয়েকজন নেতা, সমবেদনা জানাতে এসে, তাঁর বাড়ির সামনে ‘ভারতমাতা কী জয়!’ ধ্বনি তুলতে থাকেন। সাংবাদিকরা তাঁদের এ-নিয়ে প্রশ্ন করলে জনৈক নেতা জানান, তাঁরা সমবেদনা জানাতে এসেছেন রাহুলের পরিবারকে। তবে, ‘ভারতমাতা’-র জয়ধ্বনি দেওয়া কি অপরাধ?
রাহুল নিজে ব্যক্তিগত জীবনে বামপন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন, নানা সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার-গৃহীত নীতির সমালোচনা করেছেন তিনি। অযোধ্যায় রামমন্দির-সংক্রান্ত রায়ের সময়েও গর্জে উঠেছিল তাঁর প্রতিবাদী সত্তা। তারই আক্রোশ-স্বরূপ রাহুলের মৃত্যুর পর এ-ভাবে আক্রমণ করতে এসেছিলেন দক্ষিণপন্থীদের একাংশ?
গঙ্গা দূষিত হয় কেবল আমিষেই? পড়ুন: চোখ-কান খোলা পর্ব ২১
একইভাবে, তমলুক থেকে রাহুলের দক্ষিণ কলকাতার বাড়িতে তাঁর মৃতদেহ নিয়ে আসার সময়ে— বামপন্থী দলগুলির পতাকা হাতে স্লোগান দেওয়া নিয়েও তর্ক উঠেছে। তাঁদের বক্তব্য ছিল, তাঁর সত্তার প্রতি সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যেই তাঁরা নির্দিষ্ট স্লোগান দিচ্ছিলেন। বামপন্থীরা সাধারণত নিজেদের পার্টি-কমরেডদের এ-ভাবেই শ্রদ্ধা জানান, আর রাহুল নিজে যেহেতু কমিউনিস্ট পার্টির একজন সমর্থক ছিলেন, মৃত্যুর পরে এভাবেই তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন পার্টি-কর্মীরা।
অথচ, এ-দিন তাঁর মৃতদেহ যখন বিজয়গড়ের বাসভবনে নিয়ে আসা হয়, তখন যেন বিভিন্ন ভাব মিলেমিশে একাকার! তাঁর গায়ে কেউ জড়িয়ে দিলেন আর্জেন্টিনার পতাকা, কেউ দিলেন ইস্টবেঙ্গলের পতাকা, কেউ-বা কাস্তে-হাতুড়ি-তারা আঁকা লাল-ঝান্ডা। থিয়েটার, সিনে-কর্মী, লেখার অনুরাগী— সবার সব অনুভূতি মিলেমিশে একাকার।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, এই মুহূর্তে একজন সেলিব্রিটির মৃত্যু আসলে একটি ‘কনটেন্ট’ বই কিছুই নয়। অতএব রিলদুনিয়ার মানুষ যা করে, তা-ই করেছে। সে-ব্যক্তি মৃত হোক বা জীবিত, সেলিব্রিটি মানেই টিআরপি বাড়ানো কনটেন্ট। এবং রাহুলের মৃত্যুকেও তারা এইভাবেই ব্যবহার করেছে। তাতে যত না মৃত ব্যক্তির প্রতি শোক প্রকাশিত হয়েছে, তার থেকে বেশি— সে নিজে সেই মানুষটার কত কাছের ছিল— তার নির্লজ্জ প্রমাণ দেখানোর উদ্দেশ্যে মেতে উঠেছে। ঠাহর হচ্ছে, শোকের শান্ত-সমাহিত ভাব পিছনের সারিতে চলে গেছে, আর যা প্রতিভাত হচ্ছে তা দেখনদারির-ই নামান্তর। এই আকস্মিক শোকের সময়ে তাই একটা প্রশ্নই গাঢ় হয়— মানুষ কি একটু নীরব হতে শেখেনি?
