সংবাদ মূলত কাব‍্য : পর্ব ২৮

নবাবি কিসসা


দু’পাশে কোথাও কোথাও সমতল ক্ষেত্রে গ্রাম-জনপদ, কোথাও এবড়োখেবড়ো যথেচ্ছচারে প্রকৃতির গোলকধাঁধার বেহড়। আমাদের বাস এসবের ভেতর টানা হাইওয়ে ধরে খেরা রাঠোর গ্রামটির বাসস্টপে থামতেই আমরা মুন্না সিং রাঠোর ও তার বন্ধুদলের সঙ্গে নেমে পড়লাম। মধ‍্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ ও রাজস্থান— তিন রাজ‍্যেই সারা চম্বল উপত‍্যকার রাস্তাঘাট কিন্তু অতি চমৎকার। অনেকগুলি জাতীয় সড়ক, বেশ কিছু রাজ‍্য সড়ক,অগুন্তি স্থানীয় পথ সুগম। এ-রাজ‍্য থেকে সে-রাজ‍্যে চলে যাওয়া যায়। আমি কিন্তু সেই ১৯৮০-’৮১ সালের কথা বলছি, তখন যা দেখেছি। রাস্তাঘাট এবং পরিবহণ এত উন্নত হওয়ার কারণ অনুমেয়। এসব পথে অহরহ ছুটছে পুলিশের গাড়ি, এদিক-সেদিকে গ্রামেগঞ্জে তল্লাশিও হতে দেখেছি। রছেড় গ্রামেও একবার পুলিশবাহিনী তল্লাশিতে এসে আমাকে ও সৌগতকে দেখে ভারি অবাক হয়ে নানান প্রশ্ন শুধিয়ে গিয়েছে। পুলিশ অবশ‍্য এসেছিল খিদিরপুরের সেই ব‍্যবসায়ীর যে ভাইটি মালখান সিংয়ে দলে যোগ দিয়ে তখন আত্মগোপনে ছিলেন— তাঁর খোঁজে। তিনি রণবীররেরও দাদা।

খেরা রাঠোর গ্রামে মান সিংয়ের নাতি মুন্না ও তার বন্ধুদের সঙ্গে আমি আর সৌগত তো নাচতে নাচতেই নবাব সিং-মান সিংদের হাভেলির দিকে যাচ্ছিলাম। নাচতে হচ্ছিল, কারণ হাইওয়ের পর গ্রামে ঢোকার পথটিতে ওই প্রকৃতির মৃদু হস্তাবলেপন রয়েছে। কোথাও ঢালু, কোথাও চড়াই, ঢেউখেলানো পথটিতে শুধু হেঁটে যাওয়া যায় না, লাফাতে হয়, ঝাঁপাতে হয়। আর ম‌য়ূর আমাদের দেখে ছিটকে যায়।

তা ওইভাবে পথ পেরনোর পর দেখা গেল সমতলে গ্রামটি, তার পিছনে কৃষিক্ষেত্র। নবাব সিং রাঠোর-মান সিং রাঠোরের হাভেলিটির সামনে একটি খাটিয়ায় গায়ে কম্বল জড়িয়ে আধশোয়া ছিলেন এক অতি-বৃদ্ধ, তাঁকে ঘিরে খাটিয়া, টুল, মোড়ায় বেশ কিছু মানুষজন। বৃদ্ধের দিকে আঙুল তুলে মুন্না বলল, উনহনে বাবা নবাব সিং রাঠোর। সামনে গিয়ে মুন্না আমাদের পরিচয় দেওয়ার আগেই বৃদ্ধ খাটিয়া উঠে বসলেন। অতি-বৃদ্ধ মানুষটি বললেন, বঙ্গাল মুলুক সে দো বাবু আয়া, এখবর তাঁর কানে এসেছে। তাঁকে ঘিরে থাকা লোকজনদের দু’-একজনও বললেন, হা হা, তাঁরাও শুনেছেন। তাঁদের কারও কারও কাঁধে ছিল বন্দুক। খাটিয়ায় পড়ে ছিল নবাব সিংয়ের বন্দুকও।

চম্বল থেকে পিনহাট যাওয়ার বাসে প্রচার করেছিলাম আমাদের পত্রিকার! মৃদুল দাশগুপ্তর কলমে ‘সংবাদ মূলত কাব্য’ পর্ব ২৭…

