আমি বড় হয়ে উঠেছিলাম এক সরস পরিবেশে। গোস্বামীরা রসচর্চা করতে ভালবাসতেন। আমার ঠাকুরদা পরিমল গোস্বামী, বাবা হিমানীশ, জ্যাঠামণি শতদল—এঁরা সকলেই রসিক ছিলেন। এঁদের মধ্যে পরিমল গোস্বামী একটা গাম্ভীর্যের আবরণে
নিজেকে ঢেকে রাখতেন। হাসির কথা বললেও ভারি পরিমিতিবোধ ছিল তাঁর, উদারভাবে হাসতে তাঁকে কম দেখেছি, একচিলতে হাসি কোনওরকমে মুখে লেগে থাকত। অথচ সেই মানুষটি তাঁর লেখায় পরিহাস, কৌতুক, হাস্যরসের পশরা সাজিয়ে রাখতেন।
আমার বাবার কথা বলতে গেলে মনে পড়ে যায় তাঁর হাসিমাখানো মুখটি। কৌতুকভরা চোখদু’টি জানান দিত যে, মনের মধ্যে সঞ্চিত রসাধারে ক্রমাগত পাক দেওয়া চলছে। সেই রসের স্বাদ লেগে থাকত তাঁর বলা কথায় এবং লেখায়। কথায়-কথায় Pun সৃষ্টি করা— সোজা কথার উল্টো মানে আবিষ্কার করে মজা সৃষ্টি করা ছিল তাঁর কাছে অতি সহজ ব্যাপার। যে-কোনও পরিস্থিতিকে খানিকটা মজার ছোঁয়ায় ভরিয়ে দিতে না পারলে তাঁর মন ভরত না। স্বস্তি পেতেন না। দৈনন্দিন তুচ্ছ বিষয়গুলিও তাঁর রসিকতার আওতা থেকে বাদ পড়ত না। হিমানীশ রসিক মানুষের সঙ্গ পছন্দ করতেন। রসবোধহীনদের বরাবর এড়িয়ে চলতেন। চারপাশে হাসির অভাব দেখলে তাঁর ভারি দুশ্চিন্তা হত।
সেই কোন ছোটবেলায় দাদা শতদলের সঙ্গে শিবরাম চক্রবর্তীর বাড়িতে যেতে শুরু করেন। তারপর দুই ভাই শিবরামের স্নেহভাজন হয়ে ওঠেন। বাড়িতে দাদাঠাকুরের যাওয়া-আসা ছিল। স্নেহ পেয়েছেন তাঁরও। এই দুই রসিকের ভক্ত হয়ে
উঠলেন দিনে দিনে। শিবরাম চক্রবর্তীও হিমানীশের লেখা পছন্দ করতেন। হিমানীশের একটি লেখা শিবরাম চক্রবর্তী তাঁর ‘চেঞ্জে গেলেন হর্ষবর্ধন’ বইতে সংকলিত করেন। তিনি লিখেছেন— “এই সংকলনের একটি গল্প ‘বাড়ি কিনলেন হর্ষবর্ধন’ তরুণ লেখক হিমানীশ গোস্বামীর। আমার হর্ষবর্ধনদের নিয়ে লেখা তাঁর এই গল্পটি ‘টেক্কা’ নামে একটি হাসির পত্রিকায় আমার চোখে পড়ে। পড়তেই টের পাই, এই এক লেখাতেই তিনি আমার যাবতীয় স-হর্ষ কাহিনিকে টেক্কা মেরেছেন। এমন গল্প অবহেলায় তোমাদের পাতে না পড়ে অপ্রকাশিত থাকে, সেটা আমার ভালো লাগেনি, তাই তাঁর অনুমতি নিয়ে লেখাটি আমার গল্প সংগ্রহে সংযুক্ত হলো।” এই স্বীকৃতি হিমানীশের সারাজীবনের গর্বের বিষয় ছিল।

আরও পড়ুন: হিমশীতল রসিকতা ও নিরীশ্বরবাদে গড়া ছিলেন হিমানীশ গোস্মামী!
