সংবাদ মূলত কাব্য : পর্ব ৩১

ডাকু জাদুকর

ক্রমে একটা কথা বুঝতে পেরেছিলাম, মালখান সিং আত্মসমর্পণে ইচ্ছুক, এটা চম্বলে সর্বত্র রটে যাওয়ায় প্রশাসন ছিল অপেক্ষারত। সরকারি ও সর্বোদয়ী নেতাদের ভেতর ওই সময় ছিল মালখান সিংকে সদলে আত্মসমর্পণ করানোর তৎপরতা। তাই সে-সময় মালখান সিং ও তাঁর দলবলকে ধরপাকড়ের ব‍্যাপারে তেমন কোনও অভিযান ছিল না, পুলিশ ছিল ঢিলেঢালা। কিন্তু ফুলন দেবী ও তার বাহিনীকে ধরার জন‍্য  ছিল মধ‍্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান— তিন রাজ‍্যের পুলিশের জোরদার অভিযান। এইকারণেই মান সিং-পুত্র সর্বোদয়ী নেতা তহশিলদার সিং মালখান সিংয়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার বিষয়ে বলেছিলেন, মিল যায়েগা। কিন্তু ফুলন দেবীর দেখা পাওয়ার কোনও আশা দেখাননি। বরং নিরাশই করেছেন।

আমরা মাঝে মাঝেই মুরেনা, ভিন্দ, আগ্রা, জালাউন শহরগুলিতেও যেতাম। কখনও-কখনও দু-একদিন এসব শহরে থেকেছিও। মফস্বল শহরে যেমন থাকে, এসব শহরে তেমন ছোট-ছোট হোটেল আছে। আগ্রাতে তো আছেই। এসব হোটেল থেকে খুচরোখাচরা খোঁজখবরও পেয়েছি। 

একদিন মুরেনা গিয়েছি, জেলার সদর শহর। বিকেলে দেখলাম, মুরেনা জেলা মেলা হচ্ছে স্থানীয় এক মাঠে। উদ্বোধনে এসেছেন জেলাশাসক। জেলাশাসকের সঙ্গে কথা হল। খুশি-খুশি ভাব দেখিয়ে তিনিও বললেন, কয়েকদিনের মধ‍্যে মালখান সিং আত্মসমর্পণ করবেন। সে-সময় ফুলন দেবীর চেয়ে মালখান সিংয়ের নামডাক বেশি ছিল। এর কারণ তখনও ফুলনের বর্ণময় জীবনের বাকি বছরগুলি আগামীর জিম্মায় ছিল।

ফুলন দেবী থেকে পুতলিবাই, নারী ডাকাতদের কাহিনি! মৃদুল দাশগুপ্তর কলমে ‘সংবাদ মূলত কাব্য’ পর্ব ৩০…

মাধো সিং

মুরেনা শহরেই একদিন দেখলাম দেওয়ালে-দেওয়ালে, জাদু প্রদর্শনীর এক পোস্টার! ফরিদাবাদের দাউ দয়াল ইনস্টিটিউশন স্কুলের অডিটোরিয়ামে সপ্তাহব‍্যাপী ম‍্যাজিক দেখাবেন ‘চম্বল সরকার’ ডাকু মাধো সিং। ছয়ের দশকের খুঁখার বাগি মাধো সিং আত্মসমর্পণ ও কারাবাসের পর মুক্তজীবনে জাদুকর হয়েছেন, চম্বল মুলুকের শহরগুলিতে ম‍্যাজিক দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন— এ-খবর জানতাম। তাঁকে এভাবে পেয়ে যাব, ভাবিনি। ছয়ের দশকে মাধো সিং, মোহর সিং, পান সিং— এঁরা সেসময়ের চম্বলের ত্রাস। পাঁচের দশকের শেষে সর্বোদয়ী নেতা বিনোবা ভাবে দস‍্যুনেতাদের বাগি (বিদ্রোহী) আখ‍্যা দিয়ে আত্মসমর্পণ করিয়েছিলেন, সাতের দশকের গোড়ায় বিনোবার শিষ‍্য জয়প্রকাশ নারায়ণকে চম্বলে নিয়ে এসেছিলেন মাধো সিং। জয়প্রকাশের মধ‍্যস্থতায় আত্মসমর্পণ করেছিলেন মাধো সিং, মোহর সিংরা।