অবশ্য রিল বানানোতেই শেষ নয়, কে কোথা থেকে এসে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, সেই সব ছাপা কাগজের টুকরো মৃতদেহের উপর একের পর এক চাপিয়ে, ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাবটা এমন, দেখো ভাই, যতই ভিন্ন মত হোক, আমি কিন্তু প্রমাণ দিতে পারি— আমি শ্রদ্ধা জানিয়েছি। মৃত্যু হলে মানুষ প্রমাণ দিতে খুব উদ্যত হয়। শ্রদ্ধা দেখানোর প্রমাণ দেওয়ার ভিড়ে, বাকি কত কী-ই যে ধামাচাপা পড়ে যায়, তার হিসেব কে রাখে!

সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গিয়েছে, এদিন রাহুলকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার সময়ে কেওড়াতলা শ্মশানের বাইরে, তাঁর ছোটবেলার বন্ধুদের প্রথমে আটকে দেওয়া হয়েছিল। তবে বন্ধুত্বেও কি ‘সেলিব্রিটি’-দের অগ্রাধিকার? যে-বন্ধুরা মূল ঘটনাস্থল থেকে তাঁর দেহ নিয়ে এলেন, সর্বক্ষণ থাকলেন তাঁর সঙ্গে, তাঁরাই নাকি বহিরাগত— এমন অভিযোগও উঠে এসেছে।
শুটিংয়ে গাফিলতি নিয়ে তদন্ত হবে। এক অভিনেতার অকালমৃত্যুর নেপথ্যে কোথাও লুকিয়ে রয়েছে টলিউডের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অনেকগুলি প্রশ্ন। কিন্তু সেই আলোচনা চাপা পড়ে গিয়ে শোক-প্রকাশের ধরন যেখানে প্রাধান্য পায়, বুঝতে হয়, জনমন কতটা বিক্ষিপ্ত, কতটা মনোযোগ আকর্ষণকারী, কতটা প্রাধান্য পাওয়ার জন্য আগ্রহী, কতটা বিষয়াভিমুখ থেকে বিচ্যুত। রাহুলের স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা ও তাঁদের সন্তান সহজ যখন শ্মশানের ভেতরে প্রবেশ করেন ও দাহ-কাজ শেষে ফিরে আসেন, তখন তাঁদের চোখে (বিশেষ করে প্রিয়াঙ্কার চোখে) ‘কেন জল দেখা যায়নি’— এ-নিয়ে উত্তাল সমাজমাধ্যমের একাংশ। কিছু মানুষ বলছেন, কেমন শোক, যেখানে চোখে জল নেই? একুশ শতকেও কি তবে সমাজমাধ্যম ঠিক করে দেবে, প্রিয়জন কীভাবে শোক প্রকাশ করবেন, কীভাবে নয়?
রাহুল ওরফে অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় এখন সমাজমাধ্যম জুড়ে রয়েছেন। দু’দিন পর অন্য খবর, অন্য ট্রেন্ড হয়তো তাঁকে আড়াল করে দেবে। আদতে সমাজমাধ্যম নন ইভেন্ট-এর ওপর ভর করে চলে। আজ যা ইভেন্ট, কাল তা স্মৃতিধার্যও নয়। এই পদ্মপাতায় জলের প্রবণতায় মৃত্যুর মতো ভারী একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়ারা আদতে মিশে যায় যে-কোনও ঝোঁকের সঙ্গে। আর আসল প্রশ্নগুলো চাপা পড়ে যায় নিমেষেই। উপলক্ষ আর লাগে না সমাজমাধ্যমের, সে নিজের বাস্তুতন্ত্র বহাল রাখতে নিজেই উপলক্ষ তৈরি করে। শোক থেকে উল্লাস— সব অনুভবই সেখানে এক ঝলকের উপাদান। তাই এই ভিড়বাহুল্যে নিভৃতির কোনও স্থান নেই। যার ভার পাথরের মতো, তাকে পালকের মতো পলকা করে তুলতে পারে এই হইহল্লার উপদ্রব। নতুন-নতুন তর্ক, সেখান থেকে নতুন-নতুন ভাইরাল উপকরণ।
রাহুল কেমন মানুষ ছিলেন, কেমন অভিনেতা ছিলেন— এ-নিয়ে লেখা আলোচনা চলতে থাকবে, কিন্তু তাঁর আকস্মিক মৃত্যু যে-প্রশ্নগুলো রেখে দিয়ে গেল, তার উত্তর মিলবে কি?



