ঐতিহ্য থেকে উত্তরাধিকার
শীতের বিকেলে, কলকাতা শহর সাক্ষী থাকছে এক ঐতিহাসিক শিল্প-প্রদর্শনীর। ‘অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’-এর নর্থ, ওয়েস্ট ও সাউথ গ্যালারিতে, ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে নরেন্দ্রচন্দ্র দে সরকারের আজীবনের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী; চলবে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত। শিরোনাম, ‘Bengal School and the master Narendra Chandra De Sarkar।’ প্রদর্শনীর কিউরেটর অভিজিৎ সাহা।
কে এই নরেন্দ্রচন্দ্র দে সরকার? এক কথায় বলতে গেলে, জীবন্ত কিংবদন্তি। ৯৪ বছরের এক তরুণ, অদম্য উৎসাহে নিজের সৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন একটা সময়ের উত্তরাধিকার হয়ে। জন্ম ১৯৩২ সালে, কোচবিহারে। ১৯৫৭ সালে গভঃ কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট থেকে স্নাতক হয়ে, সেখানেই ১৯৫৯-এ টিচারশিপ কোর্স করেন। একই বছরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও একটি শিল্প-প্রশিক্ষণ কোর্স করেন তিনি। স্নাতক স্তরে তাঁর বিষয় ছিল ‘ইন্ডিয়ান স্টাইল অফ পেইন্টিং’। এই বিষয় নিয়েই পরবর্তীকালে আর্ট কলেজে পড়িয়েছেন। আর্ট কলেজে, তাঁর ছাত্রদের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘নরেনবাবু’ বলে।
এই প্রদর্শনীর শিরোনামে ‘বেঙ্গল স্কুল’ শব্দবন্ধটি রয়েছে। নরেন্দ্রবাবুর শিল্পকর্ম বোঝার জন্য, বেঙ্গল স্কুল সম্পর্কে কয়েকটি তথ্য জানা জরুরি। বেঙ্গল স্কুলের অন্যতম দর্শন— ‘দেশাত্মবোধ ও জাতীয় চেতনা।’ ভারত তথা বাংলায় যখন বিদেশি চিত্রকররা আঁকতে এলেন, একের পর এক বাস্তবধর্মী (Realistic) ছবি আঁকলেন পরিপার্শ্বকে কেন্দ্র করে। সেই ছবিগুলিতে যেমন ছিল পাশ্চাত্য-রীতির প্রভাব, তেমনই ঔপনিবেশিক মানসিকতায় নিয়ন্ত্রিত উপাদান। ঠিক এইখান থেকেই একদল মানুষ বেরিয়ে এসে, বাংলার নিজস্ব স্বরূপ-সংস্কৃতির খোঁজে চিত্রকলায় নিয়ে এলেন নতুন আঙ্গিক। এই ধারাকে অনেকেই আবার ‘নব্য ভারতীয় ঘরানা’ হিসেবেও চিহ্নিত করে থাকেন।
যুদ্ধ, মানবতা, শান্তি ২০২৫-এ কোনদিকে গেল পৃথিবী? পড়ুন: চোখ-কান খোলা পর্ব ১৮…
‘বেঙ্গল স্কুল’ বললেই দু’টি নাম উঠে আসে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ই.ভি হ্যাভেল। উনিশ শতকের শেষপাদ থেকে এই রীতিতে শিল্পচর্চার সূচনা, যার অন্যতম কাণ্ডারি অবন ঠাকুর। যদিও, প্রাথমিক পর্যায়ে এই রীতিকে কোনও নির্দিষ্ট নামের গণ্ডিতে বেঁধে ফেলতে চাননি তিনি। উনিশ শতকে শুরু হওয়া এই শিল্প-আন্দোলন, স্বতন্ত্র রূপ পায় বিশ শতকে এসে। বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় ১৯০২ সালে অঙ্কিত অবন ঠাকুরের ‘কচ ও দেবযানী’ ছবিটিকে স্বদেশি আঙ্গিকের প্রথম স্মারক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যদিও এর আগে অঙ্কিত, তাঁর ‘রাধাকৃষ্ণ চিত্রমালা’ও এই রীতির বাইরে নয়। খেয়াল করতে হবে, ক’বছর পরই ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পটভূমি আসছে, ফলত বিশ শতকের অনেকটা পর্বই ‘বেঙ্গল স্কুল’-এর বিকাশের ধারা।

বর্তমানে এই ধারার শেষপ্রদীপ সম্ভবত নরেন্দ্রবাবুই। অ্যাকাডেমিতে প্রদর্শিত ছবিগুলির মধ্যে যেমন এসেছে, ‘মহিষাসুর মর্দিনী’, ‘গৌতম বুদ্ধ’ ‘কার্তিকেয়’র মতো ছবি, তেমনই মহাভারতের বিভিন্ন কাহিনি ও মুহূর্তও ছবির বিষয়বস্তু হিসেবে উঠে এসেছে। উল্লেখ করা যাক কুরুক্ষেত্রের পটে অঙ্কিত কৃষ্ণ-অর্জুনের ছবিটির কথা। কৃষ্ণ, অর্জুনকে যুদ্ধর জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন; সেই ছবির নীচে উল্লেখিত ভগবতের শ্লোক। ‘কুতস্ত্বা কশ্মলমিদং বিষমে সমুপস্থিতম্।/ অনার্যজুষ্টম স্বর্গ্যমকীর্ত্তি করমর্জুন…’ অর্থ— ‘হে অর্জুন! এই অসময়ে তোমার মধ্যে এরূপ মোহ কোথা হতে এলো? শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা এইরকম আচরণ করেন না এবং এই মোহ স্বর্গ বা কীর্তি কোনোটিই প্রদান করে না।’