জয়প্রকাশ নারায়ণ

যেদিন ফরিদাবাদের দাউ দয়াল ইনস্টিটিউশনের অডিটোরিয়ামে চম্বল সরকার মাধো সিংয়ের জাদু প্রদর্শনী শুরু হবে, সেই দিনটিতেই  সকালে ফরিদাবাদ পৌঁছে গেলাম আমরা। অম্বা থেকে আগ্রা হয়ে ফরিদাবাদ যায় বাস। রিকশা চেপে দাউ দয়াল ইনস্টিউশনের গেটে নামতেই দেখলাম নানজন মিলে ওই জাদু প্রদর্শনীর প্রস্তুতি চালাচ্ছে। একটি  বড়সড় চেয়ারে বসে তাদের নির্দেশাদি দিচ্ছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়েসের লম্বা একটি লোক, বেশ সুঠাম চেহারা। চম্বলের দস‍্যুনেতাদের মত মস্ত গোঁফ নয়, ফিনফিনে গোঁফের হাসি-হাসিমুখ মানুষটির। পরনে ধূসর একটি সাফারি। তিনি মাধো সিং, ছয়ের দশকের খুঁখার বাগি, এখন জাদুকর চম্বল সরকার। তাঁর পাশে অনুরূপ একটি চেয়ারে বসে আছেন এক সন্ন‍্যাসী। আমরা পরিচয় দিতেই সহাস‍্যে আমাদের অভ‍্যর্থনা জানিয়ে মাধো বললেন, বঙ্গাল সে আয়া আপলোগ! জাদু কা দেশ! মাধো জানালেন, জাদুসম্রাট পিসি সরকারের দলের প্রদীপজি, প্রদীপ দাসের কাছে জাদুবিদ‍্যা শিখেছেন তিনি। পিসি সরকার হলেন তাঁর গুরুর গুরু। তাই তিনি ‘চম্বল সরকার’। এবার ওই সন্ন‍্যাসীও হাসি হাসি মুখে আমাদের পরিষ্কার বাংলায় বললেন, বাঙালি! কোথায় বাড়ি আপনাদের? আমি শ্রীরামপুরে থাকি, সৌগত কোন্নগরে,শুনে যেন আলোকিত হল ওই সন্ন‍্যাসীর মুখখানি! সৌগত জিজ্ঞেস করল, আপনার বাড়ি হুগলি জেলায়? সন্ন‍্যাসী নিরুত্তর থাকলেন। মনে পড়ল, পূর্বাশ্রমের কথা সন্ন‍্যাসীরা স্মরণ করেন না। হায়, মাধো সিংয়ের গুরুদেব ওই সন্ন‍্যাসীর নাম আমি ভুলে গিয়েছি। ভেতর থেকে দুটো চেয়ার এসে গেল আমাদের দুজনের জন‍্য। বাগি সর্দার, চম্বল সরকার মাধো সিং শুরু করলেন তাঁর কহানি। বাঙালি বলে খুব খাতির করতে লাগলেন আমাদের।

পিসি সরকার

মাধো সিংয়ের জন্ম আগ্রা জেলার চম্বল কিনারে পিনহাটের গড়িয়া বধরেনা গ্রামে চাষি পরিবারে জন্ম। রাজপুত রাইফেলসে্র সেনা হাসপাতালে কম্পাউডার ছিলেন। ওই কাজ করতে করতেই কৈশোরকালের এক অসম্মানের ঘটনা মনে আসতে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলল অন্তরে। গ্রামের এক দুষ্টচক্র চোর অপবাদ দিয়ে তাঁকে জেলে পাঠিয়েছিল। কাঁধে বন্দুক ঝুলিয়ে মাধো চলে গেলেন চম্বলের বেহড়ে। আগ্রা জেলার ওই চম্বল তীরবর্তী পিনহাট অঞ্চলের বেহড় তখন তোলপাড় হচ্ছে মোহর সিংয়ের দাপাদাপিতে। স্বজন-পরিজন, দোস্ত-বেরাদরদের সশস্ত্র দল গড়ে মাধো সিং হাত মেলালেন মোহর সিংয়ের সঙ্গে। মধ‍্যপ্রদেশের ভিন্দ-মুরেনার বেহড়ে তখন আরেক চাকরি-ছুট ফৌজি, যিনি কিনা টোকিও অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ পদকজয়ী, সেই পান সিং তোমর হিংসা ছড়াচ্ছেন। পাঁচের দশকে মান সিং-পুতলি বাইয়ের দাপটের পর, ছয়ের দশকেও মশমশ করছিল চম্বল— মাধো-মোহর-পান সিংয়ের গুলিগোলায়।

