আলোর হিসেব

SN Bose

তরঙ্গ? না কি কণা? এই দোলাচলে ভরা অণু-পরমাণুর ভুবন। অন্তত আমাদের স্থূল জগতের নজরে তাই মনে হয়। আসলে অণু-পরমাণুর সূক্ষ্ম জগতের বস্তুগুলো তরঙ্গও নয়, কণাও নয়। কিন্তু আমাদের স্থূল জগতের অভিধানে জাগতিক মৌলিক উপাদান বোঝানোর জন্য তরঙ্গ আর কণা ছাড়া অন্য কোনও শব্দ নেই। আমাদের কাছে ইলেকট্রন-প্রোটনের মতো জিনিসগুলো হল কণা, আর আলো অথবা শব্দ হল তরঙ্গ। একটির পরিসর সীমিত মাপের, অন্যটি অনেক বেশি ব্যাপ্ত। কিন্তু আমরা যখন আমাদের স্থূল যন্ত্রপাতির সাহায্যে সূক্ষ্ম জগতে আড়ি পাতি, তখন ইলেকট্রনের মতো জিনিস মাঝে মাঝে ঢেউ হিসেবে ধরা দেয়। আবার আলোর আচরণও কোনও কোনও ক্ষেত্রে কণার মতো ঠেকে।  

গত শতকের প্রথম দিকে পদার্থবিদরা সূক্ষ্ম জগতের এইসব কাণ্ডকারখানা দেখেশুনে বেকুব বনে গিয়েছিলেন। এর আগে পর্যন্ত কণা এবং তরঙ্গের হিসেব ভিন্ন ধরনের ছিল। কণার জগতের ঘটনাগুলো বোঝার জন্য উনিশ শতকের শেষে তলব পড়েছিল রাশিবিজ্ঞানের (স্ট্যাটিস্টিক্স) সূত্রের। ধরা যাক, একটি ঘরে ধূপকাঠি জ্বালানো হল। সেখান থেকে বেরনো ধোঁয়ার কণাগুলো কীভাবে সারা ঘরে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়বে, অথবা ধোঁয়ার কণাগুলোর শক্তি কীভাবে বন্টিত হবে, এইসব হিসেব করার জন্য সংখ্যায়ণের নিয়ম ব্যবহার করা হয়েছিল। এবারে যখন আলোর ক্ষেত্রেও কণার কথা ভাবার প্রসঙ্গ এল, তখন বোঝা যাচ্ছিল না, ঠিক কীভাবে এই হিসেবটা করা দরকার।

একটি লোহার টুকরোকে গরম করলে সেটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, আমরা জানি। এর অর্থ, সেটি আলো বিকিরণ করে। এক্ষেত্রে আলোর কণাগুলোর মধ্যে শক্তি কীভাবে ভাগাভাগি হচ্ছে, তা বোঝা যাবে সেই আলোর বর্ণালি থেকে। দেখা গিয়েছিল যে, গরম লোহার টুকরো থেকে বেরনো আলোর কণাগুলোর মধ্যে শক্তির বন্টনের হিসেব সাধারণ কণার মতো করলে বর্ণালির সঙ্গে মিলছে না। আরেকভাবে বলা যায়, আলোর তরঙ্গকে কণা হিসেবে ধরলে সেগুলোর গোনাগুনতি কীভাবে করা দরকার, এই নিয়ে ভাবনায় পড়েছিলেন পদার্থবিদরা।

আরও পড়ুন: উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বাতাস দূষিত হওয়া কি এদেশে এখন স্বাভাবিক?
লিখছেন সম্পূর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়…

আসলে পুরনো নিয়মে ভাবার অভ্যেস ছাড়তে পারছিলেন না বিজ্ঞানীরা। একটি লোহার টুকরো গরম করলে যখন আলো ছড়ায়, তখন সেই লোহার মধ্যে থাকা অণু-পরমাণু কীভাবে আলোর কণা তৈরি করে, সেই প্রসঙ্গ এসে পড়ছিল তাঁদের হিসেবে। সেখানে ছিল পুরনো দিনের আলোর তরঙ্গের ধারনার আভাস। অর্থাৎ, সাবেকি পদার্থবিদ্যার সূত্রগুলো কাজ করে না জেনেও সেগুলোকে সরিয়ে রাখতে পারছিলেন না তাঁরা। মোট কথা, একটা জোড়াতালি দিয়ে হিসেব করার চেষ্টা চলছিল।

