গোলকধাঁধার বেহড়
সৌগত অদৃশ্য! জাদুকর চম্বল সরকার মাধো সিংয়ের চমকপ্রদ জাদুতে দর্শক আসন থেকে সবাই সৌগতকে অদৃশ্য দেখলেও, গ্রিনরুমে বসা আমি ওই বোর্ডের আড়ালে থাকা সৌগতকে দেখতে পাচ্ছিলাম। হাসি-হাসি মুখে প্রস্তরমূর্তির মতো দাঁড়িয়েছিল সে। ওই নির্দেশই তাকে দিয়েছিলেন জাদুকর মাধো সিং, তালিমের সময়। মঞ্চে জাদুকর মাধো সিং মাথা নুইয়ে করতালিরত দর্শকদের অভিনন্দন গ্রহণ করছিলেন। হঠাৎ তিনি হাতের জাদুদণ্ডটি দোলালেন। দাউ দয়াল ইনস্টিটিউটের মঞ্চ তখন ধোঁয়ায় ঢেকে গেল। তখনই আমাদের আলোকচিত্রী কোন্নগরের নবগ্রামের আমুদে তরুণটি, সৌগত রায়বর্মন, ওই বোর্ডের আড়াল থেকে হাসতে-হাসতে বেরিয়ে এল। জনসমুদ্রে জোয়ার লাগল যেন, করতালির বন্যা বইল। মাধো সিং দুপুরে তাকে তালিম দেওয়ার সময় এসবই শিখিয়ে দিয়েছিলেন।
রাতে খাওয়াদাওয়ার পর মাধো সিং তাঁর কহানি, জীবনকাহিনি আরও বললেন।
১৯৭২ সালের গোড়ার দিক। পাটনা শহর। পাটনায় কাঠগোলাগুলিতে হাতে ব্রিফকেস, চোখে রিমলেস চশমা আঁটা এক সুবেশ ভদ্রলোককে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেল। দরদস্তুর করছেন, মধ্যপ্রদেশের মুরেনায় তাঁর কাঠগুদাম আছে। ওই অঞ্চলের বন কেটে কাঠ চেরাই করে পাঠাতে পারে। সদ্য কলকাতায় কয়েকটি গোলায় পাঠিয়েছেন, পাটনায়ও পাঠাতে চান, এই সব দরদাম করছেন। দু-চার দিন এইসব ঘোরাঘুরি করে ওই লোকটি হঠাৎ হাজির পাটনায় কদমকুয়ায় জেপি-র বাড়িতে। সর্বোদয়ী নেতা, জয়প্রকাশ নারায়ণের বাড়িতে তো কতজনই আসেন, সেসব সকালবেলায়। আচার্য বিনোবা ভাবে-র প্রিয়পাত্র জয়প্রকাশ নারায়ণের নামডাক সেসময় বিহার ছাপিয়ে দিল্লিতক। পাটনায় তখন তিনি জনচিত্তজয়ী জেপি। যেখানেই অশান্তি, সেখানেই সর্বোদয়ের শান্তিপ্রয়াসে জেপি। মুখ্যমন্ত্রী ভোলা পাসোয়ান শাস্ত্রীজি খুবই খাতির করেন তাঁকে। ব্রিফকেস হাতে লোকটি যখন জেপি-র বাসভবনে এলেন, তখন ঘোর দুপুর। জেপি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, দ্বারভাঙায় এক ঝামেলা থামিয়ে এসেছেন। ভরদুকুরে লোকটি এসে ইজিচেয়ারে তন্দ্রাচ্ছন্ন জেপি-কে বলল, তিনি চম্বল মুলুকের এক কাঠ-ব্যবসায়ী, মাধো সিং, মোহর সিংরা, খুঁখার ডাকুরা তাঁকে পাঠিয়েছে। লোকটি বললেন জয়প্রকাশকে, ‘আপনি চলুন স্যর, আপনাকে চম্বলে যেতে হবে। মাধো, মোহররা স্যারেন্ডার করতে চায়।’ কাতরভাবে লোকটি বললেন, আপনি না গেলে পুলিশ ওদের এনকাউন্টার করে দেবে। আপনি চলুন ভিন্দে, বা মুরেনায়।
ডাকাতি ছেড়ে জাদুকর হয়েছিলেন মাধো সিং! মৃদুল দাশগুপ্তর কলমে ‘সংবাদ মূলত কাব্য’ পর্ব ৩১…
