গত সাত-আট মাস ধরে সোশাল মিডিয়া খুললেই, একটি দৃশ্য ঘুরে-ফিরে আসত। বিবিধ পোস্টে-র মাঝে আচমকা সারি-সারি বেগুনি ইউনিফর্মের ঝলক— আশাকর্মীদের বিক্ষোভ। রাজ্যের পথঘাটে তাঁদের ধরনা, মিছিল। শ্রমের সম-মান ও বেতনের দাবি নিয়ে রাজ্যের জেলায়-জেলায় অবরোধ, হরতাল। বাংলার জেলা-শহর উজিয়ে— শিবপুর, বেলদা, খাতড়া, কাটোয়া, ময়না বাইপাস, রানিগঞ্জ, নিউ জলপাইগুড়ির পথঘাটে— উত্তাল মিছিল-জমায়েত থেকে ভেসে আসা স্লোগান— ‘পশ্চিমবঙ্গ আশাকর্মী ইউনিয়ন জিন্দাবাদ!’ কখনও পথচারী, কখনও সংবাদকর্মী, কখনও-বা আন্দোলনকারী-দের ফোনে তোলা সে-সব ছবি আর ভিডিও-তে ছয়লাপ হয়েছিল সমাজমাধ্যমের দেওয়াল। কিছুদিনের জন্য।
আজ চতুর্দিকে, কবি সুকান্তের ভাষায়, যাকে বলে ‘ক্ষুধিত দিনের সাম্রাজ্য’। গোটা দেশ-জুড়ে যুপকাষ্ঠে চড়েছে শ্রমজীবী মানুষ; একটি খাঁড়া গত কয়েক দশক ধরে একটু-একটু করে নেমে এসে এখন ঘষা খাচ্ছে ঘাড়ের চামড়ায়। মধ্যবিত্ত-সমাজের দরকচা-মারা প্রতিবাদ তার সামনে ফালা-ফালা হয়ে যায়— ইতিহাস সাক্ষী। এরকম দুর্দিনেই সবাই দেখল— আশাকর্মীদের সম্মিলিত হতাশা ও ক্রোধ মুঠো পাকিয়ে, পুলিশি ধরপাকড়ের তোয়াক্কা না করে, ব্যারিকেড ভেঙে ঢুকে গেছে স্বাস্থ্যভবনের অন্দরমহলে। সেই দৃশ্য সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে গেল টুকরো-টুকরো হয়ে। পৌঁছে গেল অগণিত মানুষের হাতের মুঠোয়। এ-যেন ক্লিন্ন-খিন্ন দুঃসময়ে হঠাৎ ঝলসে ওঠা আশার আলো। অন্ধকারে আগুনের ফুলকি।
আরও পড়ুন: ট্রেন্ডে কি ঢাকা পড়ছে নারীশ্রমের ইতিহাস! লিখছেন বৃন্দা দাশগুপ্ত…
কিন্তু অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সবসময়ে মশাল হয়ে ওঠে না। এ-সব টুকরো-টুকরো ছবি আর ভিডিও-র মেয়াদই বা কতদিন? অ্যালগরিদম-এর চোরাবালি তো অল্প সময়েই গিলে নেবে তাদের; এ-সব দিয়ে আর কতদিন আশা জিইয়ে রাখা যায়? ঠিক যেভাবে নিউজ-মিডিয়া খবর ছড়িয়ে দেয় ক্ষণিকের কৌতূহল মেটাতে, কিন্তু হুজুগ থিতিয়ে গেলে, অচিরেই সব ভোঁ-ভাঁ! টুকরো ছবি, শর্টস, মিডিয়ার বাইট, হঠাৎ আলোর ঝলকানি— এগুলো কোনও আন্দোলনের স্থায়ী ইতিবৃত্ত হয়ে থাকতে পারে কি? ইতিবৃত্ত, ইতিকথা, কিস্সা— এ-সব তো কেবল স্মৃতিচারণ নয়, তার একটা সুদূরপ্রসারী শিক্ষণের দিক রয়েছে। এক্ষেত্রে, তা শ্রমজীবী নারী আন্দোলনের একটি নির্ভরযোগ্য, দৃশ্যশ্রাব্য নথি হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতের জন্য, যাতে থাকবে আমাদের জানা-বোঝার, অনুপ্রেরণার রসদ। শব্দ-ছবির টুকরো জুড়ে কি তুলে ধরা যায় এতকিছু? আর গেলেও, তার কোনও উপযোগিতা কি আদৌ থাকে?
