প্রথমে একটা কঠিন কথা মেনে নিয়ে বাকি কথা শুরু করি। আমরা যারা আটের দশক ও তৎপরবর্তী সময়ে ধেড়ে হয়েছি, তারা আসলে কিছুই দেখিনি। আমরা এক পাতা ভাস্কর, দু’পাতা কাফকা, তিন পাতা হাংরি কপচে ভেবেছি অনন্তলায়েক হয়ে গেছি। পাড়াতুতো ক্যালাকেলি বা বড়জোর পোলিং বুথে বোমাবাজি ছাড়া আমরা কোনও যুদ্ধ দেখিনি, দেশভাগ দেখিনি। আকাশ থেকে আচমকা বারুদ উড়ে এলে গ্রামের পর গ্রাম কীভাবে উজাড় হয়ে যায়, সেসব কিচ্ছু দেখিনি।
মুশকিল হল, এই ‘দেখিনি’-র পরিধি দিয়ে ‘জানি না’ মাপা যায় না। আমি জাপানও দেখিনি, আমি মাধুরীকেও দেখিনি। তাই বলে সেসব কি নেই? অবশ্যই আছে, যে যার জায়গায় আছে। সেটা কীভাবে জানি? কারণ, জানার পিছনে নির্দিষ্ট পড়াশোনা ইত্যাদি প্রথামাফিক বিষয় আছে। উঁহু, বলা উচিত, ছিল। পড়াশোনা, বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি, বা কোনও প্রাজ্ঞ মানুষের সঙ্গে আলোচনা করা— এসব এখন মূর্খামি। আগে আমাদের পক্স হত, কলেরা হত; এখন আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া হয়। ভাত জুটুক, না-জুটুক, ডেটা যেন বাড়িতে বাড়ন্ত না হয়। ফলে, গত এক-দেড় দশকে তাবৎ গণপিণ্ড সবাই সব জানে; সব বোঝে। হোয়াটসঅ্যাপ আর ফেসবুক স্ক্রল করে-করে আমরা হয়ে গিয়েছি যুদ্ধের বিষয়ে বিশ্বপণ্ডিত— ওটা তো সোফায় কাত হয়ে টুঁই টুঁই সুইচ টিপে ভিডিও গেম খেলার মতো ব্যাপার! ভাবখানা এরকম, এই যুদ্ধটা ভাল্লাগেনি? ঠিক আছে, রিমোট হাঁকরে চ্যানেল ঘুরিয়ে অন্য যুদ্ধ দেখব!
ভিডিও গেম হোক বা যুদ্ধ— দু’টি বিষয়েই আমার খুব একটা আগ্রহ নেই। কিন্তু, যখন জানতে পেরেছিলাম, শ্রীরাম রাঘবনের পরবর্তী সিনেমার বিষয় ১৯৭১ সালের বসন্তরের যুদ্ধ, যেখানে শহিদ হয়েছিলেন ভারতের কনিষ্ঠতম পরম বীর চক্র প্রাপক, সেকেন্ড লেফটেনেন্ট অরুণ ক্ষেত্রপাল— তখন নড়েচড়ে বসেছিল আমার মতো কুঁড়েও। কারণ, শ্রীরামের স্টুডেন্ট ফিল্ম ‘দ্য এইট কলাম অ্যাফেয়ার’ (১৯৮৭) আর ডকু-ড্রামা ‘রমণ রাঘব’- সমেত (১৯৯১) তাঁর সম্পূর্ণ ফিল্মোগ্রাফির একনিষ্ঠ দর্শক হিসেবে অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে, এতদিনে তিনি তাঁর স্বাচ্ছন্দ্যের উঠোন ছেড়ে বেরোবেন; মানে, অন্য জঁরের কাজ করবেন। বলতে দ্বিধা নেই, কৌতূহল কিছুটা স্তিমিত হয়েছিল ‘ইক্কিশ’-এর ট্রেলার দেখে। সঙ্গোপনে দু’একজন বন্ধু কথা চালাচালিও করেছিলাম, তবে কি শেষমেশ ইনিও ব্রুটাস!
আরও পড়ুন: গিগ-কর্মীদের কেন শ্রমিকের মর্যাদা দেয়নি রাষ্ট্র?