পান সিং তোমর

৫০টি খুনের মামলা ছিল প্রাক্তন বাগিসর্দার অধুনা জাদুকর চম্বল সরকারের বিরুদ্ধে। অপহরণের মামলা শতাধিক। ‘এত অস্ত্রশস্ত্র, আধুনিক অত‍্যাধুনিক মারণাস্ত্র কোথা থেকে পান আপনারা?’ প্রশ্ন করলাম। হেসে, অকপটে  মাধো বললেন, ‘সেনাবাহিনীতে আমাদের দোস্তরা আছেন। তাছাড়া এই অঞ্চল থেকেই তো সেনাবাহিনীতে যোগ দেয় অনেকে। যুদ্ধ বাঁধলে, এই তো চিন-ভারত, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, এসব সময় আহত জওয়ান বলে দেয়, তার অস্ত্র খোয়া গেছে।’ মাধো বললেন, ‘সেসব অস্ত্র চলে আসে আমাদের কাছে।’ শুনে খুব তাজ্জব হলাম। মাধো বলে চললেন, ‘ওজনে একপাল্লায় হাতিয়ার, আরেক পাল্লায় সোনা, গয়নাগাটি সাজিয়ে, ওই  সোনায় অস্ত্র কিনি আমরা।’

‘এই তো’, মাধো বললেন, ‘চিন-ভারত যুদ্ধের সময় আমেরিকা ভারতকে দিয়েছিল এসএলআর, সেলফ লোডিং রাইফেল, যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই আমাদের হাতে চলে এল ওই এসএলআর!’

চোখ কপালে উঠল আমার।

মুহুর্মূহু চমৎকৃত হওয়ার আরও অনেক বাকি ছিল। মাধো বললেন, ‘বাংলায় নকশালবাদী রাজনীতি তাঁকে খুব মাতিয়ে দিয়েছিল। কলকাতায় এসেছিলেন ১৯৭১ সালে, নকশালপন্থী হওয়ার বাসনায়। সোজা চলে গিয়েছিলেন জ‍্যোতি বসুর বাড়ি। কিন্তু অনেক অনুরোধ জানালেও সে-বাড়িতে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা ঢুকতে দিলেন না।’

জ্যোতি বসু

জ‍্যোতি বসু! চমকে উঠে আমি বললাম, ‘জ‍্যোতি বসু তো নকশালপন্থী নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন সিপিএম দলের নেতা, যুক্তফ্রন্ট সরকারের উপমুখ‍্যমন্ত্রী ছিলেন বাংলায়, যুক্তফ্রন্ট তো তখন ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।’ আমি বললাম, ‘এখন তিনি বামফ্রন্টের মুখ‍্যমন্ত্রী।’

মাধো সিং বললেন, “তাই নাকি! আমাকে এখনকার লোকজন বলল, জ‍্যোতিবাবুই নকশালবাদী নেতা। তা-ই গিয়েছিলাম তাঁর বাড়ি। ঢুকতে দিল না। পুলিশের নজর এড়িয়ে কলকাতায় ক’দিন এখানে সেখানে ছিলাম। একটা চায় দুকানে প্রদীপ দাসের সঙ্গে আলাপ পরিচয়। আমার জাদুগুরু, জাদুসম্রাট পিসি সরকারের দলে ছিলেন। আড়াই মাস কলকাতায় চুপচাপ থেকে প্রদীপ গুরুজির কাজ থেকে জাদুবিদ‍্যা শিখ‍লাম।”

এরপর সৌগতর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘আজকে জাদু দেখানোর সময় বাঙ্গালিবাবু তুমকো ভ‍্যানিস কর দুঙ্গা।’ ভয়ে-ভাবনায় সিঁটিয়ে গেল গাঁট্টাগোঁট্টা আলোকচিত্রী সৌগত রায়বর্মন।

সত‍্যি-সত‍্যিই ফরিদাবাদের দাউ দয়াল ইনস্টিটিশনের অডিটোরিয়ামে আমাদের ওই উদ্বোধনী দিনে মঞ্চে তুলে দিলেন জাদুকর চম্বল সরকার মাধো সিং। বললেন, ম‍্যাজিশিয়ান চম্বল সরকারের জাদু দেখতে জাদুর ভূমি বাংলা থেকে দুই বাঙালিবাবু এসেছেন। তালি বাজাও, তালি বাজাও। উল্লাসের করতালি বাজল ছেলে-বুড়ো, পুরুষ-মহিলার ভিড়ঠাসা ওই অডিটোরিয়ামে।

এর আগে দুপুরে গুঁইগাই করা সৌগতকে বশে এনেছেন অদৃশ‍্য হওয়ার সহজ কৌশলটি শিখিয়ে। কয়েকবার তালিম দিয়ে। কিছুই না, মঞ্চের পিছনের পরদা, যাকে বলে ব‍্যাকসিন, তার সঙ্গে মেলানো মানুষকে ঢেকে দেওয়া যায়, এমন সাইজে একটি বোর্ড মঞ্চে থাকবে, জাদুদণ্ড ছোঁয়ানোমাত্র অদৃশ‍্য হয়ে যাবে সৌগত। দর্শকরা তেমনই দেখবেন।

যথাকালে ফরিদাবাদের দাউ দয়াল ইনস্টিটিউটের মঞ্চে ভ‍্যানিশ হয়ে গেল সৌগত।