আমাদের কবি বিষ্ণু দে পিকাসোকে বুঝতে চেয়েছিলেন মহানদীর উপমায়। লিখেছিলেন তাঁর এক কবিতায়, ‘পিকাসো কি মহানদী প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর বারবার/ সমুদ্রের নিত্য অভিযান/ নৈর্ব্যক্তিক সত্তা অনির্বাণ?’ একদিকে নদীর মতো নিরন্তর প্রবহমানতা, আর একদিকে অগ্নিশিখার দহনশক্তি, এই দুইয়ের সমন্বয়ে হয়তো খানিকটা অনুধাবন করা যায় তাঁর সৃজনের ফরাসি কবি পল এলুয়ার তাঁকে বুঝতে চেয়েছিলেন অগ্নিশিখার উপমায়। অরুণ মিত্রের অনুবাদে পাই এলুয়ারের এরকম তিনটি লাইন: ‘তুমি তোমার আঙ্গুলের মধ্যে অগ্নিশিখা ধরে রাখো / এবং তুমি আঁকো এক অগ্নিকাণ্ডের মতো / শেষ পর্যন্ত অগ্নিশিখাই মিলন আনে অগ্নিশিখাই বাঁচায়।’ পিকাসোর নিরন্তর সৃষ্টিপ্রবাহকে ‘জীবন্ত আগ্নেয়গিরির নিয়ত উদ্গীরণ’ বলেছিলেন তাঁরই আজীবনের বন্ধু, সঙ্গী ও সচিব সাবার্তে। কেন আগুনের উপমায় বুঝতে চাইলেন তাঁর সৃষ্টিকে তাঁর ঘনিষ্টতম এই দু’জন মানুষ? আগুনের উপমায় কি এক বিপ্লবের ইঙ্গিত নিহিত থাকে? পুরনোকে ধ্বংস করে নতুনের উদবোধনের ইঙ্গিত?
এই ধ্বংসের কথা অবশ্য পিকাসো নিজেই বলেছেন। ‘আমার কাছে একটি ছবি অজস্র ধ্বংসেরই সমাহার’। ১৯৩৫ সালে ‘কাহিয়ের দ্যু আর্ট’ পত্রিকার সম্পাদক ক্রিস্টিয়ান জেরেসো-র সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত কথোপকথনে বলেছিলেন এ-কথা। এই উক্তিকেই পরের বাক্যে প্রসারিত করেছিলেন এভাবে: ‘আমি একটি ছবি করি— তারপর সেটাকে ধ্বংস করি। শেষ পর্যন্ত যদিও কিছুই হারায় না…।’ সৃষ্টি আর ধ্বংসের মধ্য দিয়ে নদীর মতো তাঁর যে নিরন্তর সৃজনের প্রবাহ বিংশ শতক জুড়ে সারা বিশ্বের আধুনিকতাবাদী চিত্র-ভাস্কর্যে, এর অভিঘাতের ব্যাপ্তি সম্পর্কে আমরা সকলেই অবহিত।
পাবলো রুইজ পিকাসো (২৫ অক্টোবর ১৮৮১–৮ এপ্রিল ১৯৭৩) একজন স্প্যানিশ শিল্পী, একাধারে চিত্রী, ভাস্কর, ছাপচিত্রী, সিরামিস্ট, থিয়েটার ডিজাইনার, এমনকী, একটা পর্যায়ে কবি ও নাট্যকারও। যদিও তিনি তাঁর যৌবন-পরবর্তী প্রায় সমগ্র জীবনই ফ্রান্সে কাটিয়েছেন, তবু স্পেনের উদ্দামতা, ভাঙন-প্রবণতা ও প্রতিবাদী চেতনা তাঁর রক্তের ভেতর কাজ করেছে আজীবন। আর সেটাই হয়ে উঠেছে তাঁর সৃজনের উৎস। সেই উদ্দামতা থেকেই তিনি বারবার ভেঙেছেন। বিংশ শতকের প্রথম তিনটি দশকে আধুনিক ও আধুনিকতাবাদী পাশ্চাত্য শিল্পের আঙ্গিকগত বিপ্লবে পিকাসোর যে অবদান, এর সমান্তরাল কোনও কিছু ইউরোপে বা সারা বিশ্বে ঘটেছে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। কিউবিজম, কোলাজ, কিউবিজমেরও দ্বিমুখী বিস্তার— অ্যানালিটিক্যাল ও