মুন্না বলল, ১০৫ বছর বয়স হয়েছে বাবা নবাব সিংয়ের। দাদু, পিতামহকে ‘বাবা’ বলে ওরা। খাটিয়ায় উঠে বসায়, শরীর দেখলাম এ-বয়সেও খুব টানটান। প্রথমেই পরিষ্কার বাংলায় বললেন, বাংলা খুব ভাল মুলুক। বাঙালিরা খুব মিশুকে, সবাইকে আপন করে নেয়। তারপরই বললেন, ফেরার থাকার সময় বেঙ্গলে লুকিয়ে ছিলেন তিনি, বাউরিয়া সুতাকলে কাজ করেছেন তিন বচ্ছর। তাই বাংলা একটু-একটু বলতে পারেন, বুঝতে পারেন। বললেন, পরদেশি আদমিকে বাঙালিরা খাতির করে, দোস্তি পাতায়। বাঙালি বড় ভাল মানুষ। পরদেশি মানুষদের সঙ্গে আপনজনের খাতির করে বাঙালি লোক।

তহশিলদার সিং। মান সিংয়ের পুত্র

যত বছর বয়স, তার সমসংখ‍্যক খুন! শতাধিক ডাকাতি, সংঘর্ষের মামলা! শুনে আমাদের মুখচোখের ভাব দেখে বুড়ো নবাব সিং ঘোলাটে চোখদু’টি জ্বলজ্বল করে উঠল, বললেন, তারা কেউ ভাল লোক ছিল না। মান সিং-নবাব সিংয়ের অট্টালিকার পিছনে আরেকটি বড়সড় বাড়ি। সেই হাভেলিটির কোণে শ‍্যাওলা-খচিত একটি পাতকুয়ো দেখে মনে পড়ে গেল, এই পাতকুয়োয় জল ভরা নিয়ে ওই ঠাকুর বনাম বনাম ব্রাহ্মণ দুই হাভেলির মহিলাদের কলহেই বেধে গিয়েছিল চম্বলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং ঘোরতর সংঘর্ষ, প্রতিহিংসার ঘটনা।— তরুণ ভাদুড়ীর ‘অভিশপ্ত চম্বল’ বইটিতে পড়েছি। গত শতাব্দীর চারের দশকের শেষ থেকে পাঁচের দশকের মধ‍্যকাল পর্যন্ত মান সিং-নবাব সিংয়ের রাজপুত ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে ব্রাহ্মণ তলফিরামের পরিবারের ওই প্রতিহিংসার লড়াই চলেছিল। তা এমনই তুমুল, উত্তরপ্রদেশ, মধ‍্যপ্রদেশের সঙ্গে নড়েচড়ে বসে ছিল তৎকালে সদ‍্য-স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের কেন্দ্রীয় সরকার। সেনা নেমেছিল, তবে বিমানবাহিনী বোমাবর্ষণে রাজি হয়নি— সে-কথা আগেই বলেছি। পাঁচের দশকের ওই মান সিং বাহিনীর হিংসাত্মক তৎপরতা তুঙ্গে উঠেছিল— ওই সময়েই পুতলি বাঈ, চম্বলের ইতিহাসে প্রথম নারী দস‍্যুর আবির্ভাবে। ১৯৫৫ সালে পুলিশের গুলিতে ভিন্দে মান সিং নিহত হওয়া, এবং তাঁর দলের নবাব সিং, লুক্কা মহারাজ, রূপা সিং, মান সিং পুত্র তহশিলদার সিং-সহ ২০ জন ধরা পড়ায় মান সিংয়ের দলটির অবসান ঘটে। তবে গরিব চম্বলবাসীদের নানাভাবে সহায়তা করে মান সিং রবিন হুডের মান‍্যতা পেয়েছিলেন। সাম্প্রতিককালে খবর পেয়েছি , ওই গ্রামে মান সিংয়ের মূর্তিস্থাপন করে মন্দির গড়াও হয়েছে। অগুনতি হিন্দি, বাংলা, অন‍্যান‍্য ভারতীয় ভাষায় চলচ্চিত্রও হয়েছে মান সিং-পুতলি বাঈদের কাহিনি নিয়ে। ১৯৫৮ সালের ২৩ জানুয়ারি কনকনে ঠান্ডা রাতে আগ্রা জেলার পিনহাট থেকে কুমির-ঘড়িয়ালে ভরা চম্বল নদী সাঁতরে পেরতে গিয়ে উসেতঘাটে পুলিশের গুলিতে মারা যান পুতলি বাঈ। আগের একটি এনকাউন্টারে তাঁর একটি হাত কাটা যায়। একহাতেই সাঁতার কেটে পালানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি। অবসান ঘটে পুতলি বাঈয়ের দলেরও।

