‘It will have blood: They say blood will have blood.
Stones have been known to move and trees to speak…’
(Macbeth, William Shakespeare)
কত গাছ আমরা ছেড়ে আসি। ভুলে যাই। যেভাবে ফেলে আসি পুরনো বাড়ি বা পাড়া, সেভাবেই। আমাদের স্মৃতিতে সেইসব ছেড়ে আসা, উপড়ে ফেলা, হারিয়ে যাওয়া গাছের বাগান তৈরি হয়। গাছ কি কথা বলে? গাছকে কবর দেওয়া যায়? গাছের পুনর্জন্ম হয়? ধরা যাক, একটা ডুমুর গাছ? একটি ডুমুর গাছের ছায়ায়, এক নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে লালিত হতে পারে প্রেম? প্রেমের সমস্তরকম রূপ? সেই ডুমুর গাছ সময়ের কাছে পরাজিত হয়ে আবার জন্মাতে পারে নতুন কোনও জায়গায়? সমস্ত জাতিবিদ্বেষ, যৌন সংঘাত, রক্তপাত, ধ্বংসস্তুপ পেরিয়ে, দেশান্তরে? জন্মাতে পারে একই উদ্দেশ্য নিয়ে? একটি গাছ কি হতে পারে মানুষের অন্তর্লীন কথাস্রোতের নিরন্তর ভাষ্যকার? এক মৃতের চিন্তাপ্রবাহের নিরুচ্চার প্রকাশক?
ব্রিটিশ-তুর্কি সাহিত্যিক এলিফ শাফাক তাঁর ‘দ্য আইল্যান্ড অফ মিসিং ট্রিজ’ উপন্যাসটি উৎসর্গ করেছেন শিকড় থেকে উপড়ে তোলা মূলহীন, ভাসমান, অন্য দেশে বসত গড়তে বাধ্য হওয়া মানুষদের, এবং সেই সমস্ত গাছেদের, যাদের আমরা ফেলে এসেছি অতীতে অথচ যারা এখনও আমাদের স্মৃতিমৃত্তিকায় গভীরভাবে প্রোথিত। বইটির উৎসর্গ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে—
‘to immigrants and exiles everywhere,
The uprooted, the rerooted, the rootless,
And to the trees we left behind,
rooted in our memories…’

শাফাক ‘দ্য আইল্যান্ড অফ মিসিং ট্রিজ’ উপন্যাসে ‘দ্য হ্যাপি ফিগ’ নামের একটি পানশালার কথা বলেছেন, যেটি আসলে উপন্যাসের চরিত্রদের জন্য একটি সুরক্ষিত, নিরাপদ অল্টারনেটিভ স্পেস হিসেবে কাজ করে গিয়েছে। এই সরাইখানার ছাদ ফুঁড়ে উঠেছে একটি ডুমুর গাছের ডালপালা। মূল প্রেক্ষাপট ১৯৭৪ সাল। গ্রিসের সাইপ্রাস দ্বীপ তখন গ্রিক সাইপ্রিয়ট এবং তুর্কি সাইপ্রিয়টদের মধ্যে জাতিগত সংঘাতে উত্তাল। একই সঙ্গে সমাজে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যক্ত সমকামী এবং ভিন্ন যৌনতার মানুষেরা। অথচ দেখা যায়, এই হ্যাপি ফিগ সরাইখানা চালায় ইয়োরোগোস এবং ইয়ুসুফ— এক সমকামী যুগল। এই পানশালাকে তারা করে তোলে এমন এক আশ্রয়, যেখানে যে-কোনও প্রেমই পায় উপযুক্ত সুশ্রূষা। এই পানশালায় নিয়মিত দেখা করে এক গ্রিক সাইপ্রিয়ট তরুণ কোস্তাস এবং একজন তুর্কি সাইপ্রিয়ট তরুণী দেফনে। গ্রিক এবং তুর্কি সাইপ্রিয়টদের রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্ব তখন চরমে। তার সঙ্গে ভিন্ন যৌনতার মানুষদের প্রতি সামাজিক বিদ্বেষ নিয়েছে চূড়ান্ত সহিংসতার রূপ। এইরকম অস্থির সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘দ্য হ্যাপি ফিগ’ হয়ে ওঠে জাতি-শ্রেণি-লিঙ্গনিরপেক্ষ ভালবাসার এক নিশ্চিন্ত বসবাসস্থল। ইয়োরোগোস এবং ইয়ুসুফ যেভাবে নিজেদের প্রেমকে রক্ষা করতে চেয়েছে, ঠিক সেভাবেই নিরাপদে রাখতে চেয়েছে কোস্তাস এবং দেফনের ভালবাসাকেও। কিন্তু অবধারিতভাবেই এই আশ্রয় শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সমকামিতাবিদ্বেষী সহিংসতার মুখে পড়ে ইয়োরোগোস এবং ইয়ুসুফের জীবন বিপন্ন হয়। দু’জনই নিরুদ্দেশ হয়। অন্যদিকে কোস্তাস এবং দেফনের সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়ায় গ্রিক এবং তুর্কি সাইপ্রিয়টদের রাজনৈতিক এবং জাতিগত দ্বন্দ্ব। ১৯৭৪ সালে সাইপ্রাসে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায় সামাজিক এবং রাজনৈতিক অরাজকতা চূড়ান্তে পৌঁছয়। কোস্তাসকে তার পরিবার থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ইংল্যান্ডে। কোস্তাস চিঠির মাধ্যমে দেফনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করলেও যুদ্ধের কারণে সেই