সিন্থেটিক, সুররিয়ালিজম, নিও-ক্লাসিসিজমের বিকাশ একের পর এক ঘটে গেছে তাঁর ছবির মধ্য দিয়ে। তবু কেবল আঙ্গিকগত বিপ্লবের জন্যই শুধু স্মরণীয় নন পিকাসো। তিনি তাঁর সময়কে ধারণ করেছেন, সময়ের যে গভীর সংকট, তার মর্মে প্রবেশ করে এর স্বরূপ চিনিয়েছেন বিশ্বকে। ১৯৩৭-এ তাঁর ‘গের্নিকা’-র মতো আর কোনও একক শিল্পকাজ ফ্যাসিজমের বীভৎসতাকে উন্মীলিত করতে পেরেছে? বা ১৯৫২-র লিথোগ্রাফে করা ‘ফ্লাইং ডভ ওভার দ্য রেইনবো’ মতো ছবি শান্তির প্রতীক হতে পেরেছে? তথাপি ইউরোপের ইতিহাসে পিকাসোই যে প্রধান নিয়ন্ত্রক, এ-কথা স্বীকের করেননি অনেকেই। যে অর্থে অ্যাঁগ্র স্মরণীয় নিও-ক্লাসিসিজমের প্রবর্তক হিসেবে, ইম্প্রেশনিজমের সঙ্গে যুক্ত শিল্পী এদুয়ার্দ মানে, ক্লদ মোনে, এডগার দেগা, পল সেজান যেভাবে স্মরণীয় ইম্প্রেশনইজম-উত্তর শিল্পের ইতিহাসে, এমনকী, কিউবিজমে যেভাবে ব্রাক বা বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদে ক্যানদিনস্কি, সেভাবে বিশেষ কোনও পথের দিশারী হিসেবে স্মরণীয় নন পিকাসো।
আরও পড়ুন: হতাশাভরা দিনে, পিকাসো ছিলেন মাতিসের প্রধান সহায়!
লিখছেন গৌতম সেনগুপ্ত…
আঙ্গিকের দক্ষতাকে প্রায় শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো সহজ করে নেওয়া সত্ত্বেও আঙ্গিককেই কখনও শিল্পীর শ্রেষ্ঠতম অন্বিষ্টের গুরুত্ব দিলেন না পিকাসো। জীবনকে, সময়কে বাস্তবতাকেই দেখলেন শিল্পের বড় আধার ও আধেয় হিসেবে। নিজেরই শরীরচেতনা, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, প্রেম, কামনা, আর্তি— এই সমস্তকিছুর তীব্রতা প্রবহমান সময়ের নিয়ন্ত্রণে যে রূপ পেল, সেই রূপকেই প্রতিফলিত করলেন তাঁর শিল্পে। রূপ ও ভাব, আঙ্গিক ও বিষয়, শিল্প ও জীবনের এই দ্বৈততার ইতিহাসে তাঁর স্থান নির্ধারিত হবে কীভাবে, এই নিয়ে সংশয় ও মতান্তর ছিল দীর্ঘদিন।
তাই এদেশে তো বটেই, ওদেশেও পিকাসোকে বোঝার সঙ্গে ভুল বোঝার নিদর্শনও এগিয়ে চলে সমান তালে। জন রিচার্ডসনের মতো পিকাসো-বিশেষজ্ঞ যখন তাঁর শিল্পের বিবর্তনকে একাত্ম করে দেখতে চান তাঁর সঙ্গিনী বদলের সঙ্গে, এতটাই একাত্ম যে, সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতাও সে-তুলনায় তত গুরুত্বপূর্ণ থাকে না, এমনকী তাঁর কুকুরটিরও যে অবিচ্ছেদ্য ভূমিকার কথা বলেন অনেকে, তত গুরুত্বের মনে হয় না সেই বাস্তবতাকে, তখন কিছুটা সংশয় তো থাকেই। কিন্তু জন বার্জারের মতো মার্ক্সবাদী সমালোচক যখন পিকাসোর মূলগত সংকট আবিষ্কার করেন আজীবন-লালিত তাঁর আত্মাভিমানবোধে, সেই আত্মসচেতনতাতেই যখন খুঁজে পান বিষয় ও বাস্তবতার সঙ্গে তাঁর বিচ্ছিন্নতার উৎস, আর