ভাই উমর ও শার্জিল,
প্রথমে সোশাল মিডিয়ায় পরে সংবাদমাধ্যমে দেখলাম, তোমাদের জামিনের আবেদন ধর্মাবতাররা নাকচ করে দেওয়ার পর তোমরা বলেছ, অন্য যারা জামিন পেয়েছে তাদের জন্য তোমরা খুশি। আমি কিন্তু খুশি হতে পারিনি। তার দুটো কারণ।
১) একবার স্কুলফেরত, সদ্য দাড়িগোঁফ ওঠা আধসেদ্ধ স্বাধীনতাপ্রেমের আতিশয্যে, ভাগ্যগণনায় নিযুক্ত এক টিয়াপাখির খাঁচা খুলে দিয়েছিলাম মালিকটি আশপাশে নেই দেখে। টিয়াটা দৌড়ে কয়েক পা গিয়েছিল, কিন্তু উড়তে পারেনি। কারণ তার ডানাগুলো কাটা ছিল। তার মালিক মাটি ফুঁড়ে উঠে এসে আমায় কিছু কাঁচা খিস্তি দিয়ে, টিয়াটাকে নিয়ে গিয়ে আবার খাঁচায় ঢুকিয়ে ফেলেছিল। গুলফিশা ফতিমা, মীরন হায়দর, শিফা উর রহমান, মহম্মদ সেলিম খান আর শাদাব আহমেদের অবস্থাও ওই টিয়াটার মতোই। জামিনের শর্তগুলো দেখে তেমনই বুঝলাম। এককথায়, ঘরের বাইরে কোথাও তাঁদের মুখ খোলা বারণ। সচেতন, প্রতিবাদী মানুষের কাছে এ জিনিস কারাবাসের চেয়ে কম নয়। কী করে খুশি হব?
২) সোশ্যাল মিডিয়া আর সংবাদমাধ্যম মিলিয়ে তোমাদের দু’জনের আরও দুটো কথা চোখে পড়ল। উমর, তুমি বলেছ ‘অব ইয়হি জিন্দেগি হ্যায়।’ শার্জিল, তুমি কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের লাইন স্মরণ করেছ ‘দিল না-উম্মিদ তো নহিঁ, নাকাম হি তো হ্যায়/লম্বি হ্যায় গম কি শাম, মগর শাম হি তো হ্যায়।’ হিন্দি সিনেমার দৌলতে কোনও বাঙালির তোমাদের কথাগুলোর মানে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। সম্ভবত আমার বয়সের কারণেই, উমরের কথাটা তিরের মতো বুকে এসে বিঁধল। আমাদের বাংলা ভাষার সম্ভবত শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এক চরিত্রের মুখে বসিয়েছিলেন প্রশ্ন ‘জীবন এত ছোট কেনে?’ সেই ছোট্ট জীবনের পাঁচ-পাঁচটা বছর তোমাদের কেটে গেল জেলের চার দেয়ালের ভেতর। আমরা যারা বাইরে, তাদের জীবনে কত না সুখ-দুঃখ-বিষাদ-বৈচিত্র্য এল এই সময়ে! কতদিন ধরে কত ব্যয় করে কত দেশ ঘুরে দেখা হল! এতটা সময় আসলে কতটা সময় একজন মানুষের জীবনে, তা একবছর আগে চমৎকার বুঝিয়ে দিয়েছিলেন অভিনেত্রী স্বরা ভাস্কর। সে-কথা যে কিছুতেই ভুলতে পারছি না। কী করে খুশি হই?