ইতিহাসের আলপথ ধরে একটু পিছু হেঁটে দেখা যাক এর উত্তর মেলে কি না।

‘আমরা চাইছি ছ’টি ফিল্মের একটি সিরিজ বানাতে, যেগুলো আন্দোলনকর্মী, বিভিন্ন মহিলাসংগঠন এবং যেসব মানুষ শ্রমজীবী মহিলাদের সংগঠিত করছেন— তাঁদের কাজে আসবে। কাজের বিবিধ উপকরণ এঁদের সামনে মজুত— আমরা তাতে একটি সংযোজন করতে চাই। আমাদেরছবির বিষয় মূলত দুটি–নারী ও শ্রম; তাতে আমরা ছ-টি ভিন্ন ভিন্ন পেশা-কে খতিয়ে দেখব— সংগঠিত-অসংগঠিত, উভয় ক্ষেত্রেই।’ (১৯৮৬)
কথাগুলো বলছেন দীপা ধনরাজ। ১৯৮১ সালে তিনি আমস্টারডামে গিয়েছিলেন একটি নারীবাদী ফিল্ম ও ভিডিও উৎসবে যোগ দিতে। শোনা যায়, বিশ্ব-ইতিহাসে এটিই নাকি সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারীবাদী চলচ্চিত্র উৎসব। সেখানে দীপা একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন। ভারতে নারীশ্রমিকদের নিয়ে ছবি (ফিল্ম) হলে তা কেমন হওয়া উচিত,আর সে-ছবি কী করে নারীবাদী আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠতে পারে–তার একটা স্পষ্ট পরিকল্পনা ফুটে ওঠে দীপার বক্তব্যে। পাঠককে অনুরোধ করি, ওঁর বক্তব্যে বহুবচনের ব্যবহারের দিকে একটু নজর দিতে।
দীপা তথ্যচিত্র-নির্মাতা। কেউ-কেউ যাকে ‘কমিটেড ফিল্মমেকিং’ বলেন— ভারতে সেই ঘরানার অন্যতম পথিকৃৎ দীপা ধনরাজ। তবে ১৯৮০ সালে যখন দীপা ছবি বানানো শুরু করলেন, তখনও তিনি স্বনামধন্য হয়ে ওঠেননি আজকের মতো। বরং তা না হয়ে ওঠাই ছিল সেই পর্বে তাঁর ছবি করার মুখ্য শর্ত। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত তিনি ছিলেন একটি কালেক্টিভের শরিক— তার নাম ‘যুগান্তর’। নির্মাতা হিসাবে ছবির নামলিপি-তে থাকত যুগান্তরের তিন মহিলা ও এক পুরুষ সদস্যের নাম— দীপা ধনরাজ, আভা ভাইয়া, মীরা রাও এবং নভরোজ্ কন্ট্র্যাক্টর। যুগান্তরের মতো নারীবাদী ফিল্ম কালেক্টিভ এদেশে সেই প্রথম— সদর্থেই যুগান্তকারী ব্যাপার।

যুগান্তর সব মিলিয়ে চারটি ছবি তৈরি করে উঠতে পেরেছিল: ‘মোলকারিন’ (গৃহকর্মী, ১৯৮১), ‘তাম্বাকু চাকিলা’‘ঊব আলি’(তামাকের আগুন, ১৯৮২), ‘সুদেশা’ (১৯৮৩), ‘ইঢি কাথা মাত্রামেনা’(এ কি শুধুই গল্প?, ১৯৮৩)। এর পরেও অবশ্য দীপা ধনরাজ আরও অনেক ছবি পরিচালনা করেছেন, এখনও করে চলেছেন। বস্তুত যে-ছবিটির জন্য তিনি সর্বাধিক পরিচিত, দাঙ্গাবিধ্বস্ত হায়দ্রাবাদ নিয়ে তৈরি সেই তথ্যচিত্র ‘কেয়া হুয়া ইস শেহের কো’(কী হল এই শহরের, ১৯৮৬) বানানো হয়েছে যুগান্তর ভেঙে যাওয়ার পরেই। কিন্তু এই লেখায় বেশি করে আসবে দীপার, বা বলা ভাল যুগান্তরের প্রথম তিনটি ছবির কথা।
