ঠিক করলাম, গুজরাত যাব। একা। সঙ্গে একটি গাড়ি ও একজন চালক। সীমান্তে যাব তো বটেই, তবে ওয়াঘা-র দেখাদেখি গুজরাতের কচ এবং পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা ‘নাদাবেদ সীমান্ত দর্শন’ প্রজেক্টের অংশীদার হিসেবে নয়— যা কিনা ২৬ জানুয়ারি পর্যটকদের জন্য কুচকাওয়াজে সেজে ওঠে।
যাব অন্য কোনও সীমান্তের কাছাকাছি। সদ্য লড়ালড়ির গন্ধ বাতাসে অনুভব করতে। সেখানকার মানুষদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা শুনতে।
সফর-মেয়াদ বারোদিন। ড্রাইভার বোঝায়, “ক’দিন আগেই কচ্ছের এই সীমান্তে ড্রোন চালাচালি হয়েছে। এমনকী ভারতের সীমান্তের শেষ গ্রাম কুরাণ গ্রামেও ড্রোনও পড়েছে।”
আমি বলে উঠি, ‘ড্রোন পড়েছে? তবে কুরান গ্রামেই চল। আর এ তো যুদ্ধই নয়, এ তো টার্গেটেড অপারেশন।’
ড্রাইভার বলে, “টার্গেটেড অপারেশন তো ছিল ভারতের দিক থেকে। বরং চল, কচের সর্বোচ্চ পয়েন্ট ‘কালা দুঙ্গর’-এ নিয়ে যাচ্ছি। দূরবিনে ৪০ কিলোমিটার দূরে পাক সীমান্ত দেখে খুশি হয়ে ফিরে যাও।”
‘আরে দূরবিনে কুয়াশা ভরা কুরাণ গ্রাম দেখে মন ভরে নাকি!’
আরও পড়ুন: মার্কিন মুলুকের অন্দরে ড্রাগের সাম্রাজ্য!
লিখছেন তপশ্রী গুপ্ত…
আমায় নাছোড় দেখে অধৈর্য সে বলে, ‘বর্ডার-বর্ডার বলে এত অস্থির হচ্ছ, জ্যোতি মালহোত্রার মতো (ভারতীয় ইনফ্লুয়েন্সার, পাক গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ধৃত) কেউ কি না কে জানে বাবা! প্লেন-টিকিট নিয়ে পাকিস্তান চলে যাচ্ছ না কেন!’
তারপর আমি গটগট করে নেমে অন্য গাড়ির সন্ধান করছি দেখে সে বলে, ‘ম্যাডাম, জ্যোতি মালহোত্রার সঙ্গে আরও ১৩ জনকে এরেস্ট করেছে ভারত সরকার। আপনার কাছে পারমিট নেই। গুপ্তচর ভেবে বিএসএফ আপনাকে গুলি করে দেবে, মাঝখানে আমি ফেঁসে যাব। ১৫ বছর গাড়ি চালাচ্ছি, এমন জেদি যাত্রী তো আমি দেখিনি।’
২০২৫-এর মে মাসের ২৬ তারিখ। যাত্রা হল শুরু। কাশ্মীরে ২৬টি পরিবারের কর্তাকে গুলি করে সন্ত্রাসবাদীরা। তার প্রতিবাদে ভারত সরকার পাক-অধিষ্ঠিত সন্ত্রাসবাদীদের ঘাঁটিগুলো তাক করে তাদের সামরিক অভিযান ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ। মিলিটারি-এয়ারফোর্স-নেভি সেল-এর সম্মিলিত উদ্যোগে এই আক্রমণ। যে-মুহূর্তে ভারত তার চার সীমান্তকে আক্রমণে ব্যবহার করল, বহির্শত্রুর আক্রমণ আর কাশ্মীর সীমান্তে ‘কেন্দ্রীভূত’ রইল না। চার সীমান্তের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে গেল। পাক সীমান্ত চতুর্রাজ্যের মধ্যে কাশ্মীর, রাজস্থান, পাঞ্জাবের পর গুজরাতও একটি। পাঞ্জাবের ওয়াঘা-র মতো নয়। রাজস্থানের বেশিটাই মরু এলাকা। গুজরাটের সীমান্তে কচ্ছের রণ অঞ্চল। তাই সেই সীমান্ত পর্যটকদের জন্য উপযুক্ত নয়। সমুদ্র নুন বয়ে এনে ছড়িয়ে মুখ ঢাকে বালিতে। পিছল, নরম আর চোখধাঁধানো সাদায় পথ হারানোর সম্ভাবনা প্রবল।

সেনাবাহিনীর জন্যও এক দুষ্কর ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ। ৯৬ কিলোমিটার জুড়ে থাকা বিতর্কিত সীমানা ‘সার ক্রিক’— নোনা সাদা মরুজমি। কচ্ছের রণ-এর দুর্গম সীমান্ত, যেখানে রয়েছে বিএসএফ-এর কড়া পাহাড়া। তারপর শুধুই সমুদ্দুর। কাশ্মীর, রাজস্থান, পঞ্জাবের পশ্চিম সীমান্ত এখানে এসে শেষ হয়েছে।