সেই বিচ্ছিন্নতাকেই মনে করেন নিজেকে ভেঙে ভেঙে শিল্পের বিষয় করে তোলা, এবং সারা জীবনই সঠিক বিষয় খুঁজে না পাওয়ার সংকটকেই যখন বার্জার বলেন পিকাসোর প্রধানতম ব্যর্থতা, তখন আমাদের বেশ কিছুটা বিহ্বল লাগে। পিকাসোর যা কিছু সফল কাজ, পাঁচের দশকেই তা প্রায় শেষ হয়ে গেছে, তার পর থেকে তাঁর যা কিছু কাজ, সে-সমস্তই কেবল ব্যর্থতাবোধ-তাড়িত একজন হতাশ শিল্পীর নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও চর্বিতচর্বন, এরকম মতামতও খুব বিরল নয়। তাঁর ভেতরের যে অশান্ত বিক্ষোভ, তাকে তো এক ধরনের পাগলামিই বলেছেন কেউ কেউ। প্রেম ও সংবেদনের যে তীব্রতা তাঁর শিল্পে— তার প্রতিফলনের মধ্যে কেবল প্যাশনের আর্তিই দেখেছেন অনেকে, কেমন করে সেই আর্তিই বাস্তবতায় প্রতীকায়িত হয়ে যায়, সেটা তলিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করেননি। তাঁর রাজনীতি-চেতনাকেও অনেকের মনে হয়েছে আর পাঁচটা খেয়ালের মতো একটা খেয়াল মাত্র।
তাঁর প্রয়াণের ৫৩ বছর পরে শিল্পের দর্শন যখন পোস্ট-মডার্ন, কন্টেম্পোরারি, পোস্ট ট্রুথ ছাড়িয়ে আজ এআই-এর দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে, তখন ওইসব বিতর্ক ও সংশয় অনেকটাই অর্থহীন বা তামাদি হয়ে গেছে। পিকাসোর আলো ও দীপ্তি কমেনি এতটুকুও। পিকাসোকে ছাড়া আবিশ্ব আধুনিকতাবাদ প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়।

হিজ ক্লাব’।
শিল্পী: পাবলো পিকাসো
পিকাসোর শৈশবে আঁকা প্রথম যে ছবিটির সন্ধান পাওয়া যায়, সেটি তাঁর ন’বছর বয়সে নভেম্বর ১৮৯০ সালে আঁকা। শিরোনাম শিল্পীই পরে দিয়েছেন ‘হারকিউলিস উইথ হিজ ক্লাব’। পিকাসো নিজে বলতেন শৈশবে তিনি আঁকতেন রাফায়েলের দক্ষতায়। তারপর সারাজীবন চেষ্টা করেছেন সেই স্বাভাবিকতাবাদ অতিক্রম করে শিশুর সারল্যে পৌঁছতে। ১৯০১ থেকে ১৯০৪ পর্যন্ত সময়কে বলা হয় পিকাসোর ‘ব্লু পিরিয়ড’। এই সময় তিনি বার্সেলোনা থেকে প্যারিসে প্রবাসী হন। ১৯০৪ থেকে ১৯০৬ সালের পর্যায়কে বলা হয় ‘পিঙ্ক পিরিয়ড’। ১৯০৫ সাল থেকে যে ছবিগুলো আঁকছিলেন তিনি, তার অনেকগুলোতেই এসে যাচ্ছিল আয়তনময়তা ও তীক্ষ্ণ কৌণিকতার দিকে ঝোঁক। ১৯০৭-এ তিনি একটি ছবি আঁকলেন, যার শিরোনাম “Les Demoiselles d’ Avignon”. এই একটি ছবি, যা আধুনিকতাবাদের ইতিহাসে নতুন বাঁক এনেছিল। কিউবিজমের অগ্রদূত বলা যায় এই ছবিটিকে, কিন্তু সম্পূর্ণত এটি কিউবিস্ট ছবি নয়। ছবিটির প্রাথমিক কাজ পিকাসো শুরু করেছিলেন ১৯০৬-এর শরতে। প্রায় ন’মাস ধরে করেছিলেন কাজটি। ৮০৯টি প্রিলিমিনারি স্কেচ বা স্টাডি করেছিলেন এজন্য। তবু নাকি ছবিটি