মাকে পড়ে শোনানোর পরে নিজে যখন বইপাড়ায় বই কিনতে যেতাম, তখন আমার পছন্দের যে-বই কিনতাম, তার প্রকাশক দেখতাম ‘নিউ এজ’। যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’ পড়তে গিয়ে দেখি প্রকাশক ‘নিউ এজ’। মুজতবা আলীর বিখ্যাত লেখা ‘দেশে বিদেশে’ বইয়ের পাতা উল্টে দেখি ‘নিউ এজ’। বিমল মিত্রর বিখ্যাত বই ‘সাহেব বিবি গোলাম’, সেই বইয়েরও প্রকাশক ‘নিউ এজ’-এর জানকীবাবু। তাই আমার মনে ইচ্ছে ছিল, যদি কখনও আমার লেখা বই প্রকাশিত হয় তা হলে এই প্রকাশনী থেকেই প্রকাশ করব।
আমার ফেসবুক বন্ধুরা আমার নানা লেখা পড়ে বলেছেন বই প্রকাশের কথা। তাই বলে আপনারা আবার ভেবে নেবেন না ওপরের এই লেখাটা আমার, মানে অপু দে-র স্বপ্ন বলে। আসলে মনের এই কথাগুলো সেই লেখকের, যাঁর মনের ইচ্ছে অথবা স্বপ্নপূরণ হয়েছিল ১৯৫৫ সালে তাঁর প্রথম বই প্রকাশের মধ্যে দিয়ে। ‘কত অজানারে’ ছিল তাঁর প্রথম বই। ‘নিউ এজ’-এর জানকীবাবু ২২ বছরের এক তরুণের স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন। মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। বইয়ের প্রচ্ছদে শুধু শংকর। বাঙালি পাঠকের কাছে তিনি শংকর নামেই পরিচিত।
আরও পড়ুন: মণিদা একটা উপন্যাস লিখতে পারতেন এক সপ্তাহে!
লিখছেন বরুণ চন্দ…

‘কত অজানারে’ বই হিসেবে প্রকাশিত হওয়ার আগে ‘দেশ’ পত্রিকায় তা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের সময় থেকেই আলোড়ন পড়ে যায় পাঠক-মহলে। একুশ বছরের এক বালক ‘দেশ’ পত্রিকার অফিসে তাঁর পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে আসেন। ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ সেই তরুণ লেখক ও তাঁর লেখার ভক্ত হয়ে পড়েন। ‘দেশ’ পত্রিকার দফতরে তখন জমাটি আড্ডার আসর। সেই আড্ডার গল্প শুনেছি শংকরজেঠুর কাছে। কানাই সরকার ছিলেন ওই এবিপি গ্রুপে বিজ্ঞাপনের কর্তাব্যক্তি। সরকারে-সরকারে আত্মীয়তার সম্পর্কের জেরে এবিপি-র কোনও বিভাগ কানাইবাবুকে বিশেষ ঘাঁটাতেন না। শংকরজেঠুর লেখা শেষ হতেই কানাইবাবু নিজের মনেই ঠিক করে রেখেছিলেন, কে প্রকাশক হবেন এই বইয়ের। তিনি রামপদবাবুকে বলেছিলেন শংকরকে ডিএম লাইব্রেরিতে নিয়ে যেতে। শংকর রাজি না হওয়ায় তিন বছর কথা বলেননি কানাইবাবু। ‘দেশ’ পত্রিকায় গুঞ্জন শুরু হয়ে গিয়েছিল শংকরের আর লেখা হবে না এখানে। সাগরময়বাবুও নাকি বলেছিলেন, না চটালেই পারতেন।
একদিন বিমল মিত্র তাঁকে নিয়ে আসেন জানকীবাবুর কাছে। প্রকাশিত হয় তাঁর স্বপ্ন। ১৯৭৬ সাল। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিন (যা চার বছরে একবার আসে) আমার জন্ম। আর আগস্ট মাসে দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হয় ‘স্বর্গ মর্ত্য পাতাল’। বাবার মনে ডবল খুশি। ৪৫ বছর পেরনো সেই সম্পর্ক দাদা থেকে জেঠুতে পরিণত হয়েছে। ছয়ের দশক সাতের দশকে কেমন ছিল বইপাড়া? সেই সময়ে দাপুটে লেখকেরা কেমন ছিলেন, কেমন ছিল তাঁদের আড্ডার গল্প। সব শুনেছি শংকরজেঠুর কাছে। আর এই শুনতে-শুনতেই বড় হয়েছি। তাঁর চোখ দিয়ে দেখেছি চিনেছি বইপাড়াকে। যাঁদের লেখা পড়ে শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন কেটেছে, সেই লেখকদের ভেতরের মনুষ্যত্বকে স্পর্শ করিয়েছেন। আপনি যখন কথা বলেন তখন চোখের সামনে ছবি তৈরি হয়ে যায়। সেই ছবিগুলো আমার চলার জীবনের সঙ্গী। যে জীবনসংগ্রামের গল্প আপনার থেকে শুনেছি, তা আমার মনোবল বাড়ায়। আপনার জীবনের বাঁকে-বাঁকে যে খুনসুটি, মজার গল্প শুনেছি— তা আমার ব্যস্ত জীবনে কোথাও আনন্দের মুহূর্ত তৈরি করে।