আলো কণা না তরঙ্গ, তাই নিয়ে বিতর্ক চলেছে বহুদিন

এই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ অধ্যাপকের কথা চমকে দিয়েছিল সবাইকে। সে ছিল আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগের কথা। সত্যেন্দ্রনাথ বসু তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন। এই বিষয়ের নতুন প্রবন্ধগুলো তাঁর নজরে পড়ছিল। উঁচু ক্লাসে সেই বিষয়ে পড়ানোর সময় তাঁর মাথায় খেলে গিয়েছিল এক নতুন আইডিয়া। যে আধুনিক এবং সোজাসাপটা কথা শুনে স্বয়ং আইনস্টাইনও চমকে উঠেছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসু জানালেন যে, আলো কণার গণনার প্রসঙ্গে, সেটি কীভাবে তৈরি হয়েছে— সেই খবরের দরকার নেই!

তাঁর মতে গরম বস্তু থেকে বিকিরিত আলোর বর্ণালি বুঝতে গেলে শুধু আলোর কণার স্ট্যাটিস্টিক্স ঠিকমতো করলেই চলবে। ঠিকমতো বলতে তিনি যা বুঝিয়েছিলেন, তা হল এই: আলোর কণাগুলো একটি অন্যটির থেকে আলাদা করে চেনার উপায় নেই। সেগুলোকে রাম-শ্যাম, যদু-মধু— এভাবে আলাদা করা যায় না, কারণ আলোর কণাগুলোর ক্ষেত্রে সবার ‘নাম’ এক। ধূপকাঠি থেকে বেরনো ধোঁয়ার কণা কিন্তু সেরকম নয়। সেগুলোকে গোনার সময় আলাদাভাবে হিসেবে ধরতে হয়। সত্যেন বসু বলেছিলেন যে, আলোর কণার হিসেবটা আলাদা। এদের ক্ষেত্রে সর্বনামেই কাজ চলে। নামমাহাত্ম্য বলে কিছু নেই আলোর কণার জগতে।

অ্যালবার্ট আইনস্টাইন


একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধে হবে। ধরা যাক, তিনটি বাক্সে ‘ক’ এবং ‘খ’ এই দুটো কণা রাখতে হবে। একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে যে, মোট ৯ উপায়ে আমরা এই দুটো কণা তিনটে বাক্সে বসাতে পারি। ছবিতে সেগুলো এভাবে দেখানো যেতে পারে—        

 বাক্স ১বাক্স ২বাক্স ৩
ক খ  
 ক খ 
  ক খ
 
 
 
 
 
 

এবারে দেখা যাক, সত্যেন বসু আলোর কণার হিসেব কীভাবে করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন আলোর কণাগুলোকে আলাদা করে চেনা যায় না। ‘ক’ এবং ‘খ’, এরকম নাম দেওয়া যায় না এদের। সবগুলোই একরকম। তাই তিনটি বাক্সে আলোর কণা সাজানোর ধরন হবে নীচের সারণির মতো:

