পুনর্মুদ্রণ: শিবরাম চক্রবর্তী

Representative Image

রাজশেখর বসু একশো বছর আগে জন্মেছিলেন

দক্ষিণ কলকাতা তখন বনেদী ছিল না, উত্তর কলকাতারই হাঁকডাক ছিল। সেই সেকালে টাউনসেন্ড রোড নামে কলকাতায় একটা রাস্তা ছিল। সেই রাস্তার মাঝখানে একটা ফ্যাঁকড়া ছিল। ফ্যাঁকড়া থেকে গোটা তিনেক রাস্তা বেরিয়ে ছিল। তারই একটায় থাকতেন রাজশেখর বসু।

হিসেব করে দেখা গেছে, তিনি জন্মেছিলেন একশো বছর আগে, ১৮৮০ সালের ১৬ মার্চ। বাঁচা-মরা নিয়ে তাঁর এই বয়স। আমি জন্মেছি তাঁর তেইশ বছর বাদে। মানে, আমার বাঁচা-বয়স সাতাত্তর। মরার পরেও তাঁর বয়স বেড়ে যাচ্ছে দেখে খুবই আনন্দ হচ্ছে আমার। মরার পরে সকলের বয়স বাড়ে না। বাড়বে কি করে? সবাই ভুলে যায় যে।

তিনি ছিলেন যেমন নামজাদা লেখক, তেমনি রাশভারী মানুষ। সহসা কারো সঙ্গে মিশতে পারতেন না। অথচ তাঁর বাড়িতে সাহিত্যের আড্ডা হত, গল্পগুজব হত। সেই আড্ডায় তিনি গম্ভীর মেজাজ নিয়ে যোগ দিতেন। রসদ জোগাতেন। সবাই হাসত। তিনি হাসতেন না। মজার কথা এই, তাতে কারো হাসি থামত না। তিনি হাসতেন বোধহয় চুপি চুপি।

আরও পড়ুন: চলন্তিকা অভিধানে রাজশেখর বসু যেভাবে দেখতে চেয়েছিলেন বাংলা ভাষাকে! লিখছেন শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়…

তাঁর বাড়ির আড্ডায় আমি গিয়েছি দু-একবার। আড্ডা  দিতে না, বন্ধুবান্ধবদের পাল্লায় পড়ে। আমার বন্ধু প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, বুদ্ধদেব বসু তাঁর বাড়িতে যেত। তাদের পাল্লাই ছিল ভারি। তারা যেত বলে আমিও যেতুম। নইলে কে আর তেইশ বছরের বড় একজন গম্ভীর প্রকৃতির মানুষের সঙ্গে আড্ডা দিতে যায়?

আমার আড্ডা দেওয়ার একটা ভালো জায়গা ছিল প্রেমেন্দ্র মিত্রের বাড়িতে। আমার লেখক-বন্ধুরা প্রায় সকলেই তাঁর বাড়িতে আসত। হামেশাই আসতেন কাজী নজরুল ইসলাম। গান গেয়ে, গল্পগুজব করে, হো হো করে হেসে তিনি আড্ডা জমিয়ে তুলতেন। রাজেশেখর বসুর আড্ডা সেরকম ছিল না। তবুও আমার বন্ধুরা তাঁর বাড়িতে না এসে পরত না। তার বাড়ির কী যেন একটা টান ছিল, চুম্বকের মতো।

রাজশেখরবাবু, নানা রকমের লেখা লিখতেন নামে, বেনামে। তাঁর নামের লেখাগুলি ছিল যেমন নামী, বেনামের লেখাগুলি ছিল তেমনি দামী। কোনোটাই ফেলনা না। তার বেনাম, মানে ছদ্মনাম ছিল পরশুরাম।

কি করে এই বেনামটা, মানে ছদ্মনামটা তিনি নিয়েছিলেন, তাই নিয়ে একটা গল্প আছে। গল্পটা আমার পরের মুখে শোনা। শোনা গল্পটাই আবার শোনাচ্ছি।