প্রচেষ্টা দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং একসময় তাদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। এই অবস্থায় দেফনে আবিষ্কার করে যে, সে গর্ভবতী। যুদ্ধের আবহে এবং রাজনৈতিক নৈরাজ্যের মধ্যে সন্তান প্রতিপালন করা সম্ভব নয় মনে করে সে গর্ভপাত করার সিদ্ধান্ত নেয়। জীবনের এই কঠিন সিদ্ধান্তে তার পাশে দাঁড়ায় কিন্তু সেই ইয়োরোগোস এবং ইয়ুসুফ। গর্ভপাতের প্রক্রিয়া চলাকালীন সরাইখানার বাইরে সহিংস সংঘাত শুরু হয়। তারা দু’জন বাইরের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে গিয়ে আর ফিরে আসে না। ফলস্বরূপ দেফনের গর্ভপাতের প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এরপর সে এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়, যার নাম নিজের বন্ধুদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে সম্মান জানিয়ে দেফনে রাখে ইয়ুসুফ ইয়োরোগোস। যদিও মাত্র এক বছর বয়সে এই শিশুপুত্রের মৃত্যু হয়। কোস্তাসের দেশছাড়া হওয়ার পর দেফনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছিল ইয়োরোগোস এবং ইয়ুসুফ। এই যুগলকে হারিয়ে ফেলার পর দেফনের অন্তরে তৈরি হয় এক চিরস্থায়ী যন্ত্রণাময় ক্ষতস্থান৷ বহু বছর পর কোস্তাস সাইপ্রাসের একটি দ্বীপে কর্মসূত্রে ফিরে আসেন একজন প্রতিষ্ঠিত উদ্ভিদবিদ হিসেবে। এই একই দ্বীপে প্রত্নতত্ত্ববিদ হিসেবে তখন কাজ করছে দেফনে। সে কাজ করে কমিটি অফ মিসিং পারসনস নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, যারা ১৯৭৪ সালে যুদ্ধে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মানুষদের দেহাবশেষ শনাক্ত করবার দায়িত্বে নিযুক্ত। দেফনের এই কাজে যোগ দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইয়োরোগোস এবং ইয়ুসুফের পরিণতি কী হয়েছিল, তা জানার চেষ্টা করা। এই দ্বীপে বহু বছর পর কোস্তাস এবং দেফনে আবার মিলিত হয়। অবশেষে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। এরপর তারা ইংল্যান্ডে পাড়ি দেয় এবং সেখানে তাদের কন্যা আডার জন্ম হয়।
কোস্তাস ও দেফনে ইংল্যান্ডে চলে যাওয়ার ঠিক আগে দেফনে জানতে পারে, তাদের প্রিয় বন্ধুযুগল ইয়োরোগোস এবং ইয়ুসুফকে একসঙ্গে বেঁধে হত্যা করে একটি কুয়োর মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সেই কুয়োর তলা থেকে তাদের দেহাবশেষ পাওয়া যায়। দেফনে কিছুতেই তার দুই বন্ধুর নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান না করে সাইপ্রাস ত্যাগ করতে পারেনি। ইয়োরোগোস এবং ইয়ুসুফের সমকামিতা সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ এবং বিদ্বেষ-উদ্রেককারী হলেও, অন্য কেউ তাদের খোঁজ না করলেও দেফনে কিন্তু তাদের খোঁজ করা বন্ধ করেনি। যে কুয়োর তলা থেকে ইয়োরগোস এবং ইয়ুসুফের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয় সেখানে সাধারণত কোনও গ্রিক সাইপ্রিয়ট অথবা কোনও তুর্কি সাইপ্রিয়টকে হত্যা করে ফেলে দেওয়া হত। কিন্তু এই প্রথম কোনও গ্রিক এবং তুর্কি সাইপ্রিয়টের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয় যাদের একসঙ্গে বেঁধে হত্যা করা হয়েছিল এবং শরীর দু’টি একে-অপরের সঙ্গে যুক্ত অবস্থাতেই কুয়ো থেকে তোলা হয়। অর্থাৎ, মৃত্যুও ইয়োরোগোস এবং ইউসুফকে একে অপরের থেকে পৃথক করতে পারেনি— “…usually it’s a Greek Cypriot buried here, a Turkish Cypriot buried there. Killed separately. Buried separately. But never before a Greek and Turk murdered together…”, ‘So now they will be separated’… ‘they can’t be buried side by side. How sad—all this time we spent looking for them and maybe it would have been better if they were never found… if they could have remained lost together.’