শেষ করতে পারেননি। অসম্পূর্ণই রেখে দিয়েছেন। কী দেখি আমরা এই ছবিতে? পাঁচটি নগ্নিকা নারীমূর্তি নিয়ে গড়ে উঠেছে এই রচনা। বাঁদিক থেকে প্রথম চারজন দাঁড়িয়ে। ডানদিকে একটি মূর্তি উপবিষ্ট অবস্থায়। ছবিটিকে, অনেকে বলেন, গণিকালয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। ছবিটির বাঁদিকের তিন নারীর মুখ গড়ে উঠেছে প্রাচীন ইবেরীয় ভাস্কর্যের আদলে। আর ডানদিকের দু’টি মুখে রয়েছে আফ্রিকার নিগ্রো ভাস্কর্যের সংক্ষুব্ধ গাঠনিকতা।

এই ছবিটির পর থেকেই পিকাসোর ছবির আঙ্গিকে আসতে থাকল গাঠনিকতা ও কৌণিকতা। তিনি ও জর্জ ব্রাক (১৮৮২-১৯৬৩) প্রায় একই সময়ে শুরু করেছিলেন আঙ্গিক নিয়ে এই পরীক্ষা নিরীক্ষা। কিন্তু দু’জনের দৃষ্টিকোণ ও জীবনবোধ ছিল আলাদা। পিকাসোর কিউবিজম আত্মগত সংক্ষুব্ধতা থেকে উৎসারিত। আর ব্রাকের, নৈর্ব্যক্তিক স্থৈর্য থেকে। ১৯১২ থেকে পিকাসো ও ব্রাক কিউবিজমের আঙ্গিককে আরও রূপান্তরিত করলেন। যে বিশ্লেষণাত্মক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল অ্যানালিটিক্যাল কিউবিজমের পর্যায়ে এবং তাতে যেভাবে বিমূর্তায়ন আসছিল, সেই প্রক্রিয়াটি আরও অগ্রসর হল। তাতে খবরের কাগজের টুকরো অংশ বা অন্য বস্তু সাঁটা হতে লাগল। ন্যারেটিভ ছাড়িয়ে তা হয়ে উঠছিল স্বকীয়, স্বরাট এক শিল্প-প্রক্রিয়া। এই পর্যায়ের নাম হল ‘সিন্থেটিক কিউবিজম’। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে শেষ হল কিউবিজম নিয়ে তাঁদের অভিযাত্রা। এরপর কিউবিজম ছড়িয়ে পড়ল অন্য শিল্পীদের মধ্যে। প্রায় সারা পৃথিবীতে পরিব্যাপ্ত হল।
কিউবিজমের এই বিশ্লেষণাত্মক রেখার ভাঙন নিয়েই পিকাসো ১৯২৫-’২৬-এর সুররিয়ালিস্ট পর্বে পৌঁছন। এর পাশিপাশি অন্তত দু’টি পর্বে পিকাসো তাঁর রেখায় ও আঙ্গিকে ধ্রুপদী বোধ বা ‘ক্লাসিসিজম’-এর সঞ্চার ঘটিয়েছেন। সন্ধান করেছেন আনন্দের। প্রেমের সঙ্গে ‘পরম’-কে মেলাতে চেষ্টা করেছেন। ইতিমধ্যে বিশ্বযুদ্ধের উন্মত্ততা, ফ্যাসিবাদের আস্ফালন পিকাসোর প্রেমকে মানবতায় সম্পৃক্ত করেছে। সাম্যবাদ ও মানবতাবাদ একাকার হয়ে গেছে। এই মানবতাই প্রগাঢ় প্রতিবাদের রূপ নিল ১৯৩৭-এর ‘গের্নিকা’ নামে ম্যুরালধর্মী ছবিতে। অন্যদিকে সেই ঐক্যের আহ্বানেই ১৯৪৪-এর আগস্টে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিলেন। বলেছেন, ‘এ আমার সারাজীবনের, সারাজীবনের কাজের যুক্তিযুক্ত পরিণতি।’ ইতিহাসের এই জটিলতম বা কঠিনতম সময়ে সবচেয়ে সহজ হয়েছেন পিকাসো। তাঁর রেখা হয়েছে সুললিত, লাবণ্যময়। ১৯৪১-এর ১৪ থেকে ১৭ জানুয়ারির কয়েকটি দিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতির আবহমণ্ডলে পিকাসো লিখেছিলেন ‘ডিজায়ার কট বাই দ্য টেইল’ নামে একটি নাটক। এর শেষদিকে ছিল এরকম দু’টি লাইন, শঙ্খ ঘোষের অনুবাদে যা পেয়েছি, ‘জ্বেলে দাও সব আলো। এসো আমাদের সব শক্তি দিয়ে বুলেটের দিকে ছুড়ে দিই পায়রার ঝাঁক’। শান্তির প্রতীক এই পায়রার ছবি পিকাসো এঁকেছিলেন ১৯৫২ সালে।

