পরপর আন্তর্জাতিক সাফল্য পরিচালক অনুপর্ণা রায়ের। পুরুলিয়া, মুম্বই, ভেনিস— অনুপর্ণার এই দীর্ঘ যাত্রাপথ নিয়ে, লিঙ্গপরিচিতির লড়াই থেকে প্রতিরোধের ভাষ্য সিনেমায় তুলে ধরা, নানা বিষয় উঠে এল বিদিশা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথোপকথনে। ডাকবাংলা.কম-এর জন্য এক্সক্লুসিভ!
গত বছর ভেনিস ফিল্মোৎসবে ওরিজন্তি বিভাগে সেরা ছবির পুরস্কার পাওয়ার পর দ্বিতীয় ছবি বানানোর সময়ে কতটা চাপে ছিলেন? প্রথমেই একটা লাইমলাইট কি আদতে এক ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়ায়?
পুরস্কার পেয়েছি বলে, আলাদা করে প্রেশার ছিল না। সিনেমা বানানোর সময়ে বাইরের কোনও ফ্যাক্টর বা চাপের থেকেও বেশি, ন্যারেটিভ কীভাবে তৈরি করব, গল্পটা কীভাবে বলব— এটাই মাথায় ঘুরতে থাকে । আর এক্ষেত্রে আমি অনেক আগেই ‘লাভারস ইন দ্য ব্লু নাইট’-এর একটা খসড়া তৈরি করে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম, ‘সংস অফ ফরগটেন ট্রিজ’ সাফল্য পাবে না। তাই, ঠিক করাই ছিল যে, এই চিত্রনাট্যটা থেকে একটা শর্টফিল্ম বানাব। কিন্তু প্রথম ছবির সাফল্যের পর, এই ছবিটা তৈরি করা অনেকটা সহজ হয়ে গেল। ‘খান অ্যান্ড কুমার মিডিয়া’ ছবিটার প্রযোজক হতে রাজি হয়ে গেল এবং তার পাশাপাশি অন্যান্যরাও এগিয়ে এলেন। তবে, আগের ছবির ভুলচুক তো আমি নিজে জানি, সেগুলো কতটা কমিয়ে আনতে পারব, সেই চাপটা ছিলই।
গতবারের পর এবার ভেনিস ফিল্মোৎসবে সেরা এশীয় ছবি হিসেবে নেটপ্যাক পুরস্কার। পর পর দু’বার ভেনিস জয়, অবিশ্বাস্য লাগছে না? যেখানে প্যালেস্টাইনের গণহত্যা নিয়ে তৈরি হওয়া ‘নাজা’-র মতো তথ্যচিত্রর পাশাপাশি আপনার ছবি ‘লাভারস ইন দ্য ব্লু নাইট’-এর নাম উঠে আসছে।
‘নাজা’-র পাশাপাশি আমার ছবির নাম থাকা, এই প্লেসমেন্টটাই আমার সবচেয়ে ভাল লাগছে। এটা আমার কাছে দারুণ প্রাপ্তি। ‘নাজা’-র মতো তথ্যচিত্র বানানো খুব কঠিন। ওদের লড়াইটা আমরা কখনওই পুরোপুরি বুঝতে পারব না, কারণ আমরা অনেকটাই প্রিভিলেজড। গোটা ব্যাপারটা আমার কাছে যেন পরাবাস্তব, স্বপ্নের মতো। আমি চাইছি, এই স্বপ্নের ঘোরটা যেন না কাটে। ছবির প্রদর্শনীর পর, সাত-আট মিনিটের স্ট্যান্ডিং ওভেশনে আমাদের গোটা টিমই খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল।

আরও পড়ুন: ভাল চিত্রনাট্য আসলে জীবন্ত!
হানি ত্রেহানের সঙ্গে কথোপকথনে উদয়ন ঘোষচৌধুরি...
আপনি ভেনিসে ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জোর পরিচালিত ‘নাজা’ দেখেছেন? পরিচালকদ্বয়ের সঙ্গে কি আপনার কথা হয়েছে?