দেহাবশেষ খুঁজে পাওয়ার পর যখন নিয়মমাফিক ইয়োরোগোস এবং ইউসুফকে সমাধিস্ত করা হয় তখন দুজনের দেহকে বন্ধনমুক্ত করে আলাদা আলাদা জায়গায় কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয় স্বাভাবিকভাবেই। এই বিচ্ছেদ দেফনেকে কষ্ট দেয় কারণ তার দুই প্রিয় বন্ধুর সমকামী সম্পর্ক সমাজে অস্বীকৃত হলেও তার চোখে তা ছিল পবিত্র এবং আদর্শ ভালবাসার নিদর্শন।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৯০ সালে প্রকাশিত জুডিথ বাটলারের ‘জেন্ডার ট্রাবল’ বইতে উল্লিখিত ‘heterosexual matrix’-এর ধারণা। বাটলারের মতে সমাজে নারী এবং পুরুষ শুধুমাত্র দু’টি পৃথক জৈবিক শ্রেণি নয়। সমাজে কোনও পুরুষ বা নারীকে একটি বিশেষ লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃত হতে হলে তার লিঙ্গপরিচয়, শারীরিক গঠন, যৌন আকাঙ্ক্ষা এবং আচার-আচরণের মধ্যে একরকম সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। অর্থাৎ একজন মানুষ, যার শরীরে নারী-যৌনাঙ্গ রয়েছে, তাকে আচার-আচরণেও হতে হবে নারীসুলভ। তার যৌন আকাঙ্ক্ষা ধাবিত হতে হবে বিপরীত লিঙ্গের প্রতিই। একজন পুরুষের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই। যদি কোনও পুরুষ অন্য পুরুষের প্রতি আকর্ষিত হয় বা কোনও নারী যৌন আকাঙ্ক্ষা অনুভব করে কোনও নারীর প্রতি, তাহলে সেই আকর্ষণকে ‘heterosexual matrix’ অনুযায়ী স্বাভাবিক বা আদর্শ সম্পর্ক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না। ইয়োরোগোস এবং ইউসুফের সম্পর্ক এই ‘heterosexual matrix’-এর নিরিখে সমাজের চোখে অগ্রহণযোগ্য এবং অবৈধ। বাটলার তাঁর ২০০৪ সালে প্রকাশিত ‘Precarious Life’ এবং ২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘Frames of War’ এ পাঠকদের এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন যে, কেন সমাজে কিছু মানুষের জীবনকে বেশি মূল্যবান বলে মনে করা হবে? কেন তাদের মৃত্যুতে শোকের গভীরতা অধিক মাত্রায় অনুভূত হবে? উল্টোদিকে ভিন্ন জাতির বা ভিন্ন যৌনতার মানুষদের জীবন কেন সমানভাবে মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে না? কেন তাদের মৃত্যুতে একই রকম শোকক্লিষ্ট হবে না সমাজ? এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক মাইকেল ওয়ার্নার প্রবর্তিত heteronormativity-র ধারণাও। ওয়ার্নারের বক্তব্য অনুযায়ী বিসমকামী সম্পর্ক আসলে একটি সামাজিক ব্যবস্থা বা সোশ্যাল সিস্টেমের অংশ যা নারী-পুরুষের সম্পর্ককে সাংস্কৃতিক এবং পারিবারিক জীবনযাপনের পরিসরে গ্রহণযোগ্য এবং স্বাভাবিক সম্পর্ক হিসেবে প্রতিপন্ন করে। নারী-পুরুষের বিবাহ এবং প্রজননকে সামাজিক অগ্রগতির মাপকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এই সমাজ ব্যবস্থা। ফলে যারা এই সামাজিক কাঠামোর বাইরে অবস্থান করেন তাদের জীবনযাপনের ভিন্ন ধারাকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে সাধারণ মানুষ। দেফনে ইয়োরোগোস এবং ইউসুফের সমকামী সম্পর্ককে গোটা সমাজের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিল। তার কাছে ভালবাসা জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গচিহ্নভিত্তিক পরিচয়ের থেকে নিবিড়তর এবং গভীরতর এক মানবিক অভিজ্ঞতা। ইয়োরোগোস এবং ইয়ুসুফের দেহাবশেষের সঙ্গে পাওয়া যায় একটি হাতঘড়ি। ঘড়িটি দেখামাত্র চিনতে পারে দেফনে। সে বলে যে ইউসুফ ইয়োরোগোসের জন্মদিনের ঘড়িটি তাকে উপহার হিসেবে দিয়েছিল। সে একথাও জানায় যে, ঘড়িটির ভেতরে কনস্টান্টিন কাভাফির লেখা একটি কবিতাও থাকার কথা! কাভাফি লিখিত অনবদ্য চিত্রকল্পমুখর সমলিঙ্গ প্রেমের কবিতার কথা কে না জানে? ঘড়িটির ভেতরে খোদাই করা ছিল কাভাফির কবিতার দু’টি লাইন—