শিল্পকলায় পিকাসোর অভিযাত্রার পথ স্বভাবতই অনেক দীর্ঘ। একটি সীমিত শব্দের নিবন্ধে একে ধরা সম্ভব নয়। তাই আমরা এখানেই থেমে একটু বরং দেখে নিই পিকাসোর যে শেষ্ঠ অবদান কিউবিজম, তা আমাদের আধুনিকতায় কীরকম অভিঘাত সৃষ্টি করেছে।
ভারতে কিউবিজমের ঢেউ এসে পৌঁছতে সময় লেগেছে ১৯১৪-র পরে আরও একটি দশক। কিউবিজমে যে পার্স্পেকটিভ বা পরিপ্রেক্ষিত বিন্যাস-রীতি, সেটা আমাদের দেশের শিল্পে বহু আগে থেকেই ছিল। অজন্তায় বা মধ্যযুগীয় অনুচিত্রে দেখার এই দৃষ্টিকোণকে মিলিয়ে নেওয়ার যে পদ্ধতি, তার প্রচলন ছিল। স্টেলা ক্রামরিশ গগনেন্দ্রনাথ সম্বন্ধে লিখতে গিয়েও এ-কথা উল্লেখ করেছেন। তবে আমাদের আধুনিক যুগের ব্রিটিশ অ্যাকাডেমিক স্বাভাবিকতার ধারা বা নব্য-ভারতীয় ঘরানায় কিউবিজমের ছায়াপাত ঘটা সম্ভব নয়, এ-কথা বলাই বাহুল্য। অবনীন্দ্রনাথ ইউরোপীয় শিল্পকলা সম্পর্কে অনেকটাই অবহিত ছিলেন। কিন্তু কিউবজম তাঁকে খুব একটা আকৃষ্ট করেনি। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কথোপকথনে, একসময় তিনি একে কৌতুকচ্ছলে ‘কুব্জাইজম’ বলেছিলেন। কিন্তু এই শব্দটি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর বোধ ও সমালোচনা— দুটোই প্রকাশ করেছিলেন। কিউবিজম যে কৌণিকতার বিন্যাস ঘটায়, ‘কুব্জা’ কথার মধ্যে তার ইঙ্গিত থাকে। এবং এই কৌণিকতা সম্পর্কে তিনি যে খুব শ্রদ্ধাশীল নন, এ-কথাটাও পরিস্ফুট হয় এই শব্দ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে।
ভারতে কিউবিজমের চর্চা প্রসঙ্গে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশেষ উল্লেখযোগ্য। গগনেন্দ্রনাথ ১৯২২ সাল নাগাদ বা তার পরে যে ছবি করছিলেন, তাতে আলো-ছায়ার বিন্যাসে জ্যামিতিক তল বিভাজনের ইঙ্গিত দেখা যায়। এই তলের গঠনের মধ্যে কৌণিক ঋজুতারও প্রকাশ আছে। এই দু’টি বৈশিষ্ট্যের জন্য তাঁর এই ছবিগুলিকে ‘কিউবিস্ট’ বলে অনেকে মনে করেন। স্টেলা ক্রামরিশ গগনেন্দ্রনাথের ওপর একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন ‘অ্যান ইন্ডিয়ান কিউবিস্ট’ নামে। সেখানে তিনি গগনেন্দ্রনাথের ছবি প্রচলিত কিউবিজম থেকে আলাদা একটি প্রকাশভঙ্গি বলে মন্তব্য করেছিলেন।