আলাদা রকমের লেখার জন্য তাঁর একটা আলাদা নামের দরকার ছিল। কি নাম নেওয়া যায়, কি নাম নেওয়া যায়— ভাবতে ভাবতে হঠাৎ-ই খুঁজে পেলেন ‘পরশুরাম’ নামটা। পরশুরাম নামে একজন স্যাকরা ছিল তাঁর বাড়ির কাছাকাছি না কোথায় যেন। সেই স্যাকবার নামটা তিনি জড়িয়ে ফেললেন লেখালেখির সঙ্গে। স্যাকরা বানাত সোনা-রূপোর গড়ন। তিনি বানাতে লাগলেন গল্প।

অন্যেরা বলে অবশ্য অন্য কথা। অনেক কাল আগে, পরশুরাম নামে একজন রাগী মুনি ছিলেন। একুশবার পৃথিবীটাকে নাকি ক্ষত্রিয় শূন্য করেছিলেন তিনি। তাঁরই নাম অনুসারে তিনি নিজের নাম নিয়েছিলেন পরশুরাম। এটাই হয়তো ঠিক। পুরাণের পরশুরামের হাতে থাকত কুঠার, লেখক পরশুরামের হাতে ছিল কলম। কলমের মুখে দিয়ে তাঁর এমন এমন সব গল্প বেরতো যে, লোকেরা নাস্তানাবুদ হয়ে সেইসব গল্প পড়ত। এখনো পড়ে আর নাস্তানাবুদ হয়।

তাঁর গল্পগুলি হাসির। কিন্তু হো হো করে হাসার মতো না। ইংরেজিতে একটা কথা আছে না, ‘স্যাটায়ার’— সে রকম আর কি। মানুষেকে খুঁচিয়ে তাতিয়ে তিনি মজা করতেন, অর্থাৎ কেউ তার ওপর চটে গিয়ে কিস্যুটি বলতে পারত না। আসলে তিনি ছিলেন তাঁর মতো, তাঁর হাসি ছিল তাঁর হাসির মতো, অন্যের মতো না।

ঐ যে লোকে বলে, শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড, গড্ডালিকা, রাজভোগ,  ভূষণ্ডীর মাঠে, হনুমানের স্বপ্ন, চিকিৎসা সংকট, তাঁর ভালো গল্প। ওটা মিছে, কথা না। আরো অনেক ভালো  ভালো গল্প, ভালো ভালো বই তিনি লিখে গেছেন। কিন্তু দুঃখের কথা, ছোটদের জন্য তিনি খুব বেশি লিখে যান নি। আজকের ছেলেরা অবশ্য অনেকে পাকা হয়েছে। অনেকে পাকা পাকা কথা বলে। তাদের কাছে তাঁর লেখা খুব দুর্বোধ্য না মনেও হতে পারে।

হ্যাঁ, ছোটদের এবং বড়দের জন্য তিনি একটা বই লিখে গেছেন নিজের নামে। সে বইয়ের নাম ‘চলন্তিকা’। একটা ডিকসনারি। মানে, অভিধান। আমাদের বানান ভুল যতে খুব বেশি না হয়, যাতে আমরা ঠিকঠাক শব্দের ঠিকঠাক অর্থ বুঝতে পারি, সেজন্যে তাঁর এ বই লেখা। তাঁর মনটা ছিল বৈজ্ঞানিক, ভাবনাচিন্তা ছিল বৈজ্ঞানিক। অকারণে একটা বাড়তি শব্দও তিনি তাঁর লেখায় ব্যবহার করে যান নি। অনেকে অনেক ফেনানো ফাঁপানো লেখা লেখেন। তিনি তা পছন্দ করতেন না।

বুড়ো বয়সেও তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে বহুবার। কথাবার্তা হয়েছে। কিন্তু, সেই গম্ভীর চেহারা বদলায় নি তখনো দেখেছি।

তখন না, এখন মনে হচ্ছে ছেলেবেলায় তিনি নিশ্চয়ই খুব দুষ্টু ছিলেন, খাটের তলায় লুকোচুরি খেলেছেন, পেন্সিলের শিস ভেঙেছেন, দোয়াতের কালি উল্টে দিয়েছেন। নইলে এমন গম্ভীর হতে পারে নাকি কেউ? দুষ্টুরাই এমন গম্ভীর হয়ে যায় বয়েস-কালে, চারদিক দেখেশুনে।

‘যুগান্তর’ পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎকার।
মার্চ ১৯৮০
মূল বানান অপরিবর্তিত