লিখছেন রোদ্দুর মিত্র…
মোটামুটি যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি নিয়ে ঢুকেছিলাম সিনেমাহলে। কারণ, এক: এ-বছর পৌষ শুধু ডাক দেয়নি, রীতিমতো হাঁকডাক দিয়েছে। আর, দুই: ইদানীংকালে হলে, বিশেষত কলকাতার হলে গিয়ে সিনেমা দেখা কোনও যুদ্ধের থেকে কম কিছু নয়। চতুর্দিক থেকে রিংটোন, ক্যাঁওম্যাঁও, চিপসের বেলুন, ও বোনাস হিসেবে আধঘণ্টা দেরিতে ঢোকা আন্ডাবাচ্চা-সহ সুখী পরিবারগণ এড়িয়ে একাগ্র চিত্তে পর্দায় মনোনিবেশ করা এবং কান পেতে সংলাপ শুনতে চেষ্টা করা প্রায় গ্রেনেড আর মাইন টপকে হেঁটে যাওয়ারই মতো।
সিনেমা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঁদ হয়ে গেলাম কাহিনিতে। কাহিনি এই ছবির সম্পদ; যে-কাহিনি কষ্টকল্পিত নয়; জমকালো চোখ-ধাঁধানো সেট আর গা-গরম ডায়লগ নয়; যে-কাহিনি বাস্তবিক ঘটেছে। ‘ফিল্ম উইদিন ফিল্ম’-এর মতো এখানে রয়েছে দুটো কাহিনির পরত। অরুণ ক্ষেত্রপালের (অগস্ত্য নন্দা) তারুণ্য-গাথা এখানে আছে ফ্ল্যাশব্যাকে। গল্পটা আসলে ঘটছে তাঁর বাবা, প্রাক্তন ব্রিগেডিয়ার মদন লাল ক্ষেত্রপালকে (ধর্মেন্দ্র) ঘিরে; যিনি ২০০১ সালে পাকিস্তানে তাঁর ফেলে আসা পুরনো কলেজে গিয়ে, আতিথ্য নেন সেখানের প্রাক্তন ব্রিগেডিয়ার মহম্মদ নাসিরের (ফিল্মে চরিত্রের নাম মহম্মদ নিসার, অভিনয়ে জয়দীপ অহলাবত) বাড়িতে। গত ৩০ বছর ধরে নিসার আত্মদগ্ধে পুড়ছেন। কারণ, তাঁর হাতেই প্রাণ দিয়েছেন ২১ বছরের অরুণ। স্ত্রী মরিয়ম (একাবলী খন্না) ও কন্যা সাবার (অবনী রাই) বার বার বারণ সত্ত্বেও, শেষমেশ মদন লালের কাছে সেই সত্য কবুল করেন নিসার। [মজার ব্যাপার, ফিল্মে সাবা তাঁর বাবা ও মদন লালের দিন তিনেকের সফর ও কথোপকথন একটা হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরায় রেকর্ড করতে থাকেন; এবং, বাস্তবে অবনী নিজেও তাঁর বাবা, বিদগ্ধ ফটোগ্রাফার রঘু রাইকে নিয়ে ডকুমেন্টারি বানিয়েছেন।]

আমরা যারা গদিতে গা এলিয়ে ভুট্টাভাজা আর চাট্টি ঢেঁকুর-ঢেউ গিলে ‘জুদ্দু-জুদ্দু’ খেলা দেখতে অভ্যস্ত; যারা আশা করেছিলাম তথাকথিত শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে-করতে, গুহামানবের লুক নিয়ে, দু’হাতের কুড়িটা বন্দুক থেকে বমির মতো আগুন ওগরাতে-ওগরাতে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেবে মহামহিম নায়ক; আর, আমরা তুমুল হাততালি দিয়ে জাতীয় সংগীত গাইতে-গাইতে মাত করে দেব ফেসবুক— তারা অবসাদে ডুবে গেলাম এই কাহিনি দেখে। এমনকী, ধর্মেন্দ্র একবারও দাঁত কিড়মিড় করে বললেন না, ‘কুত্তে, কামিনে, ম্যায় তেরা খুন পি জাউঙ্গা!’ উলটে, তিনি বিহ্বল জয়দীপকে ক্ষমা করে দিলেন; শতাব্দী-প্রাচীন একাকী বৃক্ষের গায়ে হাত রেখে বললেন, ‘এই গাছটাও কত গুলি খেয়েছে, তবুও সবুজ দাঁড়িয়ে আছে!’ আবার এও বললেন, ‘যুদ্ধ একমাত্র তখনই থামবে, যখন আমরা থামব!’ ছিঃ ছিঃ! এ আবার কীসের বাস্তব! গাঁটগচ্চা দিয়ে যুদ্ধের সিনেমা দেখতে এসে এমন শীতলতা আমাদের পৌষকেও হার মানিয়ে দিল।
