জীবনের শেষপ্রান্তে এসে রবীন্দ্রনাথ ‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থের ‘জন্মদিন’ কবিতাতে লিখেছেন, ‘রবিপ্রদক্ষিণপথে জন্মদিবসের আবর্তন/ হয়ে আসে সমাপন।/ আমার রুদ্রের/ মালা রুদ্রাক্ষের/ অন্তিম গ্রন্থিতে এসে ঠেকে/ রৌদ্রদগ্ধ দিনগুলি গেঁথে একে একে।/ হে তপস্বী, প্রসারিত করো তব পাণি/ লহো মালাখানি।’
জীবন সায়াহ্নে উপনীত কবির কাছে এক অন্য আঙ্গিকে ধরা দিয়ে যান বৈদিক দেবতা ‘রুদ্র’। যাঁকে শুক্ল যজুর্বেদে, বাজসেনীয় সংহিতায় ‘বিশেষণ’ হিসাবে বলা হচ্ছে ‘শিব’, কখনও ‘গিরিশ’, কখনও-বা পিনাকপাণি ‘কৃত্তিবাস’। বিশেষত, এই পর্বেই সাপের সঙ্গে চলে আসছে রুদ্রের বা তাঁর বিশেষায়িত রূপ ‘শিব’এর সম্বন্ধ।
শুক্ল যজুর্বেদে একটি মন্ত্রে মেলে, ‘…যে বা সূর্যস্য রশ্মিষু।/ যে ষামপসু সদসকৃতং তেভ্যঃ সর্পেভ্যো নমঃ।’ (১৩.৮) যার মানে, যে-সর্পগণ সূর্যের রশ্মিতে বর্তমান, যে-সর্পগণ জলে বা অন্তরীক্ষে অবস্থান তাঁদের নমস্কার করি। লক্ষণীয়, এখানে কিন্তু সর্বত্র বিরাজমান সর্প কোনওরূপ সরীসৃপ নন। বরং, সূর্যের কিরণের মতো সর্পদেবতা রুদ্রের ভূষণ। কারণ, ‘সৃপ’ ধাতুর মূল অর্থ গমন করা বা এগিয়ে যাওয়া।
হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যের মতে, ‘যা সর্পণশীল বা গতিশীল তাই সাপ। সূর্যাগ্নির গতিশীল কিরণই সর্প। কিরণরূপী সর্পই পরবর্তীকালে সরীসৃপরূপে শিবের ভূষণ হয়েছে।’
আরও পড়ুন: বৃক্ষের সঙ্গে শিবের যৌন সম্পর্ক! যে-কথা উঠে আসে পুরাণে…
এখান থেকে মধ্যযুগীয় বাংলার লোকায়ত শিবঠাকুরের সঙ্গে সাপের সম্পর্ক একেবারেই ভিন্ন। সেখানে সাপ হয়ে ওঠে তাঁর বসনের একটি উজ্জ্বল নমুনা। নানাভাবে মনসামঙ্গলের কবিদের মধ্যে দিয়ে পরবর্তীর মুকুন্দ চক্রবর্তী, রামেশ্বর ভট্টাচার্য কিংবা ভারতচন্দ্র রায় হয়ে শাক্ত পদাবলী বা কালীঘাট পট থেকে বর্তমান জয়নগর মজিলপুরের মাটির মূর্তিতে ধরা দেন তিনি। সেখানে, বিশেষ করে মঙ্গলকাব্যের কবিরা দেখিয়েছেন— গ্রাম্য চরিত্রের একজন বেদে, বিশেষ করে অনার্য সম্পর্কিত বেদে-দলের নেতা হচ্ছেন ‘শিবঠাকুর’। অন্নদামঙ্গলে সরাসরি বলা হয়েছে, ‘কেহ বলে ঐ এল শিব বুড়া কাপ।/ কেহ বলে বুড়াটি খেলাও দেখি সাপ।।’ আরও ভাল বর্ণনা মেলে মুকুন্দ চক্রবর্তীর লেখায়, ‘চরণে নূপুর সর্প সর্প কটিবন্ধ।/ পরিধান ব্যাঘ্রচর্ম দেখি লাগে ধন্ধ।।/ অঙ্গদ বলয়ে সাপ সাপের পইতা।/ চক্ষু খেয়ে হেন বরে দিলাম দুহিতা।।/ গৌরীর কপালে ছিল বাদিয়ার পো।/ কপালে তিলক দিতে সাপে মারে ছোঁ।।’
এ তো গেল বাংলার শিব ও সাপের সম্বন্ধ। কিন্তু, কীভাবে সাপেরা চলে এলেন পৌরাণিক শিবের সঙ্গে? সেটির যোগসূত্র মেলে মহাভারতের আদিপর্ব (১৮), খিলহরিবংশ (১.১৪), ভাগবত (৮.৬-৭) কিংবা সবচেয়ে স্পষ্টরূপে বিষ্ণুপুরাণে (১.৯)। সেটি হল সমুদ্রমন্থনের কাহিনি আর সেই সূত্রে শিবের নীলকণ্ঠ রূপ ও বাসুকি নাগের শিবের গলায় অবস্থান।