যুগান্তরের সব ছবিই তৈরি হয়েছে ভারতে ঘটমান কোনও নারীশ্রমিক আন্দোলন নিয়ে, আন্দোলনকর্মীদের সাহায্য নিয়ে। ‘মোলকারিন’যেমন তৈরি হয়েছিল, পুনে শহর মোলকারিন সংগঠনের সহযোগিতায়;‘তাম্বাকু চাকিলা..’-র সহ-পরিবেশক ছিল কর্ণাটকের বেলগাঁও অঞ্চলের নিপানি তামাক কারখানার নারী-মজদুর সংগঠন; ‘সুদেশা’-র নামভূমিকায় রয়েছেন চিপকো আন্দোলনের একজন নেত্রী; ‘ইঢি কাথা মাত্রামেনা’, যা এই যুগান্তরের ছবির তালিকায় একমাত্র ফিকশন ফিল্ম, তার সহ-নির্মাতা হিসাবে পাশে দাঁড়িয়েছিল স্ত্রী শক্তি সংগঠন— অধুনা তেলেঙ্গানা ও তৎকালীন অন্ধ্রপ্রদেশের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ নারীবাদী প্রতিষ্ঠান।
সংগঠিত নারীশ্রমিক আন্দোলনের শরিক, সদর্থেই কমরেড হিসাবে কাজ করার পদ্ধতি কী হতে পারে, এবং সে-আন্দোলনের বিস্তারে সিনেমাকে কী করে প্রয়োগ করা যায়, তার একটি পথনির্দেশ দেয় যুগান্তর। তার গড়ে ওঠার ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যাবে, মহৎ ছবি বানিয়ে ফেস্টিভালে পাঠানো বা অ্যাওয়ার্ড হাতানো নয়— যুগান্তরের স্বার্থ ছিল— নারীস্বাধীনতার লক্ষ্যে সাংগঠনিক কাজকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
যুগান্তরের গোড়াপত্তন ঘটেছিল ভারতে নারীবাদী আন্দোলনের এক বিশেষ পর্বে। ছয়ের দশকের শেষে এবং সমগ্র সাতের দশক জুড়ে ভারতে বামপন্থী ও মানবাধিকার আন্দোলনের মধ্যে থেকে উঠে এসেছিল একটি স্বতন্ত্র নারীবাদী ধারা। এর অন্যতম সূচনাবিন্দু হিসাবে ধরা যায় ১৯৭৪ সালকে। সে-বছর বীণা মজুমদার, লতিকা সরকার প্রমুখ মানুষের উদ্যোগে— ভারতীয় সমাজে মহিলাদের অবস্থান নিয়ে একটি সরেজমিন রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসে। ‘টুয়ার্ডস ইকোয়ালিটি’ (সাম্যের পথে) নামক এই রিপোর্টে বিস্তৃত তথ্যাদি-সহ দেখানো হয়, কীভাবে গোটা দেশে মেয়েদের সংখ্যা পুরুষদের তুলনায় কম, জীবন-জীবিকার সুযোগের দিক থেকে তারা কত পিছিয়ে, বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে মহিলাদের যোগদানের হার কীভাবে ক্রমশ পড়তির দিকে, প্রভৃতি। এ-নিয়ে তীক্ষ্ণ মন্তব্য করতে ছাড়েননি তাঁরা। যেমন, রিপোর্টের শুরুতেই তৎকালীন শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ নুরুল হাসানকে উদ্দেশ্য করে লেখা হচ্ছে— ‘আমাদের অনুসন্ধানে যা প্রকাশ্যে এসেছে, তা হল— সংবিধান অনুসারে যে-যে অধিকার মেয়েদের প্রাপ্য, যেসব আইন করে তাদের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা হয়েছে— এই দেশের নারীসমাজের বিপুল অংশের জীবনযাপনে তার কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।’ ১৯৭৫ সাল ছিল আন্তর্জাতিক নারীবর্ষ, তার ঠিক আগে এই রিপোর্ট রীতিমতো সাড়া ফেলে দেয়। এ-যেন নারী-উন্নয়ন নিয়ে সরকারি জগঝম্পের ওপর জল ঢেলে দেওয়া।
এরই মধ্যে জারি হল রাষ্ট্রপতি শাসন। বামপন্থী নারীকর্মীরা গ্রেপ্তার হতে শুরু করলেন। ১৯৭৭ সালে ভার্গব কমিশনের মতো নানান তদন্তকারী সংস্থার অনুসন্ধানের ফলে প্রকাশ্যে এল বিচারাধীন নারীবন্দিদের ওপর নৃশংস অত্যাচারের ঘটনা। দীপার ভাষায়, এমার্জেন্সি-র কয়েক বছর তাঁদের প্রজন্মকে আমূল বদলে দিয়েছিল (২০২৩)। রাষ্ট্র-অনুমোদিত হিংসা, বিচার-ব্যবস্থার অপব্যবহার— স্বাধীনতা-উত্তর ভারত সম্বন্ধে এনে দিয়েছিল গভীর হতাশা, অনাস্থা। স্বাধীনতা তথা নাগরিক অধিকারের প্রকৃত ঠিকাদার যে রাষ্ট্র হতে পারে না, তা সেই প্রজন্মের অনেকেই বুঝে গিয়েছে ততদিনে। অতএব সক্রিয় রাজনীতি ছাড়া গতি নেই।