অবশ্যই দেখেছি ছবিটা। এমন ছবি করতে যে কতটা সাহস লাগে, তা আমাদের অনুধাবন করাও বোধহয় সম্ভব নয় । ‘ নাজা ‘ র মতো তথ্যচিত্র তৈরি করাটাই একটা বিপ্লবের মতো। এবং এখন তো শুনছি তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হতে পারে। এমন শক্তিশালী ছবি তৈরি করার পর যখন সরকার থেকে তিরস্কার জোটে, তখন বুঝতে হবে— ‘আর্ট ইজ পাওয়ারফুল’। আব্রাহাম এবং র্যাচেলের সঙ্গে দেখা, কথা দুই-ই হয়েছে। ওদের কথাবার্তার মধ্যে এক গভীর বেদনা আছে। সেটা আমি খানিকটা বোঝার চেষ্টা করলাম। তারপর উপলব্ধি করলাম, ওদের এই বেদনাটা, ওদের ভেতরের দুঃখটা আমার বা আমাদের পক্ষে কোনওদিনই সম্পূর্ণভাবে বোঝা সম্ভব নয়। বড়জোর সমব্যথী হতে পারি আমরা, আর বেশি কিছু পারব না। কিন্তু ওদের থেকে একটা জিনিস পেয়েছি, সেটা ওদের এই অদম্য সাহস। ওদের সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর মনে হয়েছে, আমিও হয়তো আরও একটু সাহসী হতে পারি। আর এই সাহসটা আমাদের ভারতীয় চলচ্চিত্রকারদের খুব দরকার।
ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে প্রতিরোধের কথা বলা ক্রমশ আরও কঠিন হয়ে উঠছে, পৃথিবীর যে-কোনও প্রান্তেই। চলচ্চিত্রকার হিসেবে এটা কীভাবে ভাবায় আপনাকে?
আমি আমার ক্রাফট বা নির্মাণশৈলী নিয়েই ভাবি। আমার সিনেমা তৃতীয় বিশ্বের কথা বলে। কারণ এটাই আমার সামাজিক সত্য। আর এই সমাজে ঘটে চলা নানা অন্যায়-অবদমনের ছবি যেন তুলে ধরতে পারি, এটুকুই আমার চাওয়া। কেবলই লঘু বিনোদন পরিবেশন করে গেলে চলবে না। আমি বলছি না যে, সমাজ সংশোধনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছি। কিন্তু যে-সমাজে আমি রয়েছি, বাঁচছি, তার বিশ্লেষণ-প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে নিজের সত্যটা বা আমার ব্যক্তিসত্তাকেও খোঁজার বা বোঝার চেষ্টা করছি। আমার সমবেদনার ভাষাও আমাকে শিখতে হবে, এবং তা আমাকে নিজেকেই আবিষ্কার করতে হবে। আমি আলুসেদ্ধ-ভাত খেয়ে নেব, কিন্তু কেবলই বিক্রয়যোগ্য, অর্থহীন, বিনোদনমূলক ছবি বানাতে পারব না।

বুসান ফিল্মোৎসবে তো এশিয়ান প্রিমিয়ার হবে ‘লাভারস ইন দ্য ব্লু নাইট’ ছবির। আপনি সেখানে জুরি হিসেবেও থাকছেন।
হ্যাঁ, অক্টোবরের শুরুতে সেটা হচ্ছে। এটা আমার কাছে বিশাল ব্যাপার । সিনেমা স্ক্রিনিং এর পাশাপাশি জুরি হওয়া যতটা সম্মানের আমার কাছে তার চেয়েও বেশি গুরত্বপূর্ণ দায়িত্বেরও। এটা ভেবে ভালো লাগছে অনেক সিনেমা দেখার সুযোগ হবে । নতুন অনেক কিছু শেখার সুযোগ তৈরি হল । এছাড়াও অস্ট্রেলিয়ার ‘ফিকশন ফিচার কম্পিটিশন’ বিভাগে দেখানো হবে ছবিটা, চলতি বছরের শেষেই।
আপনার সাম্প্রতিক ছবিতে একজন ‘ক্লোজেটেড গে’, তার স্ত্রী, এক চোর ও এক দালালের গল্প বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটা একটা নির্দিষ্ট আর্থ-সামাজিক শ্রেণির অন্তর্লীন ছবিটা তুলে ধরছে। মূলত প্রান্তিক শ্রেণির গল্পই বার বার তুলে ধরতে চান?
আমি আসলে প্রান্তিক হিসেবে মানুষকে দেখতে চাই না। মানুষকে মানুষ হিসেবেই গণ্য করি। ছোটবেলা থেকে জাতিভেদপ্রথা দেখে বড় হয়েছি। এবং আমার পরিবারে বড়দের মধ্যেও এই বৈষম্যর প্রভাব দেখেছি, এখন ভাবলে লজ্জাই করে।
কিন্তু বিশেষ করে এই চারজনের গল্পই কেন বলতে চাইলেন?