দেবরাজ ইন্দ্রকে দুর্বাসা মুনি একটি বিশেষ মালা দিয়েছেন, যাতে ‘শ্রী’র বাস ছিল। সেটি তিনি নিজের ঐরাবত হাতির শুঁড়ের ওপরে রাখলে, হাতি সেটা মাছি মনে করে ফেলে দেয়। পূজার নৈবেদ্য-সম এই মালা ফেলে দেওয়ার অপরাধে দুর্বাসা মুনি অভিশাপ দিলেন, সমস্ত দেবতারা শক্তি ও ভাগ্য হারাবেন। এরপরে দেবতা এবং বালির নেতৃত্বে অসুরদের যুদ্ধে শক্তি হারিয়ে, দেবতারা হেরে যান। অসুরেরা সমুদ্রমন্থন করে অমৃত লাভের চেষ্টা শুরু করল, নিজেরা অমর হওয়ার জন্যে। মন্দার পর্বত উপড়ে মন্থন দণ্ড দিয়ে সেই কাজটি করতে হবে। নিজে অমৃতের ভাগ পাবেন এই আশায় মন্থন দণ্ডের দড়ি হতে রাজি হন বাসুকি নাগ। সেই মন্থনে যে হলাহল বিষ উঠে এসেছিল, শিব সে’টি নিজের কণ্ঠে ধারণ করে ‘নীলকণ্ঠ’ হলেন আর বাসুকি নাগও নিজের কাজ শেষে স্থান নিলেন শিবের কণ্ঠে। আজও উত্তরাখণ্ড, গুজরাট, রাজস্থানের নানা স্থানে ‘নীলকণ্ঠ’ রূপে শিবঠাকুরের পূজা হয়ে থাকে।

এই যিনি ‘নীলকণ্ঠ’ শিব, তাঁর এই পৌরাণিক গল্প থেকে একটু বিজ্ঞানের দিকে এগনো সম্ভব। যখন প্রতিটি দেহের কোষের মধ্যে বিপাকীয় ক্রিয়া অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তখন তাতে ফ্রি-র্যাডিক্যালস উৎপন্ন হতে থাকে। এটি শরীরকে ধ্বংস করে। শিব কিন্তু সেই বিষকেই পান করে স্বকণ্ঠে ধারণ করেছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটি হলোসিকোয়েস্ট্রেশন (Sequestration)—যাতে বিষকে শরীরের একটি নির্দিষ্ট অংশে বিশেষ করে লিভারে আবদ্ধ করে রাখা, যাতে তা প্রয়োজনীয় নানা অঙ্গ (যেমন— হৃৎপিণ্ড বা মস্তিষ্ক)কে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে।
‘নীলকণ্ঠ’র বিষয়টিকে বলা হয় ‘সায়ানোসিস পদ্ধতি’ (Cyanosis) বিষক্রিয়ায় শরীর নীল হয়ে যাওয়া। বিশেষ করে, হেমাটক্সিনের ফলে রক্ত-সংবহনতন্ত্রের ওপরে এটি কাজ করলে, রক্তের অপর্যাপ্ত অক্সিজেনের ফলে আমাদের ত্বক, শ্লেষ্মা ঝিল্লি কিংবা টিস্যুর নীলাভ বিবর্ণতা প্রকাশ পেতে থাকে। তবে, তিনি তো ‘শিব’। তিনি ‘নীলকণ্ঠ’ হয়ে বিষের মারাত্মক প্রভাবকে তাঁর যোগশক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন।
লক্ষণীয়, এখানে কিন্তু সর্বত্র বিরাজমান সর্প কোনওরূপ সরীসৃপ নন। বরং, সূর্যের কিরণের মতো সর্পদেবতা রুদ্রের ভূষণ। কারণ, ‘সৃপ’ ধাতুর মূল অর্থ গমন করা বা এগিয়ে যাওয়া।
এবারে আসা যাক সাপের বিষ প্রসঙ্গে, যা মূলত কয়েকশত প্রোটিন এবং এনজাইমের এক জটিল মিশ্রণে তৈরি হয়। শিবের সঙ্গে সাপের বিষের এই উপাদানগুলোর সম্পর্কও বের করা সম্ভব। বিশেষ মূল উপাদান নিউরোটক্সিন (Neurotoxins) যা সরাসরি স্নায়ুতন্ত্রের ওপর কাজ করে। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, স্বল্প মাত্রায় নিউরোটক্সিন পক্ষাঘাত (Paralysis) এবং অ্যালঝাইমার্স রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে পারে। শিবের মাথায় সাপের অবস্থান কি তাঁর উন্নত স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণকে নির্দেশ করে না? আর, বিষের মধ্যে থাকা নানা প্রোটিন ও এনজাইম যেমন ফসফোলিপেজ A2 (Phospholipase A2) এবং মেটালোপ্রোটিনেস (Metalloproteinases) যে-কোনও জীবকোষের প্রাচীরকে ভাঙতে পারে। সেই জায়গায় শিবের ‘সংহার’ বা ধ্বংসের ক্ষমতার সঙ্গে এই জৈব-আণবিক ভাঙনের প্রক্রিয়ার মিল পাওয়া যায়, যা পুরনোকে ধ্বংস করে নতুন প্রাণের সঞ্চার সাধনে ক্রিয়াশীল। কীভাবে হয় সেই নবপ্রাণ সঞ্চার?
এই সূত্রেই সাপের সঙ্গে আরেকটি মিল দেখা যাক, যা হল রিজেনারেশন বা কোষের পুনর্জন্ম। সাপ পর্যায়ক্রমে তার গায়ের চামড়া বা খোলস ত্যাগ করে। একে বলা হয় একডিসিস বা Ecdysis। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অমরত্বের ভাবনা এবং কিছুটা বিজ্ঞানও। সাপের এই খোলস ত্যাগের ঘটনাটিকে মূলত ডিএনএ-র প্রান্তভাগে থাকা টেলোমেয়ার (Telomeres)-এর ক্ষয় রোধ করার একটি রূপক হিসাবেও বলা যেতে পারে। এটি নন-কোডিং ডিএনএ-প্রোটিন কমপ্লেক্স, যা ইউক্যারিওটিক ক্রোমোজোমের প্রান্তে পাওয়া যায়। এগুলি প্রতিরক্ষামূলক ‘ক্যাপ’ হিসাবে কাজ করে যা ক্রোমোজোমগুলিকে ক্ষয়, ফিউশন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ ভেবে ভুল করা থেকে রক্ষা করে। এগুলি প্রতিলিপির সময়ে জিনগত তথ্য ক্ষতি রোধ করে, প্রতিটি কোষ বিভাজনের সঙ্গে-সঙ্গে বার্ধক্য না হওয়া পর্যন্ত সেটিকে রক্ষা করে চলে। টেলোমেরেজ নামে একটি এনজাইম স্টেম সেল, জীবাণুকোষ এবং ক্যান্সার কোষের মতো নির্দিষ্ট কোষগুলিতে টেলোমেরের দৈর্ঘ্য পুনরায় পূরণ হয়, যা তাদের বার্ধক্য-প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য কোষকে বিভক্ত হতে দেয়। শিবের সঙ্গে সাপের সম্পর্ক অমরত্ব বা বার্ধক্যহীনতার (Anti-aging) এহেন বিজ্ঞানকে নির্দেশ করে। শিব জরাহীন, কারণ তিনি সাপের মতো নিয়মিত নিজেকে রূপান্তরিত বা Regenerate করতে পারেন। দ্বিসর্পিল গঠনের ডিএনএ-র প্রান্তভাগে থাকা টেলোমেয়ার’ও আমাদের জিনের স্মৃতিকে বহন করতে সাহায্য চলেছে।

আয়ুর্বেদশাস্ত্রে শিবকে ‘আদি বৈদ্য’ বা প্রথম চিকিৎসক বলা হয়েছে। শিবের সঙ্গে সাপের সম্পর্ককে দেখতে গেলে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও আয়ুর্বেদের অগদ তন্ত্র (Toxicology)— যা কিনা আয়ুর্বেদের আটটি শাখার মধ্যে একটি তন্ত্রবিষ ও তার প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করে। সেখানে বলা হচ্ছে, ‘বিষস্য বিষমৌষধম’, অর্থাৎ ‘বিষই বিষের ওষুধ’। যেমন সাপের শরীরে বিষ থাকে, কিন্তু সাপ নিজে সেই বিষে মরে না। শিব সাপেদের তাঁর দেহে স্থান দিয়ে মূলত এই বার্তাই দেন যে, বিষকে সঠিক উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করলে তা জীবনদায়ীও হতে পারে। কীভাবে? বিজ্ঞান