বামপন্থী নানান দল ইতিমধ্যেই মহিলা কর্মীদের সংগঠিত করার কাজ করছিল, গড়ে উঠছিল মহিলা ট্রেড ইউনিয়ন। ১৯৭৩ সালে হায়দ্রাবাদে গড়ে উঠল প্রোগ্রেসিভ উইমেনস অরগানাইজেশন, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী রাজনীতির সঙ্গে তা ওতোপ্রোত জড়িত। এরকম টালমাটাল পরিস্থিতিতেই মূলত দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলিতে ছবি তৈরি শুরু করে যুগান্তর। দীপা এবং আভা ভাইয়া একইসঙ্গে ছবি-করিয়ে, আবার সক্রিয় নারীবাদী রাজনীতির সঙ্গে তাঁদের গভীর যোগাযোগ। তাঁরা একাধারে গবেষক, চিত্রনির্মাতা ও অ্যাক্টিভিস্ট। রাজনৈতিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়ার অন্যতম অস্ত্র হিসেবেই তাঁরা সেই সময়ে বেছে নিয়েছিলেন সিনেমা-কে।
দীপা আমস্টারডামের চলচ্চিত্র উৎসবে যেভাবে নিজেদের কাজের বর্ণনা করেছিলেন, তার থেকে তাদের কর্মপদ্ধতির একটি সম্যক পরিচয় পাওয়া যায়: ‘প্রাথমিক গবেষণা, তার সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে অনেক ঘোরাঘুরির পর যা তথ্য জোগাড় হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমাদের ছবির বিষয় হবে কেবল শ্রমজীবী শ্রেণির মানুষ, যাঁদের বাস দক্ষিণ ভারতে। কারণ আমরা দক্ষিণ ভারতীয় ডায়ালেক্টেই বেশি অভ্যস্ত। আমাদের ছবি হবে সক্রিয় রাজনীতির সহায়ক। এবং আমরা আমাদের ছবিকে আশিরও বেশি নারীসংগঠনের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাই, যারা বিভিন্ন জঙ্গী (মিলিট্যান্ট) পদ্ধতিতে কাজ করছে।’ (১৯৮৬)
এর থেকে বোঝা যায় যে, সমাজে নারী-পুরুষের বৈষম্যকে শ্রেণিবৈষম্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা হচ্ছে না। কিন্তু একটি অপরটিকে কী করে আরও বিষিয়ে তুলতে পারে, সেটাও তাঁদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তদুপরি, ছবি-কে আঞ্চলিক স্তরের সক্রিয় নারীবাদী-বাম রাজনীতির ব্যবহারিক প্রয়োজনের উপযোগী হয়ে উঠতে হবে—এটা একটি মুখ্য শর্ত। ছবি বানিয়ে কোনও সর্বজনীন নিদান দেওয়া নয়, বরং অঞ্চলবিশেষে শ্রমজীবী মহিলাদের সমস্যাকে তুলে ধরা, বিশেষত্বগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো, সেই পরিস্থিতিকে ক্যামেরা ও সাউন্ড রেকর্ডারে ধরে রাখা, এবং তারপর সেগুলোকে একটি আখ্যানের চেহারা দিয়ে অন্যান্য সংগঠনের কাছে পৌঁছে দেওয়া— এ না হলে কাজ অসম্পূর্ণ।