হ্যাঁ, দর্শক হিসেবে হার মানতে বাধ্য হলাম শ্রীরাম রাঘবন ও তাঁর লেখক টিমের কাছে। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, যুদ্ধ আসলে কী? শত্রুপক্ষ আর সৈন্যের জবরজং ইউনিফর্মের ভেতরে থাকা মানুষটার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারা কি একজন সৈন্য ওরফে মানুষের কাজ নয়? যুদ্ধের সময়ে যথানির্দেশ আক্রমণ হানা অথচ জয়ে বা পরাজয়ে আনত হওয়া কি একজন সৈন্য ওরফে মানুষের কাজ নয়? বছর দুয়েক আগে একটা সাক্ষাৎকারে চিত্রনাট্যকার-পরিচালক অরিজিৎ বিশ্বাস বলেছিলেন, ‘একটা ভাল ‘ওয়ার ফিল্ম’ সেটাই, যেটা ‘অ্যান্টি-ওয়ার।’ ঠিক সেই কাজটাই করেছে ‘ইক্কিশ’। বরাবরের মতো এবারও কোনও গিমিক-জাতীয় মার্কেটিংয়ের অস্ত্র নেননি শ্রীরাম। বরং, মেইনস্ট্রিম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে থেকেই চুপচাপ এমন একটা ঘটনা তিনি মেলে ধরেছেন আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে, যা এখনকার রাজনৈতিক-সামাজিক পটভূমিতে চূড়ান্ত বিরল। এবং, সোশ্যাল মিডিয়ায় গত কয়েকদিনের কাওতালি দেখলে প্রত্যয় না হয়ে কোনও উপায় নেই যে, তাঁর উদ্দেশ্য সফল। মানুষ হয় এই কাহিনির চূড়ান্ত বিরোধিতা করছে, অকথ্য গালিগালাজ করছে; নয়তো, এই সিনেমার বক্তব্যকে সমর্থন করছে। এই আলোচনার দিকে খেয়াল রাখলে হয়তো স্পষ্টতর হবে কোন অন্ধকূপের অতলে ক্রমশ এগিয়ে চলেছি আমরা।

এই সিনেমা আমাদের নতুন করে শেখায় সহমর্মিতার কথা। শেখায়, পেশায় বা জীবিকায় যে যেমনই হোক— সে ততক্ষণ প্রতিযোগী, যতক্ষণ প্রতিযোগিতা চলছে। প্রতিযোগিতা থামলে, একটু হাত রেখো তার কাঁধে; ঘাম মোছার জন্য একটা গামছা এগিয়ে দিয়ো; বাড়ি পৌঁছে খবর দিতে বোলো। একজন ভারতীয়কে আশ্রয় দেওয়ার কারণে যখন নিসারের গাড়ির পিছু নেয় তাঁর দেশেরই গুপ্তচর, আর মদন লাল সতর্ক করতে চান তাঁকে— কাঁধ ঝাঁকিয়ে মৃদু হাসেন নিসার, ‘ওরা ওদের কাজ করছে, করতে দিন।’ দৃশ্যের পর দৃশ্য এভাবেই এগোয়, যা প্রায় অরণ্যের মতো দার্শনিক; যা খুব আটপৌরে সাবলীল; অথচ যেন চোখে গোঁত্তা মেরে কেউ কিছু বলছে না। অশীতিপর পিতামহ যেমন সদ্য-কিশোরের মাথায় আলতো আঙুল বুলিয়ে বলে যান জীবনের বহু গূঢ় বোধ।
শ্রীরামের অন্যান্য সিনেমার মতো এখানেও ছড়িয়ে আছে পুনে শহরের অতীত আর পুরনো সিনেমার স্মৃতিমালা। অরুণের প্রেমিকা, কিরণ (সিমর ভাটিয়া) পড়তে ভালবাসেন। দু’জনের প্রথম আলাপ হয় Irma la Douce সিনেমাটা (১৯৬৩) দেখতে গিয়ে। তারপর দেখা হয় পুনের এক সময়ের ল্যান্ডমার্ক ম্যানি’স বুক স্টোরে, যেটা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। কিরণ আর অরুণের সম্পর্ক গাঢ় হয় আর্নেস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাস ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’-কে (১৯৪০) ঘিরে, যেখানে যুদ্ধকে বীরত্বের বুদবুদে না ঢুকিয়ে সেটা নিয়ে কাটাছেঁড়া করেছেন লেখক। ঠিক সেভাবেই ‘ইক্কিশ’ কোথাও অস্বীকার করেনি যে, যুদ্ধের কোনও প্রয়োজন নেই— কিন্তু, পাশাপাশি ক্রমাগত জারণ করেছে যুদ্ধের ফলস্বরূপ মৃত্যু আর ধ্বংসলীলার বিষ কেমন বয়ে চলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
রামগোপাল বর্মা তাঁর একদা-জনপ্রিয় ও বহু বছর যাবৎ অবলুপ্ত ব্লগে লিখেছিলেন, আমরা যেমন জীবনের কিছু ঘটনা কিছু মুহূর্ত মনে রাখি, সেরকমই সিনেমারও কিছু মুহূর্ত মনে রাখি। এই সিনেমায় তেমন দুটি মুহূর্তে স্বর্গীয় জাদু দেখিয়েছেন আসগর (আসরানি) আর জাহাঙ্গীর (দীপক ডোব্রিয়াল)। পুরনো বন্ধু আসগরের সঙ্গে যখন দেখা হয় মদন লালের, আর মদন লাল তাঁর চির-লাজুক হাসিতে জানান তিনি ভারত থেকে এসেছেন, জানতে চান কৈশোরের প্রথম প্রেম হুসনার [পাঠক, পীযূষ মিশ্র-র গানটা মনে পড়ছে?] কথা— কেমন আছে সে, কোথায় আছে— আসগর কিছুতেই মনে করতে পারেন না, ভারত আলাদা দেশ হল কবে! তাঁর অ্যালঝাইমার’স আক্রান্ত মস্তিষ্কে শুধু জেগে আছে ছোটবেলার বন্ধু; তাঁর দিশাহারা দৃষ্টিতে কাঁটাতারের মতোই অর্থহীন বয়স্ক বন্ধুর বলিরেখা। আর, যুদ্ধে পা খোয়ানো জাহাঙ্গীর যখন হম্বিতম্বি করেন যে, এখুনি এই রাত্রেই ওই শত্রু ভারতীয়কে বের করে দিতে হবে এলাকা থেকে— কারণ, ভারতীয়দের সঙ্গে যুদ্ধ করেই তিনি আজ পঙ্গু— আর, ক্রোধে উন্মাদ জাহাঙ্গীর যখন এক পায়ে ভারসাম্য রাখতে পারেন না, আর মদন লাল ছুটে এসে বুকে জাপটে ধরেন তাঁকে, ফিসফিস করে বলেন, যুদ্ধে খুইয়েছেন তিনি নিজের ছেলেকে— জাহাঙ্গীর স্তব্ধ হয়ে যান। পরদিন, বিদায়বেলায় ‘খুদা হাফিজ’ বলতে এসে বিড়বিড় করেন তিনি; সামরিক অভ্যাসে একটা স্যালুট ঠুকতে গিয়ে অর্ধেক ভঙ্গিমায় কেঁপে ওঠে তাঁর হাত।
শ্রীরামের অন্যান্য সিনেমার মতো এখানেও ছড়িয়ে আছে পুনে শহরের অতীত আর পুরনো সিনেমার স্মৃতিমালা। অরুণের প্রেমিকা, কিরণ (সিমর ভাটিয়া) পড়তে ভালবাসেন। দু’জনের প্রথম আলাপ হয় Irma la Douce সিনেমাটা (১৯৬৩) দেখতে গিয়ে। তারপর দেখা হয় পুনের এক সময়ের ল্যান্ডমার্ক ম্যানি’স বুক স্টোরে, যেটা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। কিরণ আর অরুণের সম্পর্ক গাঢ় হয় আর্নেস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাস ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’-কে (১৯৪০) ঘিরে, যেখানে যুদ্ধকে বীরত্বের বুদবুদে না ঢুকিয়ে সেটা নিয়ে কাটাছেঁড়া করেছেন লেখক। ঠিক সেভাবেই ‘ইক্কিশ’ কোথাও অস্বীকার করেনি যে, যুদ্ধের কোনও প্রয়োজন নেই— কিন্তু, পাশাপাশি ক্রমাগত জারণ করেছে যুদ্ধের ফলস্বরূপ মৃত্যু আর ধ্বংসলীলার বিষ কেমন বয়ে চলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