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, বেঙ্গল স্কুলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য— জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ও বিকাশ তুলে ধরা। ধর্মগ্রন্থের বাইরেও এই শিল্পধারার চিন্তনে, গীতাকে আত্মবিকাশের অন্যতম উপাদান হিসেবে গণ্য করা হত। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে, মহাভারতের এই বিশেষ দৃশ্যর ছবি ও সেখানে ভগবতের শ্লোকের উল্লেখ নরেন্দ্রবাবুর শিল্পচেতনা বোঝার অন্যতম উপাদান। আবার, ‘মহাভারত’ সিরিজেই ‘একলব্য’র একটি ছবি প্রদর্শিত হয়েছে, যেখানে গুরু দ্রোণের সামনে নিজের বুড়ো আঙুল বলি দেওয়ার মুহূর্ত চিত্রায়িত করেছেন শিল্পী। শিক্ষার জন্য, গুরুর জন্য এই আত্মদানের সূত্র বিভিন্ন পুরাণকথায় নিহিত রয়েছে। নরেন্দ্রবাবুর এই বিশেষ মুহূর্তগুলির নির্বাচন, চিত্রায়ন বেঙ্গল স্কুলেরই এক সজীব ধারার পরিচায়ক।
এই প্রদর্শনীতে পুরাণ ও বিভিন্ন দেবদেবীর ছবিসমূহ যেমন এসেছে, তেমনই এসেছে লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানও। টেম্পেরা মাধম্যে অঙ্কিত ‘কালীনাচ’ শীর্ষক ছবিটির এর অন্যতম উদাহরণ; এই ছবিতে বিভিন্ন জনমানসের সমাগমে, বহুরূপী সেজে কালীকথার প্রদর্শন হচ্ছে। এছাড়াও প্রদর্শিত হয়েছে ‘বর বরণে’ শীর্ষক ছবি। যা তুলে এনেছে বাঙালি বিয়েতে অনুষ্ঠিত নানা উপাদান। সমাজের নানা বাস্তবচিত্রও তুলে এনেছেন নরেনবাবু তাঁর ছবিতে। ‘বাদশা’ শীর্ষক একটি ছবিতে দেখা যায়, একজন দরিদ্র, ছিন্ন পোশাক পরিহিত মুসলমান— ময়লা বস্তায় ঠেস দিয়ে, বিড়িতে সুখটান দিচ্ছেন। ছবিটির শিরোনাম কিন্তু চমকপ্রদ। একজন দরিদ্র মানুষ, যার চালচুলো নেই, সেই-ই মুহূর্তে বিড়ির সুখটানে ‘বাদশা’। শিল্পীর মধ্যে
যে এক রসিক-মরমী সত্তা বিরাজমান এই ছবি তারই নিদর্শন। প্রতিটি ছবিতে সূক্ষ ডিটেলের ব্যবহারও বিশেষভাবে লক্ষণীয়।


এখানে টেম্পেরা মাধ্যমটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিদেশি চিত্রকররা যেমন তাঁদের ছবিতে রঙের মাধ্যম হিসেবে তেলরঙ বেছে নিতেন, তেমনি দেশীয় ছবির ঘরানায় বিশেষ করে বেঙ্গল স্কুলের ছবিগুলিতে, মাধ্যম (medium) হিসেবে উঠে আসত, ‘টেম্পেরা’। যাতে ব্যবহৃত রঙের উপাদান সবই প্রাকৃতিক। যথেষ্ট সময় ও পরিশ্রমসাধ্য টেম্পেরা মাধ্যমে আঁকা। যেহেতু প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করা হচ্ছে, রঙের ঘনত্ব, ঔজ্জ্বল্য ও স্থায়িত্ব বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হত ডিমের কুসুম।

বার্ধক্যে পৌঁছেছেন নরেন্দ্রবাবু। এক চোখে প্রায় দেখতে পান না, তবুও দু’বছর আগেই শেষ করেছেন প্রায় কুড়ি ফুটের একটি ক্যানভাসের কাজ। এই প্রদর্শনীতে অন্য ছবি ছাড়াও, সর্বমোট তিনটি বড়-বড় দীর্ঘ ক্যানভাস প্রদর্শিত হয়েছে। তিনটিরই আলদা-আলদা বক্তব্য। যার মধ্যে একটির শিরোনাম ‘দ্য প্রসেশন।’ বেঙ্গল স্কুলের মূল রীতির সঙ্গে এই ছবিটির সরাসরি তেমন সম্পর্ক নেই। ছবিটি আরও আধুনিক বলা যেতে পারে। ছবিটি একটি মিছিলকে চিত্রায়িত করছে। যেখানে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ডে লেখা, মানুষের লড়াইয়ের স্লোগান, কখনও তা ন্যায্য দাবির কথা বলে, কখনও বলে সাম্য, অধিকারের কথা। নরেন্দ্রচন্দ্র দে সরকার আসলে আধুনিক একজন শিল্পী, যিনি ঐতিহ্যের ধারক হয়েও বয়ে নিয়ে চলেছেন বর্তমান ও আধুনিক সময়ের ভাষ্য। এদিন প্রদর্শনীতে এসে নরেন্দ্রবাবু বলেন, সারাজীবনে এত ছবি কখন আঁকলেন তিনি! প্রদর্শিত ছবির সংখ্যা দেখে তাঁর নিজেরই বিস্ময় জাগছে। আসলে প্রকৃত শিল্পীরা এমনই হন। আত্মমগ্ন, চিরতরুণ।