তিনি আরো বলেন, ‘বিষয়বস্তু নির্বাচনের ব্যাপারে আমরা একাধারে র্যাডিকাল ও নারীবাদী। ভারতে একজন গড়পড়তা মহিলার দিন কাটে চরম অসাম্যের মধ্যে, তারা একইসঙ্গে পিতৃতান্ত্রিক, সামন্ততান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণের শিকার।…(বৈষম্যকে) ধর্মীয় ও সামাজিক বৈধতা দিয়ে ঘর ও কর্মক্ষেত্র— দুই স্থানেই মেয়েদের ওপর অনবরত শোষণ চালানো সম্ভব হচ্ছে। সংবাদপত্রে রোজ খবর আসে, কন্যাপণ না দেওয়ার জন্য শ্বশুরবাড়িতে যুবতী স্ত্রীকে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, পুলিশ কনস্টেবল্ আর জোতদার-রা আদিবাসী ও অস্পৃশ্য জাতির মেয়েদের ধর্ষণ করছে। তবু, জনমত আর গণমাধ্যম বলেই চলে— আনুগত্য দেখালে, কৃচ্ছ্রসাধন করলে আর শতপুত্রের জননী হলে তোমার নারীজন্ম ধন্য।’ (১৯৮৬)
এখানে দু’টি বিষয় প্রায় স্বতঃসিদ্ধের মত রয়েছে, সে-দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করি— প্রথমত, ‘শ্রম’ কেবল বাড়ির বাইরে কাজের ক্ষেত্রে শারীরিক বা মানসিক শ্রম নয়, গেরস্থালির কাজও তার আওতায় পড়ে। শুধু তাই নয়, এখানে একটি ইঙ্গিত রয়েছে যে সেটি একধরনের উৎপাদিত শ্রম (অর্থাৎ যার বাজারমূল্য রয়েছে), কিন্তু নানারকমের সামাজিক আচার, বিশ্বাস, আর কুসংস্কার দিয়ে তাকে চেপে রাখা হয়। শোষণ জারি থাকে।
দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যম এ-ধরনের সামাজিক বিশ্বাসকে আরও গভীরে চারিয়ে দেয়, গণমানসে স্থায়ী করে তোলে। যে-গণমাধ্যমের সমালোচনা করছেন দীপা, তাতে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তো আছেই, উপরন্তু সে-যুগের সরকারি তথ্যচিত্রও রয়েছে। পাঁচ থেকে ছয়ের দশক অবধি ফিল্মস্ ডিভিশন (তথ্য ও প্রচার মন্ত্রক)-এর পৃষ্ঠপোষকতায় যে-সব তথ্যচিত্র তৈরি হয়েছিল, তাতে মহিলাদের গৃহকর্ত্রী হিসেবে দেখানোই ছিল রীতি। এ-ধরনের ছবির সারকথা ছিল— মহিলারা সনাতন স্ত্রীলোকের ভূমিকা পালন করুক, তবেই তারা জাতির উন্নয়নের শরিক হতে পারবেন। পরবর্তীকালে ছয়ের দশকের শেষে যখন ক্রমশ লিঙ্গবৈষম্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ল, তখন ‘উইমেনস্ ইশ্যু’ নিয়ে ফিল্মস্ ডিভিশন থেকে একাধিক ছবি বেরোলো ঠিকই, তাতে মহিলাদের সাক্ষাৎকারও থাকত। কিন্তু কারও-কারও মতে, সে-সব উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মহিলাদের চোখ দিয়ে সাবলটার্ন-দর্শন। এ-সব ছবিতে অধিকাংশ সময়ে উচ্চ-বর্গের মানুষেরই সোচ্চার উপস্থিতি। ‘পিছ্ড়ে-বর্গে’-র মেয়েদের নিয়ে বলতে গিয়ে এঁরা শুধু কুসংস্কার আর অশিক্ষাকেই দুয়ো দিতেন, শ্রেণিবৈষম্যের বিষয়টা তাঁদের চোখে পড়ত না, বা তাঁরা দেখতে চাইতেন না (সুটোরিস ২০১৬ পৃ. ১৯৬-২০০)।
