সংবাদ মূলত কাব‍্য: পর্ব ৩০

Representative Image

তফাত যাও

সাতসকালে আমাদের কাছ থেকে সৌগতর হোল্ড-অল খোয়ানোর কথা জেনে মাঠ পেরিয়ে চাচা মোহর সিং আর রছেড় গ্রামে বাচ্চাকাচ্চার দল হাইওয়ের ধারে রছেড় গ্রামের বাসস্টপে তুমুল হইচই জুড়ে দিল। আগ্রাগামী ও অম্বাগামী বাস দেখলেই ওরা চেঁচিয়েছিল, ‘কোই হামারা বাঙ্গালি মেহমান কা বিস্তার দেখা? দেখা কোই?’ গ্রামে-গ্রামে এই বার্তা রটি গেল ক্রমে। বেলা একটু গড়াতে অম্বা থেকে আগ্রাগামী একটি বাসের কন্ডাকটর বললেন, ‘হা হা, অম্বা বাসঘাঁটি মে যাও… মিল যায়েগা।’ তৎক্ষণাৎ আমি আর সৌগত একটা অম্বাগামী বাসে।

অম্বা বাসঘাঁটিতে ‘ডাকাতের দেশে’র রাজ‍্য পরিবহনের দীর্ঘকায়, স্বাস্থ‍্যবান লোকজনেরা ‘আও, আও, বাঙ্গালি ভাইলোগ, তুমহারা সামান লে যাও, লে যাও তুমহারা সামান’ বলে সৌগতর ওই হোল্ড-অলটি ঘরের কোণ থেকে এনে দিলেন। করমর্দন ও আলিঙ্গনের বন‍্যা বইয়ে দিল সৌগত। হোল্ড-অল খুলে ক‍্যামেরা ও লেন্স ইত‍্যাদি বের করে শতাধিক না হলেও অর্ধশতাধিক পরিবহন কর্মকর্তা, ড্রাইভার, কন্ডাকটরবৃন্দের ছবি তুলল। কী ভালো, কী ভালো, যেন অপরূপ ওই অম্বা বাসঘাঁটির কচৌরি আর জিলাবি!

আরও পড়ুন: পায়ে পুলিশের গুলি, আহত অবস্থায় ধরা পড়ে তহশিলদার সিং নিজের পরিচয় গোপন করেছিলেন! লিখছেন মৃদুল দাশগুপ্ত…

অম্বা। আমার মাথায় ঘুরছিল তহশিলদার সিংয়ের কাছ থেকে শোনা পুতলিবাইয়ের মেয়ে তান্নোর কথা; ১৯৫৮ সালে পুলিশের গুলিতে চম্বল নদীতে সন্তরণরতা পুতলিবাই যখন নিহত হন, শিশু তান্নো তখন এই অম্বারই অদূরে বারবাই গ্রামে দিদিমা আসগরবাইয়ের কাছে বড় হচ্ছিল। যথাকালে চম্বলের গ্রামসমাজ তান্নোর বিয়ে দিয়েছে কলকাতায়। ভাবছিলাম কলকাতায় ফিরে খুঁজে বের করব তান্নোকে। অম্বার বাসঘাঁটির একটি যুবক হাইওয়ে থেকে দূরে ধু-ধু বেহড়ের ভেতর দেখালেন বারবাই গাঁও, পুতলিবাইয়ের গ্রাম।

গত শতকের পাঁচের দশকে মান সিংয়ের বাগীদলটির সমতুল নামডাকওয়ালা হয়ে উঠেছিল পুতলিবাইয়ের দলটিও। পুতলি ছিলেন চম্বলের ইতিহাসে প্রথম নারীদস‍্যু। অম্বার অদূরে ওই বারবাই গ্রামে তাঁর জন্ম। পুতলিবাইয়ের মা আসগরিবাই ছিলেন সে-আমলে ওই অঞ্চলের নামী নর্তকী। পুতলির আসল নাম গোহরবানু। মায়ের কাছে নাচ শিখেছিল গোহরবানু আর তাঁর বোন তারাবানু। কিশোরী বয়সে গোহরবানু যখন নর্তকী হিসেবে গ্রামশহরে প্রশংসিত হল, পুতুলের মতো দেখতে বলে গ্রামবাসীরা তাঁর নাম দিল ‘পুতলি’।