কাশ্মীরের মতোই সন্ত্রাসবাদীরা এই কচ সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করতে ওঁত পেতে থাকে। আর মাছ ধরতে জেলেরা সমুদ্রের ‘লাইন অফ কন্ট্রোল’ পার হলে ভারতের জেলে কাটায় সারাজীবন। গুজরাতের কচ এলাকায় পাক ড্রোন পড়েছে প্রচুর, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম মোকাবিলা করেছে যথাযথ। রাজকোট ও ভুজের বিমানবন্দর ফৌজিদের অপারেশন-কালীন ব্যবহার ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার খাতিরে সিল করা হয়েছিল মাত্র সপ্তাহ দুই আগেই। কৃষ্ণসাম্রাজ্য দ্বারকা ও পাকিস্তানের মাঝে আরব সাগর। তাই গুজরাতের এই পাক সীমান্ত নুনে ভাসা-ভেজা মরুপ্রান্তর ও সমুদ্র-উপসাগর— দুই-ই জুড়ে।
ভুজে ভারতীয় মিলিটারির এয়ারফোর্সের শক্তপোক্ত ঘাঁটি। আমাদের রাস্তায় পড়ল বিএসএফ-এর ৮৪ ব্যাটেলিয়নের আমরাপুরের রাস্তা। সাইনবোর্ড বলছে ‘আমৃত্যু কর্তব্য।’
যাত্রার প্রাক্কালে আত্মীয়দের আত্মঘাতী হতে বারণ করা হোয়াটসঅ্যাপে উপচে পড়ছিল মেসেজ। আমার অবসরপ্রাপ্ত মিলিটারি ডাক্তার দিদি, যাঁকে কলকাতা দূরদর্শনের সাক্ষাৎকারের জন্য ভারত সরকার মুখপাত্র হিসেবে পাঠানো হয়, তাঁর সবুজ সংকেত পেলাম। যদিও জানাল, ‘কোনও ভরসা নেই।’ সেসব দোনামনা অগ্রাহ্যে করেই উড়ল আমার আহমেদাবাদের বিমান। এমনই দিনে যেদিন যুদ্ধের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথমবার গুজরাতে শোভাযাত্রায় আসছেন ভাদোদারা, ভুজ, গান্ধীনগর, দাহোদে।
গুজরাটের বহু সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁকে অভিবাদন জানাতে এসেছেন কর্নেল সোফিয়া কুরেশির মা-বাবা ও বোনও। বিমানবন্দরে নেমেই দেখলাম, ট্রলিগুলো সাজানো রয়েছে গোল করে সুটকেস তোলার সুবিধের জন্য। বিমানবন্দরের বাইরে প্রধানমন্ত্রীর জন্য বিশাল গেট বানিয়ে সাজানো।
এমন এক সময়ের আঁচ নিতেই গুজরাত সফরটি অন্যমাত্রিক হয়ে উঠল।

তার পরের গন্তব্য— উরি। গুজরাতে ল্যান্ডিং-রত বিমান আকাশে থাকাকালীনই দেখছি বহু ড্রোন ঘুরছে আকাশে। বিমানবন্দরের পাশেই মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট। খাটো বাড়িগুলোর মাথায় ঘুরছে চাকা। কোনও সিগন্যালের কারণে হবে হয়তো। এদিকে বাতাসে গুজব যে, পাকিস্তানের কিরানা টিলায় রেডিয়েশন লিকে বমি ও পেটখারাপে ভুগছিলেন গ্রামবাসীরা। যদিও পিটিআই-কে দেওয়া বিবৃতিতে এ-খবর নস্যাৎ করে দিয়েছে আইএইএ-র মুখপত্র। তবু গুঞ্জন, ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জি এয়ারক্রাফ্ট, যা ফুকুশিমার পারমাণবিক বিপদ-কালীন দৃশ্যমান হয়েছিল এবং মিশরীয় ফৌজি বিমান ‘বরণ কেমিক্যাল’ বয়ে এনেছে, যা সচরাচর তেজস্ক্রিয় সক্রিয় নির্গমনকে সংযত করতে ব্যবহৃত হয়। আমেরিকার পরিবেশ প্রতিরক্ষা সংস্থা এই সন্দেহগুলো অমূলক জানালেও পরমাণু অস্ত্র-পরীক্ষাগারে অণুকণা ছড়ানোয় যৎসামান্য প্লুটোনিয়ামের সংসর্গের জনজীবনের ওপর পরার সম্ভাবনা স্বীকার করে নিয়েছে।