এদিক থেকে জোর দিয়েই বলা যায় যে, অন্তত তথ্যচিত্রের জগতে যুগান্তর একটা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনেছিল। সমাজের নীচুতলার মেয়ে-মজদুরদের ভিকটিম বলে দাগিয়ে দিয়ে হাপুস ক্রন্দন নয়; তাঁদেরকে ছবির কেন্দ্রে রেখে, তাঁদের প্রতিপদে অনুসরণ করে, তাঁদের সংঘবদ্ধ কর্মসূচিকে একেবারে কাছ থেকে দেখা— এবং তার থেকে শিক্ষা নেওয়া— এদিক থেকে যুগান্তরের কাজ সে-যুগে প্রায় নজিরবিহীন। যুগান্তরের ক্যামেরা এবং সাউন্ড রেকর্ডার বস্তুত নৃতত্ত্ববিদের মত ঢুকে যায় ভিন্ন-ভিন্ন পেশার জগতে, আপাত-সাধারণ কাজের মধ্যে দেখতে চায় ক্ষমতার চাপানউতোর, দেহমনের স্বকীয়তা-লঙ্ঘন, দুর্ভোগের রকমফের, এবং এসবের বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁতে দাঁত চেপে রুখে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া।

যুগান্তরের সব ছবিতেই ‘কাজ’ বিষয়টা আক্ষরিক অর্থে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথম ছবি ‘মোলকারিন’ শুরুই হচ্ছে এক গৃহকর্মী পুনের কোনও গেরস্থ বাড়িতে ঘর ঝাঁট দিচ্ছেন, সেই শট দিয়ে। একইভাবে ‘সুদেশা’-তে আমরা দেখি চিপকো আন্দোলনের নেত্রী সুদেশা এবং তাঁর সঙ্গীদের— জঙ্গল থেকে ডালপাতা সংগ্রহ করে মাথায় তুলে, পাহাড়ের গা বেয়ে সারি বেঁধে উঠে আসে তারা। ছবির বেশিরভাগ জুড়ে রয়েছে কাজের ইতিবৃত্ত— ঘোল বানানো, গাছের ডাল কাটা, গরু-মোষের খাবারের বন্দোবস্ত করা। তার সঙ্গে ছবির শুরুতে টিপ্পনি: ‘মরদরা কেবল একটাই কাজ পারে, তা হল জমির খোদাই!’


কাজের জগতেও রকমফের রয়েছে। ‘তাম্বাকু চাকিলা’–য় কর্ণাটকের কুখ্যাত নিপানি টোব্যাকো ফ্যাক্টরির নরকদশা-র সঙ্গে ‘সুদেশা’-র পার্বত্য নিসর্গের কোনও মিল নেই। ‘ঘর’ বিষয়টাও প্রায় অনুপস্থিত, একদম প্রথম দৃশ্য ছাড়া। ঘর থেকে পোঁটলা করে রুটি-তরকারি-আচার নিয়ে বেরিয়ে মেয়েরা হাঁটা দেয় ফ্যাক্টরির উদ্দেশ্যে। ভোরের সূর্যের আলোয় চারিদিক ঝলমল করছে, সাউন্ডট্র্যাকে মেয়েদের হেঁটে চলার আওয়াজ, পাখির কিচিরমিচির, গরুর গলায় ঘণ্টার টুংটাং। কিন্তু এই মনোরম দৃশ্য বেশিক্ষণ থাকে না। অচিরেই তারা ফ্যাক্টরিতে পৌঁছয়। একটা সরু দরজা দিয়ে গ্যাদাগেদি করে ঢুকে যায় ফ্যাক্টরির পেটের ভেতরে। অন্ধকার গুহার মতো একটা ধূলিধূসর হলঘরে একচিলতে আলোয় গিয়ে বসে, তারপর চালুনি হাতে শুরু করে তামাকের ঝাড়াই-বাছাই। তামাক ধোলাই করার সময়ে, ঘরে ধুলোর ঝড়, অথচ সবাই নির্বিকারে নাকে চাপা দিয়ে একই ছন্দে লাঠি দিয়ে মেরেই চলেছে জড়ো করে রাখা তামাকপাতার উপর। ভয়েসওভারে জনৈক নারীকর্মীর জবানবন্দি শোনা যায়। আমরা জানতে পারি, তাদের কাজ কেবল এই হলঘরের চারদেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাঝে মধ্যেই তলব আসে ভেতরমহল থেকে— ‘দেওয়ানজি’র কাছ থেকে। এ-কথা শোনা মাত্র আমাদের মতো বহিরাগতদের কাছে ‘কাজে’র পরিসর, শোষণের ইতিবৃত্ত আচম্বিতে ছড়িয়ে পড়ে ফ্যাক্টরির ঘিনঘিনে অন্ধকারে, না-দেখা আনাচে-কানাচে।