এই সিনেমার দুটো টেকনিক্যাল দিক খানিক দুর্বল লেগেছে। এক, এডিটিং। দুই, মিউজিক। কোনও-কোনও দৃশ্য হয়তো ছোট হতে পারত। যেমন, ১৯৭১ সালে মদন লালের ভূমিকায় ধর্মেন্দ্রকে না দেখালেও হত; তাতে কাহিনির কোনও ক্ষতি হত না। বরং, আমরা যারা আপামর ভারতীয় ওই সময়ের টানটান সুপুরুষ হি-ম্যানকে দেখেছি, তারা পরচুলা পরা আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারা ধর্মেন্দ্রকে দেখে হয়তো একটু বিমর্ষই হলাম। আবার, যে-দৃশ্যে নাসির আত্ম-রোমন্থন করতে-করতে ২০০১ সাল থেকে ফ্ল্যাশব্যাকে চলে আসেন ১৯৭১-এ [দৃশ্যকে না বদলে সময় নিয়ে বলের মতো লোফালুফি করা সম্ভবত শ্রীরামের প্রিয় খেলা এবং এ-খেলায় তিনি ওস্তাদ; আগ্রহীদের জন্য রেফারেন্স: ‘বদলাপুর’ (২০১৫)], সেখানে বর্তমান লুকের জয়দীপের সামনে দিয়ে অতীত লুকের জয়দীপের হেঁটে যাওয়াটা অতিরিক্ত মনে হয়েছে। সংগীতের ক্ষেত্রে, গানগুলো ভাল, কিন্তু আলাদাভাবে ভাল। সিনেমার মুডের সঙ্গে গানগুলো মেশেনি। এবং, গানগুলো একত্রিত হয়ে ১৯৭০-’৭১ বা ২০০১-এর কোনও মেজাজ তৈরি করেনি।
যুদ্ধের দামামাতে কোনও অহমিকা নেই, রিক্ততা আছে। আছে মহাশূন্য মাঠের বুকে অজস্র ক্ষত বুকে নিয়ে একটা মহাবৃক্ষের অক্ষত জেগে থাকা। আমরা আদৌ কখনও থামব বা থামব না, জানি না। কারণ, প্রাণী হিসেবে আজকের মানুষ, হোমো সেপিয়েন্সের নিয়তিই হল খুনোখুনি করা। পাঠ্যপুস্তকের বাইরের ইতিহাস জানে, অতীতের মানুষ নিয়ান্ডারথাল খুন হয়েছে এই সেপিয়েন্সেরই হাতে। তবে, ‘ইক্কিশ’-এর এই কাহিনিতে হয়তো আমাদের মধ্যে কারও-কারও গলার কাছে দুমড়ে উঠবে ব্যথা— যখন শুনব, ‘তেরা আশিক পাগল হোকে/মেরে জ্যায়সা দিখতা হ্যায়…’। মেহফিলে দু’জন শিল্পী গানটা যখন গাইছেন, সেখানে উপস্থিত রয়েছেন দুই পিতা— মদন লাল আর নিসার। একটা চরিত্র সন্তানহারা, আরেকটা চরিত্র অনুতাপে পুড়ছে ধিকধিক। আর, যে-কোনও সন্তানের প্রথম প্রেমিক তো বাবা-ই— যে-মানুষটার সেই প্রেম আমাদের এই পুংদণ্ডিত সভ্যতায় সারাজীবন অনুচ্চারিত, অব্যক্ত থেকে যায়।
আমি জানি না, গানের কথা কী ভেবে লেখা হয়েছে; সেটা জানতেও চাই না। কারণ, ‘কবি কী বুঝাইতে চাহিয়াছেন’ জাতীয় শিক্ষাপর্ষদের প্রশ্নে আমার আশৈশব অনীহা। বরং, এই গানেরই আরেকটা লাইনের অর্থ আমার কাছে যা হয়ে উঠেছে, সেটাই বলি। ‘দেখো উলটে লফজোঁ সে ও/ সিধি বাতেঁ লিখতা হ্যায়…’। আকীর্ণ বদ্ধ ঘৃণার চাষভূমে, যা অনন্তকাল শুনেছি— ‘ওরা উলটো দিক দিয়ে লেখাপড়া করে’ বা ‘ওরা উলটো দিকে মুখ করে প্রার্থনায় বসে’— ওই কয়েকটা স্নিগ্ধ শব্দে যেন রাখা হয়েছে সেটারই উত্তর। উলটোই হোক, তবু তা পাঠ; তবু তা প্রার্থনা। কারণ, ঠিক যেটা নিসার বলেছেন, ‘খুদা কবে কীভাবে কার দুয়া কবুল করেন, কেউ তা জানে না।’ ঈশ্বর বলে আসলে কেউ কোথাও যদি থাকেন, তিনি নিশ্চয়ই জানেন, জাত-ধর্ম-সীমান্তের অনেক অনেক ওপরে ‘খুদা হাফিজ’ আর ‘রব রাক্খা’ একই আবেগ বোঝায়।