এককথায় সেই আবদার খারিজ করে দিলেন জয়প্রকাশ। চম্বল নিয়ে সর্বোদয়ীরা বিরক্ত ছিলেন। হতাশও। মান সিং, পুতলিবাই নিহত হওয়ার পর নবাব সিং-তহশিলদার সিংদের ফাঁসির দড়ি থেকে বাঁচিয়ে আত্মসমর্পণ করিয়ে আচার্য বিনোবা ভাবে তাদের বাগির (বিদ্রোহী) মর্যাদা দিয়েছিলেন। চম্বলে সর্বোদয়ীদের শান্তিপ্রয়াস চালিয়ে সরকারের কাছে বিনোবা আশা প্রকাশ করেছিলেন, চম্বলে আর অশান্তি ঘটবে না। বিনোবার ওই আশ্বাসে তিন রাজ্য সরকার, জওহরলাল নেহরুর কেন্দ্রীয় সরকার চম্বলে ঢালাও উন্নয়নের কাজ করেছিল। কিন্ত ছয়ের দশকেও চম্বলে মাধো, মোহর, পান সিংয়ের উদ্ভব ও মারকাটারি কার্যকলাপে সর্বোদয়ীরা তিতিবিরক্ত হয়েছিলেন। ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছিলেন ওই গান্ধীবাদীরা। কাঠব্যবসায়ী ওই লোকটিকে জয়প্রকাশ বলে দিলেন, আমি যাব না। কাকুতিমিনতি করতে থাকলেন লোকটি, পুলিশ ওদের মেরে দেবে স্যর! চলুন না স্যর। একটি বার। বিরক্ত হয়ে জেপি বলে ফেললেন, তা বাপু তোমাকে পাঠিয়েছে কেন! তারা নিজেরা কেউ আসতে পারেনি?
ব্রিফকেসটি টেবিলে রেখে, চশমাটি খুলে লোকটি বললেন, হম হি মাধো সিং হুঁ, স্যর।
ব্রিফকেস হাতে লোকটি যখন জেপি-র বাসভবনে এলেন, তখন ঘোর দুপুর। জেপি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, দ্বারভাঙায় এক ঝামেলা থামিয়ে এসেছেন। ভরদুকুরে লোকটি এসে ইজিচেয়ারে তন্দ্রাচ্ছন্ন জেপি-কে বলল, তিনি চম্বল মুলুকের এক কাঠ-ব্যবসায়ী, মাধো সিং, মোহর সিংরা, খুঁখার ডাকুরা তাঁকে পাঠিয়েছে। লোকটি বললেন জয়প্রকাশকে, ‘আপনি চলুন স্যর, আপনাকে চম্বলে যেতে হবে। মাধো, মোহররা স্যারেন্ডার করতে চায়।’ কাতরভাবে লোকটি বললেন, আপনি না গেলে পুলিশ ওদের এনকাউন্টার করে দেবে। আপনি চলুন ভিন্দে, বা মুরেনায়।
ইজিচেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন জয়প্রকাশ নারায়ণ। তখন জয়প্রকাশ বললেন, বেশ, তাহলে যাওয়া যাবে চম্বলে। এরপর দিনক্ষণ স্থির হল। ১৯৭২ সালের এপ্রিলে মধ্যপ্রদেশে লোকনায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণের সামনে বন্দুক, অস্ত্রশস্ত্র নামিয়ে আত্মসমর্পণ করলেন মাধো সিং, মোহর সিংরা, সেই সঙ্গে মাধোর দলের প্রায় ৫০০ সদস্য, মোহরের দলের ১৫০ সদস্য সারেন্ডার করে ওই আত্মসমর্পণসভায় জেপি-র পায়ের সামনে একনলা, দোনলা, রাইফেল, স্টেনগান, এসএলআরের পাহাড় গড়ে দিল। মধ্যপ্রদেশের চম্বল কিনারে ওই আত্মসমর্পণের সভায় হাজার-হাজার গ্রামবাসীর ভিড় জমেছিল। সারেন্ডারের শর্ত হিসেবে মাধো-মোহররা জানিয়েছিলেন, তাদের কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া চলবে না। হালকা বিচার করে শাস্তি দিতে হবে, রাখতে হবে খোলা জেলে। জীবিকা নির্বাহে চাষের জমিও চেয়েছিলেন মোহর সিং। জেপি-র পরামর্শে মধ্যপ্রদেশ সরকার সেসব মেনেও নিয়েছিল। মাধো সিংয়ের বিরুদ্ধে ছিল ৪০টি খুন ও শতাধিক অপহরণের মামলা। মাথার দাম ছিল ১০ লাখ। মোহর সিংয়ের ৬০০ মামলার ৪০০টিই ছিল খুনের মামলা, ২২ লাখ থেকে ১ কোটির