১৯৬২ সালের ১০ জুন। আপনার জীবনে এক দিনেই দু’টি আনন্দের ঘটনা ঘটে। ‘চৌরঙ্গী’-র আত্মপ্রকাশ আর ওই দিনই ছিল আপনার বিবাহ। ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশের পর প্রকাশক শচীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ‘বাক সাহিত্য’ থেকে ‘চৌরঙ্গী’ প্রকাশ করেন। আপনার এই বইটির প্রকাশের গল্পটিও বেশ মজার। কলকাতায় তখন হাতে গোনা অফসেট প্রিন্টিং মেশিন। ইগল লিথোগ্রাফ সেই সময় নামকরা কালার প্রিন্টিং হাউস। অবনীবাবু শচীনবাবুকে একদিন বলেন, “‘দেশ’-এর ধারাবাহিকটি পড়ছেন? চৌরঙ্গী। খুব ভাল লেখা। এই লেখাটি যদি আপনি বই করেন তবে এই বইয়ের প্রচ্ছদ আমি অফসেট মেশিনে ছেপে দেব।”
তখন বইপাড়ার কোনও বইয়ের প্রচ্ছদ অফসেট মেশিনে ছাপা হত না। খুব সম্ভব এই বইটির প্রচ্ছদ প্রথম অফসেটে ছাপা। এর পরেই মনোজ বসু তাঁর ‘নিশিকুটুম্ব’ বইটির প্রচ্ছদ অফসেটে ছাপান। বইটির প্রচ্ছদ করেছিলেন শিল্পী অজিত গুপ্ত। আপনার কাছেই সেই গল্প শুনেছিলাম। পোস্ট অফিস থেকে দু-আনা দিয়ে একটা গোটা স্ট্যাম্পের পাতা কিনে পৌঁছে গিয়েছিলেন অজিত গুপ্তর বাড়ি। আপনার ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন। স্ট্যাম্পের মাপে একটা ছবি এঁকে যদি তা পুরোটা দেওয়া যায়। কিন্তু অজিতবাবু প্রচ্ছদে থাকা স্ট্যাম্পের পুরো পাতাতে সবক’টা নতুন ছবি এঁকে দিয়েছিলেন। অসাধারণ সেই প্রচ্ছদ যা এখনও প্রকাশক ব্যবহার করেন। ২০১২ সালের ১০ জুন ‘চৌরঙ্গী’ প্রকাশের পঞ্চাশ বছর ছিল। স্টার মার্ক বুক স্টোরে দে’জ পাবলিশিং একটি অনুষ্ঠান করে। সেখানে মজার এক কাহিনি শুনিয়েছিলেন। আপনার বিয়ের দিন প্রকাশিত এই বই আপনাকে পরের দিন বিড়ম্বনায় ফেলেছিল। তখন হ্যান্ড কম্পোজ হত, গ্যালি প্রুফ দেখতে হত। কোনওভাবে মাঝের ১৬ পাতা বাদ চলে গেছে। লেখার পরম্পরা মিলছে না। বিয়ের দ্বিতীয় দিনের সকালেই দাদা শঙ্করীপ্রসাদ বসুকে সঙ্গে নিয়ে প্রকাশকের কাছে এসে বলেছিলেন, ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে।’ প্রথম সংস্করণের সেই বই খুঁজে পড়লে হয়তো দেখা যাবে কোনও এক জায়গায় সেই ষোলো পাতার চাহিদা। নতুন বরের এমন বিচলিত ভঙ্গিতে বেরিয়ে পড়ায় সকলেই অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্য বরাবর রত্নভান্ডার।

আপনার বলা একটি গল্প কোনওদিন ভুলব না।
কোকাকোলা কোম্পানি ১৯১৯ সালে ফ্রান্সের কয়েকজন আর্টিস্টকে কোকাকোলার বোতলের নতুন ডিজাইন তৈরি করার দায়িত্ব দেয়। একজন আর্টিস্ট (নাম মনে করতে পারছি না) যিনি কোম্পানির গোডাউনে যান। নানারকমের বোতল দেখেন সেখানে। তার মধ্যে থেকে একটি বোতল বের করে বলেন, এর থেকে সুন্দর ডিজাইনের বোতল আর কোনওদিন হবে না। ১৯১৯ সাল থেকে সেই একই ডিজাইনের বোতল এখনও চলছে।
এইরকম কত স্মৃতি, কত গল্প আজ মনে পড়ছে। মনে পড়ছে সেইদিনের কথা। এই তো কয়েকদিন আগে অসুস্থ আপনাকে হাসপাতালে ভর্তি করলাম। পরের দিন অপারেশন করতে হবে। যন্ত্রণাকাতর আপনাকে এই বয়সেও খুব কাহিল হতে দেখিনি। অবাক হইনি তখনও, যখন অপারেশনের কিছুক্ষণ পরেই হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে আপনি বলেন, ‘আমার বইমেলার বইয়ের প্রুফটা কাল দিয়ে যেও। এখানে তো কোনও কাজ নেই। শুয়ে শুয়ে দেখে রাখব।’ আসলে ঈশ্বর কিছু মানুষকে স্বতন্ত্র কিছু গুণ দিয়েই জগতে পাঠান। তাই তাঁরা আমাদের থেকে আলাদা হয়ে ওঠেন।
ভাল থাকুন জেঠু। রামকৃষ্ণলোকে। ভাল থাকুন।