লিখছেন আশীষ লাহিড়ী…
ছ-সাত বছর বিলেতে কাটিয়ে দেশে ফিরে এলেন হিমানীশ। স্বভাবে কোনওরকম সাহেবিয়ানা দেখা গেল না। বেকন, হ্যাম দিয়ে তৈরি ইংলিশ ব্রেকফাস্ট এবং পান্তাভাত একইরকম তৃপ্তির সঙ্গে খেতে দেখেছি তাঁকে। বিলেতে ভারতীয় বায়ুসেনা
বিভাগে করণিকের চাকরি করতেন। দেশে ফিরে নানা জায়গায় কাজ করেছেন। হেলায় উচ্চপদের চাকরি ছেড়েছেন। এইভাবে ছ-সাতবার চাকরি বদল করেছিলেন। বেকার অবস্থায় ভারি খুশি থাকতেন, কারণ ওই সময়ে ছবি আঁকার এবং লেখার
অঢেল সময় পাওয়া যেত। জীবনে চাহিদা কম ছিল। একটু বেপরোয়া ভাব ছিল। আমার মায়ের ওপর ভরসা ছিল যে, তিনি কোনওমতে ঠিক সংসারটি চালিয়ে নিতে পারবেন। আমি ইস্কুলে ভর্তি হতেই রাতারাতি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিলেন খরচ কমানোর জন্য। প্রতিদিন প্রায় পনেরোটা সিগারেট খেতেন তার আগে। নেশা ছিল দু-তিনটি— বই কেনা, ছবি তোলা, দাবা খেলা আর বাজার করা। নিজের হাতে রান্নাও করতেন মাঝে মাঝে। একবার বেগুনের আচার তৈরি করে সবাইকে অবাক করে দিলেন। তবে যেবার শুঁটকি মাছ রান্না করার চেষ্টা করেছিলেন সেবার পরিমল গোস্বামী বলেছিলেন— আমাকে ক’দিন হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে দে তোরা!
আমার সঙ্গে আমার বাবার ছিল বেশ বন্ধুত্বের সম্পর্ক। তাই বলে শাসন থেকে বঞ্চিত ছিলাম, তেমনটি নয়। আমার কোনও ভাই-বোন ছিল না— সঙ্গী ছিলেন বাবা । আমিও সুযোগ পেলেই বাবার সঙ্গে লেপ্টে থাকতাম। কাছাকাছি থেকে দেখতাম চিনে কালিতে কলম ডুবিয়ে অনায়াসে হাতে তৈরি কাগজের ওপর জ্বলজ্বলে ছবি ফুটিয়ে তুলছেন। আপন মনে লিখছেন— লিখতে-লিখতে মৃদু হাসছেন।

জীবজন্তুর প্রতি টান ছিল বাবার। বাড়িতে বেড়াল পোষা হত। তাদের বাহারি কত নাম। পুরন্দর আচার্য, বিচিত্রবীর্য, চিত্রাঙ্গদা, হিটলার, মুসোলিনি— আরও কত কী! চিড়িয়াখানায় প্রায়ই যাওয়া হয়, এমনকী, কার্জন পার্কের ইঁদুরদেরও বিস্কুট খাওয়াতে যেতাম বাবার সঙ্গে। বন্যপ্রাণীদের নিয়ে তৈরি ইংরেজি সিনেমা বাদ পড়ত না। নানা জায়গায় বেড়াতে ভালবাসতেন। বেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ছবি তুলতেন, গাছপালা, পাথর চেনাচেনা। তাঁর ক্যামেরায় অবশ্য বহু বিশিষ্ট জনের ছবিও ধরা পড়েছে।
আমাদের বাড়িতে কথায়-কথায় মজা সৃষ্টি হত। যেমন,
কলকাকলি— (জলের) কল থেকে জল পড়ার আওয়াজ
কর্দম— (কর=হাত+দম=জোর) হাতের জোর, হস্তশক্তি
গোবেচারা— গরু বেচে যারা। গরু ব্যবসায়ী।
দলিত— দলের চাপে পিষ্ট
নিকেশ— কেশহীন, চুল নেই এমন, টাকগ্রস্ত
অ্যালকোলাহল— মত্ততাজনিত কোলাহল
দাবানল— ইনজেকশন সিরিঞ্জ (হিন্দিতে দাবা মানে ওষুধ আর বাংলা নল)
দমকল— রুগীর রেসপিরেটর
মালকোষ— ওয়াইন সেলার
ডিভোর্স— নিরস্ত্রীকরণ
বা গো-স্বামী
পরে এই সব কথা একজায়গায় করে বাবা একটি উদ্ভট অভিধান বই বের করেন। পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় আমাকে ‘উগ্রপন্থী’ বলে ডাকতেন— তার কারণ আমি নাকি আমার মুখস্থ বিদ্যা প্রতিবার পরীক্ষার খাতায় উগরে দিতাম। আমার ছেলে কম ওজন নিয়ে জন্মেছিল বলে বাবা সবাইকে বলে বেড়ালেন, ‘আমার একটি নাতিদীর্ঘ নাতি হয়েছে!’