ওপরে উঠেছিল মাথার দাম। তবে জয়প্রকাশের মধ্যস্থতায় তাঁদের শাস্তি হয়েছিল লঘু মাত্রার। খোলা জেলে তাস খেলে, ক্যারম খেলে, নেচেগেয়ে ৭/৮ বছর জেল খেটে বেরিয়ে আসেন তাঁরা। সেনা হাসপাতালে কাজ করা মাধো সিং ছিলেন শহুরে মানসিকতার ফিটফাট মানুষটি, স্বাভাবিক জীবনে ম্যাজিক দেখিয়ে বেরিয়েছেন। আর পান সিং তো টোকিও ওলিম্পিকের ব্রোঞ্জ পদকজয়ী, তিনি ছিলেন কেতাদুরস্ত। হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর বায়োপিক হয়েছে ‘পান সিং তোমর’। মোহর সিং ছিলেন একেবারেই গ্রামীণ মানুষ। দস্যুবৃত্তি নেওয়া খেতিকিসান। জেল থেকে বেরিয়ে গ্রামীণ সম্পন্ন মানুষটি রাজনীতিতে যোগ দেন। মধ্যপ্রদেশ কংগ্রেস মোহর সিংকে লুফে নেয়। মেহগাঁও পুরসভা ভোটে দু’বার জিতে কমিশনার হয়েছিলেন তিনি। এরপর তৎকালে সদ্যোজাত ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেন তিনি। বিধানসভায় দাঁড়ানোর টিকিট পেয়েছিলেন মোহর, জিততে পারেননি তিনি। মাধো সিংয়ের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল নিবিড়। হিন্দি চলচ্চিত্র ‘চম্বল কি ডাকু’-তে অভিনয় করেন মোহর সিং। এরপর হিন্দি ছবি ‘পকড়’-এ মোহর, মাধো দু’জনেই অভিনয় করেন।


আমি যখন চম্বলে গিয়েছিলাম, ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে, মোহর তখন বিজেপি নেতাদের সঙ্গে হিল্লিদিল্লি ঘুরছেন। তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি। এখন জানছি, ২০২০-তে মারা গিয়েছেন মোহর সিং। এর বেশ কয়েক বছর আগে, মারা গিয়েছেন মাধো সিং, জাদুকর চম্বল সরকার। ‘আজকাল’ পত্রিকা থেকে অবসর নেওয়ার আগে ওই দুঃসংবাদ পেয়ে,সে খবর পত্রস্থ করেছিলাম।
১৯৭২-এ জয়প্রকাশ নারায়ণের মধ্যস্থতায় মাধো সিং, মোহর সিংদের আত্মসমর্পণের ওই সভায় মধ্যপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শ্যামাচরণ শুক্ল ও পুলিশ প্রশাসনের সামনে জেপি আশা প্রকাশ করেছিলেন, এরপর চম্বলে শান্তি বিরাজ করবে। বদলা নেওয়ার বাসনা অন্তর্হিত হবে। সর্বোদয়ী নেতা আচার্য বিনোবা ভাবে-ও নবাব সিং, তহশিলদার সিংদের সমর্পণের পর এমন আশা প্রকাশ করেছিলেন। তা হয়নি।
মাধো, মোহরদের আত্মসমর্পণের পর একদশক ঘুরতে না ঘুরতে চম্বলে সহিংস আবির্ভাব ঘটল মালখান সিং আর ফুলন দেবীর।
১৯৮০-র ডিসেম্বরে আমরা যখন চম্বলে পৌঁছেছিলাম, তখন ঠাকুরদের গ্রামে গণধর্ষিতা ফুলন প্রতিহিংসার আগুনে দপদপ জ্বলছেন, বদলা নেওয়ার ছক কষছেন। আর অগুনতি খুনখারাপি সেরে মালখান সিংয়ের ক্রোধ নির্বাপিত হয়েছে, সারেন্ডারের উপায় খুঁজছেন। মাল্লা সম্প্রদায়ের ফুলনের মতোই মালখান সিংও ছিলেন মির্ধা সম্প্রদায় ভুক্ত, পিছড়ে বর্গ। সেসময় ঠাকুরদের সঙ্গে পিছড়ে বর্গের ওই তীব্র রেষারেষির ভেতর আমরা ঢুকে পড়েছিলাম গোলকধাঁধার বেহড়ে।