আমিনা-র কথাই প্রথমে বলি। আমার ছোড়দাদুর বাড়িতে আমিনা একজন বন্ডেজ লেবার হিসেবে এসেছিল। আর আমি ছোট থেকে ওকে দেখেই বড় হয়েছি, কারণ ও আমার দেখাশোনা করত। আমিনা-র প্রসঙ্গ এলে আমার প্রথমেই দুটো জিনিস মনে পড়ে। আমাদের পুকুরপাড়ে আমিনা ছিপ নিয়ে বসে আছে। অপেক্ষায় আছে, কখন মাছটা টোপ গিলবে। দ্বিতীয় ছবি হল, রাতে সব কাজ ফুরিয়ে এলে মশারি টাঙিয়ে আমিনা একা শুয়ে আছে। আমার তখন সাত কি আট বছর বয়স। ওকে আমি প্রায়ই জিজ্ঞেস করতাম, তুমি তোমার বরের সঙ্গে কেন ঘুমাও না? তখন ও বলত, বর আমার সঙ্গে ঘুমোতে চায় না। তখন ছোট ছিলাম, অত বুঝিনি। বড় হওয়ার পর বুঝতে পারি, আমিনা-র স্বামী করিমের সেক্সুয়ালিটি হয়তো আলাদা ছিল। ১৭/১৮ বছর বয়সে পৌঁছে মনে হত, আমিনা-র ভালবাসা পাওয়ার অধিকার আছে। শি নিডস টু বি সিন, লাভড, ডিজায়ারড। যদিও এখন আমার মনে হয়, একজন স্বামী থাকাই স্বাধীনতার চিহ্ন হয়তে পারে না। কিন্তু আমিনা-র দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বিষয়টা দেখা যায়, তাহলে এই ভালবাসাই ওর কাছে মুক্তি। এই যে অবদমনের একটা পিতৃতান্ত্রিক বৃত্ত, সেটাই দেখানোর চেষ্টা করেছি। করিমকে ছেড়ে আমিনা যখন অন্য একটি পুরুষের প্রেমে পড়ল, তখনও কিন্তু সে আবার আরেকটা বৃত্তে ঢুকল। বিবাহ প্রতিষ্ঠানটা আমার কাছে এরকমই বৃত্তাকার একটা চক্র।

করিমের যে যৌন-অভিমুখ, বর্তমান সমাজে তারও তো একটা লড়াই আছে।
করিমের লড়াই কেবল তার সমান্তরাল যৌন পরিচিতির কারণেই নয়, তার আরও কিছুটা ব্যাপ্তি আছে। সমাজ ‘সিস-হেট’ অর্থাৎ বিষমকামী পুরুষকে যে-কর্তৃত্ব ও কর্তব্য সঁপে দিয়েছে, তা থেকেও সে বেরোতে পারছে না। ওর ভাবনাগুলো তো এই খোপেই ঢুকে বসে আছে। আমি তো ছেলে! আমাকে তো দায়িত্ব নিতেই হবে। আমার বউকে সবরকমভাবে আমাকেই সামলাতে হবে। স্ত্রী-র পরিচয়পত্র আমার কাছেই থাকবে, স্ত্রী-র হয়ে সিদ্ধান্ত আমাকেই নিতে হবে। এই কর্তব্য তো পুরুষেরই! এই ভাবনা এবং তা থেকে জন্ম নেওয়া যে-দ্বন্দ্ব, তাতে করিমও জেরবার।
কিন্তু এই দুটো চরিত্রকে আপনি মুম্বইতে এনে ফেললেন কেন?
এখানে একটু বলে রাখি, আমার কিন্তু আলাদা করে কোনও মুম্বইপ্রীতি নেই, কোনও রোম্যান্টিকতাও নেই। এই শহরে আমি কাজ করার জন্য এসেছি। কারণ সিনেমা তৈরির খানিকটা অনুকূল পরিবেশ মুম্বইতে আছে, এটা মানতেই হবে। তাছাড়া বাকি দুটো চরিত্রের গল্প নিয়ে গোটা টিম কাজ করেছে।
এই ছবি বহুভাষিক। মারাঠি, হিন্দি, সিলেটি-বাংলা— এতগুলো ভাষা নিয়ে কাজ করার কথা ভাবলেন কেন?
মুম্বইয়ে গোটা ভারত থেকে মানুষ কাজের খোঁজে আসে। যেমন, আমিও মাইগ্রেট করেছি। কাজেই এই অভিবাসন নিয়ে কথা বলতে গেলে, ভারতের বৈচিত্র নিয়ে কথা বলতে গেলে, ভাষার ক্ষেত্রে অবিচার করা সম্ভব নয়।
ঠিকই সেক্ষেত্রে তো গোটাটা হিন্দিতে হতে পারে না…
কেনই বা হবে! আমার কাছে, এই আন্তঃরাজ্য অভিবাসনের গল্পগুলো রীতিমতো রাজনৈতিক। এই পরিযায়ীরা কারা? তারা কেন তাদের গ্রাম ছেড়েছে? এটা তো বুঝতে হবে সেখানে ভাষা একটা বড় হাতিয়ার ।
প্রেম, গ্রহণযোগ্যতা, স্বাধীনতা আপনার ছবিতে ফিরে-ফিরে আসে। সেটা কি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সূত্র ধরেই?