কাজের পাশাপাশি, বা কাজের মধ্যেই, বারবার উঠে আসে যৌথতার ছবি— একসঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে পাশাপাশি হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য— সাউন্ডট্র্যাকে হাসিঠাট্টা, বাক্যবিনিময়। একসঙ্গে বসে আড্ডা, চা-পান। তবে এর সবচেয়ে উজ্জ্বল, প্রাণোচ্ছ্বল ছবিগুলো উঠে আসে মিছিল, ধরনা, অবরোধের সময়ে। ‘মোলকারিন’ ছবিতে পুনের গৃহকর্মীদের হরতাল আর মিটিং-এর একগুচ্ছ ফোটো পাশাপাশি বসিয়ে তার ওপর জুড়ে দেওয়া হয় স্লোগান। শহরের রাস্তায় মিছিলের দৃশ্য, উদ্ধত তর্জনী, তার সঙ্গে জিগির, পাল্টা-জিগির। এরকম আরও দৃশ্য ফিরে আসে ‘তাম্বাকু চাকিলা’ এবং সুদেশা-তে। যেন মনে হয়, কাজের পরিসরে একসঙ্গে থাকতে থাকতে, একসঙ্গে যুঝতে-যুঝতে তাদের মধ্যে এক অদৃশ্য বাঁধন শক্ত হচ্ছে। যে-শরীরগুলো একসঙ্গে সার দিয়ে বসে সারাদিন একঘেঁয়ে কাজ করে যেত, এখন তারাই পৌঁছে গেছে সমাবেশে, মিটিং মিছিলে। স্লোগান দিচ্ছে একসঙ্গে। শরীরগুলো এক, কিন্তু দেহভঙ্গিমা আগাগোড়া আলাদা— দৃপ্ত, গরিয়ান, আত্মবিশ্বাসী।

সব ক’টি ছবিতেই অনেকটা সময় জুড়ে থাকে আন্দোলনকারীদের তর্কবিতর্কের দৃশ্য। ‘তাম্বাকু চাকিলা’-র একদম শেষে একটি দীর্ঘ দৃশ্যের কথা ধরা যাক: একটা অ্যাসবেস্টসের দেওয়াল-তোলা ঘর, তার মধ্যে তামাক ফ্যাক্টরির বিভিন্ন বয়সের কপালে টিপ, গায়ে মলিন শাড়ি-পরা মজদুর-রা বসে আছেন মেঝে জুড়ে। কারো গালে পানের খিলি ঢিবি হয়ে রয়েছে। তাঁদের সামনে বসে ইউনিয়নের তিন পুরুষ নেতা খবর পেশ করেন— নিপানির অদূরে কুরবেট্টীর তামাক ফ্যাক্টরি থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে তিনজন মহিলাকর্মীকে। তাঁদের আশঙ্কা, এরকম ছাঁটাই অন্যান্য ফ্যাক্টরিতেও হবে। এমতাবস্থায় কিংকর্তব্য? কুরবেট্টীতে ধরনা শুরু হয়ে গিয়েছে এর প্রতিবাদে। নিপানির মজদুর-রা কি তাতে যোগ দেবেন? এরপর ছবির বাকি সাতমিনিট ধরে শুধু তর্কবিতর্ক। সেখানে পুরুষ নেতা তিনজন কেবলই স্রোতা। তাঁরা উবু হয়ে বসে নীরবে শোনেন। উল্টোদিকে বসে থাকা নিপানি তামাক কামগার ইউনিয়নের সদস্যকর্মীরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে চলেন, হিসাব করে দেখেন কুরবেট্টীর ধরনায় যোগ দিলে তাঁদের ওপর মালিকের তরফ থেকে কী-কী প্রত্যাঘাত নেমে আসতে পারে। কথোপকথন চলতে থাকে। ছবি কোনও বিশেষ উপসংহার ছাড়াই শেষ হয়ে যায়। শুধু জানা যায়, ১৯৮০ সালের জানুয়ারি মাসে কুরবেট্টী প্রতিবাদ-বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছিল।

শোনা যায়, নিপানির কাছে বেলগাঁও-তে হাইওয়ে বন্ধ করে পর্দা খাটিয়ে ‘তাম্বাকু চাকিলা’দেখানো হয়েছিল। প্রায় ৩০০০ লোক জড়ো হয়েছিল সেখানে। তারও আগে ছবির একটা রাফ্-কাট দেখানো হয়েছিল একটি স্থানীয় প্রেক্ষাগৃহে। সেখানে জমায়েত হয়েছিল প্রায় ২০০০ দর্শক, তাদের দাবি মেনে বারবার করে ছবিটা শুরু থেকে শেষ অবধি দেখানো হয়। তার সঙ্গে চলে আলাপ-আলোচনা, যা শেষ হতে-হতে রাত কেটে ভোর হয়ে যায় (উলফ পৃ. ২৮৫)। ছবির ফাইনাল কাট বানানোর আগে ইউনিয়নের সব সদস্যের সামনে সেটার পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী করা, তার ভিত্তিতে ফুটেজ রাখা অথবা বাদ দেওয়া— এও যুগান্তরের কর্মপদ্ধতিরই অংশ। অর্থাৎ একটি আন্দোলনের সময়ে বিভিন্ন ইউনিয়ন যেমন পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এগোয়, ছবি করার সময়েও যুগান্তর তেমনি তাদের সহযোগী শ্রমিকদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে তবে ছবির সম্পাদনার কাজ শেষ করত।