এতসব দ্বিধা পিছনে রেখে আমরা ‘কালা দুঙ্গর’ থেকে ১৫ মাইল এগিয়ে দ্রোবানা ও কোটরা গ্রাম পার হয়ে এলাম খাবড়া-ভিঘাকোট হাইওয়ের ইন্ডিয়া ব্রিজের সামনে। ব্রিজের শেষে ১২ কিলোমিটার পর ধর্মশালা। পাক সীমান্তের কাছে বলে সেতুর শুরুতেই বড় সাইনবোর্ডে লেখা যে, ‘সেলফোন নিয়ে যাওয়া চলবে না। কোনও ছবি ও ভিডিও আইনত নিষিদ্ধ।’ এখান থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে রয়েছে বিরিয়াবেট ধর্মশালা, হনুমান মন্দির ও শহিদ স্মারক। সেখান থেকে কচ জেলার আন্তর্জাতিক সীমান্তের প্রথম চেকপয়েন্টের শুরু। ব্রিজ শুরুর আগেই বাঁদিকে খাবড়া গ্রামকে পিছনে ফেলে ডানদিকে আরেকটু এগিয়ে ভারত সীমান্তের শেষ গ্রাম কুরাণ গাঁও। কুরাণ গ্রামের পরেই ভারতের তরফে সীমান্তরক্ষী দাঁডিয়ে। লাইন অফ কন্ট্রোলের শুরু ব্রিজ থেকে। ওপারে পাকিস্তান সীমান্ত। মাঝখানে বিশাল ৪০ কিলোমিটার কচ্ছের রণ অঞ্চল। তারপরই বিওপি বা বর্ডার অফ পাকিস্তান। খাবড়া ও কুরাণ গ্রামের খোঁজে আসা সার্থক। ইন্ডিয়া ব্রিজের মুখেই এখানকার জনপ্রিয় ’অ্যামেজিং কুচ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ড্রোনের ছবির বিশদ বিবরণ গ্রামবাসীরা দেখাল। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে খুবই উত্তেজিত তারা। কিন্তু ছবি তোলার তো উপায় নেই। দু’জন গ্রামবাসী-কে গাড়িতে নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে এসে ড্রোনটি দেখতে পেলাম। একটুকরো সীমান্ত-বিতণ্ডার চিহ্ন প্রত্যক্ষ করা গেল।

সেখান থেকে গেলাম কোটেশ্বর মন্দিরের কাছে পাকিস্তানের আরেকটি সমুদ্র সীমান্তে। সামনেই দেখলাম রয়েছে বিএসএফ-এর ‘ফার্স্ট লাইন অফ কন্ট্রোল’। কিছু দূর গিয়ে আরেকটি সীমান্তের শেষ গ্রাম ‘লাখপত’। সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে, আড়াই মাইল দূরে বিওপি. অর্থাৎ ‘বর্ডার অফ পাকিস্তান’। কেউ নেই চারপাশে, শুধু খাঁ খাঁ ভাঙা লাখপত দুর্গ।
অপারেশন সিঁদুরের আগে মোটরসাইকেল নিয়ে ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এর কাছে যাওয়া যেত। এখন খুব কড়াকড়ি, জানাল দু’টি কিশোর।
‘বড়লোক ছাড়া গরিবের কাছে কেউ বিয়ে দেয় না এই গ্রামে। গরিবরা পশ্চিমবাংলা থেকে বিয়ে করে মেয়ে নিয়ে আসে।’
ছেলেটি বলল, ‘আমার মা বাঙালি। কলকাতা রেলকলোনি থেকে আমার মাকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে আমার গুজরাতি মুসলমান বাবা। দু-বছর পর পর আমরা মামাবাড়ি যাই।’
‘হোয়াইট ডেজার্ট’ এবং ‘রোড টু হেভেন’-এর স্বর্গীয় শুভ্রদৃশ্যের মাঝে এগিয়ে চলছে গাড়ি। দোলাভিরায় হরপ্পা সভ্যতার সামনে দাঁডিয়ে। এখান থেকেও ৪০ মাইল দূরে পাহাড়ের ওপারে পাকিস্তান। চুপ করে ভাবছি, হয় যুদ্ধ নয় বন্যা ও ভূমিকম্পের সামনে কত সভ্যতাই নিশ্চিহ্ন হয়েছে কতবার!
ড্রাইভারের কথায় বিকল মন সচল হল। সকাল থেকে ইতিহাস খুঁজে ছুটছ! ইতিহাস তো মহান, কিন্তু মূক। তবে বধির নয়। সেকেন্দার আসে, সেকেন্দার যায়। নিজের মর্জিমাফিক ইতিহাসের নামে গপ্প লেখে তারা। ইতিহাস শুধু তা চুপচাপ শুনে যায়।