আরও পড়ুন: মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ইতিহাসের ছক মেনেই ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ ট্রাম্পের! লিখছেন সৌরীশ ঘোষ…
উপরন্তু, জীবনের যে কোনও সময়ের পাঁচটা বছরের দাম তো সমান নয়। আমার বয়সে আর খুব নতুন কিছু ঘটে না পাঁচ বছরে। সন্তানদের বড় হতে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করা, তারা নড়বড় করতে করতে শেষমেশ দাঁড়িয়ে পড়ল দেখে পরম সন্তোষ লাভ করা, অথবা পারল না দেখে আমৃত্যু হতাশায় ডুবে যাওয়া ছাড়া বিশেষ কিছু আর করার থাকে না আমার মত ছাপোষা লোকের। কিন্তু যৌবন! আহা যৌবন! সে তো অনন্ত সম্ভাবনার সময়। পাগলের মত প্রেম করার সময়, হারকিউলিসের মতো গোটা দুনিয়াটা কাঁধে তুলে নিতে পারি— এই বিশ্বাসে নতুন কিছু, অভিনব কিছু করে ফেলার সময়। তোমাদের সেই যৌবনের পাঁচ-পাঁচটা বছর কেটে গেল গরাদের পিছনে! জানি তোমরা মেধাবী ছাত্র, মাঝেমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া আর অ-গোদি মিডিয়ার কল্যাণে খবরও পাই— এই মোবাইল ফোনবিহীন, কোলাহলহীন অবসর তোমরা ব্যবহার করছ মূল্যবান সব বই পড়তে। নিজেদের বুদ্ধিতে আরও শান দিতে। কিন্তু অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগাতে তো মানুষের মাঝে আসতেই হয়। তোমাদের সেই সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয়েছে, ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না কোনও শর্তেই। কী করে ভুলি? এই জানুয়ারির শীতে বাবা-মায়ের স্নেহের ওম, ভাইবোন আর বন্ধুদের আলিঙ্গনের উষ্ণতা, প্রেয়সীর ছোঁয়ার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না জেলের কম্বল। সে যতই মোটা হোক।
তোমাদের যৌবনের এক-একটা দিন কমছে আর আমাদের পাপের বোঝা বেড়ে চলেছে। বহু প্রাণের, বহু সম্মানের বিনিময়ে লালমুখো সাহেবদের দেশ থেকে বিদেয় করার প্রায় ৮০ বছর পরেও আমরা এমন এক দেশ গড়ে তুলতে পারলাম না যেখানে মাইক হাতে অন্য মানুষকে গুলি করতে প্ররোচনা দেওয়া অন্যায়। বরং আমরা এমন এক দেশ বানিয়ে তুলেছি, যেখানে তেমন লোক মন্ত্রী হয়। আর যারা তোমাদের মতো মহাত্মা গান্ধীর অহিংসার কথা বলে, ভগৎ সিংয়ের কথা বলে, ঘৃণার জবাব ভালবাসা দিয়ে দেওয়ার কথা বলে, অস্ত্রহীন প্রতিরোধের কথা বলে – তারা দিনের পর দিন জেলে পচে। কিছুতেই ভুলতে পারছি না, তোমাদের কারাবাসের কারণ কিছু করা নয়। কিছু বলা। ভগৎ সিং তবু একটা বোমা ফাটিয়েছিলেন, কিছু সশস্ত্র কার্যকলাপ করেছিলেন, ধরা না পড়লে নির্ঘাত আরও অনেককিছু করতেন। তাই ঔপনিবেশিক শাসকের তাঁকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করার সাম্রাজ্যবাদী যুক্তি বোধগম্য হয়। নকশাল আন্দোলনের পশ্চিমবঙ্গে স্বাধীন দেশের শাসক যাদের প্রাণে মেরে দিয়েছিল বা পঙ্গু করে দিয়েছিল, কিংবা অপারেশন কাগারে যাদের জীবন গেল, তাদের একটা অংশেরও না-হয় হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার ইতিহাস আছে। কিন্তু তোমরা তো হাতে বই ছাড়া কিছু ধরেছ বলে এমনকী আদালতেও অভিযোগ ওঠেনি। তোমাদের মস্তিষ্কের বিরুদ্ধে এই রাষ্ট্রীয় অবরোধ আমাকে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে শঙ্কিত করে। তবে কি তাদের বিদ্যাবুদ্ধি দেওয়ার চেষ্টা না করে জরদ্গব করে তোলাই ভাল?