জীবজন্তুর প্রতি টান ছিল বাবার। বাড়িতে বেড়াল পোষা হত। তাদের বাহারি কত নাম। পুরন্দর আচার্য, বিচিত্রবীর্য, চিত্রাঙ্গদা, হিটলার, মুসোলিনি— আরও কত কী! চিড়িয়াখানায় প্রায়ই যাওয়া হয়, এমনকী, কার্জন পার্কের ইঁদুরদেরও বিস্কুট খাওয়াতে যেতাম বাবার সঙ্গে। বন্যপ্রাণীদের নিয়ে তৈরি ইংরেজি সিনেমা বাদ পড়ত না। নানা জায়গায় বেড়াতে ভালবাসতেন। বেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ছবি তুলতেন, গাছপালা, পাথর চেনাচেনা। তাঁর ক্যামেরায় অবশ্য বহু বিশিষ্ট জনের ছবিও ধরা পড়েছে।
আমাদের পদবি গোস্বামী। একবার একজন ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন— আপনারা কি বৈষ্ণব? আদ্যন্ত নাস্তিক হিমানীশ সুযোগ পেলেন ভদ্রলোককে বিভ্রান্ত করার। বললেন, ‘আমরা বৈষ্ণব, তবে কিনা একটু অন্যরকম বৈষ্ণব। বানান আলাদা। বইsnob!’ আমাদের নিজেদের লেখা বই সম্বন্ধে আমাদের বেজায় snobbery আছে! রাম-রাবণের ধাঁধা বলে সবাইকে অবাক করে দিতেন। দু’টি কাজের কথা বলতে হবে, যা একজন পারে অপরজন পারে না। উত্তর হল, রাবণ কোরাস গাইতে
পারে, রাম পারে না, আবার রাম পাশ ফিরে শুতে পারে, রাবণ পারে না।
আমার মায়ের মৃত্যুর পর বাবার পক্ষে একা সিঁথির বাড়িতে থাকা সম্ভব হল না। সিঁথির বাড়ির বিপুল বইয়ের সম্ভার ফেলে রেখে ঢাকুরিয়ার ছোট ফ্ল্যাটে এসে উঠলেন। তবে কোনও অবস্থাতেই মনে খুশির অভাব ছিল না। বললেন, ছোটবেলায় ফরিদপুরের রতনদিয়া গ্রামের খোলা প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতাম— তারপর শহরে এসে জায়গা ক্রমে ছোট হতে লাগল আর এই ফ্ল্যাট হল গিয়ে চটি, লোকে মহাপ্রস্থানের পথে যেতে চটিতে থাকে। ক্যান্সার হয়েছে শুনে ভারি নিশ্চিন্ত গলায় বললেন— যাক তাহলে মারা যাওয়ার একটা জুতসই কারণ পাওয়া গেল। আজকাল কত লোক বিনা কারণে মারা যাচ্ছে। ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে চাননি। সে-সময়ে তাঁর একটি চোখের দৃষ্টি সম্পূর্ণ হারিয়েছে— অপরটিতে রয়েছে কুড়ি শতাংশ। সেই অবস্থাতে টানা দশ বছর ঢাকুরিয়ার ফ্ল্যাটে সম্পূর্ণ একা থেকেছেন। একেবারে আন্দাজে লিখেছেন অজস্র রসরচনা, এঁকেছেন কার্টুন। দুরারোগ্য ব্যাধি, অন্ধত্ব, একাকিত্ব— কোনওকিছুই তাঁকে কাবু করতে পারেনি। কমেডিয়ান গ্রাউচো মার্ক্সের ভক্ত ছিলেন, তাই নিজেকে ‘মার্ক্সিস্ট’ বলতেন। আর গ্রাউচোর কথা ধার করে বলতেন— ‘Whatever it is— I am against it!’

ঢাকুরিয়ার ফ্ল্যাটে প্রতি সপ্তাহে বন্ধুরা আসতেন। আড্ডা দিতেন। সে-আড্ডাকে বলা হত মনের লন্ড্রি! মনের সকল গ্লানি নাকি সেখানে এলে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়। তাঁর জীবনের শেষ দেড় বছর কেটেছে একটি নার্সিংহোমের একফালি ঘরে। বিছানা থেকে ওঠার ক্ষমতা আর নেই তখন। তবু কাউকে কখনও নিজের কষ্টের কথা বলেননি। যাঁরা আসতেন, তাঁদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই গল্প করেছেন। রেডিও ছিল তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী। সারা পৃথিবীর খবর রাখতেন তিনি। কোনও আলোচনায়
শুনেছিলেন, গাঁজা ক্যান্সারের যন্ত্রণা খানিকটা উপশম করতে পারে। শেষ দু’দিনের অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে দু-একবার দাদাঠাকুরের গানের লাইন বলেছেন, ‘খাব গাঁজা করব মজা!’
একেবারে শেষ সময় সেবিকা বলেছে, ‘বাবু এবার ঠাকুরের নাম করো।’ উত্তরে বলেছেন, ‘রবি ঠাকুর ছাড়া আর কোনও ঠাকুরের নাম আমি জানি না।’