যে-প্রশ্ন দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেটায় ফিরি। যুগান্তর ভেঙে যাওয়ার পর, প্রায় ৪৩ বছর কেটে গিয়েছে, এই চার দশকে ছবি তোলার উপকরণও গিয়েছে বদলে, এবং আজকের দিনে সে-সব আগের চেয়ে অনেক সহজলভ্য। এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে যুগান্তরের কাজের পদ্ধতি কিন্তু বাতিল হয়ে যায়নি। এখন ইন্টারনেট ও সমাজমাধ্যমের সুবাদে সবকিছুই এই আছে–এই নেই। আন্দোলনের ছবি, ভিডিও, খবরও তাই—যদি না কেহ বা কাহারা সেগুলোকে একজায়গায় এনে পাশাপাশি বসিয়ে আন্দোলনের একটি ন্যারেটিভ খাড়া করতে পারে। তাতে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতির একটি যথাসম্ভব সৎ, কিন্তু সহজবোধ্য রূপরেখা পাওয়া সম্ভব। এর পাশাপাশি, আন্দোলনকর্মী ও চলচ্চিত্রকর্মীর সম্পর্কের ভিত্তি হবে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া: প্রতিনিয়ত আদানপ্রদান এবং আলোচনার মাধ্যমে ছবি সম্পূর্ণ হয়ে ওঠবে। আবার আন্দোলনকারীদের কাছে সে-ছবি হবে অভিজ্ঞান-অঙ্গুরীয়, বারবার তাতে ফিরে গিয়ে নিজেদের ভুলত্রুটি ছানভিন্ করার সুযোগ পাওয়া যাবে। ছবিটি কোনও নিদান দেবে না। কিন্তু আন্দোলনের একটি পূর্ণাঙ্গ নথি হিসাবে, সেটি অন্যান্য সমমনস্ক মানুষের কাছে সাফল্য-ব্যর্থতার, যাবতীয় ভুল ও ঠেকে শেখার একটি ধারাবিবরণী হয়ে থাকবে। এবং হয়ে উঠবে আমাদের নৈরাশ্য হতাশার প্রতিষেধক, পথপ্রদর্শক, ভবিষ্যতের আয়ুধ।
তথ্যপঞ্জি
Heredia, Shai & Deepa Dhanraj. “Feminist Filmmaking as ‘Bearing Witness’” in One Film at a Time. Arsenal, Institut für Film und Videokunst e.V., 2023, 16-27.
Lesage, Julia & Deepa Dhanraj. “Feminist Documentary in India.” Jump Cut, no. 31 (March 1986): 40-42.
Majumdar, Bina et al. Towards Equality: Report of the Committee on the Status of Women in India. Government of India, Ministry of Education & Social Welfare, Department of Social Welfare, 1974.
Sutoris, Peter. Visions of Development : Films Division of India and the Imagination of Progress, 1948-75. Oxford University Press, 2018.
Wolf, Nicole. “Projecting Tambaku Chaakila Oob Aali: Reflections Toward a Versatile Archive of Political Cinemas.” in Sarai Reader 09. Edited by Raqs Media Collective and Shveta Sarda. Sarai, CSDS, 2013, 284-290.
YUGANTAR. https://yugantar.film/
ছবিসূত্র: যুগান্তর ফিল্ম কালেক্টিভের ওয়েবসাইট (https://yugantar.film/)