বলে, আধুনিক চিকিৎসায় সর্পবিষের প্রয়োগের মাধ্যমে। শিবের প্রতীকী বিষ ধারণের বিষয়টি আধুনিক ল্যাবরেটরিতে জীবন রক্ষা করছে। সাপের বিষ থেকে তৈরি হয়েছে, ক্যাপ্টোপ্রিল (Captopril)-এর মতো ওষুধ। যা লক্ষ-লক্ষ মানুষের উচ্চ-রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। ক্যাপ্টোপ্রিল হল একটি গুরুত্বপূর্ণ হৃদরোগ সংক্রান্ত ওষুধ, যা ১৯৭০-এর দশকে ব্রাজিলিয়ান পিট ভাইপার (বোথ্রপস জারারাকা)-এর বিষে পাওয়া পেপটাইডের অনুকরণে তৈরি করা হয়েছিল। যা শিকারের রক্তচাপের তীব্রতাকে হ্রাস করে তাকে মেরে ফেলতে পারে। শিবের শান্ত ও সমাহিত রূপ এই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রক শান্ত হৃদ্যন্ত্রের অবস্থার কথাই বলে।
সাপের বিষে থাকা কনটোর্ট্রোস্ট্যাটিন (Contortrostatin)প্রোটিন ক্যান্সার কোষের বিস্তার রোধ করতে ব্যবহৃত হচ্ছে আজ। দক্ষিণ কপারহেড সাপের বিষ থেকে প্রাপ্ত হোমোডাইমেরিক ডিসইন্টেগ্রিন প্রোটিন, কনটোর্ট্রোস্ট্যাটিন একটি দারুণ অ্যান্টি-টিউমার এজেন্ট হিসাবে ইন্টিগ্রিনকে লক্ষ্য করে ক্যান্সারের বিস্তার রোধ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি টিউমারের বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে (বিশেষ করে স্তন ক্যান্সার, ডিম্বাশয়ের মডেলগুলিতে এটি প্রায় ৭৪% মতো কাজ করে)। শিবকে ‘মৃত্যুঞ্জয়’ বলা হয় কারণ, তিনি এমন এক শক্তির অধিকারী, যা কোষের মৃত্যু বা ‘Apoptosis’ প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
নীলকণ্ঠের প্রসঙ্গে আসে শিবের জৈবিক রসায়ন সামঞ্জস্য (Bio-Chemical Balance)। শিব যখন বিষ পান করে নীলকণ্ঠ হচ্ছেন এবং সাপ তাঁর শরীরে অবস্থান করে আছে, তখন সে’টি কিন্তু আদতে একটি জৈবিক ভারসাম্য বা হোমিওস্ট্যাসিস (Homeostasis)-এর এক চরম উদাহরণ হিসাবে আসে। হোমিওস্ট্যাসিস হল একটি সক্রিয়, স্ব-নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া— যার মাধ্যমে জৈবিক ব্যবস্থাগুলির বাইরের অবস্থার পরিবর্তন সত্ত্বেও শরীরের তাপমাত্রা, অম্লতা বা pH এবং তরলের বিষয়গুলি ভারসাম্যে স্থিতিশীল ও তুলনামূলকভাবে ধ্রুবক অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে বজায় রাখে। এ’টি একটি গতিশীল ভারসাম্য রক্ষার প্রক্রিয়া হিসাবে কাজ করে চলে। তবে, এটির ব্যর্থতা প্রায়শই রোগ বা মৃত্যুর দিকে শরীরকে পরিচালিত করতে পারে। সাপ একটি শীতল রক্তের প্রাণী। শিবের উষ্ণ বিষাক্ত দেহে বা গলায়, সাপের এই অবস্থান একটি তাপীয় ভারসাম্যকে রক্ষা করে। সেইসঙ্গে, এটি শরীরের pH মান এবং এনজাইমের কার্যকারিতা বজায় রাখারও একটি প্রতীকী অথচ বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনা হিসাবে কাজ করে।