ঢোলপুরে এক জমিদারের ছেলের বিয়ে। মায়ের সঙ্গে নাচ দেখাতে গিয়েছিল পুতলি। রাতে সে-বিয়ের আসরে ডাকাত পড়ল। ওই অঞ্চলের সে-সময়ের খুঁখার বাগী সুলতানের দলবল। কেউ বলে সুলতান পুতলিবাইকে অপহরণ করেছিল, কেউ বলে পুতলি নিজে চলে গিয়েছিল সুলতানের সঙ্গে। সময় গড়াতে জানা গেল, বেহড়েই সুলতানের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেছে। আরও সময় যেতে খবর রটল, মেয়ে হয়েছে ওদের, সে-মেয়েই তান্নো।

দলেই এক গোষ্ঠীকলহে কল‍্যা নামে এক দস‍্যুর গুলিতে সুলতান খুন হওয়ার পর পুতলিবাই ঘোর আক্রোশে কল‍্যা ও সুলতানবিরোধীদের খুন করে সুলতানের শাগরেদদের নিয়ে নিজের দল গড়ে। হয়ে ওঠে চম্বলের ত্রাস। শিশুকন‍্যা তান্নোকে পুতলি রেখে এসেছিল বারবাই গ্রামে মায়ের কাছে। একবার পুলিশের সঙ্গে এনকাউন্টারে পুতলির বাঁ-হাতটা বাদ গিয়েছিল। ১৯৫৮ সালের জানুয়ারিতে শীতের রাতে পুলিশের তাড়া খেয়ে কুমির-ভরা চম্বল নদী সাঁতরে পুতলিবাই পালাচ্ছিল, গুলিবিদ্ধ হয়ে নদীর পারে পুতলিবাই মারা যান। মৃত‍্যুর কয়েক মাস আগে আত্মসমর্পণ করতে চেয়ে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে পুতলি চিঠি দিয়েছিলেন। সাড়া মেলেনি।

ফুলন দেবী

পুতলিবাইয়ের পর চম্বলের ইতিহাসে বন্দুক হাতে বেহড়ে হিংসার পথ ধরা নারীদের মধ‍্যে ফুলনদেবীর পরিচিতি এদেশের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ১৯৮০ সালের ডিসেম্বর/১৯৮১ সালের জানুয়ারিতে ফুলনদেবী যখন তাঁর হিংসাশ্রয়ী বাগী জীবনযাপনের তুঙ্গ সময়ে, তাঁর জীবনসঙ্গী বিক্রম মাল্লা দলের ঠাকুরদস‍্যু শ্রীরামের হাতে খুন হয়েছেন। ঠাকুরদের গ্রামে গণধর্ষিতা হয়েছে ১৮/১৯ বছর বয়সি মাল্লা তরুণী ফুলন। ঠাকুরদের দাপটে গমগম করছে তাদের গ্রামগুলি আর মুষড়ে-পড়া মাল্লা মহল্লাগুলিতে ধিকিধিকি আগুন জ্বলছে কাঠকুটোয়, বদলা নেওয়ার ধোঁয়া উঠছে ঘুরপাক। সারা গায়ে কাটাকুটির চিহ্নবাহী দাউদাউ ক্রোধে উন্মত্ত ফুলন আর তাঁর সঙ্গে আসা বিক্রমের ভাঙা দলের মাল্লা শাগরেদদের আশ্রয় দিয়েছিলেন তখনকার এক বাগীসর্দার— বাবা মুস্তাকিন। চম্বলের ভেতরে গোয়ালিয়রের গোয়েঙ্কা রাজাদের একটি ভগ্নপ্রায় দুর্গে তখন থাকতেন বাবা মুস্তাকিন। ওই দুর্গেই সে-সময়ে শক্তপোক্ত হয়ে উঠছিল বাবা মুস্তাকিন আর ফুলন দেবীর দল, একত্রে মিলেমিশে। তখনই, ঠিক ওই সময়টিতেই আমি আর সৌগত পৌঁছেছিলাম চম্বলের বেহড়ে। তিন রাজ‍্যব‍্যাপী বেহড়ের গোলকধাঁধায় কত-না ভাঙা দুর্গ, আর ময়ূর-দৃষ্টিতে বিভ্রম জাগানো পাখি! সেই চম্বলের বেহড়ে ত্রাস ছড়ানো আরও কয়েকজন সশস্ত্র নারী ছিলেন— ভিন্দ, মুরেনায় সীমা পরিহার, কুসুম নইনা, বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে হাসিনা। তবে তাঁরা খুচরো।