অবশ্যই এটা একটা ব্যক্তিগত পরিসর থেকে উঠে আসে। আমার নিজের মতো করে স্বাধীনতা খুঁজে পাওয়ার অভিযাত্রাটাও খুব দীর্ঘ, এবং তা এখনও চলছে। নিজের মতো করে ভালবাসা খুঁজে পাওয়া, নিজের রাস্তা খুঁজে পাওয়া— এই লড়াই থেকেই গল্পগুলো উঠে আসে।

পুরুলিয়া থেকে দিল্লি হয়ে মুম্বই পেরিয়ে ভেনিসে পৌঁছে যাওয়া— এই রোডম্যাপে স্বাধীনতা বা ভালবাসার মানে কী আপনার কাছে?
যখন কেউ স্বাধীনতা নিয়ে আমায় প্রশ্ন করে, আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। যখন ছোট ছিলাম, আমাকে বারংবার বলা হয়েছে, ‘ঘর থেকে বেরোবে না, নদী দেখতে যাবে না।’ আমি বুঝতেই পারতাম না কেন, যতদিন-না পর্যন্ত বহতা নদীর সৌন্দর্য আমি খুঁজে পেয়েছি। কাজেই, আমার কাছে স্বাধীনতার কোনও রেডিমেড সংজ্ঞা নেই। বরং, আমার প্রশ্ন জাগে, ছোটবেলার বন্ধু ঝুমা নাথকে আমি কেন হারালাম? দলিত মেয়েদের বিয়ে হলে অনুদান পাওয়া যাবে এমন উদ্যোগের জন্যই তো ঝুমাকে হারালাম। ভালবাসার কথা উঠলে, সবার আগে একটাই কথা বলব— লাভ ইজ বিয়ন্ড জেন্ডার।
আপনার তিনটে ছবিতেই লিঙ্গ-পরিচিতির ঊর্ধ্বে উঠে ভালবাসার কথা বলেছেন আপনি!
হ্যাঁ, এটাও আমার ব্যক্তিগত পরিসর থেকেই উঠে এসেছে। কেবল এই কারণেই নয় যে, আমার চারপাশে আমি এমন মানুষ দেখেছি, সেটা তো আছেই। কিন্তু একটা সময়ের পর মনে হয়, একজন মহিলা হয়ে আরেকজন মহিলারও তো প্রেমে পড়া যায়! জেন্ডার ফ্লুইডিটি বা জেন্ডার ট্রানজিশন আমাকে খুবই ভাবায়। এটা আমার প্রিয় বিষয় বলতে পারেন। পরের ছবিতে রূপান্তরকামী নারীর (‘ম্যান টু উওম্যান’) গল্প নিয়েই কাজ করছি। এছাড়াও এমন এক দম্পতির রোম্যান্টিক সম্পর্ক নিয়ে গল্প লিকছি , যারা একটা বোঝাপড়াভিত্তিক বিয়েতে আটকে পড়েছে। এটা খুব ব্যক্তিগত জায়গা থেকেই বলা, খানিকটা আমার পরিবার ঘিরেই বলতে পারো। ছবির নাম হচ্ছে, ‘ইন দ্য শ্যাডো, ইন দ্য লাইট’। সেটা নিয়ে এখন কাজ চলছে এই ভেনিসে বসেও ।
কিন্তু আপনার ছবি ভারতীয় দর্শক কবে দেখতে পাবে?
এর উত্তর দেওয়া খুবই কঠিন। এটুকু বলতে পারি, আমার এনএফডিসি-র ওপর ভরসা আছে, সেন্সরবোর্ডের ওপর ভরসা আছে। তারা যে-কারণেই ছবিটা আটকে রাখুক-না কেন, সেটা নিশ্চয়ই বিবেচনাযোগ্য। আমাকে তারা কথা দিয়েছে, ছবিটা (‘সংস অফ ফরগটেন ট্রিজ’) রিভিউ করা হবে, এবং এই প্রক্রিয়ার ওপর আমি আস্থাই রাখছি। কারণ, আমার ছবিটা কাটাছেঁড়া করলে, ভালবাসা আর বন্ডিং ছাড়া কিছুই পাওয়া যাবে না।