পুতলি বাঈ

মান সিংয়ের দাদা নবাব সিং, ছেলে তহশিলদার সিং-সহ যাঁরা ধরা পড়েছিলেন, সকলেরই ফাঁসির আদেশ হয়েছিল। সর্বোদয়ী নেতা বিনোবা ভাবে কেন্দ্র ও রাজ‍্যগুলিতে দৌড়ঝাঁপ করে তাঁদের প্রাণরক্ষা করেন। কিছুকাল কারাদণ্ড হয় তাঁদের। ১৯৮০-র ডিসেম্বরে আমরা যখন চম্বলে যাই, তখন মান সিংয়ের দলবলের সকলেই মুক্তি পেয়েছেন। মনে হয়েছিল,অনেকেই তখন মালখান সিং, ফুলন দেবী দলবলের আত্মসমর্পণের মধ‍্যস্থতা করছিলেন, বিশেষত যাঁরা, তহশিলদারের মতো সর্বোদয়ী হয়েছিলেন। তাঁদের সকলেরই তখন যথেষ্ট বয়স হয়েছে। খেরা রাঠোর গ্রামে শীতের দুপুরে রোদে বসে নবাব সিং, লুক্কা মহারাজ, রূপা— সবার সঙ্গেই আমার কথা চলছিল। মান সিং-পুত্র তহশিলদার সেদিন বাড়ি ছিলেন না। কথা বলতে বলতে নবাব সিং জানালেন, পিলভিটে জেলে ছিলেন যখন, তখন এলাহাবাদ থেকে জওহরলালের বেটি ইন্দিরা এসেছিল তাঁকে দেখতে। নবাব সিং বললেন, ‘আমাকে দেখে তো ইন্দিরা তাজ্জব। ইন্দিরা বলল, আপ হি নবাব সিং!’

নবাব বললেন, ‘তাও তো তখন আমার ফৌজি উর্দি ছিল না, হাতিয়ার ভি ছিল না।’

সৌগত ঘুরে ঘুরে ছবি তুলছিল। খাটিয়ায় বসা নবাব সিংয়ের একাকী ছবি তুলতে গিয়ে ফস করে সে লুক্কা মহারাজকে বলে বসল, ‘আপ জারা হট যাইয়ে তো!’ আমি দেখলাম, লুক্কা মহারাজের চোখদু’টিতে যেন বিদ‍্যুৎঝলক দিল। আমি দ্রুত সামলে দিলাম ওই খাটিয়ায় রোদের দিকে লুক্কা মহারাজকে ‘ইহা বৈঠিয়ে ইহা বৈঠিয়ে’ বলে বসিয়ে দিয়ে।

পরে সৌগতকে বলেছিলাম, মান সিং পুত্রবৎ স্নেহ করতেন লুক্কাকে। ’মহারাজ’ বলে ডাকতেন। মান সিংয়ের দলে সেকেন্ড ইন কম‍্যান্ড ছিলেন লুক্কা মহারাজ।

সৌগত রায়বর্মন

কুয়োর ওপাশে ব্রাহ্মণ পরিবারটির অনেকে কৌতূহলী উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিলেন আমাদের দেখে। বিশেষত বালক, কিশোররা। সম্ভবত, এরা তলফিরামের নাতিপুতি। ‘আইয়ে আইয়ে’ বলে মুন্নারাই ডেকে এনে বসাল ওদের। ছয়ের দশকে বিনোবা ভাবে এসে রাজপুত ঠাকুর আর ব্রাহ্মণ পরিবারটির মিটমাট ঘটিয়ে দিয়েছেন। এদিনও আমার সামনেই মুন্না সিং রাঠোর আর দৌলতরাম করমর্দন করল।

আমি একটি লেখার প‍্যাড এগিয়ে দিতেই পরিষ্কার হাতের লেখা ১০৫ বছরের মহা-বৃদ্ধ লিখে দিলেন, চম্বলে আসা বাংলা মুলুকের এই দু’জন অমুক আর অমুক পত্রিকার ফোটো খিচনেওয়ালা-কে সবাই যত্ন করবেন। খাতির করবেন। এদের যেন কোনও অসুবিধা না হয়।

ফেরার সময় মান সিং-নবাব সিংয়ের নাতি আমাদের বাসস্টপে বাসে তুলে দিল। ঠিক তার আগে, ওই চড়াই-উতরাই দিয়ে বাসস্টপের দিকে যখন যাচ্ছি, দেখা গেল উল্টোদিক থেকে একদঙ্গল মানুষ আসছেন। মাঝবয়সি সুবেশ মানুষজন। তাঁরা এক ব‍্যক্তিকে ধরে ধরে নিয়ে আসছেন। মুখোমুখি হতেই চমকে গেলাম! ধরে-ধরে নিয়ে যাওয়া মানুষটির একটি পায়ে উরুর কাছে ধুতি শুকিয়ে যাওয়া কালো রক্তে লেপ্টে রয়েছে। লোকটি কাতরাচ্ছেন। মুন্নার সঙ্গে কথা বলার পর তাঁরা খেরা রাঠোর গ্রামের দিকে রওনা হলেন। চলতে চলতে মুন্না আমাদের জানাল, পাশেই একটি গ্রামে নহর (খাল) কাটা হচ্ছে। তা নিয়ে বিবাদ। গুলি চালিয়ে দিয়েছে। বাবা নবাব সিংয়ের কাছে যাচ্ছে… বিচারের আশায়।