 বাক্স ১বাক্স ২বাক্স ৩
ক ক  
 ক ক   
  ক ক  
ক   
 ক  
 ক  

ব্যস, আর কিছুর দরকার নেই। এবারে সহজ হিসেব করলেই গরম বস্তুর থেকে ছড়ানো আলোর বর্ণালি কেমন হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। আশ্চর্য রকমের সোজা হিসেব সেটা! আমরা জানি, যে কোনও এক বিশেষ তাপমাত্রায় রাখা বস্তুর একটা বিশেষ রং থাকে। যেমন, লোহার টুকরোকে কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে গরম করলে সেটির রং হবে কমলা। অর্থাৎ, কমলা রঙের আলোর কণার প্রাধান্য থাকে সেই আলোয়। নীল আলো অথবা লাল আলোর কণাও থাকবে, কিন্তু সেগুলোর সংখ্যা হবে তুলনায় কম। মনে রাখা দরকার, বিভিন্ন রঙের আলোর শক্তি আলাদা। এর অর্থ হল, আলোর কণার মধ্যে শক্তি বন্টনে বৈষম্য থাকে। নীল রঙের আলোর শক্তি বেশি, কিন্তু সেগুলোর সংখ্যা কম। লাল আলোর কণার শক্তি কম, এবং সেগুলোর সংখ্যাও কম। কিন্তু মাঝারি শক্তির কমলা রঙের আলোর কণার সংখ্যা তুলনায় বেশি। দেখা গিয়েছিল, সত্যেন বসুর সহজ নিয়মে বিভিন্ন রঙের আলোর সংখ্যার কম-বেশির তথ্য ঠিক ধরা পড়েছে! এবং এর মধ্যে পদার্থবিদ্যার পুরনো আর নতুন নিয়মের কোনও টানাপোড়েন নেই। রয়েছে শুধু একটি নিয়ম: আলোর কণাগুলো একটির থেকে অন্যটিকে আলাদাভাবে চেনা যায় না।

সত্যেন বসুর প্রবন্ধটি আইনস্টাইন জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে জার্নালে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেই প্রবন্ধে তিনি একটি দুই লাইনের ফুটনোট লিখে দিয়েছিলেন। এক অসাধারণ ফুটনোট ছিল সেটি। তাতে অনুবাদকের মন্তব্য হিসেবে আইনস্টাইন লিখেছিলেন যে, তাঁর মতে বসুর অঙ্কটি সূক্ষ্ম জগতের অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এক বিশাল পদক্ষেপ। এবং এর সূত্র ধরে গ্যাসের কোয়ান্টাম তত্ত্ব সম্পর্কে তিনি আরও নতুন তথ্য পেয়েছেন, যা অন্য প্রবন্ধে তুলে ধরবেন। এমন একটা ফুটনোট ক’জনের ভাগ্যে জোটে! তাও ইউরোপের বাইরে একটি পরাধীন দেশ থেকে কারও লেখা প্রবন্ধের ফুটনোট বলে কথা।         

পরে জানা গিয়েছিল, শুধু আলো নয়, বেশ কিছু কণাও এই নিয়ম মেনে চলে। সেগুলোর নাম রাখা হয়েছিল ‘বোসন’, যে নামকরণের উৎস বুঝিয়ে দিতে হয় না। মহাবিশ্বে আরেক ধরনের কণা রয়েছে, যেগুলোর আচরণ খানিকটা অন্যরকমের। সেগুলো আবার পাশাপাশি থাকতে চায় না। অর্থাৎ, ওপরের উদাহরণে কোনও একটি বাক্সে দুটো কণা একসঙ্গে রাখা যাবে না সেক্ষেত্রে। ইলেকট্রন হল এই ধরনের কণা। ফলে সেগুলো সাজানোর ধরন খানিকটা আলাদা। এদের নাম ‘ফার্মিওন’।

সত্যেন বসুর নির্ধারিত নিয়মের বাধ্য ‘বোসন’ কণার একটি বৈশিষ্ট্য আইনস্টাইনের হিসেবে ধরা পড়েছিল, যার আভাস তিনি তাঁর ফুটনোটেই দিয়েছিলেন। তিনি লক্ষ করেছিলেন যে, সুযোগ পেলে বোসন কণাগুলো ঘনিষ্ঠ হয়ে থাকা পছন্দ করে। একবার আমাদের উদাহরণের প্রথম সারণির দিকে নজর দেওয়া যাক। সেক্ষেত্রে দুটো কণা একই বাক্সে রয়েছে এমন ঘটনা ঘটেছে তিনবার, আর আলাদা বাক্সে থাকার ঘটনা ঘটেছে ছ’বার। অর্থাৎ, এদের একসঙ্গে থাকার সম্ভাবনা হল ন’বারের মধ্যে তিনবার, অথবা ৩৩.৩%। কিন্তু আলোর কণার ক্ষেত্রে দুটো কণা একই বাক্সে রয়েছে তিনবার এবং আলাদা বাক্সে রয়েছে তিনবার। অর্থাৎ, এদের একসঙ্গে থাকার সম্ভাবনা হল মোট ছ’বারের মধ্যে তিনবার, অথবা ৫০%। আগের তুলনায় বেশি। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, পাশাপাশি থাকার প্রবণতা সাধারণ কণার তুলনায় বেশি।