‘Arriving there is what you are destined for,
But do not hurry the journey at all…’
নিয়তির কী অদ্ভুত খেলা! দু’জনের যাত্রাই শেষ হল একসঙ্গে, তাড়াহুড়োর মধ্যে। তবে এই ঘটনাস্রোত থেকে বোঝা যায় দেফনে ইয়োরোগোস এবং ইয়ুসুফের জীবনে ঠিক কতখানি মূল্যবান ছিল।
কোস্তাস এবং দেফনে ইংল্যান্ডে চলে যাওয়ার আগে তারা ‘দ্য হ্যাপি ফিগ’ পানশালার ডুমুর গাছটির ডাল ভেঙে নিয়ে যায় এবং লন্ডনে নিজেদের বাড়ির বাগানে সেটিকে রোপণ করে। গাছটির যেন পুনর্জন্ম হয়। লন্ডনে থাকাকালীন একসময় দেখা যায় দেফনে তার অতীত জীবনের হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলির স্মৃতি থেকে কিছুতেই নিজেকে মুক্ত করতে পারে না। নিজের প্রথম পুত্রের মৃত্যু, কোস্তাসের সঙ্গে প্রাথমিক বিচ্ছেদ, প্রিয় দুই বন্ধুর এবং তাদের প্রেমের অকালপ্রয়াণ, এই সমস্তকিছু তাকে তাড়া করে বেড়াতে থাকে। নিজের অন্তরের শূন্যতা এবং বিষন্নতার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে সে অত্যধিক মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়ে। একদিন ফাঁকা বাড়িতে মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ খাওয়ার ফলে দেফনের মৃত্যু হয় এবং এর ফলে তার কন্যা আডার মানসিক স্থিতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই সময় ইংল্যান্ডে আসে দেফনের বোন মেরিয়েম। আডা প্রাথমিকভাবে মাসির প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে কারণ তাদের জীবনে চরম টানাপোড়েনের সময় মেরিয়েম কোনরকম সহায়তায় করেনি। কিন্তু মাসির কাছ থেকে আডা জানতে পারে তার মায়ের পারিবারিক ইতিহাস, সাইপ্রাসে কি ধরনের বীভৎস জাতিগত সংঘাতের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাদের পরিবারকে এবং দেফনের পরিবারের অভিবাসন সংক্রান্ত সমস্ত অভিজ্ঞতা। মাসির সঙ্গে কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে আডা তার মাকে নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ পায়। এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা ইতিহাস হয়ে ধরা দেয় পরবর্তী প্রজন্মের হাতে।
এই উপন্যাসে শাফাক ক্যাট্রিওনা মর্টিমার এবং ব্রুস এরিকসনের ‘Queer Ecology’-র তত্ত্বটি তাঁর অভিনব লিখনকুশলতায় একটি ডুমুর গাছের অস্তিত্বের দিয়ে প্রকাশ করেছেন। তাহলে ফিরে আসা যাক সেই ডুমুর গাছটির কথায় আরও একবার যেই গাছের কথা দিয়ে এই লেখা শুরু হয়েছিল। শাফাক এই ডুমুর গাছটিকে দিয়েছেন তার নিজস্ব কণ্ঠস্বর। এই গল্পে ডুমুর গাছটিও একজন কথক। এই গাছটি অতীতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার সাক্ষী। নানাবিধ স্মৃতির ধারক। সাধারণত আমরা অতীত বা ইতিহাস জানতে পারি