ভাই শার্জিল, তুমি এই দীর্ঘ আশাহীন কারাবাসের পরেও কাব্যে বিশ্বাস রাখো, আশায় আশায় থাকো— জানতে পেরে ভাল লাগল। কিন্তু মাথায় পাকা চুলের সংখ্যা বাড়তে থাকলে বোধহয় আশাবাদ কমতে থাকে। তাই তোমাদের কারাবাস অন্তত আরও একবছর বেড়ে যাওয়ার আদেশ দেখে আমার ফয়েজের ওই দুরন্ত আশাবাদী পংক্তিগুলোর বদলে বেশি করে মনে পড়ছে শৌক বহরাইচির দুটো লাইন— ‘বরবাদ গুলিস্তাঁ করনে কো বস এক হি উল্লু কাফি থা/হর শাখ পে উল্লু বৈঠা হ্যায় অঞ্জাম-এ-গুলিস্তাঁ কেয়া হোগা?’ অর্থাৎ, গোটা ফুলের বাগান বরবাদ করতে একটা প্যাঁচাই যথেষ্ট ছিল, এখানে গাছে গাছে প্যাঁচা বসে আছে। তাহলে বাগানটার কী হাল হবে? আশা বলতে এটুকুই, যে তোমাদের দু’জনের বয়স স্ট্যান স্বামীর চেয়ে অনেক কম। তাই অন্তত বিগতযৌবন হয়ে হয়ত একদিন তোমরা বেরিয়ে আসতে পারবে। এদেশে চালু কথা হল, যা নাই ভারতে তা নাই ভারতে। অর্থাৎ এদেশে এমন কিছুই ঘটে না যার দৃষ্টান্ত মহাভারতে নেই। সেই মহাভারত বলছে, রাজা যযাতি অভিশাপে হারানো যৌবন ফিরে পেতে নিজের ছেলে পুরুর যৌবন নিয়ে নিতেও দ্বিধা করেননি। কোনও বাবা এমনটা পারেন? হয়তো পুরাণ-রচয়িতা বেদব্যাস আমাদের এই শিক্ষাই দিতে চেয়েছেন যে, রাজারা কখনও কারও বাবা হন না। কেবল রাজা হন। আজকের রাজা তোমাদের যৌবন হরণ করছেন। কিন্তু শেষমেশ ভোগে ক্লান্ত হয়ে পুরুকে যৌবন ফিরিয়ে দিয়ে তপস্যায় রত হওয়ায় যযাতির স্বর্গবাস হয়েছিল। এ-যুগের রাজাদের সে মহানুভবতা নেই।
সেজন্যই তোমাদের মতো খুশি হতে পারলাম না। উমর, তোমার বাবাকে দেখলাম কোনও কোনও সংবাদমাধ্যমে। তাঁকে দেখে মনে পড়ল রামায়ণ, মনে পড়ল বৃদ্ধ দশরথের কথা। হয়তো মনে পড়ত না, যদি আমার ভাষার কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, রাজনীতি করা এক ছেলের বাবার জবানিতে না লিখতেন, ‘ফেলে রেখে আমাকে বন্ধনে/মুক্তির লড়াই লড়বে বলে/ছেলে গেছে বনে।’ আমি ভাই আমার নিরুপায় নিরাশা নিয়ে তোমাদের বাবাদের পাশেই দাঁড়ালাম। এই লেখার সমস্ত শব্দ, আমার সব লেখার সমস্ত শব্দ মুছে দিলেও যদি ধর্মাবতাররা তোমাদের মুক্তি দিতেন, একমাত্র তাহলেই খুশি হতে পারতাম।