শেষ করা যাক, নিউরোসায়েন্স-এর ভিত্তিতে শিব-মূর্তিতে সাপের অবস্থান দিয়েই। মানুষের মস্তিষ্ক বিবর্তনের মাধ্যমে তিনটি স্তরে বিকশিত হয়েছে, যা বিজ্ঞানী পল ম্যাকলিন তাঁর ‘Triune Brain’ তত্ত্বে ব্যাখ্যা করেছেন। ১৯৬০-এর দশকে ডঃ পল ম্যাকলিন প্রস্তাবিত এই ত্রি-মস্তিষ্ক তত্ত্ব থেকে জানা যায় যে, মানব মস্তিষ্ক তিনটি স্বতন্ত্র পর্যায়ে বিবর্তিত হয়েছে। যার মধ্যে একটি ‘সরীসৃপ’ মস্তিষ্ক (প্রবৃত্তি/বেঁচে থাকা-নির্ভর) একটি ‘লিম্বিক’ সিস্টেম (আবেগ-নির্ভর) এবং একটি ‘নিওকর্টেক্স’ (যুক্তি-নির্ভর) রয়েছে। এর মধ্যে ‘Basal Ganglia’ অংশটিকে বলা হয় ‘Reptilian Brain’বা সরীসৃপ মস্তিষ্ক। এই অংশটি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক প্রবৃত্তি যেমন— ভয়, আগ্রাসন, এবং যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। সাপ যেমন তার অস্তিত্ব রক্ষায় অত্যন্ত সজাগ এবং আক্রমণাত্মক। তেমনি, মানুষের ভেতরের এই সরীসৃপ মস্তিষ্কও ঠিক একই কাজ করে। শিব যখন তাঁর গ্রীবায় (যা মস্তিষ্কের একদম নীচের সংযোগস্থল বা Brainstem-এর কাছে) সাপকে ধারণ করেন, তখন বৈজ্ঞানিকভাবে তার অর্থ দাঁড়ায়— তিনি তাঁর আদিম সরীসৃপ প্রবৃত্তিগুলোকে জয় করেছেন। শিবের এই রূপটি মূলত ‘ফ্রন্টাল লোব’-এর সামনের অংশ ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ (Prefrontal Cortex) যা যৌক্তিক মস্তিষ্ক হিসাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা, সমস্যা সমাধান, মানসিক নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক আচরণ-সহ উচ্চস্তরের জ্ঞানের কার্যাবলীর পরিচালক হিসাবে কাজ করে। আর, অন্তঃমস্তিষ্ক-কাঠামোর মধ্যে থাকা হিপ্পোক্যাম্পাস, অ্যামিগডালা এবং হাইপোথ্যালামাস নিয়ে গঠিত— লিম্বিক সিস্টেম (Limbic System) যা কিনা আবেগীয় মস্তিষ্ক হিসাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় আচরণ, আবেগ, প্রেরণা এবং দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করে সেটি এক উচ্চতর চেতনার আধিপত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। শিবের গলায় সাপের এই অবস্থান হাইপোথ্যালামাস এবং অ্যামিগডালা-র উত্তেজনাকে শান্ত করার এক নিউরোলজিক্যাল রূপকও।
তাই, শিব ও সাপের এই সম্বন্ধ, আমাদের ১৯৫৪তে আইনস্টাইনের সেই বিখ্যাত উক্তির কথাই স্মরণ করায়, ‘ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান পঙ্গু, বিজ্ঞান ছাড়া ধর্ম অন্ধ’। বিষ ছাড়া অমৃতের মূল্য নেই, ধ্বংস ছাড়া সৃষ্টির অস্তিত্ব নেই, এবং সাপ ছাড়া শিবের মহিমাও অপূর্ণ। শিব আমাদের জন্য কেবল একজন দেবতা নন, তিনি হলেন একটি ব্যবস্থা। আর সাপ হল সেই ব্যবস্থার চালিকাশক্তি— যা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবকোষ থেকে শুরু করে অসীম ভক্তিপূর্ণ চিত্তাকাশ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ক্রিয়াশীল ও বর্তমান।
অরুণকুমার গুপ্ত স্মারক বক্তৃতা, ২০২৬