পিকাসোর শৈশবে আঁকা প্রথম যে ছবিটির সন্ধান পাওয়া যায়, সেটি তাঁর ন’বছর বয়সে নভেম্বর ১৮৯০ সালে আঁকা। শিরোনাম শিল্পীই পরে দিয়েছেন ‘হারকিউলিস উইথ হিজ ক্লাব’। পিকাসো নিজে বলতেন শৈশবে তিনি আঁকতেন রাফায়েলের দক্ষতায়। তারপর সারাজীবন চেষ্টা করেছেন সেই স্বাভাবিকতাবাদ অতিক্রম করে শিশুর সারল্যে পৌঁছতে। ১৯০১ থেকে ১৯০৪ পর্যন্ত সময়কে বলা হয় পিকাসোর ‘ব্লু পিরিয়ড’। এই সময় তিনি বার্সেলোনা থেকে প্যারিসে প্রবাসী হন। ১৯০৪ থেকে ১৯০৬ সালের পর্যায়কে বলা হয় ‘পিঙ্ক পিরিয়ড’। ১৯০৫ সাল থেকে যে ছবিগুলো আঁকছিলেন তিনি, তার অনেকগুলোতেই এসে যাচ্ছিল আয়তনময়তা ও তীক্ষ্ণ কৌণিকতার দিকে ঝোঁক।
রবীন্দ্রনাথের ছবির অন্যতম উৎস ছিল আদিমতার উত্তরাধিকার। আদিমতার সূত্রেই এক্সপ্রেশনিজম দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছেন। কিউবিজম সম্পর্কে তিনি কৌতূহলী ছিলেন। কিন্তু কিউবিজমের বৌদ্ধিক বিশ্লেষণ তাঁর ছবিতে তেমনভাবে আসেনি। তবে কিউবিজমের মূল ভিত্তি যে জ্যামিতিকতা ও দৃঢ়বদ্ধ রেখার সংযোগে গড়ে ওঠা কৌণিক বিন্যাস, সেটা নানাভাবেই রবীন্দ্রনাথের ছবিতে এসেছে। শান্তিনিকেতনে কিউবিজমকে সম্যকভাবে আত্তীকৃত করেছিলেন রামকিঙ্কর। কিউবিজমের ঋজু জ্যামিতিকতা তাঁর ছবি ও ভাস্কর্যে এসেছে।
বিশ শতকের চারের দশকে প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত শিল্পীরা অনেকেই কিউবিজমের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন এবং একে ব্যবহার করেছেন। এফএন সুজা আদিমতার উত্তরাধিকার থেকে গড়ে তুলেছেন তাঁর প্রকাশভঙ্গি। সূত্রে তাঁর অবয়ব বিন্যাসে প্রভূতভাবেই এসেছে কিউবিজমের তলবিশ্লেষণ রীতি। চল্লিশের শিল্পীদের মধ্যে কিউবিজম যাঁদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে, পরিতোষ সেন তাঁদের অন্যতম। জাহাঙ্গির সাবাভালা, জে সুলতান আলি, সতীশ গুজরাল, রামকুমার প্রমুখ শিল্পীর ছবিতে কিউবিজমের নানা ধরনের ব্যবহার দেখা যায়। সোমনাথ হোরের ১৯৬০-এ করা ‘কমপেনিয়নস’ নামে তেলরঙের ছবিটিতে লৌকিকের সঙ্গে মিলিয়ে কিউবিজমেরও সূক্ষ্ম ব্যবহার ছিল। পরবর্তীকালে তাঁর ছাপচিত্র ও ভাস্কর্যে তিনি যে ‘ক্ষত’-র দর্শন রূপায়িত করেছেন, তার মধ্যে এসেছে দৃঢ়বদ্ধ কৌণিক বিন্যাস, সেখানে কিউবিজম একটি বিশেষ মাত্রা হিসেবে কাজ করেছে। ছয়ের দশকের এবং তার পরের অনেক শিল্পীই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিউবিজম ব্যবহার করেছেন। আমরা তার বিস্তৃত বিবরণে যাচ্ছি না।
এইভাবে পিকাসোর উত্তরাধিকার আমাদের দেশে শুধু নয়, সারা বিশ্বেই নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছে।