কোনও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। কিন্তু একটি গাছকে কথক হিসেবে এই উপন্যাসে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে শাফাক একটি দুর্দান্ত কাজ করেছেন। তিনি জোর দিয়েছেন নন হিউম্যান ন্যারেশনের ওপর। মানুষ সৃষ্টির কেন্দ্রে রয়েছে এবং অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সমস্ত কিছুরই সে নিয়ন্ত্রক এই ধারণা ভেঙে একটি ডুমুর গাছকে গল্পের কেন্দ্রে রাখার মাধ্যমে শাফাক মনুষ্যকেন্দ্রিকতা থেকে নিজের গল্পের দূরত্বকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এবার প্রশ্ন উঠতে পারে ঔপন্যাসিক কথক হিসেবে একটি ডুমুর গাছকেই কেন বেছে নিলেন? কেন অন্য কোনও গাছ নয়? এই উপন্যাসের পটভূমি মূলত গ্রিসের সাইপ্রাস দ্বীপ। ডুমুর গাছ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের একটি অতি পরিচিত উদ্ভিদ। তাই এই ভূখণ্ডের ওপর ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক সমস্ত ঘটনা— তা সে রাজনৈতিক চঞ্চলতা হোক বা বাস্তুচ্যুতি, সেই সব কিছুরই সাক্ষ্য বহন করে এই গাছ। একটি উদ্ভিদ দ্বারা সংরক্ষিত অতীত কোনওভাবেই পক্ষপাতপূর্ণ বা একপেশে হতে পারে না। সে আনবায়াসড ন্যারেটর। এর ফলে ইউরোগোস এবং ইউসুফের সমলিঙ্গ প্রেমের অভিজ্ঞতা এই গাছ দেখেছে অত্যন্ত সহজ এবং স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। মনুষ্যসমাজ যেখানে সমকামী প্রেমকে অস্বাভাবিক এবং অবৈধ বলে চিহ্নিত করে সেখানে একটি গাছ সব রকম সামাজিক বিধি-নিষেধের বেড়া অতিক্রম করে দু’জন পুরুষের ভালবাসাকে যথার্থ মর্যাদা দিতে সক্ষম। ইউরোগোস এবং ইয়ুসুফ চালিত সরাইখানার নাম ছিল ‘দ্য হ্যাপি ফিগ’, এই জায়গাটি কেন এমন আনন্দময় এবং উৎসবমুখর তা কিন্তু পাঠক জানতে পারছেন পানশালার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা ডুমুর গাছটির দৃষ্টি দিয়েই—
‘It was inside this celebrated eating house and watwering hole- crowded, rowdy, joyous and hospitable–‘… ‘In this very spot was offered the best food, the best music, the best wine and the best dessert, speciality of the house— oven-roasted figs with honey and aniseed ice cream. But there was something else to the place, too, suicide it’s regular customers: it made one forget, even if for just a few hours, the world outside and its immoderate sorrow.’
আবার এই ডুমুর গাছটিই সাইপ্রাসের হিংসাত্মক ইতিহাসের সাক্ষী থেকেছে দিনের পর দিন। গাছটির কণ্ঠস্বরেই পাঠক শুনতে পান সেই সহিংসতা এবং ধ্বংসলীলার ইতিবৃত্ত—
‘When the bomb exploded, one of my branches caught fire from the sparks. Within a few seconds I was in flames. No one noticed. Not for a while. They were all in shock, frantically trying to help the injured, removing the fallen debris, unable to look at the dead bodies. There was dust and smoke everywhere, ashes swirling in the air like a flight of moths around a candle. I heard a woman crying. Not loud, barely audible, almost a muffled sound, as if too afraid to make any noise. I listened and I continued to burn.’