উত্তরপ্রদেশের ঘুরা কা পুরায়া গ্রামে ১৯৬৩ সালে ফুলনের জন্ম তথাকথিত নীচু মাল্লা পরিবারে। ফুলনের বাবার জমিজমা গ্রাস করেছিল ফুলনের জ‍্যাঠা ও তার ছেলে মায়াদিন। জ‍্যাঠতুতো দাদা মায়াদিন সর্বদা মারধর করত ফুলনকে। জোর করে ১১ বছরের ফুলনের সঙ্গে ৩০ বছরের পুত্তিলালের বিয়ে দিয়ে দেয় মায়াদিন। পুত্তিলালের অত‍্যাচারে বালিকা ফুলন পালিয়ে আসে ফের বাবার কাছে। অত‍্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় জ‍্যাঠতুতো দাদা মায়াদিন। স্থানীয় পুলিশের মদতে চোর অপবাদ দিয়ে মায়াদিন ফুলনকে কয়েক দিন জেলও খাটায়। এরপর এক রাতে পিতৃগৃহ থেকে ফুলন উধাও হয়। কেউ বলে, ফুলনকে ওই অঞ্চলে খুঁখার বাগী সর্দার বাবু গুজ্জর অপহরণ করে। ঠাকুর সম্প্রদায়ের বাবু গুজ্জর ফুলনের ওপর অত‍্যাচার চালাত। এসব দেখে একদিন গুজ্জরের দলের বিক্রম মাল্লা গুলি চালিয়ে দেয়। নিহত হয় বাবু। ফুলনের মতো বিক্রমও মাল্লা। বিক্রম বিয়েও করে ফুলনকে। এরপর বছর ঘুরতে-না-ঘুরতে বিক্রম-ফুলনের নেতৃত্বাধীন দস‍্যুদলটিতে মাল্লা বনাম ঠাকুরদের উত্তেজনা ছড়াতে থাকে। এ-দলে ছিল ঠাকুর দু-ভাই শ্রীরাম ও লালারাম। শ্রীরাম-লালারাম ভ্রাতৃদ্বয় আচমকা বিক্রমকে হত‍্যা করে ফুলনকে তুলে নিয়ে যায় বেহমাই গ্রামে। ঠাকুরদের ওই গ্রামে গণধর্ষিতা হয় ফুলন। ক্রোধে দাউদাউ তরুণীটিকে বেহড়ে গোয়ালিয়র রাজের এক ভাঙা দুর্গে আশ্রয় দেন বাগী সর্দার বাবা মুস্তাকিন।

মালখান সিংয়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মান সিং-পুত্র তহশিলদার বলেছিলেন, ‘ঘুমো, ঘুমো, মিল যায়েগা।’ কিন্তু ফুলন দেবীর সাক্ষাৎ পাওয়া, হাত উলটে তহশিলদার বলেছিলেন, দুষ্কর, খুব দুষ্কর। এ-জেলা সে-জেলা বেহড়ে ঘুরতে-ঘুরতে গোয়ালিয়র-রাজের কয়েকটি দুর্গের ধ্বংসস্তূপে একা শুধু ময়ূর ঘুরছে, দেখেছি। কেবল ভিন্দ জেলার বলধওয়ারের বেহড়ে দূরের একটি ভাঙা দুর্গ থেকে উসকোখুসকো একটি লোক চেঁচিয়েছিল, ‘তফাত যাও…।’