সত্যেন বসুর প্রবন্ধটি আইনস্টাইন জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে জার্নালে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেই প্রবন্ধে তিনি একটি দুই লাইনের ফুটনোট লিখে দিয়েছিলেন। এক অসাধারণ ফুটনোট ছিল সেটি। তাতে অনুবাদকের মন্তব্য হিসেবে আইনস্টাইন লিখেছিলেন যে, তাঁর মতে বসুর অঙ্কটি সূক্ষ্ম জগতের অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এক বিশাল পদক্ষেপ। এবং এর সূত্র ধরে গ্যাসের কোয়ান্টাম তত্ত্ব সম্পর্কে তিনি আরও নতুন তথ্য পেয়েছেন, যা অন্য প্রবন্ধে তুলে ধরবেন। এমন একটা ফুটনোট ক’জনের ভাগ্যে জোটে! তাও ইউরোপের বাইরে একটি পরাধীন দেশ থেকে কারও লেখা প্রবন্ধের ফুটনোট বলে কথা।

তবে এদের কাছাকাছি আনার জন্য অনুকূল পরিবেশ দরকার। প্রথম সারণিটি ছিল ক্লাসিক্যাল হিসেবের কণার জন্য। সেক্ষেত্রে কণা শুধু কণা হিসেবেই ধরা দেয়। কণা এবং তরঙ্গের দোলাচলে পড়তে গেলে বিশেষ পরিবেশ চাই। কেমন সেই পরিবেশ? যখন কণাগুলোর ছোটাছুটি কম হবে, তখনই সেগুলো কাছাকাছি আসতে পারবে। এবং সেই পরিবেশেই কণাগুলোর মধ্যে তরঙ্গভাবও ফুটে উঠতে পরে। কোনও কণা তরঙ্গরূপে বিস্তৃত হলেও তার ব্যাপ্তির একটা সীমা থাকে। কণাগুলো পরস্পরের থেকে বহু দূরে থাকলে সেই বিস্তৃতিও তুলনায় কম মনে হবে। ফলে সেক্ষেত্রে কণাগুলোর তরঙ্গ-ভাবের তুলনায় কণা-ভাবই বেশি করে পরিস্ফুট হবে। কিন্তু তাপমাত্রা কম হলে কণাগুলোর মধ্যে ছোটাছুটি কমে আসবে। তখন কাছাকাছি আসার সুযোগ থাকবে। এবং তখনই একটির তরঙ্গের বিস্তৃতির সঙ্গে অন্যটির গায়ে গা লেগে থাকার অবস্থা তৈরি হবে।

সেই অবস্থায় বোসন কণাগুলোর মধ্যে জড়াজড়ি করে ঘনিষ্ঠ হয়ে থাকার প্রবণতা যে বেড়ে যায়, তা আইনস্টাইন বুঝতে পেরেছিলেন। সত্যিই এমনটা ঘটে কি না, তা অবশ্য পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব ছিল না তখন। কারণ এর জন্য যে হিমশীতল তাপমাত্রার দরকার, তা তৈরি করার যন্ত্রপাতি ছিল না সেই সময়। সত্যেন বসু এবং আইনস্টাইনের এই ভবিষ্যৎবাণী বিজ্ঞানীরা প্রায় ৭০ বছর পর, ১৯৯৫ সালে, পরীক্ষা করে দেখতে পেরেছিলেন। সেই তিন বিজ্ঞানীকে (এরিক কর্নেল, উওলফগাং কেটার্লি, কার্ল ওয়াইম্যান) ২০০১ সালে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বসুর পাঠানো সেই অসাধারণ প্রবন্ধটির ফলশ্রুতি ছিল এই গবেষণা। আজ যখন মহাবিশ্বের অর্ধেক কণার প্রসঙ্গে আমরা তাঁর নাম উচ্চারণ করি, তখনও একশো বছর আগেকার এক বাঙালি বিজ্ঞানীর সহজ অথচ দুঃসাহসী ভাবনার কথাই প্রতিধ্বনিত হয়।