একটি গাছ, সে জ্বলতে-জ্বলতে, ধ্বংস হতে-হতে, সংরক্ষণ করে গিয়েছে ঘটমান মুহূর্তদের, সাক্ষ্য বহন করেছে একটি ভূখণ্ডের রাজনৈতিক সংঘর্ষের বিচিত্র ব্যথাদীর্ণ অভিজ্ঞতার। এই ডুমুর গাছ দেখেছে প্রেম, আনন্দ, ভালবাসার উচ্ছ্বাস, উৎসবমুখরতা, আবার এই সমস্ত কিছুর বিপরীতে দেখেছে ধ্বংস, সহিংসতা, ঘৃণা, মানুষের অমানবিক প্রবৃত্তি। এই বৃক্ষ যেন হয়ে উঠেছে ইতিহাস ও মানব-অভিজ্ঞতার এক অতিকায় আর্কাইভ।
ডুমুর ফলের সঙ্গে যৌন আকাঙ্ক্ষা, শরীরী উর্বরতা এবং প্রজননের প্রত্যক্ষ সাংকেতিক সম্পর্ক রয়েছে। ডুমুরের ফলের ভেতরের অংশ বেশ মাংসল। ফলটির ভেতরে থাকে প্রচুর ছোট ছোট ফুল। এই ক্ষুদ্রাকার ফুলগুলি বাইরের দিকে বিকশিত না হয় ফলের ভিতরে প্রস্ফুটিত হয়। অর্থাৎ, ডুমুর ফল নিজের ভিতরে লালন করে বহুত্বকে। নিজের দেহে ধারণ করে অসংখ্য মুকুল এবং বীজ। এই ফল যেন এমন এক হৃদয় যার আকাঙ্ক্ষা বাইরে থেকে দৃশ্যমান নয়, কিন্তু অভ্যন্তরে পূর্ণ বিকশিত। ডুমুর ফল বাইরে থেকে কঠিন কিন্তু ভিতরটা রসালো এবং নরম- অর্থাৎ একইসঙ্গে এই ফল ধারণ করে পুরুষের কাঠিন্য এবং নারীর কোমলতা বা নারীর স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং পুরুষের কমনীয়তা। হয়ে ওঠে সমকামী, বিষমকামী, উভকামী সমস্ত রকম যৌন আকাঙ্ক্ষা এবং অভিমুখের প্রতীক। এই সূত্রে মনে পড়ে যেতে পারে ডি এইচ লরেন্সের ‘Figs’ কবিতার কিছু লাইন—
‘The fig is a very secretive fruit.
As you see it standing growing, you feel
at once it is symbolic:
And it seems male.
But when you come to know it better,
You agree with the
Romans, it is female. ‘


এলিফ শাফাকের এই উপন্যাসটি তাঁর অন্যান্য অনেক উপন্যাস— যেমন ‘The Bastard of Istanbul’ (২০০৬) ‘The Forty Rules of Love’ (২০০৯), ‘The Architect’s Apprentice’ (২০১৩), ‘Three Daughters of Eve’ (২০১৬), ‘10 Minutes and 38 Seconds in This Strange World’ (২০১৯), ‘There are Rivers in the Sky’ (২০২৪)-এর মতোই মূল কাহিনির কেন্দ্রে রেখেছে প্রান্তিক মানুষদের এবং তাদের ভালবাসাকে। গল্পে বড় হয়ে উঠেছে প্রেম— সমস্ত ঝড়-ঝঞ্ঝা, প্রতিকূলতা অতিক্রম করে টিকে থাকা প্রেম, সামাজিক বিধিনিষেধকে উপেক্ষা করে সহমরণ স্বীকার করে নেওয়া প্রেম, হারিয়ে যাওয়া ভালবাসা খুঁজতে-খুঁজতে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি দেওয়া প্রেম, নিজে পুড়তে-পুড়তে, ছাই হয়ে যেতে-যেতে সমস্ত প্রেমসঞ্জাত স্মৃতি সংরক্ষণ করে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মত প্রগাঢ় ভালবাসা। তাই এই লেখা শেষ করব নিরুদ্দেশ গাছেদের দ্বীপে জায়গা করে নেওয়া বিচিত্র বৃক্ষসদস্যদের মধ্যে অন্যতম— ডুমুর গাছের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিয়েই। পাঠক এই উপদেশ মনে রাখবেন আশা করি—
‘For wisdom, try a beech, for intelligence, a pine; for bravery, a rowan; for generosity, a hazel; for joy, a juniper; and for when you need to learn to let go of what you cannot control, a birch with its white-silver bark, peeling and shedding layers like old skins. Then again, if it’s love you’re after, or love you have lost, come to the fig, always the fig.’




